আগে সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!

গদ্য আর পদ্য সদ্য বিয়ে করেছে, বেশ কিছুদিন ভালোবাসা-বাসির পরে। ওদের এই ভালোবাসার বিয়ে নিয়েও অনেক গল্প আছে, তবে সেই গল্পগুলো আজকে নয়। আজকে ওদের বিয়ের পরের গল্প হবে।

তো যা হয়, ভালোবাসার-বাসির বিয়ে মানেই তো কিছু কাঠ-খড় পুড়িয়ে করা বিয়ে, আর বিয়ের আগে মন-প্রাণ ভরে ঘুরতে পারেনি একসাথে রিক্সায়, রাখতে পারেনি হাতে-হাত, হাঁটতে পারেনি নরম নদীর পাড়ে, গায়ে লাগাতে পারেনি মিহি বাতাস, তো সেই সব আক্ষেপ দূর করতে বিয়ের কয়েকদিন পরেই গদ্য পদ্যকে তার একটি একান্ত ইচ্ছের কথা জানালো।

তো কী সেই ইচ্ছে?

গদ্যর খুব ইচ্ছে হচ্ছে, পদ্যকে নিয়ে কয়েক দিনের জন্য বেড়াতে যাবে কক্সবাজার। দুজন একেবারে দুজনার হয়ে কাটাবে একান্ত আর নিরিবিলি কয়েকটি দিন। খালি পায়ে হাঁটবে নরম বালুতে, পা ভেজাবে সাদা ফেনা তোলা ঢেউয়ে, বসবে নারিকেল গাছের শিকড়ে, ঝিনুক দিয়ে আঁকিবুঁকি করবে বালুচরে, শেষ বিকেলে দেখবে গোধূলির রাঙা আকাশ, রাতের জ্যোৎস্না ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবে দুজনে, আরও কত কী?

কোনো এক নদীর তীরে…। ছবিঃ সংগ্রহ

তো গদ্যের এই ইচ্ছার কথা শুনে, সব সময়ের চঞ্চলা পদ্য বেশ গম্ভীর হয়ে গেল এবং গদ্যের কাছে জানতে চাইলো, দুজনের যাওয়া-আসা বাদে তিনদিন থেকে কক্সবাজার থেকে ঘুরে আসতে কত খরচ লাগতে পারে?

গদ্য তো মহা উৎসাহে লেগে গেল, সার্বিক হিসেব করতে। সব কিছু মিলিয়ে, হিসেব শেষে দেখা গেল, ৫ দিনে ১৫,০০০ হয়ে যাবে, তবে যেহেতু বিয়ের পরে আর এবারই প্রথমবার দুজনে মিলে কোথাও যেতে চায়, তাই আর একটু স্বচ্ছন্দে করতে চাইলে ২০,০০০ যথেষ্ট।
বেশ উৎসাহ আর উদ্দীপনা নিয়ে গদ্য পদ্যকে তার হিসেবের ফর্দ দেখালো, ১৫ এবং ২০ হাজারের দুই রকমই!

আর তাই দেখে, পদ্য বেশ সুন্দর করে গদ্যকে বোঝাতে লাগলো, যে কেবল বিয়ে করলে, কত টাকা ধার-দেনা করেছ, আর আমাদের তো নিজেদের কিছুই নেই, তাই এখনি না গিয়ে, তোমার ধার-দেনা একটু কমিয়ে নাও, আর এই ফাঁকে,

“আগে সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!”

তারপর নাহয় যাবো একসাথে? কী বলো?

খুবই যুক্তিযুক্ত কথা, এই কথা, এই অকাট্য যুক্তি খণ্ডনের কোনো উপায় গদ্যর কাছে নেই, কার কাছেই বা আছে এমন যুক্তি খণ্ডনের উপায়? তাই গদ্যও মেনে নিল। তবে অনেক স্বপ্নের জাল বোনা আর কল্পনার আকাশে কিছু বর্ণিল ঘুড়ি তো উড়িয়ে ফেলেছিল সে, এইসব কিছু হিসেব করতে করতেই! তাই কিছুটা মন খারাপ হলো খুব স্বাভাবিকভাবেই। তবে সেটা পদ্যকে বুঝতে দিলো না কিছুতেই।

