এক সবুজ নদীর গল্প…

নদীর দেশের মানুষ যেহেতু নদী তো অনেকই দেখেছি। পাহাড়ে পাহাড়েও বহুবার বহু নদী দেখেছি। কখনো নীল নদী বা নদীর পানি, কখনো টলটলে স্বচ্ছ জলের, কখনো ঘোলা কাদাযুক্ত পানির নদী, কখনো একদম সাদামাটা নদীরা যেমন হয় তেমন নদী। কিন্তু এমন ঝকঝকে সবুজ নদী এর আগে কখনো চোখে পড়েনি কোথাও। নৈনিতাল হয়ে আলমোরা যেতে পাহাড়ি নদীর এমন সবুজ রূপ দেখে ভীষণ চমকে গিয়েছিলাম। নদী যে কখনো স্বচ্ছ আর সবুজ হতে পারে ভাবিনি। স্বচ্ছ নদী বা নদীর পানি তো অনেক দেখেছি। কিন্তু এমন সবুজ আর স্বচ্ছ একই সাথে এটা দুর্লভ একটা ব্যাপার মনে হয়েছে আমার কাছে।

নৈনিতাল থেকে আলমোরা প্রায় ৫৫ কিলোমিটারের পাহাড়ি পথ। যে পথের প্রায় ৩০-৩৫ কিলোমিটার যাবার পথে এই পাহাড়ি নদী প্রথমে চোখে পড়ে আমাদের। আর এই নদীকে দেখার পর থেকেই সবাই ছটফট করছিলাম কখন আর কীভাবে এই নদীর কাছে নামতে পারবো। নদীর টলটলে জল ছুঁতে পারবো, নদীর তীরে একটু চুপ করে বসতে পারবো, নদীর বুকের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথরের উপরে গিয়ে দাঁড়াতে পারবো? গাড়ি ছুটছিল পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে আর আমরা খুঁজছিলাম এই নদীর কাছে যাওয়ার কোনো একটা পথ বা উপায়।

সেই নাম না জানা নদী। ছবিঃ লেখক

প্রায় এক ঘণ্টা পরে, সকালের নাস্তা করতে যেখানে থেমেছিলাম সেই হোটেলের পেছনে গিয়ে নদীটি আবার আমাদের চোখে পড়াতে তক্ষুনি নেমে যেতে চাইছিলাম ওর কাছে। কিন্তু সেখান থেকে নদীর কাছে যাওয়ার কোনো উপায় না পেয়ে, হোটেলের ছাদ থেকেই টলটলে বয়ে যাওয়া জলের মিহি স্রোত দেখছিলাম। পাথরের খাঁজে খাঁজে কীভাবে বয়ে চলেছে পাহাড়ি জলের ধারা নদী হয়ে। কী এক আকর্ষণে আর মায়ায় যেন বেঁধে ফেলে যে কোনো পাহাড়ি নদী আমাদেরকে।

তাই সেই পাহাড়ি স্বচ্ছ জলের নদীর মায়া আর আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে নিয়ে নাস্তা শেষ করে আবারো আমাদের গাড়ি চলতে শুরু করাতে গাড়ির ড্রাইভারকে জানিয়ে দেয়া হলো, সামনে সুযোগ পেলেই যেন নদীর কাছে নামা যায়, এমন জায়গা দেখে গাড়ি থামিয়ে দেবেন। নিজেদের গাড়ি থাকলে এটাই একটা অন্যতম সুবিধা। যখন আর যেখানে খুশি ইচ্ছামতো সুবিধাজনক হলেই থামিয়ে দেয়া যায়। সময় আর প্রকৃতিকে নিজেদের মতো কিছুটা সময় উপভোগ করা যায়।

নদীর তীরে উচ্ছ্বাস। ছবিঃ লেখক

ঠিক সেভাবেই ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছে আর মাঝে মাঝে নদীর পাশে নেমে যাওয়া যায় এমন জায়গা দেখে চলেছে। সাথে আমরাও। প্রায় ৩০ মিনিট চলার পরে এমন একটা জায়গা পাওয়া গেল, যেখানে গাড়িও চাইলে নেমে যেতে পারে নদীর পাড়ে। গাড়ি থামানো হলো। আমরা আর গাড়ি না নামিয়ে ঝুকিমুক্ত থাকতে চাইলাম। যদি পরে আবার গাড়ি পাহাড়ি নদীর খাড়া আর ঝুরো মাটির পথ বেয়ে উঠতে না পারে! তাই নিজেরাই নেমে গেলাম, বাকি পথটুকু পায়ে হেঁটে। নদীর পাড়ে গিয়ে থমকে গেলাম এমন স্বচ্ছ আর সবুজ জলের এক নদী দেখে। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দুইপাশে যতদূর চোখ যায় শুধু স্বচ্ছ, টলটলে, সবুজ জলের বয়ে চলা, পাহাড়ি উঁচুনিচু আর আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে।

