দিয়াবাড়ি, সিঙ্গাপুর রিসোর্ট আর তুরাগের তীরে এক অদ্ভুত বিকেলের গল্প

তুরাগ তীরে দিয়া বাড়ি। ছবিঃ http://offroadbangladesh.com

ঈদের ছুটির শেষ দিন। দুপুরের খাবারের পরে একটি ভাত ঘুম দিলাম। দিনটা কিছুটা মেঘলা ছিল, আর ভর দুপুরে পড়েছিল অঝোর ধারায় বৃষ্টি। তাই বিকেলটা বেশ মিঠে ছিল। তাকে বললাম, চল বাইরে যাই, একটু হেঁটে আসি? শরীরটা জ্যাম হয়ে গেছে এই কদিনের খাওয়া-ঘুম আর টিভি দেখে দেখে।

কোথায় যাবে?

তেমন কোথাও না, একটু হাঁটাহাঁটি।

ঠিক আছে, চল যাই।

দিয়া বাড়ি। ছবিঃ i.ytimg.com

বাইরে বের হবার পরে সে দেখি রিক্সা ডাকে। আমি তো রিক্সায় চড়তে চাইনি, হাঁটবো একটু।

রিক্সা দিয়াবাড়ি যাবে?

যাবো ৫০ টাকা ভাড়া!

আমি চুপসে গেলাম, আবার রিক্সা ভাড়া দিতে হবে? তাও ৫০ টাকা! তার মানে যাওয়া-আসা মিলে ১০০ টাকা! হায়রে কেন যে বাইরে বের হতে চাইলাম? এরচেয়ে বাসায় শুয়ে-বসে টিভি দেখা ভালো ছিল! ঈদের মাসের মাঝখানে সব সময় কিছুটা টানাটানি থাকেই, তাই দৈনন্দিন খরচের বাইরে আর কোনো রকম খরচের পক্ষে ছিলাম না আদৌ।

কী হলো, থম মারলে কেন? তোমাকে রিক্সা ভাড়া দিতে হবে না, চলো।

আহা, কী যে মধুর মতো লাগলো কথাগুলো যে রিক্সা ভাড়া দিতে হবে না! তাই উঠে পড়লাম রিক্সায়, দিয়াবাড়ির উদেশ্যে।

দিয়াবাড়ি জলাশয়। ছবিঃ i0.wp.com

বৃষ্টি ঝরা বিকেল, হিমেল হাওয়া, মেঘলা আকাশ, ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা আবহাওয়া, ধুলো বা বিকট শব্দহীন স্বচ্ছ রাস্তায় ধীরে ধীরে রিক্সায় চড়া আমার সব সময়ই ভীষণ ভালো লাগার। আর যদি পাশে থাকে প্রিয়জন, তার হাসিমুখ, উদ্ভাসিত প্রতিক্রিয়া আর বেড়ানোর উচ্ছাস তবে তো সেই রিক্সা ভ্রমণ হয়ে ওঠে আরও আনন্দঘন আর মনোরম।

কয়েকটি অলি-গলি, উঁচু-নিচু ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে ১৫ মিনিটের মধ্যেই রিক্সা পৌঁছে গেল দিয়াবাড়ি বটতলায়।

মামা, এইটুকু রাস্তা তো ২০ টাকা ভাড়া, আপনি ৫০ টাকা চাইলেন কেন?

মামা ঈদের সময় একটু বেশী দিবেন না? এমনিতে ৩০ টাকায় আসি!

মিয়া এই জন্য, এই মানুষ ঠকানোর জন্য উপরওয়ালা আপনাদের আর ভালো করে না বুঝলেন, ৫০ টাকা দিয়ে নেমে গেলাম।

এবার কোথায় যাই? এর আগে তো কখনো এদিকে আসিনি, তাই এদিক ওদিক তাকিয়ে ডানের মহাসড়ক ধরে হাঁটা শুরু করলাম। কিছুদূর যেতেই তুরাগ নদীর একাংশ চোখে পড়লো, কিন্তু অত্যন্ত নোংরা আর আশেপাশে বস্তির ঘিঞ্জি-কোলাহল, ডাস্টবিন, গ্যারেজ, উটকো কয়েকটি দোকান। তাই সেখানে না থেকে আর একটু সামনে এগোলাম। সেখানে গিয়ে কিছুটা ফাঁকা জায়গায় নদীর তীরে দুই-তিনটি নৌকা বাঁধা দেখলাম ঘাটে। ভাবলাম তবে একটু নাহয় নৌকা ভ্রমণ করি এই শেষ বিকেলে, নীরব ঢেউহীন নদীতে।