কিন্তু পদ্য? পদ্য তো গদ্যকে চেনে খুব খুব ভালো করে, ও ঠিকই বুঝে গেল গদ্যর ঢেকে রাখা আর চেপে রাখা মন খারাপ ও বিষণ্ণতাটা। তাই একেবারে আন্তরিকভাবেই গদ্যকে বলল-

তুমি না হয় বন্ধুদের সাথে ঘুরে এসো কয়েকদিনের জন্য, আমিও একটু মা-বাবার কাছে থেকে আসি কয়েকটা দিন। এই প্রথম ওদের ছেড়ে আছি। কী বলো, পরে সংসারটা একটু গুছিয়ে নিয়ে যাবো একসাথে।

কিন্তু গদ্য এভাবে চায়নি, তবুও ওর মন ভালো করতে আর বিষণ্ণতা কাটাতে অনেকটা জোর করেই পাঠানো হলো, বন্ধুদের সাথে কক্সবাজারে।

কক্সবাজার। ছবিঃ লেখক

ঘুরে এলো গদ্য ওর বন্ধুদের সাথে কক্সবাজার থেকে, খরচ হয়েছে জনপ্রতি ৫,০০০ টাকা। যেখানে দুজন মিলে গেলে ১৫-২০ হাজার টাকা লাগতো!

২) প্রায় এক বছর পরে, এলো ডিসেম্বর মাস। গদ্য-পদ্যর নতুন সংসার চলছে বেশ হেলে-দুলে, পাল তুলে, নরম নদীতে, ঝিরঝিরে বাতাসে তৈরি হওয়া মৃদু ঢেউয়ের দোলার মতো করে। হালকা হালকা শীতের আমেজ, সকালে গ্রাম থেকে পাঠানো খেজুর রসের স্বাদ, দুপুরে নতুন তরকারীর সাথে মাছের ঝোল, বিকেলে বন্ধুদের সাথে লাল চা আর ডালপুরী, সন্ধ্যায় বাসায় গিয়ে মচমচে পিঠা, রাতে খাবারের পরে পেপার নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে একটু কফির চুমুক দিতে-দিতে, গদ্য পদ্যকে কোথায় বেড়াতে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়।

আর সেই প্রস্তাব গায়েই মাখে না পদ্য, সাংসারিক আর সামাজিক বাস্তবতার বেড়াজালের কারনে! কারণ, গদ্যর ছোট ভাই এসেছে ওদের সাথে থাকতে, সাথে তৈরি হয়েছে পদ্যরও কিছু পারিবারিক দায়িত্ব, যে কারণে চাকুরী দুজন মিলে করলেও, অবস্থার তেমন একটা উন্নতি হয়নি ওদের, আবার অভাবেও কাটছে না দিন। দুজনের সংসার, পারিবারিক দায়িত্বর কারণে বিয়ের শুরুতে হওয়া ধার-দেনাগুলো আর শোধ করা হয়ে ওঠেনি সময় মতো। পারেনি ইচ্ছে থাকা স্বত্বেও। উল্টো এখন অফিসের একটু সচ্ছল সহকর্মীদের কাছেও কিছু কিছু ধার করতে হয়েছে!

চুপচাপ থাকে পদ্য, কিন্তু গদ্য ওকে ছাড়ে না, মতামত জানতে চায়, কোথায়, কীভাবে আর কখন যেতে চায়, সামনে দুজনের অফিসেই বেশ কয়েকদিনের ছুটি আছে, এই ছুটিটা কাজে লাগানো যেতে পারে। এবার পদ্য কিছুটা সরব হয়ে, ওদের সংসারের বর্তমান প্রেক্ষাপট আর সামাজিক ও দুজনের পারিবারিক দায়িত্বের কথাগুলো তুলে ধরে। খুব স্বাভাবিক আর অকাট্য যুক্তি এবারেও।

কিন্তু গদ্য এবার পাল্টা যুক্তি তুলে ধরলো। আরে শোনো, এমন টুকটাক ধার-দেনা তো থাকবেই, তাই বলে কি জীবনটা পানসে করে ফেলতে হবে? চলোই না, বেড়িয়ে আসি কোথাও থেকে? আমার কাছে কিছু টাকা জমানো আছে, আর একটু এদিক ওদিক করলেই, মানে এক-দুই মাস সংসারের একটু হিসেব করে চললেই হয়ে যাবে। চলো যাই? এই দিনগুলো কিন্তু আর ফিরে আসবে না।

নাহ, আমি যাবো বেড়াতে, অবশ্যই যাবো, বেড়াতে আমার খুব খুব ভালো লাগে, আর তোমার সাথে হলে তো কথাই নাই, তবে একটু পরে, কিছুদিন যাক

“আগে সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!”

