কলকাতার আলুসেদ্ধ গরম ও এক পশলা বৃস্টি

বনগাঁ থেকেই তুমুল গরমের মুখে পরেছে ছেলেটি। গরম মানে, এই সেই গরম নয়, একেবারে আলুসেদ্ধ হওয়ার মত গরম যাকে বলে। তবুও বেশ ধীরে ধীরে মোকাবেলা করছিল সেই প্রায় আগুন গরম।

এরপর বনগাঁ লোকালে চমৎকার পরিবেশ, মানুষে মানুষে চাপাচাপিতে পরে প্রায় চ্যাপ্টা হবার জোগাড়। তার উপর যদি যেতে হয় দাড়িয়ে থেকে তবে তো আর কথাই নেই। কারন এই ট্রেনে শুরু থেকে অর্ধেক পথ বসে যেতে পারলেও, পরের অর্ধেক প্রায় অধিকাংশ যাত্রীকেই দাড়িয়ে যেতে হয়। এটাই এই ট্রেনের অলিখিত নিয়ম।

তবুও মৃদু সান্ত্বনা বলতে ছিল, ট্রেনের খোলা জানালা দিয়ে মাঝে ঢুকে পড়া টুকরো বাতাস। টুকরো এজন্য যে, সে বাতাস গুলো সরাসরি গায়ে এসে লাগতে পারছিলনা, অজস্র মানুষের ভিড়ে। তাই ট্রেনের দোলায় দাড়িয়ে থাকা মানুষদের শরীর যখন দুলে ওঠে সেই ফাঁক ফোঁকর থেকে টুকরো বাতাস গায়ে এসে লেগে একটু একটু করে জুড়িয়ে দিচ্ছিল।    

ব্যাস্ত কলকাতা। ছবিঃ সংগ্রহ

এভাবে মানুষের ভিড়ে, গরমে, হাপিত্যেশ করতে করতে একটা সময় বনগাঁ লোকাল শিয়ালদহ পৌঁছে গেল। ছেলেটি ভেবেছিল যাক বাবা, আপাতত ট্রেনের ভিড় আর অসহ্য গরম থেকে তো বাঁচা গেল। কিন্তু সে কি আর জানতো, যে কলকাতায় তার জন্য কেমন গরম অপেক্ষা করছে? মোটেই জানতোনা।

আর তাই কলকাতা নেমে শিয়ালদহ স্টেশনের রাস্তা পেরিয়ে বাসে করে হাওড়া যেতে যেতে সে যেন পুরোপুরিই আলু সেদ্ধ গরমের মুখে পড়েছে! ট্রেনে তো তবু একটু আধটু বাতাস টুকরো করে হলেও আসছিল। কিন্তু কলকাতা যেন বাতাস বন্ধ করে রেখে একটা দমবন্ধ পরিবেশে আবদ্ধ করে রেখেছিল নিজেকে। আর এই শহরে আগত সকলকে।  

অসহ্য গরমে একটু পানির খুব দরকার ছিল তার। তাড়াহুড়ো করে বাসে উঠতে গিয়ে পানি কেনা হয়ে ওঠেনি তাই রাগ লাগছিল খুব নিজের উপরেই। এই সময়ে যেটা হয়, পানি থাকলে যতটা তেষ্টা পায়, সাথে পানি না থাকলে তেষ্টা যেন বহুগুণ বেড়ে যায়। একটা অস্থিরতা কাজ করতে শুরু করে।  

গরম আর সহ্য করতে পারছিলনা কিছুতেই, তেস্টায়, ঘামে আর জ্যামে একদম যাচ্ছেতাই অবস্থা দাঁড়িয়েছে। বাস থেকে নেমেই পরবে কিনা সেটা ভেবে যখন…

ভীষন বিরক্তি নিয়ে মুখ তুলে সামনে তাকালো আবার চোখ নামিয়ে নিল। কিন্তু তাৎহ্মনিক আবার ভিড়ের মধ্যে তাকালো, মনে হল ভিড়ের মাঝে, গা ঘেঁসে-ঘেঁসে দাড়িয়ে থাকা লোক গুলোর মাঝ থেকে একটি চোখ, ওকে দেখছিল! হ্যাঁ একটি চোখই। কারন মানুষের ভিড়ে দুই চোখ দেখা যায় এতোটা ফাঁকা বাসের মধ্যে ছিলোনা।

তাই আবারো তাকালো ভিড়ের মাঝে, হ্যা ঠিক যা ভেবেছিল, মানুষের ভিড়ের ফাঁক গলে একটি চোখ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে!

