সবুজ ধানের মাঠ পেরিয়ে দিবর দীঘি ও অবাক স্তম্ভ

bty

দিবর দীঘির সাথে আমি একটুও পরিচিত ছিলাম না। যে কারণে আমার কোনো রকম পরিকল্পনার মধ্যেই এটা ছিল না। সেটাই স্বাভাবিক। যেটা আমি চিনি না, জানি না, কোনোদিন নাম শুনিনি সেটা তো কোনো পরিকল্পনায় থাকার কথাও না। আমার পরিকল্পনায় ছিল আলতাদীঘি।

আলতাদীঘি যাবো শুনে এক বন্ধু পরামর্শ দিল আলতাদীঘি যেহেতু যাবে সাথে প্রাচীন আরেক দীঘি “দিবর দীঘির সাথে দীঘির অবাক স্তম্ভ” দেখে এসো। বন্ধুর পরামর্শমতো একদিনে দুই দীঘি দেখতে বেড়িয়ে পড়লাম।

তো এক সকালে নাস্তা করে বেরিয়ে পড়লাম। সেদিন ঈদের পরদিন হওয়ায়, বাসের সংখ্যা একটু কম ছিল আর এক বন্ধু জানালো নওগাঁ থেকে বাসে যেতে হবে ধামুরহাট। যে কারণে ধামুরহাটের বাস না পেয়ে আর বন্ধুর পরামর্শ মেনে নিয়ে নজিপুর থেকে সাপাহারের বাসে উঠে পড়লাম নওগাঁ থেকে।

৬০ বিঘার দীর্ঘ দীঘি। ছবিঃ লেখক 

নওগাঁ থেকে নজিপুরের দূরত্ব ৫৫ কিলোমিটার। মফস্বলের মিনি বাসে একটি জানালার পাশের সিট নিয়ে বসে পড়লাম। সময় লাগবে প্রায় দুই ঘণ্টা। বাসে ওঠার কিছু সময় পরেই বাস ছেড়ে দিল। কয়েক মিনিট হালকা ধুলো বালির পথ পেরিয়ে মূল শহর থেকে মহাদেবপুরের পথে চলতে শুরু করতেই নির্মল, বিশুদ্ধ বাতাস প্রাণ ভরে নিয়ে নিলাম বাসের খোলা জানালা দিয়ে। আর অপলক চোখে তাকিয়ে রইলাম যতদূর চোখ যায় দিগন্ত জোড়া সবুজের দোলা দিয়ে যাওয়া অবারিত ধানক্ষেতের দিকে।

নওগাঁ জেলায় আর কিছু থাকুক আর নাই থাকুক, আর কিছু ভালো লাগুক আর নাই লাগুক এই একটি জিনিষ আমার ভীষণ, ভীষণ আর ভীষণ ভালো লাগে। যারা একটু সবুজ ভালোবাসে, ভালোবাসে প্রকৃতি, নরম কোমল আর প্রশান্তির পরিবেশ, নওগাঁ শহর থেকে যে কোনো দিকে কয়েক কিলোমিটার গেলেই এই ভালো লাগার ব্যাপারটা পেয়ে যাবেন। নওগাঁ জেলার উপজেলাগুলোর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অবারিত সমতল ভূমিতে চোখ জুড়ানো, মন মাতানো আর প্রাণ ভুলানো সবুজ ধান গাছ।

মিহি বাতাসে ধান গাছের দোল খাওয়া, ধান গাছের শীষের উপরে উড়তে থাকা, বসে থাকা আর খেলা করে যাওয়া ফড়িং। লাল, হলুদ, সবুজ, খয়েরি, কালো নানা রঙের বর্ণীল সব ফড়িংদের মন মাতানো খেলা। ধান গাছ আর বড় সবুজ ঘাসে নির্জনে, নিরালায় আর নিস্তব্ধ জায়গা ছাড়া এত এত রঙবেরঙের ফড়িং আর কোথাও দেখা যায় বলে আমার মনে হয় না। আমি অন্তত দেখিনি।

মন মাতানো সবুজ। ছবিঃ লেখক

তাই যখনই যে গ্রামের পথের বাঁকে বাস থেমেছে, টুক করে নেমে গেছি সবুজ ধানক্ষেতে, রঙিন ফড়িং দেখতে, উড়ে যেতে, বসে থাকতে, খেলা করতে। এ আমার দারুণ লাগে। যেন ওদের খেলা দেখা মানে নিজেই ওদের সাথে খেলা করা। ওদের উড়ে যাওয়া যেন নিজেরই ওদের সাথে উড়ে চলা, ওদের চুপ করে ধানের শীষে বসে থাকা যেন আমারই সবুজ ঘাসে চুপ করে বসে থাকা।

