সবুজের ভূস্বর্গ সিলেটের বুকে দুই রাত তিন দিনের বাজেট ট্রিপ

সিলেট একটি মায়ার নাম। আর এই মায়ার টানে দলবল নিয়ে সিলেটে একবার নয়, হানা দিয়েছি বহুবার। তবুও সিলেট নিয়ে আমাদের আগ্রহ এতটুকুও কমেনি কখনো। সবুজের এই অকৃত্রিম আবাসস্থল বছরের সবসময়ই ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত।

তবে বর্ষাকালে সিলেটের রূপ লাবণ্য যেন উপচে পড়ে। আমার কাছে বর্ষা মৌসুমের সিলেটকেই সবচেয়ে আকর্ষণীয় মনে হয়। গত বর্ষায় সিলেটে তিন দিন দুই রাতের মাঝারি ধরনের ট্যুর শেষ করে আসলাম। আজ সেই ট্যুর সম্পর্কেই সহজভাবে বর্ণনার চেষ্টা করবো।

সবুজের ভূস্বর্গ সিলেট; সোর্সঃ studybarta.com

আমাদের প্ল্যান ছিল মোটামুটি এরকমের-

দিন ১: ঢাকা-শ্রীমঙ্গল-সিলেট

দিন ২: সিলেট-জাফলং-লালা খাল-সিলেট

দিন ৩: সিলেট-বিছনাকান্দি-রাতারগুল-সিলেট-ঢাকা

দিন ১

ঢাকা-শ্রীমঙ্গল

ঢাকা থেকে রাত ৯:৫০-এ উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে করে সিলেটের শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। আনুমানিক ভোর সাড়ে ৪টায় আমরা শ্রীমঙ্গল পৌঁছে যাই। আলো ফোটা অবধি স্টেশনে বসে থেকে স্টেশন থেকে জীপ ভাড়া করি সারাদিনের জন্য। চাইলে সিএনজিও রিজার্ভ করতে পারেন।

 লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান; সোর্সঃ www.newsbangladesh.com

শ্রীমঙ্গলে দেখার মতো ট্যুরিস্ট স্পটগুলো হলো: বাইক্কা বিল, মাধবপুর চা-বাগান (সকাল ৮টায় গেট খোলে), মাধবপুর লেক, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, বাংলাদেশ চা উন্নয়ন কেন্দ্র (BRTI), বধ্যভূমি ৭১, নীলকণ্ঠ কেবিন। উল্লেখিত স্পটগুলো ঘুরে পানসীতে দুপুরের খাবার খেয়ে সাড়ে ৪টার মধ্যে শ্রীমঙ্গল স্টেশনে চলে যাই।

  • ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল ট্রেন ভাড়া= ২৯৫/- (প্রথম শ্রেণী চেয়ার)
  • জীপ রিজার্ভ= ২,৫০০/-
    অথবা, সিএনজি রিজার্ভ= ১,২০০/-
  • মাধবপুর প্রবেশ ফি= ১০০/- (প্রথম চেকপোস্টে ৫০/-, পরের চেকপোস্টে, ৫০/-)
  • লাউয়াছড়া প্রবেশ ফি= ২০/-
  • নীলকণ্ঠ কেবিনে ৮ রঙের চা= ৮০/- (আসলে দেখতেই বেশি সুন্দর, খেতে মোটামুটি)
  • পানসী রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার= ১০০/-
বাইক্কা বিল; সোর্সঃ bangla.jagoroniya.com

শ্রীমঙ্গল-সিলেট

শ্রীমঙ্গল-সিলেট র‍্যুটে দিনে বেশ কয়েকটি ট্রেন যাতায়াত করে। আমরা ৫টার একটি ট্রেনে স্ট্যান্ডিং টিকেট কেটে উঠে পড়ি। ট্রেনে না যেতে চাইলে স্টেশন থেকে অটো করে শ্রীমঙ্গল বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাসে করে সিলেট যাওয়া যাবে। বাসে আড়াই ঘণ্টার মতো সময় লাগে।

