দিল্লীর মেট্রোর মারপ্যাঁচে…

দিল্লীর মেট্রো একটা মস্ত মারপ্যাঁচে ব্যাপার। যেটা এর আগে দুই একবার না বুঝলেও এবার হাড়ে হাড়ে বুঝেছি। তবে হ্যাঁ, আমাদের মতো সাধারনণ বাংলাদেশি যারা শুধু নিউ দিল্লী স্টেশন থেকে এয়ারপোর্ট টার্মিনাল ২ অথবা ৩ এ যাবে অথবা এয়ারপোর্টের টার্মিনাল দুই বা তিন থেকে নিউ দিল্লী ট্রেন স্টেশনে যাবে তাদের জন্য মোটে তেমন মারপেঁচে মনে হবে না। কিন্তু সরাসরি এই দুই গন্তব্যের বাইরে গেলেই বা যেতে চাইলেই তাদের কাছে দিল্লীর মেট্রো বেশ খটমট আর মারপ্যাঁচে মনে হবে। ঠিক যেমনটা আমার হয়েছে।

এবার দিল্লী থেকে দেরাদুন যেতে আমার প্লেন আর ট্রেনের মাঝে ঠিক ৬ ঘণ্টা ট্রানজিট ছিল। তো এই ৬ ঘণ্টার একটি মুহূর্তও আমি হেলায় হারাতে রাজি ছিলাম না। তাই এই ৬ ঘণ্টার জন্য আমার বরাদ্দ ছিল দিল্লীর বিখ্যাত একটা স্থাপনা, আকশারাধাম দর্শন। বিশেষ করে এর বাইরের ও ভেতরের কারুকাজ, অনন্য শিল্প শৈলী আর অপূর্ব সন্ধ্যায় লাইট শো। কিন্তু দিল্লী মেট্রো লাইনের মারপ্যাঁচ বাঁধাল ঝামেলা আর আমাকে খাওয়ালো ঘোল।

মেট্রোর ভিতরের আসন। ছবিঃ সংগ্রহ 

প্লেন থেকে নেমে বাসে উঠে মেট্রো লাইন স্টেশনে নেমে মেট্রো ধরে সোজা নিউ দিল্লী স্টেশনে চলে গেলাম। ভেবেছিলাম ঠিক তেমন করেই নিউ দিল্লী স্টেশন থেকে মেট্রো ধরে আকশারাধাম চলে যাবো। কিন্তু বাস্তবতায় সেটা অন্যরকমভাবে ধরা দিল। মেট্রো স্টেশনে গেলাম ঠিকই, টিকেটও কাটলাম আকশারাধাম স্টেশনের, মেট্রো লাইন এসে পৌঁছে যাবার পরে তাতে উঠেও পড়লাম। বেশ চলেছি হেলেদুলে, কোনোরকম কোনো দিকে চোখ-কান না দিয়ে।

আর এই কোনোদিকে চোখ-কান না দেয়াটাই আমাকে ঝামেলায় ফেলে দিল। তাই মাঝে মাঝে চোখ-কান খোলা রাখতেই হয়, বিশেষ করে দিল্লীর মেট্রোতে উঠে নতুন আর অচেনা কোনো গন্ত্যব্যে যেতে চাইলে। কারণ নিউ দিল্লী থেকে আকশারাধাম যেতে চাইলে মাঝে একটা জায়গায় মেট্রো পরিবর্তন আবশ্যক, যেটার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। গ্রিন লাইন থেকে ইয়োলো লাইন মেট্রোতে ট্রান্সফার হতে হয়। কিন্তু আমি মোবাইলের স্ক্রিনে মনোযোগ দিয়ে থাকায় সেটা খেয়ালই করলাম না।

মেট্রোর ব্যস্ততায়। ছবিঃ সংগ্রহ 

প্রায় ৪০ মিনিট যাবার পরেও যখন আমি আমার গন্তব্যের কোনো ঘোষণা শুনতে পেলাম না তখন পাশের এক যাত্রীকে আমার গন্ত্যব্যের কথা জানাতেই, তিনি আমাকে জানালেন যে আমি অনেকটা দূরে চলে এসেছি আমার গন্তব্য ছেড়ে আর সেই গন্তব্যে যেতে হলে আবার ২০ মিনিট পিছনে গিয়ে তারপর মেট্রো পরিবর্তন করে আমার গন্তব্যে যেতে হবে। এই কথা শুনেই ঝটপট পরের স্টেশনে নেমে গেলাম।

ফেরার মেট্রো পেয়ে গেলাম এক মিনিটের মধ্যেই। সেটিতে করে আবারো প্রায় ২০ মিনিট উল্টো পথে গিয়ে গাজিয়াবাদ স্টেশনে নেমে আকশারাধাম এর ইয়োলো লাইন মেট্রোতে চড়ে বসলাম। ১৫ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম একদম আকশারাধাম স্টেশনে। মেট্রোর কাঁচের জানালা দিয়েই পাশের ঝলমলে আর সন্ধ্যার লাইট শো আকশারাধাম দেখতে পাচ্ছিলাম। স্টেশনে নেমে ঝটপট সেদিকে হেঁটে গেলাম। তিন বা চার মিনিট হেঁটে গেলেই আকশারাধামের প্রবেশদ্বার। পৌঁছে গেলাম প্রবেশদ্বারে।

