মদেসিয়াদের গল্প

“মদেসিয়া” শব্দটা প্রথম জানতে পারি সমরেশ মজুমদারের সাতকাহন উপন্যাসটা পড়ার সময়। সেটাই সেই ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের মাঝামাঝি স্কুল জীবনের শেষ দিকে। এরপর আবার উত্তরাধিকার পড়ার সময়। জলপাইগুড়ি চা বাগানেই মদেসিয়াদের সাথে আমার পরিচয়, সমরেশের মজুমদারের বইয়ের মাধ্যমে।

মদেসিয়ারা আসলে একটা প্রায় বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী। প্রায় বিচ্ছিন্ন এইজন্য বলেছি যে আমি এদের জন্ম, আদিবাস, ভারতে এদের সঠিক মর্যাদা সম্বন্ধে জানি না। সেদিন একটু চেষ্টা করেছিলাম ডুয়ার্স থেকে শিলিগুড়ি যাবার সময়, কিন্তু সেভাবে জানার উপায় করতে পারিনি।

তো সমরেশ মজুমদারের ডুয়ার্স আর জলপাইগুড়ির চা বাগানে মদেসিয়াদের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল সেই ১৯৯০ দশকে। ব্যস তখন ওই পর্যন্তই। মদেসিয়া নারী-পুরুষ জলপাইগুড়ি ও ডুয়ার্সের চা বাগানে ওদের মজুর খাটা, চা পাতা তোলা, ফ্যাক্টরিতে কাজ করা, চা বাগানের অদূরের বস্তিতে বা গায়ে ওদের স্থায়ী বা অস্থায়ী আবাসে বেড়ে ওঠা। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের পরিচিতি পাওয়া সবই ওই চা বাগানের মধ্যেই আবদ্ধ দেখতে পেয়েছি। এরপর ভুলেও গিয়েছি স্বাভাবিকভাবেই।

ট্রেনের করিডোরে মদেসিয়া। ছবিঃ লেখক

এরপর ২০১৭ সালের ডিসেম্বর। প্রায় ২০ বছর পরে ডুয়ার্স যাবো বলে পরিকল্পনা করতেই মনে পড়লো উত্তরাধিকার আর সাতকাহনের কথা। সেই সময়ের ডুয়ার্সের সাথে মিল খুঁজে পেতে আবারো বই দুটো পড়তে শুরু করলাম এবং আবারো আংরাভাসানদী, ডুয়ার্স, জলপাইগুড়ি, সবুজ চা বাগান, গভীর অরণ্যের সাথে নতুন করে আবারো পরিচিত হই চা বাগানের সেই মদেসিয়াদের সাথে। যাদের সাথে ২০ বছর আগে বই পড়ার মাধ্যমে পরিচিত হয়েছিলাম।

কিন্তু যখন ডুয়ার্সের চা বাগানে পৌঁছে গেলাম, সবুজ সমুদ্র আর গভীর অরণ্যের মোহে ওদের কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। একরাত এক দিনের পুরো সময়টুকুই অরণ্যে, সবুজে, ঘাসে, শিশিরে, কুয়াশায় ডুবে ছিলাম। তাই মদেসিয়াদের কথা আর মনে পড়েনি একবারও।

পরদিন সকাল। একটা মেঘ-কুয়াশা-শিশির আর সবুজে জড়ানো মায়াময় আর ঘোর লাগা একটা সকাল। তেমন একটা সকালে নির্জন লাটাগুড়ি স্টেশনে অলস সকালে ট্রেনে চেপে বসলাম শিলিগুড়ি যাবো বলে। ট্রেন চলছে গভীর অরণ্য আর সবুজ সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে। বেশ কয়েকটা স্টেশন পরে এলো অদ্ভুত নামের এক স্টেশন ডামডিম! নাম দেখেই আমরা অবাক আর আমার ছেলে তো হেসে গড়িয়ে পড়ছে প্রায়, এখনো হাসে মনে পড়লে, ডামডিম!

ডুয়ার্সের স্টেশন। ছবিঃ লেখক 

সেই ডামডিম নিয়ে মজা করতে করতেই কোথা থেকে যেন হুড়মুড় করে একদল অন্য রকম মানুষের দল ট্রেনে উঠে পড়লো। একেবারেই অন্য রকম বেশভুষা, কথাবার্তা আর আচার আচরণ। কোনো কিছুই যেন সাধারণ মানুষের সাথে মিলছে না। আরও অবাক করার মতো ব্যাপার হলো, ট্রেনে পর্যাপ্ত আসন ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও তাদের কেউই সিটে এসে বসলো না। অবাক লাগলো ব্যাপারটা।

আর সবচেয়ে অবাক ব্যাপার দুই থেকে তিনটি পরিবার হবে হয়তো এক সাথে এবং এদের প্রত্যেকের সাথেই পাঁচ থেকে ছয়টি বাচ্চা-কাচ্চা আর প্রত্যেকটির বয়স ঠিক এক থেকে দেড় বছরের ব্যবধানে! সবাই ওদের দেখে বেশ মজা পেয়েছে। আর শুধু বাচ্চাকাচ্চাই নয়, পুরো পরিবারের সবকিছুই যেন নিয়ে নিয়েছে ওরা, ওদের সাথেই।

