গা ছমছমে ওল্ড মানালির গল্প

হিমাচল প্রদেশে ঢোকার মুহুর্তে ভোডাফোন থেকে ম্যাসেজ এলো ওয়েলকাম টু দ্য ল্যান্ড অফ দ্য গডস। মনে মনে শিহরণ জাগছিল যত মানালির দিকে এগোচ্ছিলাম। পাহাড় আর পাহাড়ের সারির মধ্যে দিয়ে পাথুরে রাস্তায় এঁকেবেঁকে আমাদের গাড়ি সন্ধ্যার একটু আগে পৌঁছাল মানালিতে। ছোট্ট সুন্দর শহর। অল্প জায়গার ভেতর অনেক মানুষ গিজ গিজ করছে।

বাংলাদেশ থেকে মোট জার্নির সময় ততক্ষণে ৫০ ঘন্টার মতো হয়ে গিয়েছে বা তারও বেশী। আমার দরকার ছিল নিশ্চুপ পাহাড়ি একটি রাত। তাই মানালি ছেড়ে ওল্ড মানালির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম । হিসেব করলে এক কিলোমিটার মতো রাস্তা হবে নিউ মানালি থেকে ওল্ড মানালি পর্যন্ত। তাই খামোখা ১০০ টাকা বাড়তি খরচের ইচ্ছে ছিল না।

মানালি, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ Unsplash 

ওল্ড মানালির দিকে হাঁটতে শুরু করার একটু পরেই দেখলাম চায়ের দোকান। ওখানে বসে চা খেতে খেতে নিজেকে একটু উষ্ণ করার চেষ্টা করলাম। সন্ধ্যা নেমে এলে বেশী শীত করতে শুরু করেছে তখন। ব্যাগ থেকে ফেদার জ্যাকেট বের করে গায়ে চাপিয়ে নিলাম।  চা শেষ করে হাঁটতে শুরু করলাম। ততক্ষণে রাস্তা সহ চারপাশের পাহাড়টা বেশ নিশ্চুপ হয়ে আসতে শুরু করেছে।

ঝিঁঝিঁর তীক্ষ্ণ শব্দ শোনা যাচ্ছে আশেপাশের হাজার বছরের পুরনো বার্চের বাগান থেকে। এই বার্চ ট্রিগুলো বিশাল উঁচু ও মোটা আকারের। এর ভেতরের অন্ধকার এত গভীর যে তাকাতেই ভয় হচ্ছিল। পথের মধ্যে একটি রেন্টাল শপ থেকে একটি স্লিপিং ব্যাগ ভাড়া করে নিলাম।

তাজা ফলের মানালি। ছবিঃ লেখক 

সেখান থেকে ওল্ড মানালিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ততক্ষণে রাত আটটা বেজে গিয়েছে। নিউ মানালির মতো এখানে এই রাতে খুব বেশী সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না মানালসু নদীটির গম গম শব্দ ছাড়া। তাড়াহুড়ো করে সস্তায় একটা হোটেল খুঁজতে শুরু করলাম। বেশীক্ষণ ব্যয় হয়নি হোটেল খোঁজার জন্য। হোটেল নিজেই এসে ধরা দেবে আপনার কাছে।

৩০০ টাকায় নদীর ধারে একটি কটেজের রুম। বিশাল বেড, একটা বারান্দা আর বাথরুমে হট শাওয়ারের ব্যবস্থা। বারান্দায় দাঁড়ালে বোনাস হিসেবে চাঁদের আলোয় চিকচিকে নদী ও পৃথিবীর সব নির্জনতা পাওয়া যায়।  টানা জার্নিতে এত ক্লান্ত লাগছিল যে বিছানায় এলিয়ে পড়া ছাড়া আর কিছুই ভালো লাগছিল না। গরম পানি দিয়ে গোসল সেরে কটেজেই খাবারের অর্ডার করে আসলাম। রুটি, মুরগি ফ্রাই আর চির পরিচিত রাজমা।

হোটেল বারান্দা। ছবিঃ লেখক 

খাবার খেয়ে হোটেলের বারান্দায় গিয়ে চুপ করে বসে রয়েছি গুটিসুটি দিয়ে। মন ভালো লাগছিল না কোনো কারণে। কিন্তু একা একা বাড়ি থেকে এত দূরে ভালোবাসার পাহাড়ে এভাবে কজন-ই বা সময় কাটাতে পারে, এসব ভেবেই নিজেকে সান্তনা দেবার চেষ্টা করছিলাম। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে দরজা খুলে দেখি হোটেলের ম্যানেজার এসেছে। উনি বললেন আপনার বারান্দায় আমি কাজ শেষে বসে একটু মদ্যপান করি প্রতিদিন।আপনার যদি অসুবিধা না হয়।

বাকিটা বললাম কোনো সমস্যা নেই, আসুন বসুন। একা একা এত সুন্দর পরিবেশ উপভোগ করতে একটু কষ্ট হচ্ছিল বৈকি। উনি হেসে বললেন আপনিও জয়েন করতে পারেন ইচ্ছে করলে। আমি বললাম না থাক আমার অভিযান আছে, এগুলো ধরাও ঠিক হবে না এখন।

