গাইডহীন তাজিংডং জয়ের গল্প: গন্তব্য শেরকর পাড়া

টানা প্রায় ২৫ মিনিট টানা হাঁটা, আবার বিশ্রাম, সেই ৩০ মিনিটের মতো কমপক্ষে! সাথে পানির পিপাসা, বার-বার করে বলা হলো, শুধু গলা ভেজাতে, বা এক-আধ ঢোক খেতে, কিন্তু নাহ, যে যখন পানি খায় এক সাথে প্রায় হাফ লিটার! যে কারণে তাৎক্ষণিক আরাম হলেই এরপরেই ট্রেকিংয়ের কষ্টটা অনেক বেশী পরিমাণে বেড়ে যায়। সেই সাথে শুরু হলো, গরম কাপড় সহ ব্যাগ বহনের ভীষণ যন্ত্রণা!

পেছন থেকে একজনের পরামর্শ- ভাই এখন থেকে ১০ মিনিট হাঁটা আর ১৫ মিনিট বিশ্রাম! তখন যা মনে হয়েছিল, তা আর উচ্চারণ করলাম না, যাদের বোঝার তারা বুঝে নিয়েন! এভাবে ৪০ মিনিট বা ১ ঘণ্টার কমলা বাগান আমরা ৩:৩০ ঘণ্টায় পৌঁছালাম! এখানে এসে পাহাড়ের ছায়া আর গাছের ঠাণ্ডা বাতাস পেয়ে দুই-একজন পারলে ১০-১৫ মিনিট করে একটু ঘুমিয়ে নেয়! এই হলো অবস্থা, তখনই বুঝতে পারলাম প্রথমবার, যে আজকে আমাদের খবর আছে।

অপূর্ব পথে, বান্দরবান। ছবিঃ লেখক

এরপর শুরু হলো পানি নিয়ে চরম অবস্থা, কারণ একবারে যারা প্রায় হাফ লিটার পানি পান করেছে, তাদের পানি তো শেষ! এবার অন্যদের কাছ থেকে পানি চাওয়া শুরু হলো। তা নিয়ে প্রায় ঝগড়া ও মারামারির পর্যায়, পানি দিতে অস্বীকার করায়! একের পানি অন্যকে দেবে না সেটাই স্বাভাবিক, আর অন্যদের কাছে পানি আছে সেটা খেতে পারছে না চরম পিপাসায়, সুতরাং মেজাজ চড়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়!

এভাবে-সেভাবে চলে এলাম বোডিং পাড়ার প্রায় কাছে, দেখা যাচ্ছে কিন্তু পৌঁছাতে এখনো ১ ঘণ্টা সময় লাগবে! কারণ আমাদের দ্রুত গতিতে ওঠা-নামা! আর সেই পথটুকুও বেশ বিপদ সঙ্কুল ছিল, কারণ পা পিছলে পড়লেই কয়েকশ ফুট নিচে, সেখানে কোনো গাছও ছিল না যে আঁকড়ে ধরবে। তাই এখানে আবারো ৩০ মিনিটের বেশী বিশ্রাম, খাড়া ঢাল বেয়ে নিচে নামার মানসিক প্রস্তুতির জন্য। অবশ্য সবাই-ই নেমে এলো কোনো সমস্যা ছাড়াই, কিন্তু সেই নামার ধকল কাটাতে আরও ৪০ মিনিট বা তার চেয়েও বেশী বিশ্রাম ওই বোডিং পাড়াতে।

এরপরেই শুরু হলো আসল খেলা, কে পারবে আর কে আর পারবে না, আর কে যাবে-কে যাবে না সেই সব তর্ক-বিতর্ক, যুক্তি-অযুক্তি আর নিয়মিত দোষারোপের খেলা! জেদের বশে সবাই যাবে, কেউই ফিরে যেতে চায় না, সুতরাং শুরু হলো আসল ট্রেকিং এবং প্রথমবারের মতো একদম খাড়া গাছের শিকড় আর লতাপাতা ধরে, ভীষণ সরু পথ ধরে। এদের ভেতর তিনজন কোনো রকম হামাগুড়ি দিয়ে একটি গাছের শিকড়ে বসে, আর পারবে না বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে দিল, আর এগোনোর চেয়ে তারা মরে যেতেও রাজি আছে!