সন্ধ্যা ৭টায় সিলেট স্টেশনে পৌঁছে সিএনজি নিয়ে চলে যাই আম্বরখানা মাজারগেটে। সেখানে মাঝারি মানের একটি হোটেলে চেক ইন করে ফ্রেশ হয়ে চলে যাই এখানকার বিখ্যাত পাঁচভাই হোটেলে।

হযরত শাহজালাল (রাঃ)-এর মাজারশরীফ; সোর্সঃ vromonguide.com
  • শ্রীমঙ্গল থেকে সিলেট ট্রেন ভাড়া= ৬৫/- (স্ট্যান্ডিং)
    অথবা,
    স্টেশন থেকে বাসস্ট্যান্ড অটো ভাড়া= ১০/-
    শ্রীমঙ্গল থেকে সিলেট বাস ভাড়া= ১২০/-
  • স্টেশন থেকে মাজারগেট সিএনজি ভাড়া= ২০/-
  • সিলেটে হোটেল ভাড়া= ২,০০০/- (দুইদিনের জন্য, চারজন থাকা যায়)
  • পাঁচভাই হোটেলে রাতের খাবার= ১২০/-

দিন ২

সিলেট-জাফলং

ভোরে উঠে ফ্রেশ হয়ে মাজারগেটের সামনের নরমাল হোটেল থেকে নাস্তা সেরে নেই। সিএনজি নিয়ে চলে যাই কদমতলী বাসস্ট্যান্ডে। সেখানে থেকে বাসে করে জাফলং। অথবা মাজারগেট থেকে সরাসরি রিজার্ভ সিএনজি কিংবা লেগুনা করে জাফলং যাওয়া যায়। প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগবে।

জাফলং; সোর্সঃ travelersofbangladeshblog.wordpress.com

নৌকা রিজার্ভ নিয়ে চলে যাই জিরো পয়েন্টে। নৌকার মাঝিই গাইড হিসেবে কাজ করবে। সেখান থেকে ৫-৭ মিনিট হেঁটে সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা যা অনেকে মায়াবী ঝর্ণা নামেও চেনে। এখানে আরও রয়েছে খাসিয়াপল্লী, চা-বাগান, পান বাগান, জমিদার বাড়ি।

  • সিলেট থেকে জাফলং বাস ভাড়া= ৬৫/-
    অথবা, রিজার্ভ সিএনজি= ১,৫০০-১,৮০০/-
    রিজার্ভ লেগুনা= ২,০০০-২,৫০০/-
  • নৌকায় জাফলং জিরো পয়েন্ট থেকে মায়াবি ঝর্ণা= ৪৫০/- (রিজার্ভ)

জাফলং-লালাখাল-সিলেট

জাফলং থেকে বাসে করে আসার পথে বাস কন্টাক্টরকে বলে সারিঘাট লালাখাল রোডের মুখে নেমে যাই। সেখান থেকে অটোতে লালাখাল ট্যুরিস্ট স্পটে চলে যাই। এখানে নৌকা দিয়ে ঘোরা যায়। নদীর স্বচ্ছ সবুজাভ পানি এর মূল আকর্ষণ।

লালাখাল; সোর্সঃ www.dinpratidin.com

রাতে পানসী রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরে আসি। ঘুমোবার আগে হোটেলের পাশেই হযরত শাহজালাল (রাঃ)-এর মাজার জিরায়ত করি।

  • জাফলং থেকে সারিঘাট বাস ভাড়া= ৩০/-
  • সারিঘাট থেকে লালাখাল ট্যুরিস্ট স্পট অটো ভাড়া= ১৫/-
  • লালাখানে নৌকা ভ্রমণ= ৬০০/- (এক ঘণ্টা)
  • পানসীতে রাতের খাবার= ১৫০/-

দিন ৩

সিলেট-বিছানাকান্দি

সকালে ফ্রেশ হয়ে হোটেল থেকে চেক আউট করে ব্যাগপত্র হোটেলের রিসেপশনে রেখে দেই। সাধারণ মানের এক হোটেলে নাস্তা সেরে সিএনজি রিজার্ভ করে বিছানাকান্দির উদ্দেশ্যে রওনা দেই। এক সিএনজিতে ৫ জন সর্বোচ্চ যাওয়া যায়। লেগুনা নিলে এক লেগুনায় ১০-১২ জন যাওয়া যাবে। অত্যন্ত ভঙ্গুর এই রাস্তায় প্রায় ৩ ঘণ্টা সময় লাগবে।