নাহ, তার চেয়ে তুমি তোমার জমানো টাকা দিয়ে কোনো একজনের ধার শোধ করে দাও, আমি অত হিসেব করে চলতে পারবো না, বেড়িয়ে এসে, সংসারের টানাটানি আমি করতে পারবো না। তার চেয়ে অল্প খরচে তুমি কোথাও গিয়ে ঘুরে এসো। এবার আর গদ্য জোর করলো না পদ্যকে। ছুটি পেয়ে অফিসের সহকর্মীদের সাথে প্ল্যান করে চলে গেল এক পাহাড়ের দেশে। বেড়িয়ে এলো, আর সাথে করে নিয়ে এলো অন্য এক পৃথিবীর প্রতি আকর্ষণ! ঘুরে বেড়ানোর, প্রকৃতির প্রতি জন্মালো প্রেম, পাহাড়ের সাথে হলো পরকীয়া, জীবন দেখা পেল এক নতুন জীবনের! যান্ত্রিক জীবন খোঁজ পেল এক অন্যরকম প্রেরণা ও জীবনকে উপভোগের অনন্য উপায়!

পাহাড়ে সবুজের সমুদ্র। ছবিঃ লেখক

এরপর থেকে, গদ্য মাঝে মাঝেই এই দুই-এক দিনের জন্য সময় পেলেই পালিয়ে যায়, কোথাও না কোথাও। জীবনকে দেখে নেয়, জীবনের অন্য এক রূপে, খুঁজে পায়, ভালো লাগা আর ভালোবাসার নতুন-নতুন ঠিকানা। যে ঠিকানার ঠিকানা অনেকেই পায় না!

কিছুদিন পরে এক রমজানে, উৎসব ভাতা পাবার আগে-আগে, গদ্য আবার প্রস্তাব দিল পদ্যকে, চল এবার আমরা কোথাও যাই, দূরে কোথাও। এবার তো তোমার ঘুরে এসে আর সংসারে টানাটানির কিছু নেই, বোনাসের টাকা দিয়ে বেড়িয়ে আসি চলো?

মাথা খারাপ হলো তোমার? গদ্যর প্রতি পদ্যের প্রশ্ন।

কেন মাথা খারাপের কী হলো, বুঝলাম না তো?

বোনাসের টাকায় সবাইকে কিছু না কিছু তো দিতে হবে, নাকি? সবাই প্রত্যাশা করে আছে, দুজনেই চাকুরী করি।

হ্যাঁ ঠিক আছে, সে হিসেব আমি করেছি তো! সবাইকে কিছু না কিছু দিয়েও আমরা বেশ আরামে বেড়িয়ে আসতে পারবো কোথাও না কোথাও। তাই চলো যাই?

না, না, না, আমি ভেবে আর হিসেব করে রেখেছি, সবাইকে দিয়ে তারপর বাসার জন্য কিছু ফার্নিচার কিনবো, তেমন কিছুই তো নেই আমাদের, কাউকে বাসায় ডাকতে পারি না, অথচ সবাই সংসার গুছিয়ে ফেলছে! আমরাও যাবো একসাথে ঘুরতে কোথাও, আর একটু পরে-

“আগে, সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!”

