বনগাঁ লোকালে বোকামী

আজকাল বনগাঁবাসীর পাশাপাশি আমাদের বাংলাদেশিদের কাছেও বনগাঁ থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত যেতে বনগাঁ লোকাল একটি খুবই জনপ্রিয় ট্রেন। এটা অনেকেই জানি যে বনগাঁ লোকাল হলো ভারতের একটি লোকাল ট্রেন আর এই ট্রেনের জনপ্রিয়তা দিন দিন আমাদের কাছে বেড়েই চলেছে আর চলবেও।

বেশ কয়েকটা কারণে বনগাঁ লোকাল ওদের পাশাপাশি আমাদের কাছেও দারুণ জনপ্রিয় যার মধ্যে অন্যতম হলো খুবই কম টাকায় বনগাঁ থেকে শিয়ালদহ পৌঁছে যাওয়া যায়। বনগাঁ থেকে মাত্র ২০ রুপী শিয়ালদহ। আর দ্বিতীয় কারণ হলো বাসের মতো কোনো অসহনীয় জ্যামে পড়ে প্রচুর সময় নষ্ট হবার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই (এক-আধটি ব্যতিক্রম ছাড়া)। এই দুটি বিশেষ কারণে আমাদের দেশের অনেকের কাছেই বনগাঁ লোকাল দারুণ একটি সাশ্রয়ী বাহন হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যারা আমার মতো খুবই কম খরচে ভারতের নানা জায়গায় যাওয়া আসা করে মাঝে মাঝেই।

মাঝ পথের স্টেশন। ছবিঃ সংগ্রহ

তবে হ্যাঁ বনগাঁ লোকালে কিছু সমস্যাও যে নেই তেমন কিন্তু নয়। বেশ কিছু সমস্যা আছেই। যার মধ্যে অন্যতম হলো সিটের একটা সমস্যা। কারণ এই ট্রেনে আপনি যতই ফাঁকা সিটের অনেকগুলো বগি দেখেন না কেন, বনগাঁ থেকে একটি দুটি স্টেশনে যেতে যেতেই সিট তো সিট, দুই সিটের মাঝের সামান্য ফাঁকা জায়গাগুলো পর্যন্ত পরিপূর্ণ হয়ে যায় চোখের পলকে। এই যে সিট আর সিটের মাঝের ফাঁকা অংশ যেখানে দুই সিটের যাত্রীরা পা রেখে আরামে যায় বা যেতে চায়, সেখানেই আমরা (পড়ুন বাংলাদেশিরা) একটা বোকামি করে ফেলি।

শুধু কি আমরা বোকা বনে যাই তাই-ই নয়, আমাদের ওদের অনভ্যেস আর জানা থাকার কারণে কখনো কখনো ভীষণ অপমানিত হতে হয় ওদের স্থানীয়দের দ্বারা! একটা সময় তো এমন আসে যে শুধু তারা আমাদের দুই একজনকে নয় পুরো বাংলাদেশিদেরকেই অবমাননাকর কথাবার্তা বলে থাকে, যেটা খুবই আপত্তিকর। সেইসব করুণ কটু কথা আর অসহনীয় অপমানজনক কথাগুলো এত বেশি গায়ে এসে লাগে যে যারা অপমান করছে তাদের নয়, আমরা যারা অপমানিত হচ্ছি তাদেরকে কী যে অসহ্য আর অসহনীয় মনে হয় বলে বোঝানো খুব মুশকিল। কখনো কখনো তো তাদের অপমানিত হওয়া কথাগুলো শুনে ইচ্ছে হয় পারলে তখনই ট্রেন থেকে নেমে যাই!

ট্রেনের ভিতরের চিত্র। ছবিঃ লেখক

এখানে এখন স্বাভাবিকভাবেই খুব কমন একটা প্রশ্ন এসে যায় আর অনেকের মনে এই প্রশ্ন এসেই গেছে ঠিক কী কারণে এই ট্রেনে উঠে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বোকামি করে বসি? আর কী কারণে আমরা ভারতীয়দের কাছে নিদারুণভাবে অপমানিত হই?

তো আর ভনিতা না করে একদম মূল প্রসঙ্গে আসা যাক, ঠিক কখন, কী কারণে আর কীভাবে বা কী জন্য আমরা বোকামি করে নিজেদেরকে ওদের অপমানিত করার সুযোগ দিয়ে থাকি?

