পেহেলগামের বেতাব ভ্যালীর আক্ষেপের গল্প

বেতাব ভ্যালীর উচ্ছ্বসিত লিডারের দুধ সাদা রূপ! ছবিঃ শান্তানু

আরু ভ্যালীতে যে অসহ্য সুখের দেখা পেয়েছিলাম, বেতাব ভ্যালী কেন যেন আমার কাছে ততটা ভালো লাগেনি প্রথমে। তবে আরু ভ্যালী আর বেতাব ভ্যালীর অবস্থান যেন দুই মেরুতে। আরু ভ্যালী যেখানে বিশাল বিশাল পাহাড়ের গায়ে গায়ে অবস্থিত, বেতাব ভ্যালী ঠিক তার উল্টো পাহাড়ের ভ্যালীতে অবস্থিত। চারদিকে সবুজ পাহাড় আর পাইনের অরণ্য বেষ্টিত পাহাড়ের নিচে এক বিশাল সমতল ভূমি বা ভ্যালী যেখানে আরু ভ্যালীর অবস্থান।

তবে আরু ভ্যালীর বিশেষ আকর্ষণ হলো এখানে লিডার একদম অন্য রকম রূপে বয়ে চলেছে। এক এক জায়গায় লিডার নদীর একেক রকম রূপ ঝরে পড়ছে। আরু ভ্যালীতে ঢোকার মুখে দেখা মেলে এক ভীষণ খরস্রোতা আর উত্তাল লিডারের। তার উচ্ছ্বাস আর আহ্বানে ইচ্ছে হবে নিজেকে সঁপে দিতে ওর ভীষণ শীতল উম্মত্ত জলের স্রোতে। এখানে লিডারের বয়ে চলার উচ্ছ্বাসে চারদিকে দুধ সাদা এক মোহময় জগৎ তৈরি হয়ে থাকে সব সময়।

বিশাল বিশাল পাথরের মাঝে ভীষণ গতিতে ছুটে চলা লিডার আপনাকে থমকে দেবে, অবাক আর অপলক চোখে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হবেন সেদিকে। মনে হবে যেন অনন্তকাল যদি এই লিডারের উচ্ছ্বাস আর বাঁধভাঙা জলের গান শোনা যেত! ইচ্ছে হবে জলের স্রোতের ভয়াবহতাকে উপেক্ষা করে পাথরে পাথরে লাফ দিয়ে ছুটে বেড়াতে লিডারের বুকের মাঝে, সুখের স্রোতে আর অপার্থিব আকর্ষণে ইচ্ছে হবে অবগাহন করতে।

পাইন বন ছুঁয়ে উচ্ছ্বসিত লিডার নদী। ছবিঃ লেখক

দুই পাশের পাইনের ঘন অরণ্যের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা দুধ সাদা স্রোতের লিডার, মাঝে মাঝে বড় বড় পাথরের বাঁধা পেয়ে সেই উচ্ছ্বাস যেন আরও উদ্বেলিত হয়ে এগিয়ে চলে সামনের দিকে। একটু সামনে এগিয়ে যেতে যেতেই সেই প্রমত্ত লিডার যেন ধীরে ধীরে তার গতি কমিয়ে দিতে থাকলো। শান্তভাবে বয়ে চলতে শুরু করলো। আর আরও একটু সামনে গিয়ে লিডার যেন একদম স্তিমিত হয়ে চুপ করে রইলো! বেশ অবাক লাগলো দেখে। একটু আগের প্রমত্তা, উচ্ছল যৌবনা, গতিশীল সেই নদী এখানে, একটু পরেই কীভাবে এত এত শান্ত হয়ে গেল! বেশ অবাক আর অভিভূত হবার মতো ব্যাপার।

এরপর আরু ভ্যালীর সবুজ ঘাস, পাথরের রাস্তা, বুনো ফুল মাড়িয়ে যখন অন্য প্রান্তে পৌছালাম তখন দেখা পেলাম অন্য আরেক লিডারের। যে লিডার পাথরের পাহাড় বেঁয়ে নেমে আসছে উন্মাদ ভঙ্গিতে! যা একটু পরেই সেই আবারো ধীর লয়ে বইতে শুরু করলো শান্তভাবে! অবাক ব্যাপার হলো এই অল্প জায়গাতেই লিডারের তিন রকম রূপ পাবার কারণ হলো, এক জায়গায় লিডার নেমে আসছে পাহাড়ের শরীর বেঁয়ে নিচের দিকের একদম সমতলে সেখানে এক শান্ত লিডার।

বেশ কিছুটা বয়ে গিয়ে আবারো নেমে যেতে শুরু করেছে আরও নিচের পাহাড়ের দিকে পেহেলগামের দিকে। তাই যেখানে সমতল, সেখানে এক শান্ত লিডারের দেখা মিললেও, যেখানে পাহাড় থেকে নামতে শুরু করে সেখানে এক অন্য রকমের ভয়ানক সুন্দর লিডারের দেখা মেলে!

