সিলেট ভ্রমণের ইতিবৃত্তান্ত: বিছানাকান্দির হুটহাট পরিকল্পনা

সিলেট নিয়ে গল্প শুরু করেছি আগের লেখায়। আগের রাতটা টাঙ্গুয়ার হাওরের তাহিরপুরে নৌকায় কাটিয়েছি। পরদিন সকালে তাহিরপুর থেকে লেগুনায় করে ৮০ টাকা দিয়ে চলে আসলাম সুনামগঞ্জ। ৯০ টাকা দিয়ে বাসের টিকেট কেটে উঠে পড়লাম সিলেটের বাসে। একটু হিসেব নিকেশ করছিলাম কত টাকা খরচ গেল টাঙ্গুয়ার হাওরে। যোগ বিয়োগ করে বুঝলাম প্রতিজনের ১,৬৫০ টাকার মতো খরচ হয়েছে সিলেট পর্যন্ত ফেরত আসতে। আমরা আসার আগেই এই ট্যুরের বাজেট ঠিক করেছিলাম ৩,০০০ টাকা। পকেট হাতড়ে দেখলাম ভালোই টাকা আছে।
পাশের সিটে বসা বন্ধু শাহরিয়ার বললো এই টাকা রেখে কি লাভ? ব্যস, শুরু হয়ে গেল বাসে বসেই পরবর্তী গন্তব্যের পরিকল্পনা, কীভাবে যাওয়া যায়, কোথায় যাওয়া যায়, খরচ কত পড়বে। দুই-তিন জন বলছে সিলেট শহর ঘুরে দেখবে। সিলেটে আমার মামার বাসা, তাই শহর আগেই ঘুরে বুঝেছিলাম বিশেষ কিছু দেখা যাবে না এখানে। তাই বিছানাকান্দির আইডিয়া দিলাম।

অপরুপা বিছানাকান্দি, ছবিঃ লেখক

বাসেই চলছে আলোচনা। কয়েকজন বিছানাকান্দি যাওয়ার জন্য এক পায়ে খাড়া, কয়েকজন সিলেট শহরকেই প্রাধান্য দিচ্ছে আর কয়েকজন জানে না কী করবে। পরে ঠিক করলাম আগে দেখি কয়টায় সিলেট পৌঁছাই। সুনামগঞ্জ থেকে সিলেট পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর দেড়টা বাজলো। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। যেখানেই যাই, আগে আম্বরখানা যেতে হবে। ২০ টাকা দিয়ে কুমারগাও থেকে আম্বরখানা চলে গেলাম। আম্বরখানায় ছোটখাট একটা ভোটের আয়োজন হয়ে গেল, সিলেট শহর না বিছানাকান্দি? বিপুল ভোটে বিছানাকান্দি জয়যুক্ত হলো, যাদের শহর ঘোরার ইচ্ছে ছিল বুঝিয়ে বললাম বিছানাকান্দি যাই খারাপ লাগবে না। শেষমেষ রাজি হলো সবাই।
লোকে লোকারণ্য বিছানাকান্দিতে, ছবিঃ মাসুদুর রহমান

আম্বরখানা থেকে বিছানাকান্দির উদ্দেশ্যে প্রচুর সিএনজি ছেড়ে যায়। তবে সরাসরি বিছানাকান্দি যায় না, যায় হাঁদারপাড় পর্যন্ত। আম্বরখানা মসজিদের পাশেই সিএনজি স্ট্যাণ্ড। সরাসরি হাঁদারপাড়ের সিএনজি না পাওয়া গেলে আগে সিএনজি দিয়ে চলে যেতে হবে গোয়াইনঘাট, ভাড়া ৮০ টাকা। তারপর গোয়াইনঘাট থেকে সিএনজিতে হাঁদারপাড়, ভাড়া ৪০ টাকা। আমরা সরাসরি হাঁদারপাড়ের সিএনজি পেয়ে গেলাম, ভাড়া ২০০ টাকা চাচ্ছিল। আমরা তো নেট ঘেঁটেই গেছি, তাই ১২০ টাকার উপরে দিবো না বলে উল্টো হাঁটা শুরু করেছিলাম, সিএনজি ওয়ালা ডেকে এনে সিএনজিতে বসালেন এবং আরেকটা সিএনজিও ঠিক করে দিলেন। দুই সিএনজি চললো হাঁদারপাড়ের উদ্দেশ্যে।
বিছানাকান্দি যাওয়ার পথে, ছবিঃ লেখক