৩) প্রায় দুই বছর পরে, এলো আবার ডিসেম্বর। বেড়াতে যাবার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। গদ্য-পদ্যর চাকুরী পরিবর্তন হয়েছে, স্যালারি বেড়েছে দুজনেরই, বাসার কিছু ফার্নিচারও কেনা হয়েছে, মোটামুটি চলে যাচ্ছে, খারাপ না একেবারে। সামনে পহেলা বৈশাখ।

আজকাল পহেলা বৈশাখও বেশ উৎসব আর ঘটা করে পালন করা হয়ে থাকে। অনেক অফিস আবার এই উৎসব উপলক্ষে ভাতাও দেয়া শুরু করেছে! গদ্যর অফিসেও এই উৎসব উপলক্ষে কিছু অতিরিক্ত বোনাসের অনুমোদন দিয়েছে। সেই উচ্ছ্বাসে গদ্য এবার পদ্যকে নিয়ে কোথাও না কোথাও যাবেই যাবে বলে মনস্থির করে ফেলেছে। এবার আর কি যুক্তি দেবে পদ্য, যা গদ্য এড়াতে পারবে না? তাই এবার বেশ অবিচলভাবেই পদ্যকে বেড়াতে যাবার প্রস্তাব দিল গদ্য।

কিন্তু পদ্য? পদ্যর কাছে তো রয়েছেই খণ্ডনহীন যুক্তি, কী সেটা?

কী আবার, “আগে, সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!”

যে টাকা দিয়ে বেড়াতে যাবার প্ল্যান করছো, চল বেড়াতে না গিয়ে একটা ওয়াল টিভি কিনি? কেমন সুন্দর লাগবে বলো? অনেকটা বড়লোকি ব্যাপার! আমার তো অনেক অনেক দিনের ইচ্ছে একটা বেশ বড় ৪২ ইঞ্চি ওয়াল টিভি কেনার! চল তোমার অতিরিক্ত বোনাস আর আমার কাছে কিছু জমানো আছে ব্যাংকে, সব মিলিয়ে ডাউন পেমেন্ট হয়ে যাবে, বাকি কিস্তি আমি দেব, তোমাকে দিতে হবে না! আমার সংসারের একটা বড় জিনিস হয়ে যাবে! বেড়াতে যাবো পরে একসাথেই, ঠিক আছে?

“আগে, সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!”

পদ্যর এই যুক্তিও অনেক যুক্তিযুক্ত! গদ্যও তা মেনে নিল, কোনোরকম তর্কে না জড়িয়েই। কেনা হলো, বড় টিভি। ড্রইং রুম, এমনকি বাসার হালচালই বদলে গেল! সবার আচার-আচরণও বদলে গেল বেশ! কিন্তু গদ্যের মনে ভালো লাগলেও, উৎসাহ খুব একটা পাচ্ছে না! মন যে তার প্রকৃতির কাছে পড়ে আছে! তাই পদ্যের কাছে ছুটি নিয়ে একা একাই চলল কোথাও ঘুরে আসতে।

যাবার সময় পদ্য, গদ্যকে বলল, মন খারাপ করো না, আমরা একসাথে যাবো কোথাও না কোথাও, ঠিক আছে?

৪) পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে, গদ্য-পদ্যর সংসার। ওদের অনেক লক্ষ্মী দুটি ছেলে-মেয়ে আছে। মেঘ আর মেঘা। আর এখন তো পদ্য আগের চেয়ে অনেক অনেক আর অনেক বেশী সংসারী হয়ে গেছে! এখন নিজের অফিস, বাচ্চাদের দেখাশোনা, সংসারের ভার, ভবিষ্যতের চিন্তা, ছেলে-মেয়ের স্কুলের ভাবনা, ভালো কোথাও পড়তে পাঠানো, টিচার-প্রাইভেট-কোচিং, নাচ-গান-ছবি আঁকা-খেলাধুলা-সাঁতার শেখা, আরও কত শত সামাজিকতা রক্ষা করতে করতে কেটে গেছে, আরও ৫ বছর! কিন্তু পদ্যর আর কোথাও যাওয়া হলো না বেড়াতে, গদ্যর সাথে একসাথে!

বেড়ানোর কথা বললেই, টাকার হিসেব করে, বিভিন্ন অকাট্য যুক্তি দেখিয়ে, নিরস্ত্র করে গদ্যকে। কারণ ওই একটাই-

“আগে, সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!”

আর গদ্য, কখনো একা, কখনো বন্ধুদের সাথে, কখনো সহকর্মীদের সাথে, এখানে-সেখানে-ওখানে ঘুরে ঘুরে জীবনের নতুন মানে খুঁজে পেয়েছে। জীবনকে নতুন করে চিনতে শিখেছে, সংসারের সব চাহিদা মিটিয়ে, সংসারের বাইরেও নিজের আলাদা একটা পৃথিবী গড়েছে।

আর পদ্য সংসারের ১০ বছর পেরিয়ে যাবার পরেও তার একটাই কথা…

“আগে, সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!”

