বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি রেল স্টেশনের গল্প

bdr

ট্রেন আর রেল স্টেশন আমার বরাবরের ভালো লাগা। ভীষণ রকমের ভালো লাগা বলা যায়। প্রতিটি মানুষের কিছু কিছু জিনিষের প্রতি যেমন একটা মোহ বা আকর্ষণ থাকে, আমারও তেমনই একটি মোহ বা আকর্ষণ আছে এই ট্রেন আর রেল স্টেশনের প্রতি। আর আজকে এমনই একটি স্টেশনের গল্প বলবো যেটার অবস্থান আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশের অন্য যে কোনো স্টেশনকে হার মানিয়ে দেবে নিমেষেই।

এর আগে বহুবার এই পথে ট্রেনে করে গিয়েছি। প্রতিবার গিয়েছি আর একটা অন্য রকম রোমাঞ্চ ছুঁয়ে গেছে অজান্তেই। বিশেষ যে কারণে এই স্টেশনটি আমার একান্ত আপন মনে হয় সেটা হলো, এটা আমার জন্মস্থান। তবে শুধু জন্মস্থান বলেই নয়, এর চারপাশের অপরূপ প্রকৃতি যে কোনো মানুষকেই মুগ্ধ করবে নিমেষেই। এ আমি হলফ করে বলতে পারি।

স্টেশনের উপর থেকে। ছবিঃ লেখক

চলুন তবে বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি রেল স্টেশনের গল্পটা শুনে আসি। ও হ্যাঁ স্টেশনের নামটি আমি এখনই না বলে আগে এর রঙ, রূপ, রস, গন্ধ, সাজসজ্জা ও অপার আকর্ষণের কথা কিছু বলে নেই।

এটাই এই দেশের একমাত্র রেল স্টেশন, যেখানে নামার পরে নীল আকাশকে মনে হবে যেন হাতের নাগালে চলে এসেছে বুঝি! উড়ে যাওয়া মেঘেদেরকে মনে হবে এই বোধহয় ছুটে এলো আপনার কাছে! আর যদি আকাশে থাকে থোকা থোকা কালো মেঘেদের দল, তো মনে হবে যেন, ওরা বুঝি আপনার ইশারার অপেক্ষায় আছে!

আপনি ইশারা করলে বা হাত দিয়ে সম্মতি দিলেই বুঝি ঝুপ করে ঝরিয়ে দেবে ঝিরঝিরে বৃষ্টি! এটাই একমাত্র রেল স্টেশন, যেখানে আপনি আছেন আকাশ বা মেঘেদের কাছাকাছি, আর চারপাশের সবুজেরা আছে আপনার থেকে অনেক নিচে, চারদিকের পুরো প্রান্তর যেন সবুজের চাদর বিছিয়ে রেখেছে আপনার জন্য!

প্লাটফর্মের খাড়া পথ! ছবিঃ লেখক

সবুজ ঘাস, গাছপালা, ধান ক্ষেত, অল্প অরণ্য, ঝকঝকে মাথার সিঁথির মতো রাস্তা, পিপীলিকার মতো যানবাহন সব আপনার থেকে অনেক অনেক নিচে অবস্থান করছে! আপনি যেখানে আছেন বসে, দাঁড়িয়ে বা চলেছেন ধীর লয়ে হেঁটে সেখানে শুধু লাল ইটের, সাদা পাথরের আর লোহা ও কংক্রিটের বসবার জায়গা আর প্লাটফর্ম।

কাছে পিঠে দুই একটি অনন্তকাল ছায়া বিলিয়ে যাওয়া বট গাছ, কয়েকটি সবুজ লতা, দুই চারটি কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া আর বাকি সবকিছু নিচে আপনার পায়ের তলায়! টিকেট ঘর, স্টেশন মাস্টারের রুম, সিগন্যাল রুম অফিস ঘর সব, সবকিছু আপনাকে বেশ কয়েকটি সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের নিচে সমতলে নেমে পেতে হবে।

এটি-ই কি একমাত্র স্টেশন যেখানে একই সাথে প্রমত্ত বয়ে চলা নদী আছে (ঘন বর্ষায়), আছে শতাব্দী পুরনো বাংলাদেশের একমাত্র আর বিখ্যাত রেল সেতু যা শত বছর পেরিয়ে, শত বাঁধা আর ঝঞ্ঝা সয়েও টিকে আছে আপন মহিমায়? হয়তো তাই। আমার অন্তত তাই মনে হয় যতটুকু জানি। এই এক স্টেশনে বসে বা হেঁটেই আপনি উপভোগ করতে পারেন বয়ে চলা প্রমত্তা নদীর উচ্ছল যৌবনা রূপ, অবশ্যই ঘোর বর্ষায়।

এখানে গরম যতই পড়ুক, একটা ভিন্ন রকম উচ্চতায় আর সমতল থেকে বেশ উঁচু আর পাশে বিশাল এক বয়ে যাওয়া নদী আছে বলে সবসময়ই একটা ঝিরঝিরে হাওয়া আপনাকে শীতল পরশ বুলিয়ে যাবে। একটা মিহি বাতাসের রেশ আপনাকে মাতাল করে তুলতে চাইবে। বটের ছায়ায় বসে নদীর কুহুতান শোনা আর ঝিরঝিরে বাতাস গায়ে মেখে চারপাশের সবুজ প্রকৃতিতে ডুবে যাওয়া শুধু এখানেই সম্ভব। যেখানে স্টেশনটা যেন ঠিক এক পাহাড়ের চূড়ায় বসে আছে।

