নীল আকাশ, রঙিন পাহাড় আর ঝলমলে লেকের মান-অভিমান!

দেয়াল থেকে লাফ দেবার পরেই একটা অন্য রকম আনন্দ হতে লাগলো। উহ যাক তবে, লেকের চারপাশটা মনের মতো করে ঘুরে দেখা যাবে ধীরে ধীরে, পাহাড়ের পায়ে পায়ে হেঁটে বেড়িয়ে। তখনো দূরের পুব আকাশে সূর্য দেখা দেয়নি। এমনকি পাহাড়ের দেয়ালের ওপারেও সে ওঠেনি বেশ বোঝা গেল।

তবে হোটেলের নিচু পথ পেরিয়ে লেকের পাড়ের মল রোডে যেতেই সূর্য দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে উঁকি দিতে শুরু করেছে বোঝা গেল। কারণ সূর্য দেখা না গেলেও লেকের জলে তার ঝিলিক ঠিকই দেখা গেল। দূর পাহাড়ের ফাঁকা দিয়ে লেকের জলে সূর্যের ক্ষীণ বিকিরণেই ঝিলমিল করে হাসছিল নৈনিতালের পাহাড়ি আভিজাত্য টলটলে লেকের ছোট ছোট তরঙ্গরাশি।

লেক পাহাড়ের মিতালী। ছবিঃ লেখক

বেলকোনিতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলের মাকে বাই বাই জানিয়ে মল রোড ছেড়ে, একদম লেকের জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকা আর একটি পথে নেমে পড়লাম ছোট্ট সিঁড়ি দিয়ে। যে সিঁড়ির পরের পথ পার হলেই লেকে নামার ঘাট, রঙ বেরঙের নৌকা বাঁধা ঘাটে। পাহাড়ি হালকা বাতাসে বর্ণীল নৌকাগুলো মৃদু দুলে দুলে উঠছে ছোট ছোট ঢেউয়ের দোলায়। ততক্ষণে সূর্যি মামা কনকনে শীতের সকালে দারুণ মিষ্টি রোদ উষ্ণতার আরাম দিতে শুরু করেছে।

কী দারুণ একটা সকালের শুরু হলো, চারদিকে পাহাড় ঘেরা বর্ণীল জনপদের ঘুমন্ত ঘরবাড়ি, স্বচ্ছ টলটলে জলের হাসি, ঘাটে বাঁধা রঙিন নৌকা, কনকনে শীতের বাতাসের সাথে দারুণ আদুরে রোদের উষ্ণ পরশ। এমন একটি সকালে একাকী আভিজাত্যের সুখ উপভোগের জন্য আর কী চাই?

সূর্য ওঠার অপেক্ষায় নৈনিলেক। ছবিঃ লেখক

হ্যাঁ, আরও একটু ভালো হতো, পেতাম আর একটু বাড়তি আভিজাত্যের ছোঁয়া, উপভোগ করা যেত আরও একটু বাড়তি বিলাসিতা, যদি এই মুহূর্তে পাওয়া যেত এক মগ ধোঁয়া ওঠা উষ্ণ কফির মাদকতার স্পর্শ। ঠোঁটে, জিভে, গলায়, আর লোভাতুর মুখে। নাহ, সে আর পাওয়া যাবে না।

কারণ নৈনিতালের এমন ভোরে, এক হিম জড়ানো সকালে, নরম বিছানার তুলতুলে উষ্ণতার আরাম রেখে কেউই আমার মতো পাগুলে ভাবনা ভেবে বের হয়নি। পাহাড়ের পায়ে হেঁটে হেঁটে, লেকের জলের শীতলতা আর নরম রোদের উষ্ণতা উপভোগ করার স্বাদ আর কারো জাগেনি। সেখানে কোনো দোকান, চা বা কফির কাউকে পাওয়া তো অনেক দূরের ব্যাপার।

লেক পাড়ের মল রোডে। ছবিঃ লেখক

তাই দুই চোখের উৎসুক চাহুনি আর ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকলাম লেকের জল ছুঁয়ে থাকা নিচু পথ দিয়ে, ঠাণ্ডা বাতাস আর উষ্ণ রোদের আদর উপভোগ করতে করতে। এতক্ষণে প্রতীক্ষার রোদ পাহাড়ের আড়াল থেকে ধুসর আকাশে উঠে এসেছে, জ্বলজ্বল করছে।

আর সেই সূর্যের আলতো পরশে ধুসর আকাশ যেন লাজে নীল হয়ে গেছে অল্প কিছু সময় সূর্যের আদুরে ছোঁয়া পেয়েই। লাজে এত এত নীল হয়েছে যে চোখ ধাঁধিয়ে গেছে আকাশের দিকে তাকিয়েই। এমন মেঘহীন ঝকঝকে নীল আকাশ দেখাটাও মনে হলো যেন অন্য রকম আনন্দের, দারুণ সুখের আর নীরবে উপভোগের।

লেক পাহাড় আর সূর্যের আলোতে, এক অপার্থিব সকালে।

তাই সেই ঝকঝকে নীল আকাশকে একান্তে উপভোগ করার জন্য কিছু সময় দাঁড়িয়ে রইলাম লেকের পাড়ের একটি গাছের সাথে হেলান দিয়ে। এমন অপরূপ আকাশ দেখতে দেখতে পাহাড়ের বোধহয় অভিমান হয়েছিল খুব, ওকে কম গুরুত্ব দেয়ায়। তাই সে আকাশের নীল থেকে আমার চোখ, মনোযোগ আর আকর্ষণকে নিমেষেই নিয়ে গেল তার দিকে।

সূর্যের আলো কেড়ে নিয়ে, নিজেকে রাঙিয়েছে অদ্ভুত এক সোনালি, লাল আর মেরুন রঙে! যে রঙ দেখে, যে রুপ দেখে আর পাহাড়ে এমন ঢং দেখে বিমোহিত হয়ে যাবে যে কেউ, যে কেউ। এমনকি সে যদি পাহাড় প্রেমী নাও হয়। আর আমি? তাহলে আমার কী হতে পারে ভাবা যায়?