সেই এক চোখের দিকে তাকিয়েই যেন মুহূর্তেই গরম দুরে পালালো! যেন একটা ঝিরঝিরে হাওয়া কোথাও থেকে গাঁ ছুঁয়ে দিয়ে গেল!  

আবারো তাকালো, এবার দূরের সেই চোখে চোখ পড়তেই, তপ্ত কলকাতায় যেন ঝরঝর করে এক পশলা বৃস্টি নামলো! আহ, সে কি বৃষ্টি, সুখের বৃষ্টি, রিমঝিম ছন্দের বৃষ্টি, প্রান আকুল করা, হৃদয় ভিজে যাওয়া এক পশলা বৃষ্টি।

আবারো চোখ নামালো, আবারো তাকালো….

এবারের চোখের চাহুনিতে যেন, খোলা জানালা গুলো দিয়ে রিমঝিম বৃষ্টির সাথে ঝিরঝিরে হাওয়া দিয়ে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে গেল মনে প্রানে, সমস্ত সত্তা জুড়ে! কিছুক্ষণ এমনই চলছিল বাসের ভীষণ ভিড়ের মধ্যে চলন্ত বাসের দুইপাশের দুই আসনের দুরত্তের মাঝে চোখাচুখির এক অদ্ভুত ভালোলাগার খেলা। দুজনেই দুজনের চোখের ইশারায় যেন দুজনকে ফাগুণ হাওয়া বিলিয়ে যাচ্ছিল।

কখন, কিভাবে যেন কলকাতার আলুসেদ্ধ গরমের মাঝে, ঝিরঝিরে বাতাস, এক পশলা বৃস্টি, নরম-কোমল সুখ-সুখ অনুভূতি ছুয়ে যেতে লাগলো, ভিড়ের মাঝে, দুজনের দুই চোখের চাহুনিতে, হ্মনে-হ্মনে দৃস্টি বিনিময়ে! দারুণ কিছু অপার্থিব মুহূর্ত গরমে মিলিয়ে গেল নিমিষেই, তবে রেশ ঠিক-ই রয়ে গেল।

দাদা হাওড়া এসে গেছে নামবেন না?

চমক ভাঙলো বাসের হেলপারের কর্কস কন্ঠে..

সাথে-সাথে যেন ঝিরঝিরে হাওয়ায় উত্তাপ ছড়িয়ে গেল! বৃস্টি যেন নয় আগুনের হলকা এসে পুড়ে দিয়ে গেল!

যেন গরমে আলুসেদ্ধ হয়ে যাচ্ছে! ভিড়ে হাঁসফাঁস করতে লাগলো, মেজাজ যেন চরমে উঠে গেল হেল্পারের ডাকে। ধুর, বেশ ভালোই তো চলছিল, লোকাল বাস, বেশ ভিড়, মাঝে মাঝে বাসের দোলা, তার দুচোখের আকুলতা, ছেলেটির চোখ ব্যাকুলতা, দুজনের চোখে চোখে দারুণ কিছু ভালোলাগা।

উহ, কি দরকার ছিল হাওড়া এতো তাড়াতাড়ি চলে আসার, বাস থেমে যাওয়ার? কেন আজকে ভীষণ জ্যামে বাসটা দাড়িয়ে থাকলোনা অনন্তকাল! অথচ যেদিন তাড়াতাড়ি কোথায় যেতে হবে, সেদিন ঠিক-ই জ্যামে পড়ে থাকে অজস্র সময়। আর আজকেই… ধুর। ভাগ্য মাঝে মাঝে কেমন যে অবিচার করে সুখ অভাবি মানুষগুলোর সাথে। ছেলেটি তার মধ্যে আবার অন্যতম।  

হাওড়াতে যেহেতু বাস থেমেই গেল,  তাই কোন উপায় না দেখে, বাধ্য হয়ে ওকেও নেমে যেতে হল…

বাসের দরজা দিয়ে তপ্ত রোদের মাঝে নেমে দাড়িয়ে, জানালার ধারে বসে থাকা লাল-সবুজে সেজে থাকা সেই ললনার দিকে তাকালো…

বাস ছেড়ে দিল…

ছেলেটি তাকিয়ে ছিল…

কয়েক সেকেন্ড পরে লাল-সবুজ সেও একবার ফিরে তাকালো, চোখে আকুলতা আর ঠোঁটে এক চিলতে হাসি দিয়ে….

ইস, যেন তপ্ত রোদে আবারো এক পশলা বৃস্টি ভিজিয়ে দিয়ে গেল ছেলেটিকে…

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হংকংয়ের শীর্ষ সব ভ্রমণস্থানের গল্প

নিঝুম দ্বীপে ঘোরাঘুরি ও কিছু দিক নির্দেশনা