লোকাল মার্কেট। ছবিঃ লেখক 

উনার সাথে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিলাম। মদ্যপান সেরে উনি চলে গেলেন আর আমি বসে রইলাম। উত্তাল নদীতে চাঁদের আলো পড়ে চিকচিক করছে। যেন দুধের নদ বয়ে চলেছে। নিচে পাইন গাছের সারির মধ্যে বাতাসের শন শন শব্দ আর এই বিশাল পাহাড়ে একা একা আমি যেন মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ছিলাম।

দু’চারবার কাশি হয়ে গলা চুলকাতে শুরু করলে আমি স্লিপিংব্যাগে ঢুকে পড়লাম ঘরে ঢুকে। কম্বল ব্যবহারে অতিষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম আমি তাই একটু নতুন করে স্লিপিং ব্যাগ ব্যবহার করা। ভোর সকালে ফোনের শব্দে ঘুম ভাংল। কলকাতা থেকে আসার পর বন্ধু জয়কে জানাতে ভুলে গিয়েছিলাম আমি পৌঁছেছি।

মানালির ভ্যালি। ছবিঃ লেখক 

সকালে উঠে হোটেলের বাইরে এসে দেখি চিকচিকে রোদে পাহাড় সবুজ হয়ে ছড়িয়ে আছে চারদিকে। সবখানে যেন শান্তি আর শান্তি। ওল্ড মানালির দোকানপাঠগুলো বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছে ততক্ষণে। অনেক মানুষ ট্রেকিংয়ের জন্যেই হয়তো ঘাড়ে বিশাল সব বোচকা নিয়ে বের হয়েছেন। একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে স্যুপ খেয়ে একটু পেট ঠাণ্ডা করে নিলাম। বেশ শান্ত এই ওল্ড মানালি।

গ্রামটি ছেড়ে পাহাড়ের একটু উপরের দিকে উঠতে শুরু করলাম। উপরে ওঠার সাথে সাথে আস্তে আস্তে চারদিকের লোকজন কমতে শুরু করল। পাহাড়ের একটু উপরে উঠে দেখলাম কাঁটা তারের প্রাচীর দেয়া। হয়তো বন্য প্রাণী থেকে গ্রাম রক্ষার জন্য এটি দেয়া হয়েছে অথবা যাবার অনুমতি নেই। কৌতূহলী হয়ে একটু উপরে উঠতেই সুন্দর ঘাসে মোড়া একটা পাথরে বসে পুরো মানালি ভ্যালি দেখা যাচ্ছে।

ওল্ড মানালি ছাড়িয়ে আরো উপরে যাই। 

আবাক হয়ে পুরো ভ্যালির দিকে দেখছি। পাহাড়ি হাজার বছরের পাইন বনের ভেতর দিয়ে তখন কেটে যাচ্ছে দিনের সময়। দেখতে দেখতে দুপুর হয়ে এলো। আমি ইতস্তত এদিক ওদিক নির্জন পাহাড়ে ঘোরাঘুরি করে আবার ওল্ড মানালিতে ফিরে এলাম।

অনেকদিন পর একা একা ঘুরে বেশ ভালো লাগছিল। স্বাভাবিক জীবনের ক্লান্তি, হতাশা, দৈন্যতা কখন কোথায় রেখে এসেছি জানি না। কিন্তু একা ঘুরে যে কতটা নির্জনতা উপভোগ করা যায় তা ওল্ড মানালি থেকেই শিখেছি।

রুট ও খরচের খসড়া:

ওল্ড মানালি যেতে হলে আপনার দরকার হবে একটি ভারতীয় ভিসা। যে কোনো পোর্ট দিয়ে প্রবেশ করে কলকাতা থেকে ট্রেন, বাস বা বিমানে যেতে হবে দিল্লি অথবা চণ্ডীগড়। ট্রেনে শ্রেণীভেদে দিল্লি বা চণ্ডীগড়ের ভাড়া পড়বে ৬৭৫ থেকে ৩,৫০০ রুপি। বিমানে পড়বে ২,৪০০ থেকে ১২,০০০ রুপি। এই জায়গাগুলো থেকে বাস পাওয়া যাবে মানালির। বাস ভাড়া পড়বে ৪৯০ রুপি থেকে ১,৪০০ রুপি।

মানালি নেমে ম্যাপ দেখে বা যে কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই উপরের দিকে ওঠা ওল্ড মানালির পথ দেখিয়ে দেবে। হেঁটে যেতে ৩০-৪০ মিনিট সময় লাগবে অথবা সিএনজি বা ট্যাক্সি ভাড়া করে যেতে পারেন। ভাড়া পড়বে ৬০-১৫০ রুপি। হোটের খরচ সিজন ও অফ সিজনে ১,০০০-৩০০ রুপি বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য। আর খাবারের খরচ প্রতি বেলা ২০০-৫০০ রুপি পর্যন্ত হতে পারে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

৮টি অনিন্দিত দর্শনীয় স্থান যা অনেকেরই অজানা

নিঝুম দ্বীপের নির্ঘণ্ট: রামপুরা টু সদরঘাট!