দূরের আকশারাধাম। ছবিঃ লেখক 

কিন্তু পুলিশের বাঁধা ভেতরে যাওয়া যাবে না। কেন? সন্ধ্যা ৬টার পরে আর ভেতরে প্রবেশ করা যায় না। আর ওখানে নিয়ম তো নিয়মই। দেশি আর বিদেশি বলে কোনো আলাদা নিয়ম বা খাতির নেই। তাই চুপচাপ হাইওয়েতে দাঁড়িয়েই কতক্ষণ দূরের আকাশারাধামের আলোকসজ্জা দেখলাম। দুই-চারটা ছবি তুলে ফেরার পথ ধরার জন্য মেট্রো না অটোতে করে ওল্ড দিল্লী যাবো সেই ভাবনা ভাবতে লাগলাম।

কারণ আকশারাধামের প্রথম মিশন ফেইল হলেও ওল্ড দিল্লীতে ঘুরে ঘুরে পায়ে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে বিখ্যাত দিল্লী-৬ অথবা করিম হোটেলে রাতের ডিনার করবো বলে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম। তো সেই উদ্দেশ্যেই এবার ওল্ড দিল্লী যাত্রা। ট্রানজিট পিরিয়ডের দ্বিতীয় মিশনে। কী আর করার! দিল্লী মেট্রো লাইনের মারপ্যাঁচে পড়ে আকশারাধাম দেখার সাধ না মিটলেও মিশন দুই কিছুতেই বরবাদ হতে দেয়া যাবে না। যে কারণে আবারো মেট্রোর মারপ্যাঁচে না পড়তে আর ঝামেলামুক্ত ভাবে ওল্ড দিল্লী পৌঁছে যেতে এবার মেট্রোর পরিবর্তে অটোকেই বেছে নিলাম।

ঝামেলাহীন ভ্রমণে মেট্রো দারুণ। ছবিঃ সংগ্রহ 

তবে হ্যাঁ যতই মারপ্যাঁচে আর খটমট মনে হোক না কেন, যদি ঠিক মতো নিজের কাছে গন্ত্যব্যের একটা ম্যাপ থাকে আর থাকে দিল্লী মেট্রোর অ্যাপ নিজের মোবাইলে, সেই সাথে ভালো করে মেট্রোর ম্যাপ জেনে নিতে পারলে পুরো দিল্লীর আনাচে, কানাচে ঘুরে বেড়াতে দিল্লী মেট্রো লাইনের কোনো বিকল্প নেই। এবং অবশ্যই সেটা অনেক অনেক কম খরচে, অল্প সময়ে আর জ্যাম ও ঝামেলামুক্ত ভাবে। আর যে ব্যাপারটা এর আগে আমি খেয়াল করিনি কিন্তু এবার মেট্রোর মারপ্যাঁচে পড়ে খেয়াল করেছি সেটা হলো, মেট্রোতে প্রতিটা স্টেশনে পৌঁছে যাবার বেশ আগেই কোথায় আসছে আর কোন দিকে প্লাটফর্ম সেটা বেশ কয়েকবার ঘোষণা দেয়া হয়।

আর এরপরের কোন স্টেশন সেটাও জানিয়ে দেয়ার পাশাপাশি প্রতিটি কামরাতে মনিটর আছে যে মনিটরে কোথায় আছেন, এরপর কোথায় যাবেন তারপর কোথায় পৌঁছাবে এবং কোন পাশে প্লাটফর্ম সবকিছু অনবরত দেখাতে থাকে। আর শুধু এটাই নয় পুরো মেট্রো লাইনের গন্ত্যব্যের একটা ম্যাপ সব সময় নানার রঙে নিজেকে জানান দিতে থাকে। যেটা এর আগে আমার চোখেই পড়েনি। প্রথম ভুল করার পরে এসব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছিলাম চোখ আর কান খোলা রেখে।

মেট্রো লাইন ম্যাপ। ছবিঃ সংগ্রহ 

তাই সব সময় যানবাহনে উঠেই মোবাইল স্ক্রিনে চোখ আটকে না রেখে নিজের সুবিধার জন্য চোখ-কান খোলা রাখা খুবই জরুরী। বিশেষ করে সেটা যদি হয় নতুন কোনো শহরে আর একদম নতুন কোনো গন্তব্যে যাবার সময়। তবে যাই বলি না কেন আর নিজে যতই পথ হারিয়ে বা মেট্রোর মারপ্যাঁচে পড়ি না কেন, সময়, অর্থ, জ্যাম, ঘাম আর অযথা ঝামেলা এড়াতে দিল্লী মেট্রো লাইনের কোনো বিকল্প বা তুলনা নেই। সে আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লম্বা ছুটিতে ভরপুর বছর ২০১৯ সাল

চাঁদপুর-বেলগাঁও চা বাগানের গল্প