দিয়াবাড়ি অদূরে কাশফুলের সমারোহ। ছবিঃ http://shadhinbangla24.com

কিন্তু নৌকার মাঝির ভাড়া চাওয়ার ধরণ আর সামগ্রিক ব্যবহার দেখে পড়িমরি করে রাস্তায় উঠতে পারলে বাঁচি! সেই ব্যবহার আর কুৎসিত দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলতে চাই না। রাস্তায় উঠে হাঁটতে লাগলাম ধীরে ধীরে। একটু পরে একটা রিক্সা নিলাম সামনেই ইস্টার্ন হাউজিং প্রকল্পের বেশ মনকাড়া একটা জায়গা নাকি আছে জেনে। চললাম সেই জায়গার উদ্দেশ্যে। রাস্তার ডানপাশে বস্তি, বামে দখলের মহাউৎসব দেখে ভালো মনটা খারাপ হয়ে গেল!

নদীর ওপারে দেখা যাচ্ছে সারি সারি কাশফুলে ছেয়ে যাওয়া দিগন্ত! আফসোস হলো, ইশ ওই জায়গাটায় যাওয়া গেলে বেশ হতো। কিন্তু রিক্সা ঠিক করে বেশ কিছুদূর চলে আসাতে কাশফুলের নরম ছোঁয়া আর পাওয়া হলো না। পরে খুব তাড়াতাড়ি আর একদিন আসবো বলে নিজেদেরকে নিজেরাই সান্ত্বনা দিলাম। রিক্সা চলছে ইস্টার্ন হাইজিং প্রকল্পের দিকে। প্রায় ১০ মিনিট রিক্সা চলার পরে, একদম তুরাগের তীর ঘেঁষে চলতে লাগলাম।

তুরাগের তীর দখল করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন রকম স্থাপনা, দোকান-পাট, কিছু রিসোর্টের মতো করে দখল করা জায়গা আর ছোট ছোট হোটেলের মতো করে বেশ গোপনীয় করে রাখা কিছু অদ্ভুত আস্তানা। সেসব দেখি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে এগোই। একটু পরে চোখে পড়ে বেশ নাম শোনা তামান্না পার্ক। সেখানে নিদারুণ ভিড় আর রাস্তায় জ্যাম। এখানে রাস্তার ডান পাশে আবার চিড়িয়াখানা বা বোটানিক্যাল গার্ডেনের শেষাংশ এসে মিশেছে। সবুজে-সবুজে আচ্ছাদিত কোলাহল আর লোকালয়হীন একটি অনিন্দসুন্দর জায়গা। দেখেই মনটা আবার ভালো হয়ে গেল।

নদীর মাঝে বাসের সাঁকো। ছবিঃ লেখক

রিক্সা আবার এগোতে থাকলো। আর একটি সামনে এগোতেই চোখে পড়লো তুরাগের তীর থেকে বেশ দূরে একটি ছোট্ট সবুজ গ্রামের মতো ভূখণ্ডের হাতছানি! অবাক হলাম প্রথমে বেশ, যে নদীর এত দূরে কীভাবে গ্রাম গড়ে উঠতে পারে? তাও এত এত গাছের সমারোহ সমেত! আর একটু এগোতেই চোখে পড়লো, সিনেমার মতো করে বেশ বড় আর মজবুত বাঁশের সাকো করে রাখা আছে সেই গ্রামে যাবার জন্য। বেশ আগ্রহ জন্মালো জায়গাটাতে গিয়ে দেখা ও বোঝার জন্য, যে ব্যাপারটা আসলে কী?

রিক্সা থামালাম, কোনো দ্বিধা ছাড়াই। রিক্সা ছেড়ে দিয়ে সেই বাঁশের সাঁকোতে ওঠার আগেই দুই দারোয়ান এসে হাজির, টিকেট লাগবে!

আরে বলে কী, কীসের টিকেট ভাই? নদীর পাড়ে হাঁটব, গ্রামের ভেতর ঢুকব, তাতে আবার টিকেট লাগে নাকি? তাজ্জব বনে গেলাম দু’জনই। তাও আবার টিকেট কত ২০+২০= ৪০!

আমার অবাক চাহুনি দেখে দুই দারোয়ান জানালো ওটা কোনো গ্রাম নয়, ওটা হলো রিসোর্ট!