তাই আজকাল আর গদ্য বলেও না কোথাও যাবার কথা পদ্যকে! কারণ বললেও কোনো না কোনো অকাট্য যুক্তি দেখিয়ে বলে বসবে, যাবো একসাথে তুমি-আমি একদিন, ঠিক দেখো যাবো… তবে?

“আগে, সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!”

আর এই সংসারটা গোছানোর মধ্যে আরও যা-যা প্রতিনয়ত থাকে, সেসবের মধ্যে অন্যতম হলো পদ্য যখনই বাজারে যাক না কেন, আর যে কাজেই যাক না কেন, সেইসব বাজারের মাঝেও একবারের জন্য হলেই বিভিন্ন প্লাস্টিকের দোকানে ঘুর-ঘুরে, একটি মরিচের কৌটা, কখনো চিনি রাখার জন্য একটা পট, অফিসের খাবার নেবার জন্য বিভিন্ন আকার আর ধরনের বাটি, কখনো সিলভারের কড়াই, একটা ডিম ভাজার জন্য, একটা পোঁচ করার জন্য, একটা ছেলে-মেয়ের অল্প কিছু রান্না করার জন্য, একটা মাছের, একটা মাংসের, একটা মুরগীর জন্য, ছোট্ট হাড়ি, কোনোটা চায়ের জন্য, কোনোটা ডিম সেদ্ধ, কোনোটা আলু সেদ্ধ, কোনোটা অল্প পানি গরমের জন্য, কোনোটা শুধু মোটা কাপড় গরম পানিতে ফোটানোর জন্য! চায়ের চামচ-চা ছাঁকুনী-মশলার থালা, ফলের ঝুড়ি, সরপোশ! কী নেই এমন যা বাদ পড়ে কেনাকাটা থেকে?

নাহ একবারে কেনে না সব কিছুই, হয়তো মনে পড়ে না। কিন্তু যখনই বাজারে যাবে, তখনই বাজারের লিখিত বা অলিখিত তালিকায় থাকবে এসব জিনিসের কিছু না কিছু!
যা শুধু পদ্য কেন, বাজারে গেলে গদ্য দেখতে পায় পদ্য, ওর মায়ের বয়সী, নানীর বয়সী, এমনকি নানীর মায়ের বয়সীরাও এমন হরেক রকমের কাজের জন্য হরেক রকমের বাহারি কিন্তু কমদামী কেনাকাটা করে। এমন নয় যে এসব জিনিস সংসারে নেই, আছে সবই, হলেও চলে আর না হলেও চলে, তবুও কেনে!

কেনে আর কিনেই চলে, এটা ওদের সংসার গোছানোর অন্যতম সরঞ্জাম! না কিনলে যে সংসার অগোছালো থেকে যাবে! আত্মীয়-স্বজন আর পাড়া প্রতিবেশী অলক্ষ্মী বলবে! তাই সবকিছু ঠিকঠাক থাকতে হবে, অন্তত সাধ্যের মধ্যে যতটুকু সম্ভব। মনে-প্রাণে লক্ষ্য ওই একটাই-

“আগে, সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!”

৫) কেটে গেল আরও ৫ বছর। গদ্য-পদ্য আর মেঘ-মেঘাদের “অ-গোছানো” সংসারের। বেড়েছে দায়িত্ব, বেড়েছে চাপ, বেড়েছে ধার-দেনা আর হয়েছে ব্যাংক লোন! ঢাকার বাইরে এক টুকরা জমি কিনেছে, ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে যাচ্ছে, ওদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক অনেক কষ্ট আর সাধ্যের বাইরে গিয়েও বুকিং দিয়েছে ফ্ল্যাটের! এখন পদ্য অনেক অনেক আর অনেক খুশি!

