একটি জলজ মানচিত্রের গল্প!

যে কোনো মানচিত্র সাধারণত কাগজে, পেপারে, বোর্ডে, ডায়েরিতে বা মাটিতে আঁকা হয়ে থাকে। তবে অনেক সময় পাথরে বা পাহাড়েও মানচিত্র দেখা গেছে বা যায়। আমিও তাই জানতাম বা তেমনই দেখেছি। কিন্তু কোনো দেশের মানচিত্র যে জলজও হতে পারে এমনটি কখনও শুনেছেন?

জলজ মানচিত্র! ছবিঃ লেখক

আমি শুধু শুনিইনি, দেখেছিও। একবার দুইবার নয়, বহুবার দেখেছি। ওর পাশে বসেছি, সেই জলজ মানচিত্রের জল নিয়ে খেলাও করেছি! হ্যাঁ সত্যি, একদম সত্যি। আর হ্যাঁ এই জলজ মানচিত্রটি কিন্তু অন্য কোনো দেশের নয়, আমাদের বাংলাদেশেরই!

অনেকেই হয়তো সেটা জানে না। এমনকি অনেকে হয়তো সেই জলজ মানচিত্রের আশেপাশে বসবাস করেই সেটার খোঁজ জানতে পারেনি কোনোদিন! তবে আজ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশর সেই জলজ মানচিত্রর গল্পটাই বলি?

বিজ্ঞান ভবনে বাংলাদেশের ম্যাপ। ছবিঃ লেখক

আচ্ছা পুকুর তো সবাই কমবেশী চিনি, জানি বা দেখেছি, তাই না? পুকুর যে কোনো জায়গার কমন একটি জলাশয়। কিন্তু আজ যে পুকুরটির গল্প বলবো সেটি শুধু একটি পুকুর নয়, পুরো পুকুরটিই যেন একটি বাংলাদেশ! হ্যাঁ ঠিক তাই, পুরো পুকুরটি একটি জীবন্ত বাংলাদেশের অন্যন্য রূপ বা বাংলাদেশের একটি জলজ মানচিত্র! যার অবস্থান এককভাবে দেশের আয়তনে সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।

অনেক স্মৃতির সিনেট ভবন। ছবিঃ লেখক

এমনিতেই সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়াশোনা করেছেন তাদের কাছে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে প্রিয় জায়গা আর একটিও হতে পারে না। ঠিক তেমনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়াশোনা করেছে তাদের প্রত্যেকের কাছেই এটি অন্যতম প্রিয় একটি জায়গা হয়ে থাকে সবসময়। তাই আমি যেহেতু এই বিদ্যাপীঠেই জীবনের অন্যতম ৫টি বছর কাটিয়েছি সুতরাং আমার কাছেও একটি অন্যতম আকর্ষণীয় একটি স্থান।

প্রিয় প্রাঙ্গনে, প্রিয় প্রতিকৃতি। ছবিঃ লেখক

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কোণাই আমার কাছে বিশেষ প্রিয়। এবং শুধু আমার নয়, যে কারোর কাছেই এগুলো দারুণ আকর্ষণীয় লাগবে এ কথা বলতে পারি নির্দ্বিধায়! হোক সেটা প্রবেশ মুখের কাজলা বা মেইন গেট, জুবেরি ভবনের সবুজ গালিচা আর ঘন অরণ্যসম আম বাগান, নান্দনিকতায় ভরা প্যারিস রোড, দুষ্টুদের ইবলিশ চত্বর!

কলাভবনের নানা রকম বেদী, আমার নিজের রবীন্দ্র ভবন, সুবিশাল লাইব্রেরী, দেবদারুর ছায়া ঘেরা আর মায়ায় ভরা সিনেট ভবন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত সাবাস বাংলাদেশ, ধুলো ওড়া সাদা-আকাশী সাজের বাস স্ট্যান্ড, কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তন, অপরূপ শহীদ মিনার, বিভীষিকাময় বদ্ধভূমি! প্রত্যেকটি স্পট এক একটি দারুণ দর্শনীয় স্থান।

বেদনার বদ্ধভুমি। ছবিঃ লেখক

তবে এই সবগুলো জায়গার বাইরেও আমার কাছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যে জায়গা বা যে সৃষ্টিটি বিশেষ আকর্ষণের বা অনেক বেশী মাদকতাময় সেটা হলো একাডেমিক ভবনগুলোর পেছনে, আরও বিশেষ করে বললে তৃতীয় বিজ্ঞান ভবনের ঠিক পেছনে আর তাপসী রাবেয়া হলের পিছনের তুত বাগানের সাথে লাগোয়া একটি পুকুর!