পাহাড়ি স্টেশন থেকে নিচের সবুজ! ছবিঃ লেখক

নির্জন, ছিমছাম, ঝকঝকে, বিলাসী, পাহাড়ের চূড়ায় দোল খাওয়া আর একটু যেন অভিমানী অনিন্দ্য সুন্দর এক স্টেশন। পাকশী রেল স্টেশন! যার দুইপাশে যেদিকেই তাকাবেন প্রথমে শুধু আকাশই দেখতে পাবেন। নিচে তাকালে পাবেন অপার সবুজের মায়াবী হাতছানি, পদ্মার উত্তাল বাতাস আর একান্ত অবসর কাটানোর কিছু অদ্ভুত সময়। মাঝে মাঝে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ঝমঝমে শব্দে চমকে উঠে তাকিয়ে থেকে দেখবেন লাল রঙা ব্রিজের বুক চিরে, পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে ছুটে চলেছে লাল-সবুজের কোনো ট্রেন।

পাকশী রেল স্টেশনের এমন নির্জন, নিস্তব্ধ আর মিহি বাতাসের সাথে পদ্মা নদীর মোহময়তা উপভোগ করতে হলে শেষ বিকেলকে বেছে নেয়াই সবচেয়ে ভালো। তাতে করে শেষ বিকেলের বা সন্ধ্যা শুরুর টকটকে সূর্যের নদী ও সবুজের মাঝে ডুবে যাওয়া অপার্থিব প্রকৃতিও পেয়ে যাবেন। অথবা যেতে পারেন কোনো বর্ষায় যখন ঘন কালো মেঘে ঢেকে যাবে পুরো আকাশ, সবুজ গাছেরা ঝড় তুলবে একূল-ওকূল, তুমুল বৃষ্টি নামবে পুরো চরাচর জুড়ে।

একটি বেদীতে ছাতা মাথায় চুপ করে বসে থেকে উপভোগ করতে পারেন অপার্থিব আর অতুলনীয় কিছু সময়। স্মৃতির এ্যালবামে জমা করতে পারেন সুখ তারার মতো দুর্লভ কোনো কিছু। একবার গিয়েই দেখুন না কেমন লাগে? এমন একটি স্টেশনে, পাহাড়ি স্টেশন, যার চারপাশে সবুজ, পাশেই প্রমত্তা পদ্মা আর বাংলাদেশের একান্ত ঐতিহ্য হার্ডিঞ্জ ব্রিজ রেল সেতু।

দূরের ঐতিহ্যবাহী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ছবিঃ লেখক

বাংলাদেশের সব জায়গা থেকেই ট্রেনে বা বাসে করে পাকশী যাওয়া যায়। এটিই আমার মতে সবচেয়ে ভালো, সাশ্রয়ী আর আরামদায়ক মাধ্যম। পাকশিতে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। একবেলা ঘুরে পরের বেলা বা সন্ধ্যার আগেই পাবনা বা ঈশ্বরদী চলে আসতে পারেন। চাইলে চলে যেতে পারেন নিজের গন্ত্যব্যেও। আবার দেশের যে কোনো জায়গা থেকে বাসেও আসতে পারেন পাকশী। উপভোগ করতে পারেন এক অনন্য রেল স্টেশন। বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি রেল স্টেশন, পাকশী রেল স্টেশন!

এখন প্রশ্ন হলো, পাকশী কীভাবে পাহাড়ি স্টেশন হলো? প্রশ্ন আসবেই স্বাভাবিক, কিন্তু একটু ভালো করে ভেবে দেখলেই উত্তর পেয়ে যাবেন। ভেবে দেখতে হবে যে সমতল থেকে কতটা উঁচুতে ঠিক কোনো এক পাহাড়ের চূড়ায় যেন এই স্টেশনের অবস্থান!

আসলে ব্যাপারটা হলো, যখন পদ্মা নদীর উপরে এই ব্রিজ করা হয়, তখন পদ্মা ছিল প্রমত্তা, স্রোত, জোয়ার-ভাটা, ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস এই সবকিছু থেকে ব্রিজকে নিরাপদ রাখতে সমতলের অনেক অনেক উঁচুতে এই স্টেশন ও নদীর এপার-ওপারের সংযোগ পথ তৈরি করা হয়েছিল, যেটা দুই পাড়ের স্বাভাবিক অবস্থান, ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট, মাঠ এসবের থেকে অনেক উঁচুতে। যেন অনেকটা পাহাড়ের মতো করে নিরাপদ এই রেল লাইন ও পাকশী স্টেশনের অবস্থান।

আহা, অপূর্ব স্টেশনের শেষ বিকেল। ছবিঃ লেখক

তাই আমি এটিকে পাহাড়ি স্টেশন নাম দিয়েছি। আমার কাছে তেমনই লাগে সব সময় আর লাগবেও। এই স্টেশন দিয়ে যাওয়া-আসার সময় আমি পাহাড়ি স্টেশনের স্বাদ পাই। তাই এটি আমার কাছে পাহাড়ি স্টেশন।

বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি রেল স্টেশন, পাকশী।

Loading...

One Comment

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মহীশূর প্যালেস দর্শন

দক্ষিণ বলিভিয়ার সালার ডি ইউনি: বিশাল এক প্রাকৃতিক দর্পণ