পাহাড়ে সোনা রোদ। ছবিঃ লেখক

আমি মুহূর্তেই ভুলে গেলাম নীল সাজে নিজেকে অপূর্ব করে সাজিয়ে তোলা ঝকঝকে হাসি ছড়ানো মেঘহীন আকাশকে। আমি মুহূর্তেই আকর্ষিত হলাম পাহাড় তার অনন্য আর অভিমানী রূপ নিয়ে নানা রঙে আমার সামনে দেখা দেয়াতে, তার দিকে। পাহাড়ের দিকে। মুহূর্তেই যেন প্রেমিকা বদল করার মতো করে আমার ইচ্ছা, আগ্রহ আর আকর্ষণ বদলে গেল পাহাড়ের বর্ণীল রূপ দেখে, নিজেকে তার কাছে হারিয়ে ফেলে।

আর আকাশের সাথে পাহাড়ের বুঝি অনেক বেশি অভিমান হয়েছিল যে কারণে পাহাড় সূর্যের রঙ, আলো আর উষ্ণতা কেড়ে নিয়ে শুধু নিজেকেই সাজায়নি, সে নিজের সাথে সাজিয়ে দিয়েছিল লেকের টলটলে জলের ঢেউকেও, তারই বর্ণীল প্রতিচ্ছবি দিয়ে, আলো দিয়ে, ছায়া দিয়ে, রঙ দিয়ে আর নিজেকে দিয়েই।

লেকে সোনালী পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি। ছবিঃ লেখক

এ যেন আকাশের সাথে পাহাড়ের প্রেমিক নিয়ে প্রতিযোগিতা! এ যেন আকাশের কাছ থেকে তার পুরনো প্রেমিকের মন ছিনিয়ে নিতে লেকের সাথে মিতালী করা। দুজন মিলে একজনকে বশ করে পাহাড়ের কাছে নিয়ে আসা। তাই নীল সাজে সেজে থাকা আকাশকে রেখে আমি পাহাড়ে মত্ত হলাম।

পাহাড়ের রঙ দেখে, পাহাড়ের বধু সাজ দেখে, পাহাড়ের রূপ দেখে, সূর্যের সাথে পাহাড় আর পাহাড়ের সাথে তারই বান্ধবী হয়ে যাওয়া লেকের মাঝেই পাহাড়ের বর্ণীল প্রতিচ্ছবি দেখে। আকাশকে রেখে ক্লিক করতে শুরু করলাম পাহাড় আর লেকের।

কিন্তু আমি কি অতই বোকা প্রেমিক নাকি? আমি কি এতই কম ভালোবাসার মতো কেউ নাকি, আমি কি এতই অল্প লোভী নাকি? আমি কি এতই সুবোধ নাকি যে পাহাড়কে পেলে আকাশকে পুরোপুরি ভুলে যাবো? লেকের মাঝে পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি পেলে আমি আকাশের দিকে তাকাবো না? পাহাড় আর লেকের ছবি তুললে সেখানে আকাশ থাকবে না?

লেক পাহাড়ের বন্ধুতা। ছবিঃ লেখক

উহু, তা হতেই পারে না। আমি অতটা সৎ, অতটা স্বচ্ছ, অতটা নিস্পাপ নই, হতে পারবো না, হতে চাই-ই না, যে শুধু পাহাড়কে ভালোবাসবো, লেকের পাশে বসবো আর আকাশকে চুপিচুপি দেখবো না। এক্ষেত্রে আমি বিশ্বাসঘাতক হতে পারি, অসৎ হতে রাজি আছি, পাহাড়কে একটু কষ্ট দিতেও বিবেকে বাঁধবে না এতটুকু!

সত্যি বলছি, এদেরকে একই সাথে পেলে আমি হয়ে যেতে পারি বহুমুখী প্রেমিক, ভাগ করে দিতে পারি আমার ভালোবাসা, আবেগকে করে দিতে পারি কয়েক টুকরো, মন দিতে পারি একাধিক জনকেই।

পাহাড়ের ভ্যালীতে প্রাচীন মসজিদ। ছবিঃ লেখক

যদি পাই এমন নীল সাজে সেজে থাকা ঝকঝকে আকাশ, সূর্যের আলোয় নিজেকে সাজানো সোনালি রঙের পাহাড় সেই সাথে সূর্য, নীল আকাশ আর পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি বুকে নিয়ে ঢেউ তোলা টলটলে লেকের এমন অপার্থিব আকর্ষণ, সম্মোহন আর অবাধ্য আহ্বান।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আগে সংসারটা একটু গুছিয়ে নেই!

এ যেন স্বপ্নের ঘর!