সবকিছু মিলে সে দারুণ পরিপূর্ণ একটা সংসার পেতে যাচ্ছে! পদ্যর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, যে কতটা খুশি-গর্ব-অহংকার আর একটি তৃপ্তি খেলা করে যায় চোখে-মুখে! যা দেখে গদ্যরও ভালো লাগে অনেক অনেক।

এবার পদ্য বেশ বড়সড় একটা প্ল্যান করলো, ছেলে-মেয়েসহ পদ্যকে নিয়ে আসছে ঈদে দেশের বাইরে বেড়াতে যাবে। যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়া সহ সব খরচ গদ্য একাই করবে, শুধু যদি কোনো কেনাকাটা কেউ করতে চায় তো সেটার ব্যয়ভার পদ্যকে দেবে! এই কৌশল এই জন্য নিল যে তাতে করে ভ্রমণে গিয়ে কেনাকাটার মতো ফালতু কাজে আর পদ্য জড়িত হবে না, তার উপর যদি করতে হয় নিজের টাকা দিয়ে? তবে তো আর কথাই নেই! তাই এই বুদ্ধি বের করে, প্রস্তাব দিল পদ্যকে। পদ্যরও ভালো লাগলো এই প্রস্তাব, যাক খরচ তো আর ওকে করতে হবে না!

এবার জিজ্ঞাসা করলো, গদ্যকে, তো কী রকম খরচ হবে বলে হিসেব করেছ? গদ্যর হিসেব করাই ছিল, তাই বলে ফেলল, এই ধর মোটামুটি ৫০,০০০ টাকার মধ্যে আমাদের সবার হয়ে যাবে। বেশ ১০ দিনের মতো বেড়ানো যাবে ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। বেড়াতে যাবার কথা শুনে ওদের ছেলে-মেয়ের নাচানাচি শুরু হয়ে গেছে! আর অন্যদিকে দিন আর টাকার পরিমাণ শুনে পদ্যর চেতনা হারানোর উপায় হয়েছে প্রায়!

তুমি কি পাগল হয়ে গেলে! মাথা কি আর আজকাল একদম কাজ করে না তোমার? কী হলো তোমার? তুমি ঠিক আছো তো? গদ্যকে পদ্যর স্নেহের সম্ভাষণ!

কেন, তুমি এত অবাক হচ্ছ কেন? আর এত নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া দেখানোর কী হলো, কিছুই তো বুঝলাম না?

তুমি কী বুঝবে, তুমি কি সংসার চালাও? নাকি সংসারের কোনো দিকে কোনো খেয়াল আছে তোমার? তোমার কাছে জীবন হলো একটা ফানি ব্যাপার! ওই গানের মতো

“দুনিয়াটা মস্ত বড়, খাই-দাই ফূর্তি কর!”

মানে কী, আমি কখন কী ফূর্তি করলাম?

দেখ, নিজেই চিন্তা করে দেখ?

কি জানি বাপু, বুঝি না তোমাকে!

কবেই বা বুঝেছিলে?

আচ্ছা বাদ দাও, আমাকে বলো বেড়াতে যাবে না কেন?

কেন তাও তোমাকে বলে দিতে হবে নাকি?

যে পরিমাণ টাকার বাজেট তুমি করেছ, ও দিয়ে আমাদের ফ্ল্যাটের টাইলসগুলো চেঞ্জ করা যাবে, অথবা বাথরুমের ফিটিংসটা নিজেদের মতো করে নেয়া যাবে, ওরা যা দিয়েছে আমার পছন্দ হয়নি, ফ্ল্যাটে ওঠার পরে সবাইকে একবার ডাকতে হবে! সেখানে কত খরচ আছে, অথবা সোফাটা সেই কবেকার, সেটা পরিবর্তন করা যাবে, ছেলে-মেয়ের জন্য আর কিছু মিলিয়ে তুমি-আমি একটা ফিক্সড ডিপোজিট করতে পারি, যা ওদের লেখাপড়ায় কাজে লাগবে, অথবা ফ্ল্যাটের এক মাসের কিস্তি দিতে পারবে অনায়াসে, তাতে করে এক মাসের চাপ তো অন্তত কমবে?

এমন আরও অনেক প্রয়োজনীয় যে কোনো একটা বড় কাজ করা যাবে, যেটা আমার সংসারের জন্য খুবই জরুরী!

আরে, সব তো ঠিক-ই আছে, ওদের পড়াশুনা তো চলছেই ভালোভাবে। কিসের সমস্যা?