বিছানাকান্দি; সোর্সঃ www.ntvbd.com

হাদারপাড় ঘাটে নেমে সেখান থেকে আবার নৌকা রিজার্ভ করতে হবে। ভরা বর্ষায় গিয়েছিলাম বলে পানি ছিল ভরপুর। তাই পান্থুমাই ও বিছানাকান্দির জন্য নৌকা রিজার্ভ নিয়ে নেই। পানির পরিমাণ কম থাকলে পান্থুমাই যাওয়া যায় না।

  • সিএনজি রিজার্ভ= ১,৫০০/-
    অথবা, লেগুনা রিজার্ভ= ২,১০০/-
    (সিজনে দাম বেড়ে যায়)
  • নৌকা রিজার্ভ= ১,৮০০/- (শুধু বিছানাকান্দির জন্য নিলে আরও কমে পাওয়া যাবে)

বিছানাকান্দি-রাতারগুল-সিলেট

নৌকা দিয়ে দুপুরের মধ্যে ঘাটে এসে আবার সিএনজিতে উঠে পড়ি। ফেরার রাস্তাতেই রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট পড়ে। আমাজন বনের সদৃশ এই জলাভূমিতে বেশ রোমাঞ্চকর ভ্রমণ শেষে সিএনজি করে শহরে চলে আসি।

  • রাতারগুল নৌকা ভাড়া= ১,২০০/-
  • লাইফ জ্যাকেট ভাড়া= ৪০/-
রাতারগুল; সোর্সঃ bn.wikipedia.org/wiki

সিলেট-ঢাকা

সন্ধ্যায় সিলেট স্টেডিয়ামের পাশের চা-বাগানে নেমে যাই। সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে চলে আসি আবার পাঁচভাই রেস্টুরেন্টে। রাতের খাবার খেয়ে হোটেল থেকে ব্যাগপত্র নিয়ে কদমতলী বাসস্ট্যান্ডে চলে যাই। ট্রেনের টিকেট পাইনি বলে বাসে করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেই।

  • পাঁচভাইতে রাতের খাবার= ১৩০/-
  • সিলেট থেকে ঢাকা বাস ভাড়া= ৪৭০/-
সিলেট স্টেশন; সোর্সঃ globaltimes.com.bd

কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

  • শহরে শাহজালাল (রঃ)-এর মাজার সহ আছে শাহ পরান (রঃ)-এর মাজার, লাক্কাতুরা চা-বাগান, সিলেট স্টেডিয়াম, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। সন্ধ্যায় এগুলোর কিছু কিছু ঘুরে দেখতে পারবেন।
  • রাতারগুলে গাছগাছালির মাঝে জলাভূমিতে নৌকা দিয়ে ঘুরে বেড়াতে হয়। ডালে সাপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন অচেনা ক্ষতিকর প্রাণী থাকে। তাই সাবধানতা অবলম্বন করা আবশ্যক।
  • মাজারগেটের সামনে খাওয়ার হোটেলগুলো তেমন একটা সুবিধার না। খাওয়ার জন্য জিন্দাবাজারে অবস্থিত পাঁচভাই ও পানসী রেস্টুরেন্ট এখানে বিখ্যাত।
  • আমরা ৪ জনের গ্রুপ ছিলাম। ঢাকা থেকে শুরু করে আবার ঢাকা ফেরত আসা পর্যন্ত মোট ৩,৫০০ টাকা খরচ হয়েছে।
  • জাফলং, বিছানাকান্দি মানুষের ফেলা ময়লা আবর্জনায় ভরপুর হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রাখতে আমাদের সচেতনতার বিকল্প নেই। তাই যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না।

Feature Image: www.tripadvisor.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আমেরিকার যত ভ্রমণস্থানের গল্প: লাস ভেগাস সিটি

বাংলাদেশি পর্যটকরাও যেতে পারবেন সিকিম, অরুণাচল ও লাদাখ!