নদীর ওপারে আকাশ ছুঁয়েছে সবুজ পাহাড়ের সিঁড়ি, যতদূর চোখ যায় নদীর তীর ঘেঁষে সবুজ পাহাড়ের পাহারা যেন। কেউ যেন অনন্ত যৌবনা নদীর কোনো রকম ক্ষতি করতে না পারে। সবুজ পাহাড়ের প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রেখেছে সবুজ সাজের অপরূপ এই নদীকে। পাহাড়ের উপরে পুরোপুরি মেঘমুক্ত ঝকঝকে নীল আকাশ, নদীর মাঝে মাঝেই রয়েছে ছোট, বড় আর মাঝারি আকারের নানা রকমের পাথরের ছড়াছড়ি। ইচ্ছে হলেই যে পাথরে পা দিয়ে চলে যাওয়া যায় মাঝ নদীতে। যেন নদীর বুকেই ভেসে থাকা কিছু সময়ের জন্য।

টলটলে জলের পাহাড়ি নদী। ছবিঃ লেখক

স্বচ্ছ জলের সবুজ নদীর জলে দেখা গেল ছোট ছোট রঙিন দুই একটি মাছের চলাচল। হুটহাট ছুটে চলেছে পাথরের খাঁজে খাঁজে, এখানে ওখানে। নদীর উপরে স্বচ্ছ জলের মাঝে একটি পাথরের উপরে বসে বসে ভাবছিলাম নদীর পানি কীভাবে সবুজ হলো? এমনটা তো আগে কখনো শুনিনি, দেখিনি আর ভাবিনিও। তাহলে কীভাবে পানি এত সবুজ আর স্বচ্ছ হলো? আর এই নদীটির নাম-ই বা কী? সে নাম নাহয় পরে কারো কাছ থেকে জেনে নেয়া যাবে। কিন্তু পানি কীভাবে এত এত সবুজ হলো?

এই কথা ভাবতে ভাবতেই চোখ পড়লো নদীর জলে পাহাড়ের প্রতিচ্ছবিতে। আর তখনই সমাধান পেয়ে গেলাম। সবুজ নদীর স্বচ্ছ জলের অদ্ভুত সৌন্দর্যের। হ্যাঁ, আসলে পুরো নদীর চারপাশের সবটুকু জুড়েই রয়েছে সবুজ পাহাড়ের সারি। একদম নদীর তীর ঘেঁষে থেকে শুরু করে, দূরে যতদূরে চোখ যায় পুরো প্রান্তর জুড়েই সবুজ পাহাড়ের হাতছানি। সামনে-পিছনে, ডানে-বায়ে সবখানেই শুধু সবুজ পাহাড়ের সমারোহ, ঘন অরণ্য, মানুষ বা কোলাহল মুক্ত নীরব, নির্জন আর নির্মল সবুজ প্রকৃতি। আর সেই সবটুকু সবুজের, পাহাড়ের প্রতিচ্ছবির, গাছের আর অরণ্যের সবুজ ছায়া নদীর টলটলে জলে পড়ে নদী সবুজ রঙ ধারণ করেছে বা নদীর রঙ সবুজ হয়েছে।

পাহাড়ি নদীর পাথরে… ছবিঃ লেখক

আমরা অনেক অনেক সময় নিয়ে সেই নাম না জানা সবুজ নদীর স্বচ্ছ জলের মাঝে পাথরে বসে থেকে, পাহাড় দেখে, বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ জলের মাছের সাঁতার দেখে, ঘন অরণ্যের নির্জনতা আর উপরের মেঘমুক্ত নীল আকাশের বিশালতা উপভোগ করেছিলাম প্রাণভরে। এতটাই, এতটাই নীরব আর নির্জন ছিল সেই পাহাড়, নদী, অরণ্য আর নীল আকাশ ঘেরা প্রকৃতি যে পুরো সময়টায়, সেখানে আমরা ছাড়া আর কেউ ছিল না, আসেনি আর পথেও ছিল না কোনো গাড়ি।

সবুজ নদী! ছবিঃ লেখক

আমরা সবাই আলমোরার নাম না জানা সেই সবুজ সাজের নদীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। যে কারণে ড্রাইভার অনেক ডাকাডাকি করেও আমাদের খুব সহজে তার গাড়ির দিকে ফেরাতে পারেনি। যতক্ষণ না স্বেচ্ছায় আমরা আমাদের উপভোগের শেষ রেশটুকু পেতেও ঠায় বসেছিলাম সেই নাম না জানা সবুজ নদীর স্বচ্ছ জলের ভেসে চলা, ডুবে থাকা পাথরের উপরে। অপার্থিব কিছু সময় কাটিয়েছিলাম সেই সবুজ নদীর পাড়ে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হাওড়ায় কুমারটুলির মূর্তি কাব্য

সোনাগাজীতে বাংলাদেশের প্রথম বায়ুকল: মুহুরি প্রজেক্ট