নওগাঁ জেলা শহর থেকে বাইরে বের হলেই এই অপার্থিব দৃশ্য আমাকে মুগ্ধ করে দেয়। চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে, নীরবে দাঁড় করিয়ে দেয়, কোনো এক সবুজ ধানক্ষেতের কোনো এক প্রান্তরে। আমিও বসে থাকি, চেয়ে থাকি, ফড়িংয়ের সাথে খেলা করি আপন মনে। এটা নওগাঁর বিশেষত্ব আমার কাছে।

বাসে চলা-থামা, আমার নামা-ওঠা, বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের সবুজের বুক চিরে সামনে এগিয়ে যাওয়া আর বুক ভরে নিতে থাকা, জমা করতে থাকা বিশুদ্ধ বাতাসের মাঝেই ঝুপ করে বৃষ্টি নেমে গেল ঝিরঝির করে। ঝিরঝির থেকে টুপটাপ আর টুপটাপ থেকে তুমুল বৃষ্টি যেন হঠাৎ করেই ভাসিয়ে নিতে চাইলো চারপাশকে। সবাই তড়িঘড়ি করে তাদের জানালাগুলো লাগিয়ে দিল। আমিও টেনে দিলাম একটু ফাঁকা রেখে।

যেন বিশুদ্ধ বাতাসের সাথে একটু বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগে হাতে, মুখে, গালে, গলায়, কপালে, হৃদয়ে। যেন শীতল করে দেয় কিছুটা। শুনলাম চারপাশে বলাবলি করছে কোথায় যেন পানি হচ্ছে। এদিকে নাকি এই সময়ে অনেক পানি হয়। কিছুই বুঝে উঠতে না পেরে, কান খাড়া করে শুনে নিজের মতো করে বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম। প্রায় ২০ মিনিট বাসের লোকজনের নানা রকম কথা, অভিব্যক্তি আর চারপাশের উদ্বিগ্নতা দেখে বুঝলাম, এরা বৃষ্টি নামাকে পানি আসছে বলে! মনে মনে হাসলাম। এতটুকু দেশ অথচ কত রকমের ভাষা, শব্দ আর সেসবের অর্থেরও কত ভিন্নতা।

প্রাচীন স্তম্ভ। ছবিঃ লেখক

এরই মধ্যে চলে এলাম নজিপুর। নজিপুর থেকে আরও প্রায় ২৫-৩০ মিনিটের পথ সাপাহার। মাঝে পড়ে অনেক নাম শোনা, বইয়ে পড়া চীনামাটির দেশ পত্নীতলা। নওগাঁর পত্নীতলায় চীনামাটির সন্ধান পাওয়া গেছে! কত যে পড়েছি হায়, কিন্তু কোনোদিন চোখে দেখিনি। নেমে যাবো নাকি এখানেই? নাহ থাক আজকে নয় আর একদিন।

আবারো টিপটিপ বৃষ্টি ঝরতে শুরু করলো। ওদের কাছে পানি আসছে বা পানি নামলো আবার। সেই পানি যে নামলো আর থামে না। শেষ পর্যন্ত ওই পানি না নামতেই চলে এলো আমার সেই সময়ের গন্তব্য সাপাহারের দিবর দীঘির মোড়। নেমে পড়লাম লুঙ্গি মাথায় দিয়ে, জ্বরের ভয়ে। এক দোকানের চালার নিচে বেশ কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে বৃষ্টি একটু থেমে আসতেই রাস্তা পেরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যাটারি রিক্সায় উঠে পড়লাম ভাড়া ১০ টাকা, দূরত্ব দুই কিলোমিটারের চেয়ে একটু বেশী।

দিবর দীঘির প্রবেশ পথ। ছবিঃ লেখক

যেখানে নামালো রিক্সা, মাটির কাঁচা রাস্তা চলে গেছে দূরে দুই পাশে দেবদারু গাছের মাঝ দিয়ে। একই রকম দেবদারু গাছের সারির মাঝ দিয়ে কাঁচা মাটির রাস্তায় হেঁটে যেতে দারুণ লাগছিল। একটা জায়গায় নিয়ে রাস্তা একটু বামে বাঁক নিল। সোজা চলে গেছে দীঘির ঘাটে আর একটি রাস্তা চলে গেছে পিকনিক স্পটে।