ওহ আচ্ছা, কৌতূহলের কারণে সেই ২০+২০=৪০ টাকার টিকেট কেটেই নেমে পড়লাম ঢালু বাঁশের সাঁকোতে। তবে জায়গাটা দারুণ, আর সেই বাঁশের সাঁকোটাও। এই ব্যাপারে কোনো আফসোস নেই।

বাঁশের সাঁকোর দু’পাশে মুক্ত নদীকে দখল করে প্রায় বদ্ধ জলাশয় করে, সেখানে রেখেছে দুটি রঙিন বোট, টাকার বিনিময়ে যেখানে ওঠা যায়। স্বচ্ছ টলটলে জলের নিচে ছোট-ছোট মাছের ছোটাছুটি। কিছু কচুরিপানার দলের থমকে থাকা, মেঘলা বিকেলের ঠাণ্ডা বাতাসে ধীরে ধীরে হেঁটে হেঁটে গিয়ে পৌঁছালাম ওপারের রিসোর্টে। নাম “সিঙ্গাপুর রিসোর্ট!” বা এমন কিছু একটা। আফসোস হলো, কেন নিজেদের একটা বাঙালি নাম দেয়া হলো না দেখে। ওপারে উঠতেই দেখি বানান ভুল সম্বলিত একটা সাইনবোর্ড ঝুলছে! দেখে বোঝা গেল, বেশ উচ্চশিক্ষিত লোকজন অনেক আরাম করে এটা দখল করেছে!

এক অপার্থিব বিকেল বেলা। ছবিঃ লেখক

এরপর ধীরে ধীরে রিসোর্টের ভেতরে গেলাম। বেশ কিছু ফলজ আর বনজ গাছের সবুজ ও বৃষ্টির জমে থাকা ভেজা পাতার স্পর্শ নিতে নিতে। সদ্য গড়ে ওঠা একটা রিসোর্ট। রিসোর্টের শেষপ্রান্তে পৌঁছে দেখা গেল, নদীর আরও বেশ ভেতরে বা নদীর উপরে গড়ে তোলা হয়েছে ছোট ছোট বাঁশের মাচা দিয়ে তৈরি করা কটেজ বা সময় কাটানোর জন্য ঘর। যেখানে পাতা আছে কিছু চেয়ার আর গাছের টেবিল। একদম নদীর উপরেই! নিচে বয়ে যাওয়া নদীর উপরে তৈরি করা ঘরের চেয়ারে বসে পড়লাম।

এরপর অদ্ভুত একটা আচ্ছন্নতা ঘিরে ধরল যেন। চারপাশ আর দু-চোখের দৃষ্টিসীমায় ধরা পড়া বিমোহিত বিকেলের দুর্লভ কিছু মুহূর্ত, অদ্ভুত কিছু ছবি, মনোমুগ্ধকর প্রকৃতির রঙ-বদলের বর্ণিল খেলা দেখে।

মেঘলা আকাশ রঙ ছড়াতে শুরু করলো তার নিজস্ব নিয়মে, ধীরে-ধীরে। সূর্য ডুবে যাবার ঠিক আগে আগে পৃথিবীর দিকে এক ঝলক দৃষ্টি মেলেছিলো ঘোমটা খুলে, সাদা বকগুলো কালো হয়ে যাওয়া সবুজ গাছে আর ঘাসে বসে অদ্ভুত এক মায়া ছড়ালো, থেমে থাকা নদীর জলে হাসগুলো সাঁতার কাটছিলো আয়েসি ভঙ্গিতে, জেলে তার ছোট ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে মাছ ধরছিলো আপন মনে, মুক্ত আকাশ জুড়ে উড়ে বেড়াচ্ছিল অসংখ্য পাখিদের দল।

দিনের শেষ আলোতে বাড়ির পথ ধরেছিল নাম না জানা শত মানুষের দল, ইঞ্জিন চালিত নৌকায়, দিয়ে যাচ্ছিল মৃদু ঢেউয়ের দোলা, দূরের লোকালয়ে চলছিলো অজস্র সঙ্গীতের অদ্ভুত প্রতিযোগিতা। এরপর ধীরে-ধীরে নেমেছিল এক সুরেলা সন্ধ্যা, বিদায় দিয়ে সেই অদ্ভুত অনাকাঙ্ক্ষিত আর অসাধারণ বিকেলকে।

দিয়াবাড়ি। ছবিঃ somewherein

ঢাকার এত কাছে, এত অল্প সময়ে, কোনো রকম জ্যাম-ধুলো-বালি আর শব্দ দূষণ বা কোলাহলহীন কোনো অদ্ভুত গ্রাম বা নিশ্চুপ জায়গা থাকতে পারে সেটা ভাবিনি। আর থাকলেও সেই জায়গা যে এতটা আবেদন রাখতে পারে নাগরিক জীবনে সেটাও জানা ছিল না।

সবকিছু মিলে দারুণ আর এক অদ্ভুত বিকেলের, অসাধারণ কিছু সময়, মুহূর্ত আর ছবি ছিল সেটি। যেখানে ছিল নিখাদ প্রকৃতির স্পর্শ আর সুখের কিছু স্মৃতি-ছবি-গল্প-কথা-গান।

যে বিকেল ভেঙেছিল, জমে থাকা পুরনো অভিমান!

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ট্রেকারদের স্বর্গ রুট সান্দাকফু থেকে ফালুটের পথে

মুসা খানের মসজিদ ও বহু ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সমাধিস্থল