কিসের সমস্যা মানে? খালি ঘুরে ঘুরে কাটিয়ে দিলেই হবে? ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে না? ওদের কি রাস্তায় ফেলে যাবো তুমি-আমি! বড় হয়ে ওরা যেন বলতে না পারে যে আমরা কিছু রেখে যাইনি ওদের জন্য!

মানে কি? আবার কি রেখে যাবো, লেখাপড়া শিখছে ভালোভাবে, শেষ করে, আল্লাহ বাঁচালে, নিজেদেরকে নিজেরা ঠিক-ঠাক করে নেবে, যে যেভাবে চায়! আমাদের দায়িত্ব ওদের তৈরি করে দেয়া, পড়াশুনা শেষ করা, ব্যস। যা দরকার ওরা করে নেবে। আর আমাদের যদি কিছু থাকে তো সেটা ওদের বোনাস! আর কী চাই?

নাহ, আমি তোমার সাথে একমত নই, আমি আমার ছেলে-মেয়ের জন্য সংসারের এত অর্থ অপচয় করতে দেব না কিছুতেই!

তবে কি যাবে না এবারেও!

নাহ, যাবো যাবো, তবে এখনি নয়… আর একটু পরে,

“আগে, সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!”

৬) বড় একটা দীর্ঘশ্বাস বের হলো গদ্যর বুকের একেবারে গভীর থেকে, আর পদ্যকে বলল সাথে নিজের সাথে নিজেরই স্বগতোক্তি, আরে এই যে সংসার সংসার করে নিজেকে বঞ্চিত করছো প্রতিনিয়ত, জীবনকে শেষ করে ফেলছো সংসারের পিছনে, শেষ বয়সে এসে দেখবে এই সংসার তোমাকে কিছুই দেবে না, অবহেলা আর অপমান ছাড়া! অপমান না হোক, অন্তত তোমার এই সংসারের প্রতি এত নিবেদনের জন্য শেষ পর্যন্ত কিছুই তুমি পাবে না প্রতিদান, মনে রেখ! এই আমি বললাম।

এর চেয়ে চল, বেড়িয়ে পরি, জমা করি কিছু সুখ স্মৃতি, কিছু ছবি, কিছু গল্প, কিছু হাস্যরস, মজার-মজার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা, সাথে কিছু মান-অভিমান, জীবনের শেষ বেলাতে, যখন কেউ থাকবে না পাশে বা কাছে, যেন হাসি-আনন্দ-গল্প আর চোখ বুজে হারিয়ে যাবার কারণ হয়ে থাকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত!

জীবনের নতুন মানে খুঁজে নেই চলো? এই সংসারের কাছ থেকে কিছুটা ছুটি নিয়ে মাঝে-মাঝে, সাধ আর সাধ্যের মধ্যে, তোমার-আমার পছন্দ-অপছন্দ মিলেমিশে, কখনো পাহাড়ে, কখনো সমুদ্রে, কখনো অরণ্যে, কখনো মরুভূমিতে, কখনো সবুজে, কখনো সাদার শুভ্রতায়, কখনো কোনো গোধূলিতে কোনো নীল পাহাড়ের চূড়ায়, কখনো চাঁদনী রাতে, তারা ভরা আকাশের পানে তাকিয়ে কোনো নীরব সমুদ্রের সীমানায়?

চল যাই, বেরিয়ে পড়ি?

হ্যাঁ যাবো, একটু সময় দাও। তুমি-আমি একসাথে-

“আগে, সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!”

হাহ, থাক তবে, তুমি তোমার সংসার গোছাও, তোমার সংসার গোছানো হলে আমাকে বলো, যাবো তুমি আমি একসাথে, তোমার

“সংসার একটু গোছানো হলে!”

৭) এইভাবে কেটে গেলো আরও ১০ বছর, পদ্যর সংসার কিছুতেই আর গুছিয়ে ওঠে না… বয়স হয়ে গেছে ৪৫! শরীর ভারী হয়ে উঠছে দিন-দিন, দেখা দিয়েছে ছোট-খাট শারীরিক সমস্যাও, প্রায়ই যেতে হয় ডাক্তারের কাছে, নিয়মিত খেতে হয় কোনো না কোনো ওষুধ! এখন আর গদ্যই বলার সাহস পায় না, কোথাও বেড়াতে যাবার কথা! পদ্যর শারীরিক সামর্থ্য কমে গেছে। বেশিক্ষণ হাঁটতে পারে না, আবার বেশিক্ষণ বসতেও পারে না, আবার একটানা শুয়েও থাকতে পারে না। নাহ, খুব বড় কোনো সমস্যা নয়, তবে অন্তত কোথাও বেড়াতে যাবার জন্য আদর্শও নয়।