সিলেট থেকে হাঁদারপাড়ের ৩-৪ কিলোমিটার রাস্তা খুব সুন্দর, বেশ ভালো। কিন্তু এরপর থেকে শুরু হওয়া কাঁচা রাস্তার বর্ষাকালে যে কী বাজে অবস্থা হয় না দেখলে বোঝা যাবে না। ঝুলে ঝুলে যাচ্ছি সিএনজি দিয়ে। সিলেট থেকে হাঁদারপাড় যেতে ২ ঘণ্টা লাগে সর্বোচ্চ। তবে রাস্তাটি সবসময়ই জ্যামের শিকার হওয়ায় তিন ঘণ্টা লাগলো আমাদের হাঁদারপাড় পৌঁছাতে। আমরা বিকেল ৪টায় পৌঁছালাম সেখানে। তবে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে একটা জিনিস মাথায় রাখা উচিত সেটা হলো যে সিএনজি দিয়ে আসবেন ফিরে যাবেন সেই সিএনজিতেই, ড্রাইভারের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলে নেবেন। নাহলে সন্ধ্যায় সিএনজি পাওয়া বেশ দুষ্কর।
আশেপাশের জনপদ, ছবিঃ লেখক

হাঁদারপাড় থেকে বিছানাকান্দি যাওয়ার জন্য প্রচুর নৌকা পাওয়া যায়, বড় ছাউনি দেয়া নৌকা। এক নৌকায় সর্বোচ্চ ১০ জনই বসা যায়, আমরা ছিলামও দশ জনই। বিছানাকান্দি যাওয়া আসায় নৌকা ভাড়া ১,২০০ টাকা থেকে ১,৫০০ টাকা। তবে সিজনের আগে আগে এই ভাড়া কমে ১,০০০ টাকাও হয়ে যায়। তাই একটু দরদাম করে নেবেন। আমরা হাঁদারপাড় পৌঁছাতেই মাঝিদের ঝাঁক ঘিরে ধরলো, একটু পাশ কেটে বের হয়ে আসলাম আর সরাসরি নৌকায় গিয়ে কথা বলে এক মাঝি ঠিক করলাম ১,২০০ টাকায়। মাঝি আমাদের সেই মজার মানুষ, আমাদের থেকে বয়সে অনেক ছোট। আমাদের নৌকায় উঠিয়ে ছেড়ে দিলো নৌকা সে।

মেঘপাহাড়ের খেলা, ছবিঃ লেখক

নৌকা চলছে মোটরের শক্তিতে। চারপাশে শুধু সৌন্দর্যের খেলা। প্রথম কিছু পথ জনপদের মাঝ দিয়ে গেল, তারপর থেকে আশেপাশের যে সৌন্দর্য লীলা শুরু হলো তা ঢোক গিলে দেখা ছাড়া উপায় ছিল না। বিশাল বিশাল সব মেঘালয়ের পাহাড় আর পাহাড়ের উপরে ভাসমান কুয়াশা মিশ্রিত মেঘের মেলা আশ্চর্যতার সব সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। বিছানাকান্দির সেই নদীতে স্রোতও নেহাত কম ছিল না, ভাবছিলাম এত পানি আসছে কোথা থেকে। পানির রঙটাও লোভনীয়, দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। অনেক কষ্টে সে ইচ্ছে নিবারণ করলাম যখন মাঝি জানালো, “অবাই, আর একটু সময়ের ভিতর পৌঁছায় যাবো বিছানাখান্দি, দয়া করি লাফ-ঝাপ দিয়েন না!” সিলেটি ভাষার সেই অনুরোধ না রেখে পারলাম না, সত্যি সত্যি একটু পরেই পৌঁছে গেলাম বিছানাকান্দি। হাঁদারপাড় থেকে বিছানাকান্দি আসতে ৩০-৩৫ মিনিটের মতো সময় লাগে।

বিছানাকান্দিতে নেমেই বাজারের দিকে এগোতে লাগলাম সবাই, বিকেল পড়ে গেছে। বাজারগুলোর জন্য মনে হলো সৌন্দর্য ঢাকা পড়ে গেছে। প্রচুর মানুষ বিছানাকান্দিতে, এজন্য আরেকটু মনঃক্ষুণ্ণ হলাম। পর্যটন স্থানে উপচে পড়া মানুষের ভিড় আমার কখনোই ভালো লাগেনি। তবে অত-শত চিন্তা না করে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে এই চিন্তা করে হাফপ্যান্ট আর টিশার্টে নেমে গেলাম বিছানাকান্দির পানিতে। পানিতে নেমেই বুঝলাম ঠিক কোন জাদুর টানে হাজার হাজার মানুষ এখানে ছুটে আসে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আর স্রোতস্বিনী এই ধারায় বসে থাকাটাই যেন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পানি খুব বেশি না, বসে পড়লে গলা সমান পানি হয়। আশেপাশে কথা বলে জানলাম অদূরেই আছে বিশাল এক ঝর্ণা, তারই পানি এই বিছানাকান্দির পানি। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো সেই ঝর্ণা ভারতে পড়েছে, বাংলাদেশে নয়।
আয় তবে সহচরী হাতে হাত ধরি ধরি, ছবিঃ লেখক