নব্য ট্রেকার! ছবিঃ লেখক

সুতরাং অনেক আলাপ-আলোচনা আর সমালোচনার পরে সিদ্ধান্ত হলো যারা আর পারবে না, তারা এখানেই দিনের বাকি সময় ও রাতে থেকে পরদিন সকালে থানচি চলে যাবে, আর আমরা পরের দিন ফিরে এসে তাদের সাথে এক হব। সেভাবেই তিন জন চলে গেল, আরও দুই-একজন ছিল কিন্তু তারা তাদের আত্মসম্মান বাঁচাতে আর ফিরে যাবার পরিবর্তে তাজিংডং জয়ের জন্যই অন্যদের সাথে রয়ে গেল।

আবার শুরু হলো বাকিদের পথ চলা, পেছনে সাথে রেখে যাওয়া সাথীদের চিন্তা! ওরা কীভাবে যাবে, কার সাথে যাবে, ঠিকমতো ফিরতে পারবে কিনা? সেসব। এভাবে ১৫ মিনিট হাঁটা আর ১৫ মিনিটের চেয়ে বেশী বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে একসময় পৌঁছালাম দুই পাহাড়ের মাঝের এক অনিন্দ্যসুন্দর ভ্যালীতে, অবশ্য ওটাও একটা পাহাড় ছিল কিন্তু ওই দুই পাহাড়ের চেয়ে তুলনামূলক নিচুতে তাই ভ্যালী বলেই ভুল হয়।

সে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য, শেষ শীতের পাতা ঝরা বিকেল, জুম চাষের জমিগুলো অদ্ভুত সুন্দরভাবে সাজানো, যেন এঁকে রাখা ছবি! বড়-বড় সবুজ ঘাসের মাঝে-মাঝে ফুটে থাকা রঙ-বেরঙয়ের জংলী বর্ণিল বিচ্ছুরণ। সকল ক্লান্তি আর অবসন্নতা যেন নিমেষেই মিলিয়ে গেল সেই অপার সৌন্দর্য অবলোকনের নেশায়! বিমোহিত হয়ে ছিলাম সবাই, একই সাথে আর সেই আবেশেই সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত আর তেমন বড় বিশ্রাম নিতে হয়নি।

স্মরণীয় সেই ট্রেক। ছবিঃ লেখক

তবে হ্যাঁ, একটা জায়গা সবার জন্যই বেশ ভীতিকর আর ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, জায়গাটার নাম সঠিক মনে নেই বা জানা নেই। যেখানে অনেকটা নিচুতে ট্রেইল করে নামতে হয়, শুধু দুটো বাঁশের আশ্রয় নিয়ে, একটিতে খাঁজে-খাঁজে পা রেখে আর একটি হাত দিয়ে ধরে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য, এরপরে চারদিকে খাড়া পাহাড় বেষ্টিত বেশ অন্ধকারাচ্ছন্ন আর গা ছমছমে কিছু পথ পেরিয়ে, সাথে আরও দুটি পাহাড় আর এক পাহাড়ের চূড়ায় উঠে দেখা মিলল সেই অনেক কাঙ্ক্ষিত তাজিংডংয়ের।

সেও লম্বা পথ, তখনো… তখন ঘোর সন্ধ্যা, সামনে শেরকর পাড়া, কিন্তু সেই পাড়াতে পৌঁছাতেও পেরুতে হবে আরও অন্তত দুইটি পাহাড় আর শেরকর পাড়া যাবার ভীষণ সরু রাস্তা, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে, ভীষণ সাবধানতার সাথে। কারণ তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে, সামনে নিকষ কালো অন্ধকার। অথচ রাস্তাটা ছিল ভীষণ মায়া মাখা আর মুগ্ধতায় ভরপুর, কিন্তু উপভোগের সেই মানসিকতা তখন কারোই ছিল না। পেটে ক্ষুধা, মনে যন্ত্রণা আর গিঁটে-গিঁটে ব্যথা! সেই সাথে জেঁকে ধরেছে পাহাড়ি শীতের কাঁপন!

অবশেষে, সেইসব অন্ধকার-ব্যথা-যন্ত্রণা আর আশঙ্কা কাটিয়ে পৌঁছে গেলাম শেরকর পাড়া শুরুর শেষ পাহাড়ের পাদদেশে, যেখানে আমাদের সারাদিনের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য অপেক্ষা মৃদু এক বাঁশের ঝর্ণা! হ্যাঁ বাঁশেরই কারণ, সেই ঝর্ণা যে কোথায় তা দেখা বা বোঝা যায় না, শুধু বাঁশ দিয়ে দিয়ে দূর থেকে বাঁশের ভেতর থেকে গড়িয়ে আশা সেই ঝর্ণার নাম দিয়েছিলাম ব্যাম্বু ফলস!

সারাদিনের ক্লান্তি আর অবসন্নতা কিছুটা হলেও দূর করেছিল সেই ঝর্ণা ও গোসল, সন্ধ্যা ৭:৩০ এ পৌঁছে গেলাম শেরকর পাড়া। কিন্তু তাজিংডং এর চুড়া? সে এখনো রাত্রি শেষের অপেক্ষায়…!

(চলবে)

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আশুরার ছুটিতে সাজেক ভ্রমণে টিজিবি

দিনে দিনে ঘুরে আসুন ফুলের রাজধানী গদখালি থেকে