দার্জিলিং পাড়া গ্রাম ও সাঙ্গু নদীর গল্প

বান্দরবান, পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি জেলা। স্রষ্টা এই জেলাটিতে উজাড় করে ঢেলেছেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পাহাড়, নদী, বন কোনোটিরই অভাব নেই এ স্থানে। প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের বুকে জেগে আছে গাছ-গাছালি ও বিশাল এক প্রাণীজগৎ। এখানকার পথেঘাটে ছড়িয়ে আছে ভিন্ন একেক জীবনকথা।

প্রকৃতি ও জীবনের কিছু অদেখা সৌন্দর্য অবলোকন করতেই সে’বার গিয়েছিলাম বান্দরবান। যাত্রাটি ছিল বিগত ভ্রমণের চেয়ে অনেকটা আলাদা ও স্মরণীয়। ঢাকা থেকে বান্দরবান শহরের অন্ধকারাচ্ছন্ন এক ভোরে পৌঁছে, ভোরের আলো ফুটতেই আমরা বান্দরবান শহর ছেড়ে ভেতরের দিকে পা বাড়িয়েছিলাম সেদিন।

সাঙ্গু নদীর বুকে সূর্যের আলোকছটা; সোর্স: লেখিকা

বান্দরবান শহর থেকে কিছুটা ভেতরে যেতেই দেখা পেলাম সুন্দর একটি নদীর। পাহাড়, সবুজ আর বিশাল আকাশে ভেসে থাকা শুভ্র মেঘের সৌন্দর্যের ভিড়েও এই নদীটির সৌন্দর্য উপেক্ষা করার কোনো উপায় ছিল না। সবুজ জল বুকে ধারণ করা নদীটির পাশ ঘেঁষা পাহাড় ও সবুজের চাদর সৌন্দর্য ঢাকেনি নদীটির, বরং আরো বাড়িয়েছে।

পাহাড়ি পথে চলতে চলতে অদ্ভুত এক প্রশান্তি খুঁজে পাচ্ছিলাম সবুজ জলের এই নদীটির দেখা পেয়ে। অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারী এই নদীটির নাম সাঙ্গু নদী।

চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলার এই নদীটির দৈর্ঘ্য ২৯৪ কিলোমিটার। নদীটি সাপের ন্যায় এঁকেবেঁকে ছড়িয়ে আছে বহুদূর।

অপরূপ পাহাড়ি নদী; সোর্স: প্রসুন খন্দকার

সাঙ্গু নদীর পাশাপাশি কোথাও কোথাও এই নদীটি শঙ্খ নদী নামেও পরিচিত (যদিও সাঙ্গু নদী নামেই পরিচিতি অধিক)। কর্ণফুলীর পর পাহাড়ি এই নদীটি চট্টগ্রাম বিভাগের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী। বান্দরবান শহর থেকে রুমা যাওয়ার পথে বেশ কয়েকবার দেখা হলো প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্যের উৎসের সঙ্গে।

দুটো পাহাড়ের মধ্য দিয়ে যেভাবে এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে নদীটি, ঠিক একইভাবে আমাদের মস্তিষ্কেও অনেকটা ভালোলাগা নিয়ে চলাচল করতে শুরু করেছিলো। তাই ভেবে রাখলাম সুযোগ পেলেই এর জলে পা ভেজাবো, মন-মস্তিষ্ক জুড়িয়ে নেবো। ঠিক সেই মুহূর্তে নদীটির জল ছুঁতে না পারার কারণ হলো পাহাড়ি যে পথে আমরা ছিলাম তার উচ্চতা নদীটি থেকে অনেক উপরে।

পাহাড়ের কোলঘেঁষা সাঙ্গু নদী; সোর্স: লেখিকা

বান্দরবান শহর থেকে কেওক্রাডং পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানো অবধি আরো অনেকবার দেখা হলো সুন্দর এই নদীটির সঙ্গে। দেখতে পেলাম নদীর বুকে সাঁইসাঁই করে ছুটে যেতে অসংখ্য মাছ ধরার ইঞ্জিন নৌকা। যেতে যেতে জানলাম, এই নদীটি অনেক পরিবারের আয়ের উৎস। জানলাম, এই নদীটিকে ঘিরে বেঁচে থাকা অনেক জীবনের গল্প।

আমাদের গাইড তাওহিদ ভাই বললেন, ছোটবেলায় বাবা ও চাচাদের সঙ্গে গিয়ে এই নদী থেকে অনেক মাছ ধরতেন তিনি। তারপর সেই মাছ কিছু রাখতেন নিজেদের খাবার যোগাতে আর বাকিটা বিক্রি করে আয় করতেন। ভালোই লাগছিল এই নদী ঘিরে জমে থাকা তার ছোটবেলার গল্পগুলো শুনতে। সাথে নদীটির বয়ে চলা দেখতেও ভীষণ ভালো লাগছিল।

সবুজাভ জলের সাঙ্গু নদীর বয়ে চলা; সোর্স: প্রসুন খন্দকার

সাঙ্গু নদীতে চাইলেই নৌকা ভাড়া করে ঘুরতে পারবেন। আপনাদের গাইডকে বললে তিনি ব্যবস্থা করে দেবেন। নদীতে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর ও এর শীতল জলে পা ভিজিয়ে স্বর্গীয় সুখ অনুভব করার সুযোগটি কোনোভাবেই হাতছাড়া করবেন না।

আপনার গন্তব্য যদি বান্দরবান থেকে কেওক্রাডংয়ের পথে হয় তবে সাঙ্গু নদী, চিংড়ি ঝর্ণা ও আরো কিছু প্রাকৃতিক মুগ্ধতার সঙ্গে যোগ করতে পারবেন দারুণ একটি গ্রামের সৌন্দর্যও। গ্রামটির নাম দার্জিলিং পাড়া। এই গ্রামটি অনেকের কাছে বাংলাদেশের দার্জিলিং। অনেকেই শুনে থাকবেন এই গ্রামের নামটি, সঙ্গে এর মন ভোলানো সৌন্দর্যের কথাও।