আগে থেকেই গলায় প্রচণ্ড কাশি বাঁধিয়ে বের হয়েছি সিলেট ট্যুরে, তার উপর টানা এক ঘণ্টা বিছানাকান্দির বরফ পানিতে বসে ছিলাম। স্রোতের তাণ্ডব এতই বেশি যে একটু মাঝখানে যেতে চাইলেই পড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল। আর সেই পানিতে পড়ে গেলে নিয়ন্ত্রণ রাখা খুব কঠিন হয়ে যেত, উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে পানি খেতে খেতে মাথা ফাটাতাম নিশ্চিত। তাই হাতে হাত ধরে নিলাম সবাই আর আস্তে আস্তে মাঝ বরাবর যাওয়া শুরু করলাম। এই পদ্ধতিটা বেশ ভালো কাজে দিয়েছে, বিড়ম্বনার সৃষ্টিও করেছে প্রচুর। কারও যদি পা হড়কে যেত তাহলে সবাই পড়ে যাচ্ছিল একে একে, ভারসাম্যের আজব খেলায় পরাজিত সবাই হার মানেনি শেষ পর্যন্ত।
বিছানাকান্দিতে স্রোতের তাণ্ডব, ছবিঃ লেখক

বিছানাকান্দির রক্ত ঠাণ্ডা করা সেই পানি থেকে উঠে গেলাম মাঝির ডাকাডাকিতে। মাঝি জানালো আরো পরে গেলে সিএনজি পাবো না, রাতে থাকতে হবে এখানেই। মনে করেছিলাম এমনিই ভয় দেখাচ্ছে, তবে কথার সত্যতা বুঝতে খুব বেশি সময় লাগলো না। ফেরার পথ ধরি আমরা। গোধূলীর লালিমায় অপার্থিব লাগছিল অসাধারণ এই ফেরার রাস্তাটিকে। পুরো আকাশ লাল করে সূর্য বাড়ি ফিরছে সারাদিনের দাবদাহ শেষে। ফোন বের করে কয়েকটি ছবি তুললাম, ছবি তুলেই বুঝলাম ঠিক কতটা অপ্রাকৃত লাগছে আজকের আকাশকে।
ফেরার পথে গোধূলীবেলা, ছবিঃ লেখক

হাঁদারপাড়ে নেমেই সিএনজি খুঁজতে লাগলাম, কিন্তু কোনো সিএনজিই এমন নেই যার প্যাসেঞ্জার নেই। একটা চিপাগলি দিয়ে উঠে গেলাম এক ব্রীজে, সেখানে সিএনজি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তবে সেখানেও না পেয়ে মাঝি আমাকে নিয়ে গেল অন্য এক বাজারের দিকে, সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম সব সিএনজি আগেই চলে গেছে। আমাদের সিএনজি লাগতো দুইটা, একটা বাকিরা ব্যবস্থা করছে আরেকটা আমি। এক ড্রাইভারকে সেখানে বসে থাকতে দেখে অনেক অনুরোধ করলাম, কিন্তু তিনি ৯০০ টাকার নিচে যাবেন না। পরে সেখানেই সিএনজি সমিতির অফিসে গেলাম, এক ড্রাইভার ৭০০ টাকায় রাজি হলেন আর অন্যদিকে তারা ৬৫০ টাকায় আরেকটি সিএনজির ব্যবস্থা করে ফেলেছে। একমাত্র মাঝির কারণেই সেদিন হাঁদারপাড় থেকে সিলেট ফিরতে পেরেছিলাম। কৃতজ্ঞতায় হাতে ১০০ টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়েছিলাম, যদিও সে নিতে চায়নি তবুও জোর করেই দিলাম অনেকটা।
আমার ফেরার পথ যদি মেঘে ঢেকে যেত, ছবিঃ লেখক

সিলেট পৌঁছে গেলাম রাত আটটার দিকে, দুইজন বন্ধু দৌড় দিলো ট্রেন ধরবে বলে। আমরা ধীরে সুস্থে সিলেটের পানসি রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসে সারাদিনের খাওয়া-দাওয়া একবারে করলাম। সিলেট রেলস্টেশনের পাশেই অবস্থিত সিলেট বাসস্ট্যাণ্ড থেকে ৩০০ টাকা দিয়ে বি-বাড়িয়ায় টিকেট কিনে নিলাম। রাত সারে এগারোটায় আমাদের বাস ছেড়ে দিলো। ভোর সাড়ে চারটায় নেমে গেলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। এভাবেই শেষ হলো আমাদের দুই দিনের স্বপ্নময় সিলেট ট্যুর।
ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পূর্ণিমার আলোয় নাফাখুমে ক্যাম্পিং

তুক'অ দামতুয়া অভিযান