আমি সময় অপচয় না করে সোজা দিবর দীঘির শান বাঁধানো ঘাটে গিয়ে পৌঁছালাম। অন্যান্য সাধারণ দীঘির মতোই বেশ বড়, চারকোণা একটি টলটলে জলে ভরা দীঘি। যার চারপাশে অন্যান্য দীঘির মতোই নারকেল, ফুল, পাতা বাহারসহ নানা রকমের আম, জাম আর কাঁঠাল, কলার গাছে আচ্ছাদিত, ছায়া ঘেরা চারপাশ।

কিন্তু এই দীঘির একটি বিশেষত্ব হলো, যার টানে বা যে অবাক বস্তু দেখতে স্থানীয় বা দূর দূরান্ত থেকেও প্রতিদিন শত শত মানুষ ছুটে আসে সেটা হলো, ৬০ বিঘার দীর্ঘ দীঘি আর যার ঠিক মাঝখানে সেই কোন যুগের ৩১.৮ ফুট দীর্ঘ একটি মিনার। যার ৬.৩ ফুট পুকুরের পানির তলায় মাটির নিচে আর বাকি অংশ পুকুরের পানির উপরে দিব্বি দাঁড়িয়ে আছে। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ শত বছর ধরে। তার চেয়েও বেশী বছর ধরে হয়তো।

টলটলে জলে দাড়িয়ে অবাক স্তম্ভ। ছবিঃ লেখক

এর সঠিক ইতিহাস যে কী, কেউই সঠিকভাবে বলতে পারেনি। পাল বংশের মহিপাল কোনো এক বিজয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে বা কার জন্য, কী উপকারে নাকি কারো স্মৃতি ধরে রাখতে (নানা রকম মতভেদ আছে) এই স্তম্ভ বসিয়ে রেখে গেছে উইকিপিডিয়ায় কিছু লেখা আছে পেলাম। কিন্তু ইতিহাস আমি বলতে পারি না আর বলিও না, সেই ইচ্ছা করে না। কারণ ইতিহাস তো লেখাই আছে, যে কেউ চাইলেই খুঁজে পেতে পারে। আমি শুধু আমার অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির কথা বলি, বলতে পারি আর এতেই স্বচ্ছন্দবোধ করি।

দীঘির ঘাটে একটি নৌকা বাঁধা থাকে, যাত্রী পেলে জনপ্রতি ১০ টাকার বিনিময়ে বেশ গভীর দীঘির টলটলে শীতল জলের মৃদু ঢেউয়ের দোলা খাওয়াতে খাওয়াতে নিয়ে যায় প্রাচীন ঐতিহ্য বা এই দীঘির বিশেষ আভিজাত্য সেই পানির উপরে জেগে থাকা মিনারের কাছে। ডিঙি নৌকাতে করে যেতে আসতে কিছুটা রোমাঞ্চ লাগে বৈকি। শান বাঁধানো ঘাটে ডিঙি পেয়ে ঝটপট উঠে পড়লাম সময় নষ্ট না করে। আর ঈদের ছুটির ভীষণ কোলাহল থেকে নিজেকে দূরে রাখতে।

bty

নরম জলে ভেসে, হালকা ঢেউয়ে দুলে, ঝিরঝিরে বাতাস গায়ে মেখে, কিছুটা ভয়, অল্প একটু শঙ্কা নিয়ে ডিঙিতে চড়ে ছুঁয়ে দেখলাম দীঘির মাঝের সেই প্রাচীন মিনারকে। চমৎকার একটি বেলার দারুণ উপভোগ্য কিছু সময়ে অসাধারণ কিছু প্রাপ্তি, নির্মল বাতাস, বুক ভরে নেয়া নিঃশ্বাস, অবারিত সবুজ ধানক্ষেতের দোলা, বর্ণীল ফড়িংয়ের ওড়াউড়ি, ঝিরঝিরে আর টুপটাপ বৃষ্টির স্পর্শ, ব্যতিক্রমি মিনার নিয়ে অন্য রকম আকর্ষণের দিবর দীঘি।

বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন নিয়ে নিজেদের মতো করে এমন প্রশান্তির পথ পেরিয়ে এমন অন্য রকম ব্যতিক্রমি স্থাপনাযুক্ত দীঘি একবার দেখা যেতেই পারে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বৃত্তে থেকেই বৃত্তের বাইরের এক পরিব্রাজকের সাথে গল্পগুজব

ঘুরে আসুন 'সিটি অব পার্ল' খ্যাত হায়দ্রাবাদে