তার উপর যোগ হয়েছে, ছেলে-মেয়েদের নতুন ভাবনা, ছেলের মেডিকেলে পড়া, মেয়ের পড়াশুনার পাশাপাশি ভালো একটা বিয়ের চিন্তা। সাথে মেয়ের জন্য টুকটাক গহনা বানানো, একটু টাকা পয়সা জমলেই, বাড়িতে রঙ করানো, জমিতে কিছু ফসল লাগানো, একটি লোক রাখা, তাকে সবকিছু বুঝিয়ে দেয়া ও তদারকি করা, আরও কত শত সংসারের কাজ, এসবের কি আর শেষ আছে? নেই।

৮) পদ্য আর গদ্যর বয়স ৫০ পেরিয়ে গেছে! পদ্যকে ঘিরে ধরেছে বার্ধক্য এরই মধ্যে! কিন্তু গদ্য যেন এখনো তরুণ! দুজনের মন-মেজাজ আজকাল একেবারেই আলাদা, চিন্তা-ভাবনা একেবারেই দুই মেরুর, যার অনেকটা আগে থেকেই ছিল, এখন তা আরও প্রকট হয়েছে। আর লেগেই থাকে খিটমিট দুজনের সাথে, সারাক্ষণ সারাক্ষণ!

গদ্যকে এখন প্রতিনিয়ত কথা আর খোটা শুনতে হয় তার একাকী জীবন নিয়ে, ভ্রমণ নিয়ে, নিজের জন্য গড়া নিজের পৃথিবী নিয়ে, ওর ছেলে মানুষী ছবি-গল্প-কথা আর নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়ে!

আর পদ্য এখনো সময়-সুযোগ আর শারীরিকভাবে সুস্থ হলেই লেগে পড়ে ওর সাধের সংসারে পিছনে। আর এখনো মন খুব ভালো থাকলে গদ্যকে বলে, একবার না একবার ওরা বেড়াতে যাবে, দূরে কোথাও, শুধু গদ্য আর পদ্য একসাথে, শুধু-

“আগে, সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!”

৬৫ বছর পরেও গদ্যর সংসার আর গুছিয়ে ওঠা হলো না, হলো না শেষ বাজারে গিয়ে না হোক, বাসার গেটের সামনে এলে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কেনা, সেইসব প্লাস্টিকের রঙিন আর কমদামী জিনিসপত্র, হাড়ি-পাতিল, খুনতি-কড়াই, সরপস আর চা ছাঁকুনী! হলো না শেষ সোফার কভার বদলানো, পর্দার কাপড় পরিবর্তন, মেঝের টাইলস বদলানো, বাথরুমের ফিটিংস ঠিক করা আর বিছানা-বালিশের কভার পরিবর্তন! আর সেই সাথে হলো না, ৬৫ বছর বয়সেও কোথাও কোনো ভ্রমণ গদ্য-পদ্যর একসাথে। কেন হলো না? কারণ একটাই, পদ্যর-

“আগে, সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!”

আর পদ্যর? জীবন এখনো রঙিন, বর্ণিল, আনন্দময় আর ভেসে বেড়ানোর মতো উচ্ছ্বাস ও উদ্দীপনায় ভরা!

কিন্তু পদ্যর হলো না আজও সংসারটা গুছিয়ে নেয়া!

তাই আজকাল, গদ্য কোথাও বেড়াতে যায়, আর যাবার সময় পদ্যকে কোনো আমন্ত্রণ জানায় না, শুধু শুনিয়ে যায়, কয়েক যুগ ধরে গদ্যকে, পদ্যর শোনানো কথাই-

তুমিও যাবে, বেড়াতে একদিন, একসাথে-

“আগে, সংসারটা একটু গুছিয়ে নাও!”

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সেন্ট্রাল আমেরিকায় ব্যাকপ্যাকিং টিপস

নীল আকাশ, রঙিন পাহাড় আর ঝলমলে লেকের মান-অভিমান!