শান্ত লিডার পেহেলগামের পথে! ছবিঃ লেখক

আমাদের বেশ কয়েকজন শান্ত লিডারের পানিতে পা ভিজিয়ে দুই একটা ছবি তোলার চেষ্টা করতেই ছুটে পালিয়েছে পা পানিতে ছোঁয়ামাত্র! কারণ পানি এতটাই ঠাণ্ডা যে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পা জমে বরফ হয়ে যাবে! এতটাই হিম শীতল লিডারের পানি।

তবে বেতাব ভ্যালী আসলে একটা পিকনিক স্পট। এখানে স্থানীয় কাশ্মীরিরা বেশী আসে সারাদিনের জন্য, দল বেঁধে, খাবার নিয়ে। সকালে আসে, সারাদিন খেলাধুলা করে সমতলের, নদীতে আর শুয়ে বসে কাটায় বেতাবের সমতল সবুজ গালিচার নানা জায়গায়।

পুরো ভ্যালীর মাঝে রয়েছে বিশ্রাম নেবার জন্য অনেক কাঠ আর লোহার সমন্বয়ে তৈরি বেঞ্চি, ছোট ছোট ব্রিজ, লিডারের ক্ষীণ ধারা কোথাও কোথাও বয়ে চলেছে এঁকেবেঁকে, সবুজের মাঝ দিয়ে। লিডারের অন্য পাশে রয়েছে পাইনের ঘন অরণ্য আর নানা রকম কটেজ, বেশ আকর্ষণীয় তবে লোহার ব্যারিকেড থাকার কারণে ওপাশে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। খুব সম্ভবত ওপাশে সেনাবাহিনীর সংরক্ষিত কোনো এলাকা বলে মনে হলো।

কোন এক অবসরে, বেতাব ভ্যালীতে। ছবিঃ লেখক

তবে আমার কাছে বেতাব ভ্যালী রোমাঞ্চকরের পরিবর্তে বেশ আরামদায়ক ভ্রমণের একটা জায়গা মনে হয়েছে। যেখানে পুরো পরিবারের সবাই মিলে সারা দিনের জন্য যেতে পারে, চুপচাপ করে নিজেদের মত একটি দিন উপভোগ করতে। হাতে এক মগ গরম কফি নিয়ে লিডারের হিম জলে পা ভেজাতে, পাহাড়ের বাতাস গায়ে মাখতে, সবুজে বসে থাকতে আর দূরের পাহাড়-ঝর্ণা-অরণ্যের দিকে অপলক চেয়ে থাকতে বেতাব ভ্যালীর জুড়ি নেই।

তবে এক বা দুই ঘণ্টার জন্য বেতাব বা আরু ভ্যালী গেলে পরে ফিরে আসার সময় মন খারাপ হবে নিশ্চিতভাবেই। এই দুটি জায়গার জন্যই একটি করে দিন যদি বরাদ্দ রাখা যায় তবেই কিছুটা উপভোগ করা যাবে মন দিয়ে, তৃপ্তি না হলেও একেবারে অতৃপ্তি থাকবে না, যেটা থাকে একদিনেই দুই থেকে তিনটি স্পট কভার করতে চাইলে। ওতে করে শুধু ছবিই তোলা হয় কিছু। জায়গাটার আসল রূপ-রস-গন্ধ বোঝা যায় না, উপভোগ করা যায় না আর পরিশেষে সঠিক প্রশান্তিটা আসে না।

তাই আমার কাছে অন্তত আরু আর বেতাব ভ্যালী তৃপ্তি দিতে পারেনি মোটেই, কিছু আক্ষেপ বাড়ানো ছাড়া! আবারো যাবার এবং সময় নিয়ে একটি করে দিন দুই জায়গাতেই থাকার আকর্ষণ তৈরি করা ছাড়া! তবে একবার অবশ্যই যাবো যেবার একদিন আরু আর একদিন শুধু বেতাব ভ্যালীর জন্য বরাদ্দ থাকবে।

তবে সেই দিনের অপেক্ষায়…

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বগালেক থেকে রুমা বাজার: মহুয়ার গন্ধ ও পাহাড়ের আলিঙ্গন!

সহস্রধারা ঝর্ণা, ঝরঝরি ট্রেইল,গুলিয়াখালী সী বীচে টিম বাউন্ডুলে