হ্যাঁ একটি পুকুরই মাত্র, তবে সেটি সাধারণ কোনো পুকুর নয় আদৌ! এই পুরো পুকুরটি অবিকল একটি বাংলাদেশের মানচিত্র! ঠিক যেভাবে আমাদের মানচিত্র দেখা যায়, পুকুরটি হুবহু সেভাবেই খনন করা হয়েছে! বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর কিছুকাল পরেই (সঠিক সন-তারিখ জানতে পারিনি)।

জলের সে দেশ। ছবিঃ লেখক

প্রথম দেখাতে এটাকে অন্য সাধারণ একটি পুকুরই মনে হবে আপনার কাছে। কিন্তু আপনি পুকুরের চারপাশে একটু হাঁটলে, বসলে বা দাঁড়িয়ে ভালো করে তাকালে একটু পরেই বুঝতে পারবেন যে এটি আর দশটা পুকুরের মতো সাধারণ কোনো পুকুর নয়, পুরো পুকুরটাই আমাদের বাংলাদেশের একটি জীবন্ত মানচিত্র! ভালো করে তাকিয়ে খুঁজলে আপনি খুঁজে পাবেন সবগুলো বিভাগ!

রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও চট্রগ্রাম! যখন এই মানচিত্র আপনার চোখে ধরা পড়বে তখন আপনি একটা অদ্ভুত আচ্ছন্নতায় আসক্ত হয়ে পড়বেন নিজের অজান্তেই! একটা বিশেষ ভালো লাগার আবেশ আপনাকে ছুঁয়ে যাবে নিমেষেই! একটা অজানা মায়ায় বাঁধা পড়বেন আপনি!

প্রানের প্রাঙ্গণ! রাবি। ছবিঃ লেখক

পুকুরটি সবচেয়ে ভালোভাবে উপভোগ করা যায়, রাজশাহী বা রংপুর বিভাগের ভারতীয় অংশ থেকে! হ্যাঁ ভারতীয় অংশই! কারণ পুরো পুকুরটা যদি বাংলাদেশ হয় তবে পুকুরের চারপাশের কিনারা তো ভারতের অন্তর্ভুক্তই আপেক্ষিকভাবে! একটু কষ্ট হলেও আপনি পুকুরের অনেকটা অংশ উপভোগ করতে পারবেন হেঁটে হেঁটেই।

তবে ইদানীং পুকুরের রংপুর-রাজশাহী বর্ডার লাইনে একটা টং ঘরের মতো বানিয়েছে ছায়া ঘেরা গাছের ছায়ায়, সেখানে বাঁশের বিছানায় বসেও চুপচাপ উপভোগ করতে পারবেন বাংলাদেশের এই জলজ মানচিত্র! পিছনে রয়েছে বোটানিক্যাল গার্ডেন, একপাশে তুত বাগান আর অন্য পাশগুলোতে রয়েছে উদ্ভিদ বিজ্ঞানের জন্য নানা রকম উদ্ভিদের মাঠ।

প্রিয় প্যারিস রোড। ছবিঃ লেখক

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন যখনই সময় পেতাম আমি এখানে গিয়ে চুপচাপ কিছু সময় কাটিয়ে আসতাম। আমার ভীষণ ভালো লাগতো সব সময়। কেমন যেন একটা অন্য রকম অনুভূতি হতো বাংলাদেশের এই জলজ মানচিত্রর কাছে গেলেই! সবুজ মাঠ পেরিয়ে গিয়ে এক এক সময় এক একটি বিভাগের পাশে গিয়ে বসে থাকতাম। কখনো পার্বত্য-চট্রগ্রাম, কখনো সিলেট, কখনো রাজশাহী আর কখনো খুলনা বা বরিশাল বিভাগের কোনো জায়গায়।

জলজ মানচিত্র। ছবিঃ লেখক

তবে ঢাকায় কখনো যাওয়া হয়ে ওঠেনি ওই জলজ মানচিত্রের! কারন ঢাকাটা যে একদম পুকুরের মাঝখানে! নৌকা বা কোনো ভেলা তো নেই বা ছিল না! আর সাঁতার দিতেও তেমন একটা ইচ্ছা হতো না। তাই বাংলাদেশের বর্ডার লাইন ধরেই নিজের মতো করে উপভোগ করতাম বাংলাদেশের একমাত্র (আমার জানা মতে) জলজ মানচিত্র বা ম্যাপের পুকুর।

জলজ মানচিত্রের পাড়ে বাঁশের ঘর। ছবিঃ লেখক

এই যেমন সময় পেতেই ছুটে গিয়েছিলাম গত সপ্তাহে দেখতে প্রিয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আর খুব প্রিয় সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের বাংলাদেশের জলজ মানচিত্র বা পুকুর!

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

খঞ্জনদীঘির পাড়ে খানিয়াদীঘি রাজবিবি মসজিদ

ভারত ভ্রমণে ভাতের হাহাকার!