এই ট্রেনের একটা অলিখিত নিয়ম আছে, যেটা আমাদের জানার কোনো কারণ নেই। সেটা হলো আপনি যে স্টেশন থেকেই উঠে থাকুন না কেন, আপনি জানেন আর নিজ চোখেই দেখেছেন যে আপনার দুই সিটের মাঝের ফাঁকা জায়গাগুলো পরের চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ভরে গিয়েছিল, তার মানে পুরো পথেই এই রকম চিত্রই থাকবে। কারণ এই ট্রেনে যারা ওঠে তারা সবাই মূলত শিয়ালদহ স্টেশনেই নামে। এর আগের কোনো কোনো স্টেশনে দুই-চারজন নামলেও যতজন নামে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশী মানুষ উঠে থাকে! যারা সবাই শিয়ালদহ যাবে।

বনগাঁ লোকালের স্বাভাবিক চিত্র। ছবিঃ সংগ্রহ

যে কারণে এই ট্রেনের যাত্রীরা, বিশেষ করে যারা লোকাল যাত্রী, নিয়মিত যাতায়াত করে থাকে, তারা একটা নির্ধারিত সময় পরে প্রায় প্রত্যেকেই নিজেদের সিট নিজের ইচ্ছায় ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়, আর তার ঠিক সামনে যিনি দাঁড়িয়েছিলেন তাকে বসতে দেয়। এখানে কোনো লেখালেখি নেই, কোনো নির্দেশনা নেই, কোনো বাধ্যবাধকতা কোনো কিছুই নেই যদিও, কিন্তু ওরা সবাই ওদের নিজেদের স্বার্থেই এটা করে থাকে। সবাই মানে একদম সবাই। অর্ধেক পথ বসে আর অর্ধেক পথ দাঁড়িয়ে গিয়ে যারা দাঁড়ানো ছিল তাদের বসতে দিয়ে। তার মানে হলো সমান সমান, দুই পক্ষই অর্ধেক দাঁড়িয়ে আর অর্ধেক বসে তাদের গন্তব্যে যাবে। তবে বৃদ্ধ, মহিলা আর শিশুদের ক্ষেত্রে এই অলিখিত নিয়ম প্রযোজ্য নয়।

আর ঠিক এখানেই আমরা দারুণ বোকামি করে ফেলি আর ওরা এই সুযোগে আমাদের অপমানের মুখে ঠেলে দেয় প্রায় প্রতিনিয়ত। কারণ যখনই অন্য সবাই অর্ধেক পথ যাবার পরে নিজ থেকে উঠে অন্য দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের নিজের সিট ছেড়ে দেন, তখন আমাদের কেউ কেউ জানে না ঠিক আছে সেটা বুঝলাম, ওরাও সেটা বুঝেই বেশ ভদ্র ভাবেই বলে, দাদা এক ঘণ্টা তো বসে এসেছেন, এবার আপনি দাঁড়িয়ে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দাদাকে বসতে দিন। কিন্তু আমরা কথা কানে তো দেই না যেন! কারণ আমরা শুনেও না শোনার ভান করে চোখ বুজে বসে থাকি!

লোকাল ট্রেনের নিয়মিত দৃশ্য। ছবিঃ সংগ্রহ

ব্যস, আর যাবেন কোথায় দাদা? এভাবে একবার দুইবার বলার পরেই ওদের মাথা গরম হয়ে যায়, মুখের আগল খুলে যায়, নিয়মের অনিয়ম দেখে ওরা যেন সবকিছু ভুলে গিয়ে আমাদের পাশাপাশি পুরো দেশবাসীকেই নানা রকম অপমানে বর্ণিল করতে থাকে! এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ট্রেনকে নিজের দেশের আপন সম্পত্তি ভেবে বলে দেন, ২০ টাকা দিয়ে টিকেট করে সিটে বসেছি, ছাড়বো কেন? কেন দাঁড়িয়ে যাবো? ব্যস আর যাবে কোথায়? কত রকম গা ঘিনঘিনে অকথ্য ভাষা যে ওদের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে না শুনলে বলে বিশ্বাস করানো যাবে না। তখন শরমে নিজের মুখ যেন নিজের কাছেই লুকিয়ে রাখি!