পাহাড়ের গ্রাম ও জন-জীবন; সোর্স: সানজিদা আলম ইভা

কেওক্রাডং পাহাড়ে যাওয়ার পথে রয়েছে এই গ্রামটি। পাহাড়ের চূড়ার অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছালেই দেখা মিলবে ছোট্ট এই গ্রামের। পুরো পথের তুলনায় জায়গাটি ব্যতিক্রম। দূর থেকেই দৃষ্টি কেড়ে নেবে এখানকার রঙিন বাড়িগুলো। তাছাড়া এখানে দেখা পাবেন জানা, অজানা অনেক রঙিন ফুলের। তার মধ্যে অধিকাংশই পাহাড়ি ফুল।

দার্জিলিং পাড়া গ্রামটি প্রকৃতির সৌন্দর্য ঘেরা অসাধারণ একটি গ্রাম। পাহাড়ের মাঝখানে এই গ্রামটি। চারপাশে সবুজের সমারোহ। কিছুটা দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন হাত বাড়ালেই মেঘ ছোঁয়া যাবে। তবে মেঘেরা এখানে বাড়িগুলোর চেয়েও অনেকটা নিচে থাকে। ভোরে পাহাড়ের মাঝখানে ঝুলে থাকা মেঘের দৃশ্য দেখতে বেশ লাগবে।

অপরূপ সৌন্দর্যের দার্জিলিং পাড়া গ্রাম; সোর্স: লেখিকা

তাছাড়া দূর পাহাড়ের কোলঘেঁষে সূর্যটা যখন আলো ফেলে এই গ্রামে সেই দৃশ্যটিও আপনাকে মুগ্ধতায় ঘিরে ফেলবে। আমরা যখন পাহাড়ের বুকে বেশ পথ হেঁটে এই গ্রামে পৌঁছেছিলাম তখন দুপুর হয়ে গিয়েছিল। মাথার উপর ঝলমলে রোদে এই গ্রামটি তখন শান্তির উৎস হয়ে উঠেছিলো আমাদের কাছে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পূর্ণ এই গ্রামটিকে আরো সুন্দর করে রেখেছে পরিচ্ছন্নতা। এখানকার লোক-জন বেশ যত্নের সঙ্গে গ্রামটিকে পরিষ্কার রাখেন। তারা যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলেন না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি আরো বেশি মুগ্ধ হবেন এখানকার মানুষের ব্যবহার ও আচরণে।

পাহাড়ের বুকে গ্রামীণ জীবন; সোর্স: সানজিদা আলম ইভা

এর আগে অনেকের কাছেই শুনেছিলাম পাহাড়ে বাস করা মানুষেরা বেশ আন্তরিক হয়, তবে এত বেশি আন্তরিক তা কাছ থেকে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। যেতে যেতে দেখা পেলাম মাথার পেছনে ঝোলানো ঝুড়ি ভর্তি আদা ও কমলা নিয়ে ফেরা জুম চাষীদের। আমরা তাদের সঙ্গে গল্প করলাম, কমলা কিনলাম (প্রত্যেক পিস কমলা ১০ টাকা)।

এই গ্রামে বাস করা মানুষের সংখ্যা বেশ কম। বড়জোর ৩০টির মতো পরিবার এখানে বাস করে। তারা অধিকাংশই বম জাতি। আমাদের চেয়ে তাদের জীবনযাপন যেমন ভিন্ন, তেমনি ভিন্নতা ও বৈচিত্র্য ভাষার বেলাতেও।

পাহাড়ি গ্রামের পথ ধরে ভ্রমণকারী; সোর্স: লেখিকা

এই পাহাড়ে বসবাসরত মানুষদের ভাষা আলাদা হলেও বাংলা ভাষাতেও বেশ ভালোভাবে কথা বলতে পারেন সকলেই। তাদের মূল উপার্জন হয় জুম চাষের ফসল থেকে। আদা ও কমলা বেশি চাষ করা হয় এখানকার জমিতে।

এখানে দুটি দোকান রয়েছে যেখানে বিশ্রাম নেয়া ও যেকোনো বেলার খাবার খেতে পারবেন। তাছাড়া এখানকার কিছু কটেজে ভ্রমণকারীদের জন্য থাকারও ব্যবস্থা রয়েছে। গ্রামটিকে গভীরভাবে জানতে চাইলে, কিছুটা সময় নিয়ে এখানকার জীবন বৈচিত্র‍্য বুঝতে চাইলে বা এখানকার সৌন্দর্য ভালোভাবে উপভোগ করতে চাইলে ২/১ দিন থেকে যেতে পারেন সেসব কটেজগুলোতে।

দার্জিলিং পাড়ায় খাবার দোকান; সোর্স: সানজিদা আলম ইভা

পাহাড়ি সাঙ্গু নদী ও পাহাড়ি গ্রাম দার্জিলিং পাড়ায় সময়গুলো সুন্দর স্বপ্নের মতোই কেটে যাবে। প্রকৃতির এই সৌন্দর্যের ঘোরে ডোবার জন্য শীতকালই সবচেয়ে উত্তম সময়। তাই আপনার পরবর্তী ভ্রমণের জন্য তালিকায় তুলে রাখতে পারেন জায়গাগুলোকে।

ফিচার ইমেজ- লেখিকা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ট্রানজিটের অবসরে…

দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গের গৌরব মোজাফফর গার্ডেন এন্ড রিসোর্ট