গাইডহীন তাজিংডং জয়ের গল্প!

গাইডহীন তাজিংডং-শুরুর কথা

অ্যাডভেঞ্চারের পাগলামিটা ছিল সব সময়ই। পায়ের তলায় একটু মাটির ছোঁয়া পেয়ে দাঁড়াতে শেখার পর থেকে পাগলামিটা নেশায় পেয়ে বসলো। আর তাই শুরু হলো ছুটে বেড়ানো আর ছুটে বেড়ানো, সময়-সুযোগ পেলেই। আর এই অ্যাডভেঞ্চারের শুরুটা হয়েছিল সমুদ্র দিয়ে। কয়েকবার সমুদ্রের উচ্ছ্বাসে ভেসে আর উত্তাল ঢেউয়ে হারিয়ে গিয়ে যে সখ্য গড়ে উঠেছিল তা দিয়ে ভ্রমণ আনন্দ হলেও, মাথার ভেতরে ঘুণপোকার মতো জেঁকে বসা অ্যাডভেঞ্চারের পূর্ণতা পাওয়া যাচ্ছিল না। তাই সেই অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় যাওয়া হলো বান্দরবান। একবার, দুইবার, তিনবার।

বান্দরবান শহর সাথে কক্সবাজার, নীলগিরি আর কক্সবাজার, এরপর বগালেক ও ফেরার পথে আবারো সেই কক্সবাজার! কিন্তু কোনো ভ্রমণেই সত্যিকারের অ্যাডভেঞ্চারের রোমাঞ্চকর স্বাদ কেন যেন পাওয়া যাচ্ছিল না! যে কারণে সেবার আগে থেকেই ঠিক করা হলো, কোনো রকম গাইড ছাড়া, আর কাউকে কোনো রকম (পুলিশ বা আর্মি) তথ্য না দিয়ে আর কোনো রকম যোগাযোগ না করে, নতুন রূপে আর নতুনভাবে দেখবো বান্দরবান আর চেষ্টা করবো জয় করতে তাজিংডংয়ের স্বপ্ন চূড়া! যে অ্যাডভেঞ্চারের নাম দিয়েছিলাম “গাইডহীন তাজিংডং!” চলুন শুনি একে একে সেই রোমাঞ্চকর গল্পের অগোছালো কথামালা।

বান্দরবান। ছবিঃ লেখক

“এক কাজ করি, আমরা আজকেই শেরকর পাড়া চলে যাই, এখানে (থানচি) খাওয়া-দাওয়া করে রাতে ওখানে থাকবো! ৪ টার পরে রওনা দেই?” ৩:৩০ এ থানচি পৌঁছে, একজন অতিরিক্ত ওজনের মানুষের মন্তব্য, যাদের সাথে কোনো গাইড নেই, যাদের কেউই আগে থানচি বা তাজিংডং যায়নি, যে গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে ৪ জন আছে, যারা এবারই প্রথম পাহাড়ে এসেছে!

আমি বললাম, এত তাড়াতাড়ির কী আছে? আমাদের তো সময়ের অভাব নাই। ভালো করে খেয়ে-দেয়ে, বাকি সময়টা এখানে এই সাঙ্গুর তীরে শুয়ে-বসে কাটিয়ে, রাতে আরাম করে ঘুমিয়ে, সকাল-সকাল বেরিয়ে পড়বো তাজিংডংয়ের উদ্দেশ্যে। এবং সবাই তাতে সম্মত হয়েছিল। কেন যেন সব ভ্রমণেই আমাদের গ্রুপের সবাই আমার পরামর্শ বা ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্য দেয়, সে নিম রাজি হয়েই দিক বা সানন্দে!

ভাগ্যিস সবাই রাজি হয়েছিল আর আমরা থানচিতেই থেকে গিয়েছিলাম সেই রাতের জন্য, ভাগ্যিস! কারণ, আমাদের সাথে কোনো গাইড ছিল না! আমরা আর্মি বা পুলিশকে জানাইনি, পুরো রাস্তাই ছিল অচেনা! ভরসা ছিল শুধু সাহস, অদম্য ইচ্ছা আর রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারের মানসিকতা।

সাঙ্গুর তীরে। ছবিঃ লেখক

অথচ থানচি থেকে পরের দিন ১১:৩০ ঘণ্টা, আসলেই ১১:৩০ ঘণ্টাই লেগেছিল! সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭:৩০টা পর্যন্ত লেগে গিয়েছিল শেরকর পাড়া পৌঁছাতেই! তাজিংডং তো তার পরদিন সকালে পৌঁছেছিলাম বা জয় করেছিলাম! কেন, এত সময় কেন লেগেছিল? সেই প্রশ্ন অনেকের মনে এসেছে, জানি। আসবে সেটাই স্বাভাবিক, যে বা যারা এই পথে গিয়েছেন।

সে এক চরম কষ্ট আর পরিশেষে রোমাঞ্চে ভরপুর, জীবনের অন্যতম সেরা পাহাড় প্রেমের গল্প আর অর্জনের গল্প।

শীতের শেষ বিকেলে, গরম ভাত আর ডিমের তরকারী দিয়ে ঠেসে ভাত খেয়ে আর সবার ব্যাগগুলো রেস্ট হাউজে রেখে চলে গেলাম স্নিগ্ধ সাঙ্গুর সঙ্গ নিতে। সেই টলমলে আর স্বচ্ছ, স্বপ্নিল জল দেখে শীতের কামড় উপেক্ষিত হলো, সরিষার তেলের মালিশে!