ব্যাগপত্র, ট্র্যাঙ্ক, কাপড় চোপড়, হাড়ি পাতিল, লাঠি-লোটা কী নেই সাথে? দেখে মনে হচ্ছিল ওরা বোধহয় ওদের বাসা পরিবর্তন করছিল মানে এক চা বাগান থেকে বোধহয় অন্য চা বাগানে স্থানান্তরিত হচ্ছিল।

এসব দেখছি আর ভাবছি এই ভিন্ন ধরনের মানুষরা আসলে কারা? ঠিক এমন সময় একজন তাড়ির বোতল বের করতেই মনে পড়ে গেল সমরেশের উপন্যাসের মদেসিয়াদের কথা। তাৎক্ষণিক মাথায় চলে এলো আরে ওদেরকে তো আমি চিনি, একটু একটু জানি। ওরা তো সেই মদেসিয়া নারী পুরুষ, যাদেরকে বইয়ে পড়ে একটু একটু জেনেছি।

ওদের জীবন যাপন। ছবিঃ লেখক 

এরপর থেকেই ওদেরকে দেখতে লাগলাম। ওদের কথা, আচার আচরণ, পোশাক, নানা রকম কার্যকলাপ। আর যেটা বুঝলাম ওরা এখনো এতই সহজ, সরল আর প্রাকৃতিক রয়ে গেছে যে চিন্তাই করা যায় না। কারণ একটি স্টেশনে দাঁড়াবার পরে ওদের কয়েকটা ছবি তুলেছিলাম বাচ্চাদের। যেটা দেখতে ওরা ভীষণ আনন্দ বোধ করেছিল আর অনুরোধ করেছিল ছবিগুলো ওদের মাকে একটু দেখানোর জন্য। সেই ছবি দেখে ওরা দারুণ খুশি হয়েছিল, আর আশা করেছিল, হয়তো কোনো পত্রিকায় ওদের ছবি ছাপা হবে কোনো একদিন!

হায়রে ওরা তো জানে না, যে আমি শখের ছবি তুলেছি, পত্রিকার জন্য তোলা আমার কর্ম নয়। তবে দারুণ ভালো লেগেছে আর মজা পেয়েছি প্রায় ২০ বছর আগে বইয়ে পড়া মদেসিয়াদের দেখে। আরও বেশী মজা পেয়েছি বইয়ে যেমন পড়েছি ওরা এখনো ঠিক সেই আগের মতোই আছে! এতটুকু বদলায়নি বোধহয়। অন্তত ট্রেনে যেতে যেতে ওদেরকে যতটুকু দেখেছি।

ক্যামেরায় ওদের উচ্ছ্বাস! ছবিঃ লেখক 

ওরা যেখানেই যায় দল বেঁধে যায়, এক চা বাগান থেকে অন্য চা বাগানে, এক আবাস থেকে অন্য আবাসে যায় ওদের সাধ্যের সবটুকুই সাথে করে নিয়ে। বাচ্চাকাচ্চা, বাসন-কোসন, জামা কাপড়, বাক্স পেটরা, যা আছে সবসময় ওদের সাথে সাথেই ঘুরতে থাকে। যেহেতু ওদের কোনো স্থায়ী আবাস নেই বা আছে বলে আমার জানা নেই। প্রাকৃতিকভাবেই ওরা ভবঘুরে জীবন যাপন করে অভ্যস্ত বোধহয়।

তবে সত্যি বলতে কি, ওদের দেখে কেন যেন তেমন কোনো কষ্ট বা দুঃখবোধ জাগেনি। যেটা হয়েছে কলকাতার টানা গাড়ি আর যারা সেটা টানে তাদের দেখে, কাশ্মীরের অসহায় আর অভুক্ত বাচ্চাদের দেখে, শিমলার জামে মসজিদের নিদারুণ কষ্টে কাটানো মুসাফির খানা দেখে আর লাদাখের পথে পথে রাস্তা ঠিক করা মজুরদের দেখে।

এদের দেখে আমি বেশ অবাক হয়েছি সেই যেমন পড়েছি তেমনই দেখে, বেশ অন্যরকম একটা মিল পেয়ে বইয়ের সাথে বাস্তবের। মোট কথা, বেশ দারুণই লেগেছে কল্পনার সাথে বাস্তবের মিল দেখে বা পেয়ে। বই পড়ার পরে বাস্তবের মদেসিয়াদের দেখে।

এতেই অভ্যস্ত ওরা, খুশিও যেন! ছবিঃ লেখক 

মদেসিয়াদের দেখার আগ্রহ যদি কারো থেকে থাকে বা হয়, তবে যেতে হবে জলপাইগুড়ি বা ডুয়ার্সের যে কোনো চা বাগানে। সাধারণত চা বাগানেই এদের দেখা মেলে। আমি যতটুকু জানি।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: নেপালের পোখরা ভ্রমণ

পুনর্ভবা, নামের আকর্ষণে!