ভারতের জিভে জল আনা সব মজাদার স্ট্রিটফুড

স্ট্রিট ফুড মানে রাস্তার ধারে ছোট ছোট দোকানে হরেক রকমের জিভে জল আনা খাবার। শুধুমাত্র রাস্তার ধারেই মেলে এই খাবারগুলো তাই এর নাম স্ট্রিট ফুড। স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে একটু অস্বাস্থ্যকর হলেও বেশিরভাগ ভোজনরসিকরা নিজেদের আটকাতে পারেন না এই স্ট্রিট ফুড দেখলে। ১৯ শতকে ট্রান্সালভেনিয়াতে সর্বপ্রথম স্ট্রিট ফুডের চলন হয়। সেসময় ক্রিমে মাখা পপকর্ণ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর ভেসেলে করে পোড়া মাংসের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে স্ট্রিট ফুডের এই সংস্কৃতি।
পাশের দেশ ভারত এই সংস্কৃতিতে বেশ এগিয়ে। কলকাতার অলিগলি বা মুম্বাইয়ের বাজারগুলোতে হাঁটলেই নাকে ভেসে আসে মজাদার সব খাবারের ঘ্রাণ। ভারতে ভ্রমণকারীদের অনেকটা ফ্যান্টাসির পর্যায়ে পড়ে এই স্ট্রিট ফুডগুলো চেখে দেখা। আমাদের আজকের আয়োজন ভারতের মজাদার আকর্ষণীয় সেসব স্ট্রিটফুড নিয়ে যা ভারতে গেলে অবশ্যই চেখে দেখা উচিত।

লখপূর দা ভাল্লে

লখপূর দা ভাল্লে, ছবিঃ d3u4hzlr7ozpoo.cloudfront.net

জম্মু কাশ্মীরের দিকে যারা রওনা দিয়েছেন বা দেবেন তাদের জন্য এই খাবার অপেক্ষা করছে জম্মু-কাশ্মীরের প্রবেশস্থল লখনপূরে। সবুজ আর লাল আভার চাটনি দিয়ে পরিবেশনকৃত এই ভাল্লে নামক স্ট্রিটফুড মূলত ভাজা জলখাবার। ভাল্লের হালকা ঝাল আর মিষ্টি মাখা ঘ্রাণই যথেষ্ট আপনার পেটে ক্ষিদে বাড়াতে। তবে শুধুমাত্র নিরামিষাশীদের জন্য তৈরি করা হয় এই সুস্বাদু খাবার, তাই আমিষের বায়না করলে লাভ তেমন হবে বলে মনে হয় না। লখনপূরের অলিগলিতে ভাল্লের দোকান থাকে ভোজনরসিকে ভরপুর।

ছোলা ভাটুরা

ছোলা ভাটুরা, ছবিঃ vipbags.com

এই খাবারের নাম শোনেনি এমন খুব কম লোকই আছেন। পাঞ্জাবের প্রায় সবাই সকালের নাস্তা শুরু করে এই ছোলা ভাটুরা বা ছোলে ভাটুরে দিয়ে। পাঞ্জাবি এই খাবার তৈরি করা হয় সবুজ মটরকে পাঞ্জাবি ঝাল আর ঝোলের সাথে রান্না করে আর পুরি বা লুচি দিয়ে পরিবেশন করে। ভারতের অমৃতসারে প্রথম চলন হয় এই ছোলে ভাটুরের। কালের বিবর্তনে এখন এটা গোটা ভারতবর্ষে অত্যন্ত জনপ্রিয় খাবার। তবে আপনি যদি একদম আসল পাঞ্জাবি স্বাদ পেতে চান তবে চলে যেতে হবে অমৃতসারের কোনো ঘুপচি গলিতে আর অর্ডার দিয়ে বসে পড়তে হবে রাস্তার ধারে বিছানো কোনো দোকানের বেঞ্চিতে।

আলু টিক্কি

আলু টিক্কি, ছবিঃ flavorverse.com

আলু টিক্কি বা আলু চাট রাতারাতি দিল্লীর স্ট্রিট ফুডের জন্য একটি উপহার বনে যাবে এটা সেদিনও কেউ জানতো না! ছোট ছোট আলু দিয়ে বানানো আমাদের দেশের আলুর চপের মতো এই আলু চাট দিল্লির লখনৌর নিজস্ব আবিষ্কার। মুম্বাইয়ে এই খাবারের নাম রাগদা প্যাটিস। ছোলা-ঝোল আর ঝাল-মিষ্টি চাটনির সাথে পরিবেশন করা এই আলু টিক্কি দেখে জিভে জল আসতে বাধ্য যে কারো।

তুন্দে কাবাব

তুন্দে কাবাব, ছবিঃ blogspot.com

কাবাব সবসময়ই মানুষের প্রিয় খাদ্যের মধ্যে ছিল। কিন্তু লখনৌর এই তুন্দে কাবাবের যেমন আছে স্বাদের ঐতিহ্য তেমনি এর নামকরণের পেছনে রয়েছে একটুখানি নাটকীয়তা। তুন্দে কাবাবের জনক হাজী মুরাদ আলি লখনৌতে প্রচলন করেন তুন্দে কাবাব যার কেবলমাত্র হাত ছিল একটি। ভারতে এক হাত থাকা মানুষদের তুন্দে বলা হয়, সেই বিদ্রুপকে কাজে লাগিয়ে তিনি এমন এক উপহার দিয়ে যান লখনৌবাসিকে যার জন্য বিদ্রুপ প্রশংসায় পরিণত হয়। একদম শুরু থেকে ভেতর পর্যন্ত অত্যন্ত নরম এই কাবাবের স্বাদ যে একবার পেয়েছে সে বারবার পেতে চায়।