এরপর রুমে ফিরে কিছু আড্ডা আর স্বাভাবিক এবং নিয়মিত প্যাচাল। রাতের খাবার খেয়ে শুরু হলো সেই অনির্ধারিত বিষয়ের নির্ধারিত বিতর্ক! যা সব ভ্রমণেই হয়ে থাকে! এবারের নির্ধারিত বিতর্কের অনির্ধারিত বিষয় ছিল, আগে কোনটা বা কোথায় যাব, তাজিংডং না নাফাখুম? এই যুক্তি, সেই যুক্তি, এক-একজন এক-এক দলে আরও কত কী?

শেষ পর্যন্ত একজনের যুক্তি ছিল এই রকম যেহেতু তাজিংডংয়ের চেয়ে নাফাখুম তুলনামূলকভাবে সহজ ও স্বল্প সময়ের সেহেতু আমরা আগে তাজিংডং যাই, পরে ফিরে এসে সময় আর এনার্জি থাকলে তখন নাফাখুম যাওয়া যাবে। তো শেষে ভোটাভুটি হলো, যেদিকে ভোট বেশী পড়বে সেদিকে আগে যাবো। হলো ভোট, একজন ভোট না দেয়ার পূর্ব পর্যন্ত সমান-সমান! এবার শুরু হলো ওপেন পলিটিক্স, কে সেই নিরপেক্ষ জনকে তাদের দলে নিতে পারে! এমনকি তাকে ভ্রমণের খরচের স্পন্সরশিপ দিয়ে হলেও কেউ কেউ দলে নিতে বা পেতে চায়!

পিক ৬৯! ছবিঃ লেখক

যাই হোক তিনি শেষ পর্যন্ত তাজিংডং যেতেই রাজি হলেন, সুতরাং আর কোনো ঝামেলা থাকল না, পরবর্তী সকালে দেশের অন্যতম স্বপ্ন চূড়া জয়ের আনন্দ নিয়ে ঘুমোতে গেলাম।

ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠে সবাই প্রস্তুত, খোঁজ নিয়ে জানা গেল ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা লাগবে তাজিংডং যেতে, বাহ বেশ তো! চেষ্টা করলে নাকি গিয়ে ফিরেও আসা যাবে! তবে তো আর কথাই নেই, পারলে আজকেই ফিরে এসে, কালকে নাফাখুম যাবো। কিন্তু হায় কে জানত আজকে ফিরে আসা কেন, আমরা শুধুমাত্র তাজিংডংয়ের চূড়াতেই পৌঁছাতে পারব না! আর ফিরতে-ফিরতে হবে পরদিন রাত ১০টা! হ্যাঁ, তাই হয়েছিল। পথে যেতেই তিন জন পুরোপুরি অনুপযুক্ত হয়ে গিয়েছিল বোডিং পাড়া যেতে না যেতেই! এবং তাদের ফিরেও আসতে হয়েছিল! সেও এক বীভৎস গল্প!

শুরু হলো আমাদের আনন্দ যাত্রা, মহা উদ্যমে, ভীষণ রকম উত্তেজনা নিয়ে, কাঁধে ব্যাগ, হাতে লাঠি, কোমরে গামছা, মাথায় ক্যাপ বা হ্যাট আর গায়ে একাধিক সোয়েটার ও জ্যাকেট!! অথচ সবাইকে পই-পই করে বলে দেয়া হয়েছিল, একটির বেশী গরম কাপড় সাথে না নিতে, কারণ পাহাড়ে অতটা ঠাণ্ডা লাগে না, বিশেষত ট্রেকিংয়ের সময়।

আর রাতে যেখানে থাকবো, সেখানে লেপ না হলেও মোটা কাঁথা পাওয়া যাবে। বলা হয়েছিল স্যান্ডেল বা জুতো মাত্র একজোড়া নিতে এর বেশী নিলে ব্যাগ ভারী হয়ে যাবে, যা পরে বইতে তার বা তাদেরই অনেক বেশী কষ্ট করতে হবে। এমনকি ব্যাগ হালকা করার জন্য কিছু অতিরিক্ত আর অপ্রয়োজনীয় জিনিস ফেলেও দিতে হতে পারে! বলা হয়েছিল, পর্যাপ্ত শুকনো খাবার সাথে রাখার জন্য যেন, দুই-তিনদিন অনায়াসে সেগুলো দিয়ে কাটিয়ে দেয়া যায়, যদি পাহাড়ি খাবার খেতে আপত্তি থাকে বা অনেকে খেতে না পারে।

কুয়াশা জড়ানো সকাল। ছবিঃ লেখক

কিন্তু না, প্রাথমিক যে পরামর্শগুলো দেয়া হয়েছিল, অধিকাংশজনই সেটা মানেননি বা গুরুত্ব দেননি! যে কারণে একজন শুধু শুকনো মরিচ আর পেঁয়াজ বিক্রি করেই তার ভ্রমণের সমস্ত খরচ তুলে নিয়েছিল! আসলেই তাই। সেই গল্প বলব আলাদাভাবে।

১০ কী ১৫ মিনিট যেতেই এক একজন ব্যাগ নামিয়ে সটান করে শুয়ে পড়ল! খুবই গরম লাগছে, প্রায় ঘেমে গেছে! এই শেষ ডিসেম্বরের শীতেই! সবার গরম কাপড় আর জিন্স পরিবর্তন করতে, করতেই সকালের নাস্তার সময় হয়ে গেল! সুতরাং সবাই নাস্তা সেরে আবার চলা শুরু করতেই প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল! এবার বুঝুন ১৫ মিনিট চলার পরেই ৪৫ মিনিটের বিশ্রাম! সেটাও একদম সমতলে, চড়াই এখনো শুরুই হয়নি! কি হয়েছিল সেই ট্রেকিং এর?

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঢাকার প্রাণ, বুড়িগঙ্গায় ভ্রমণ

লিখতে পারেন আপনিও!