কেউ কেউ নিজের জন্য কিছু অনুশোচনা পাবার জন্য বলে বসেন, দাদা সারারাত না ঘুমিয়ে এসেছি তাই একটু ঘুমিয়ে নিচ্ছি! ব্যস এবার তো আর কয়েক কাঠি সরেস হয়ে যায় ওদের মুখের ভাষা, যার একটি শব্দও কানে শুনে সহ্য করার মত নয়। নাহ রাগ ওদের উপর লাগে না, রাগ লাগে আমাদের ভাইদের উপরে, কারণ যদি নিয়ম মানতে নাই পারি, যদি ওদের মতো করে ওদের অভ্যেসে নিজেকে মানিয়ে নিতে নাই পারি, তবে কেন ভাই, কম পয়সায় এই পথটুকু যাব? কেন বাসে ২৫০-৩০০ টাকা ভাড়া দিয়ে যাই না? কেন নিজেকে নিজে এভাবে অপমানিত করে নিজের সম্মান নিজের কাছেই নষ্ট করি? এমন তো নয় যে আপনি অভাবি, আপনার কাছে টাকা নেই, আপনি অসহায়? তাহলে তো আর বাস বা ট্রেনের টিকেট কেটে, ট্র্যাভেল ট্যাক্স দিয়ে মাত্র ২০ রুপিতে কলকাতা যেতে বাড়ি থেকে বের হতেন না।

বনগাঁ লোকাল। ছবিঃ লেখক

তাহলে কেন ভাই, নিজের পাশাপাশি, নিজের অন্যান্য পাঁচজন বাঙালি, কখনো কখনো পুরো দেশটাকেই ওদের অকথ্য অপমানের মুখে ফেলছেন? অথচ আপনি নিজেও জানেন, মানেন আর বোঝেন যে আপনি, আমি বা আমাদের কেউই যারা ওদেশে যাচ্ছি বা যাই তারা কেউই মাত্র ২০ রুপী দিয়ে, ওদের অভ্যেস আর নিয়ম না মেনে, এমন অপমান সয়ে সয়ে ওদের দেশে যাই, অতটা অভাবি, অসচ্ছল বা অসহায় তো আপনি আমি নই আসলেই।

তাই বলি কী, যদি বনগাঁ লোকালে যেতেই হয়, তাহলে ভাই ওদের মতো করে, ওদের অভ্যেসে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে, ওদের অলিখিত নিয়ম মেনে, নিজের সম্মান বজায় রেখে, ওদের মতো কষ্ট করে বসে আর দাঁড়িয়ে, সবার সাথে একাত্ম হয়ে যাই? এমন নয় যে ওরা আপনাকে যেতে বারণ করেছে, বাধা দিয়েছে বা আপনাকে অযথা অপমান করেছে। ওরা যা করছে বা করার সুযোগ পাচ্ছে তার সবটুকু সুযোগ আপনি আমি-ই দিয়েছি। তাই ভাই বনগাঁ লোকালে গেলে ওদের মতো স্মার্ট হয়ে, নিজে কষ্ট করে, ২০ রুপী দিয়েই বুক ফুলিয়ে যাই চলেন।

বনগাঁ লোকালের ভিতরের চিত্র। ছবিঃ লেখক

নিজেকে, নিজের দেশের ভাইদেরকে, পুরো দেশবাসীকে বোকা বানিয়ে এভাবে বা অপমানিত করে আর বনগাঁ লোকালে না যাই! কী বলেন?

পরিশেষে, আসছে ছুটি আর ভ্রমণ মৌসুমে আমাদের কেউ যেন আর এমন পরিস্থিতির মুখে না পড়ি সেটা খেয়াল রাখবো। কারণ নিজের সম্মান একদমই নিজের কাছে। নিজেই যদি নিজেকে সম্মান দিতে না পারি, কেউ এসে সম্মান দিয়ে যাবে না, সেটা মাথায় রাখা ভালো।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সিলেটের মাধবপুর চা বাগান ও লেক ভ্রমণের আদ্যোপান্ত

ব্যাংককের নিকটবর্তী ৫টি অসাধারণ দ্বীপ: ঘুরে আসতে পারেন সহজেই