মোমো

মোমো, ছবিঃ healthmania.org

ভারতে যাওয়ার আগেই অনেকে ঠিক করে রাখে যে খাবারটি অবশ্যই খেতেই হবে সেটা হলো মোমো। ভারতের প্রতিটি অলিগলিতে একটু খুঁজলেই পাওয়া যাবে মোমোর দোকান। মোমো হলো একদম নরম পুডিংয়ের ভেতর সবজি বা মাংস দিয়ে গোল গোল করে বানানো একপ্রকার খাবার যা চাটনি অথবা সসের সাথে পরিবেশন করা হয়। দামে সস্তা আর পেটও ভালো ভরে এমন খাবার খুঁজলে মোমোর বিকল্প নেই। তিব্বত আর নেপালের স্থানীয় খাবার হিসেবে খ্যাত মোমোই ভারতের একমাত্র স্ট্রিটফুড যা রাস্তা থেকে উঠে এসেছে নামীদামী হোটেলের মেন্যু কার্ডে।

লিট্টি ছোখা

লিট্টি ছোখা, ছবিঃ manjulaskitchen.com

রাজস্থানের ডাল বাট্টির বিহারি সংস্করণ হলো লিট্টি ছোখা। লিট্টি ছোখা বেগুন বা আলুভর্তার ঝাল-ঝোল আর রুটির তৈরি এমনই এক খাবার যা একই সাথে সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার বা রাতের খাবার হিসেবেও খাওয়া যায়। এই খাবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বিহারের ভালোবাসা। তার সাথে একটুখানি ঘি দিলে পুরো ব্যাপারটাই জমে ওঠে অনন্যতায়। বিহারের পাটনার অলিগলিতে শুরু হওয়া এই খাবারের চল এখন পুরো ভারতবর্ষে চলে।

পানিপুরি

পানিপুরি, ছবিঃ blogspot.com

দিল্লিতে গোলগাপ্পে আর কলকাতায় পানিপুরি নামে খ্যাত যে খাবার সব ভোজনরসিকদের নজর কেড়েছে তা হলো ফুচকা। ফুচকা নিয়ে তো নতুন কিছুই বলার নেই তবে যেটা বলার তা হলো একটু খানি ঝাল, সরষে আর আচারের সাথে দারুণ লাগে ফুচকা নামক খাবারটি। এখন ভারতের একটু ভালো স্ট্রিটফুডের দোকানগুলোয় পাওয়া যায় চকলেট ফুচকা, দই ফুচকা সহ আরো নানা রকমের নানা স্বাদের ফুচকা।

চাওমিন

চাওমিন, ছবিঃ lokaso.in

আমাদের দেশে যা নুডুলস নামে পরিচিত ভারতে সেটা চাওমিন হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। রাস্তার পাশে বৃষ্টির দিনে উদরপূর্তি করতে চাইলে চাওমিনের বিকল্প নেই। ৯০ দশকের দিকে ভারতের এমন একটি স্ট্রিট ফুডের দোকান পাওয়া যেত না যার সামনে লোকজন লাইন ধরে দাঁড়িয়ে নেই এক প্লেট চাওমিনের জন্য। গরম নুডুলস লাল করে রান্না করা হয় এসব দোকানগুলোতে, ব্যবহার করা হয় নানা উপকরণ চাওমিনকে আরো আকর্ষণীয় বানাতে।

পায়া স্যুপ

পায়া স্যুপ, ছবিঃ i.ytimg.com

ভারতের অধিকাংশ নিরামিষ খাবারের ভিড়ে একটি আমিষের স্বাদ পেতে মন যখন মরিয়া হয়ে উঠে তখন পায়া স্যুপের কথা মনে পড়বে সবার আগে। ভূপালের ছাত্তোরি গলি থেকে সরাসরি উঠে আসা এই স্যুপে দেয়া হয় ভেড়ার মাংস। ভূপালের ভ্রমণ অনেকটা ফ্যাকাসে হয়ে যাবে যদি আপনি ছাত্তোরি গলিতে গিয়ে এই পায়া স্যুপ না চেখে দেখেন। ভূপালের এই অন্ধকার গলি থেকে রাতারাতি পুরো ভারতবর্ষের জনপ্রিয় নন-ভেজ খাবার হয়ে উঠেছে এই পায়া স্যুপ।

বাড়া পাও

বাড়া পাও, ছবিঃ thefoodxp.com

মুম্বাইয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয়, চটজলদিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যাক কিনে নেয়া স্ট্রিট ফুড হলো বাড়া পাও। বার্গারের মহারাষ্ট্রীয় সংস্করণ হলো এই বাড়া পাও। ছাত্র থেকে শিক্ষক, ব্যবসায়ী থেকে চাকুরীজীবী, ধনী থেকে গরিব সবার জন্য সার্বজনীন খাবার মুম্বাইয়ের বাড়া পাও। বিশ্বাস করা হয় যে, যেকোনো রাস্তার ধারের দোকান ছাড়া এই মারাঠি খাদ্যের মজাটা ঠিক জমে ওঠে না। রুটির ভেতর আলু-মরিচ অথবা মাংস দিয়ে তৈরি এই খাবারের চাহিদা রয়েছে সারা ভারতে।
ফিচার ইমেজ- wordpress.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রংপুরের ভিন্নজগত পার্ক যেন এক অন্য জগতে নিয়ে যায়

যে ৮টি কারণে বাতিল হয়ে যেতে পারে আপনার আমেরিকান ভিসা