আন্দামান সাগরে ঝড়ের কবলে একদিন (ভিডিও)

ফি ফি আইল্যান্ড

ফুকেট যেদিন পৌঁছালাম আমরা, তার একদিন পরে আমাদের ফি ফি আইল্যান্ড যাওয়ার কথা। ঝড়ের পূর্বাভাস আগে থেকেই ছিল, ঠিক যেদিন আমরা যাবো সেদিনই। দলে আমরা সব মিলে ৯ জন, এর মধ্যে আমার ম্যানেজার মাহমুদ ভাই, ভাবী ও তার দুই ছেলে মেয়ে আইল্যান্ড ট্রিপ থেকে নাম প্রত্যাহার করে নিল। আমরা বাকি ৫ জন ঝড় উপেক্ষা করেই যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমরা ভেবেছি ঝড়ের কবলে পড়ার সম্ভাবনা থাকলে ফি ফি আইল্যান্ডের জাহাজই ছাড়বে না। বিকেলে ট্যুর অপারেটর থেকে আমাদের ৫ জনের জন্য ফি ফি আইল্যান্ডের প্যাকেজ নিয়ে আসলাম। প্যাকেজ মানে ১,২০০ বাথে (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩,০০০ টাকা) হোটেল থেকে পিক আপ, ড্রপ, জাহাজে ফি ফি যাওয়া আসা, স্নোরকেলিং আর দুপুরের খাবার। হিসেব করে দেখলাম বেশ ভালোই ডিলটা।

ডুয়াংজিত বীচ রিসোর্ট, ফুকেটে এখানেই ছিলাম আমরা-ছবি লেখক

সকালে ঠিক ৭টায় আমাদের রিজোর্টের নিচে এসে থামলো ট্যুর অপারেটরের গাড়ি। চমৎকার রোদ উঠেছে, ঝড়ের ব্যপারটাই আর আমাদের মাথায় থাকল না। ৪৫ মিনিটের চমৎকার ড্রাইভ শেষে আমরা জেটিতে পৌঁছালাম। অনেকগুলো জাহাজ গা ঘেঁষাঘেষি করে দাড়িয়ে আছে। এর মধ্যে চমৎকার একটা জাহাজে আমরা উঠে পড়লাম। উপরে উঠে একেবারে সামনের সারিতেই জায়গা পেলাম। ঝকঝকে রোদ, চমৎকার আবহাওয়া, নির্ধারিত সময়েই জাহাজ রওনা হয়ে গেল আন্দামান সাগরের বুক চিরে ফি ফি আইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে।
জাহাজ ছেড়ে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে-ছবি লেখক

বন্দর এলাকা পার হয়ে সমুদ্রের দিকে যেতে যেতেই আস্তে আস্তে আন্দামান সাগরের সৌন্দর্য দেখা দিল। প্রথমে একটা দুটো ছোট সবুজ পাহাড় দেখা গেল সমুদ্রের বুকে। ধীরে ধীরে দেখা মিলল ফি ফি আইল্যান্ডের। আগে দেখা ছবিগুলো এ দ্বীপের প্রতি কত অবিচার করেছে সেটা সামনাসামনি না দেখলে বুঝতাম না। বিশাল পাহাড়ের গা ঘেঁষে চলছে আমাদের জাহাজ। আমরা হাঁ করে গিলছি অসম্ভব নীল সমুদ্রে পানির পাশে পাহাড়গুলোর সৌন্দর্য। এর মধ্যে একটা খাড়িতে চলে এসেছে জাহাজ, এখানে আমাদের কিছুক্ষণ থাকার  কথা, কিন্তু ঠিক সেই সময় থেকে শুরু হলো বৃষ্টি, আর বড় বড় ঢেউ। জাহাজ খাড়িতে বিপজ্জনকভাবে দুলতে থাকলো। জাহাজের ক্যাপ্টেন জানিয়ে দিল এখানে না থেমে আমরা ফি ফি আইল্যান্ডের মূল জেটিতেই থামবো।
ফি ফি আইল্যান্ড-ছবি লেখক

ফি ফি আইল্যান্ডের মূল জেটিতে যখন আসলাম তখন ভালোই বৃষ্টি পড়ছে। এর মধ্যে স্নোরকেলিং করতে নামলাম আমরা দুজন। অধিকাংশ লোকজনই এ আবহাওয়ায় আর স্নোরকেলিং করতে নামল না। পানিতে নেমে সমুদ্রে স্বচ্ছ তলদেশে অনেক মাছ দেখলাম, কিন্তু বৃষ্টির কারণে ভিজিবিলিটি অনেক কমে গেছে। তাই বেশি সময় পানিতে থাকতে পারলাম না। জাহাজে উঠে এসে ভালো পানিতে গোসল করে দ্বীপে নামলাম। দুপুরের খাবারের জন্য নির্ধারিত যে হোটেল আছে সেখানে খেতে বসে গেলাম। এক টেবিলে দশজন করে, বেশ ভালোই খাবার-দাবার দিয়েছে। আমাদের টেবিলে বাকি পাঁচজন কেরালা থেকে এসেছে, খেতে খেতেই তাদের সাথে ভালো সম্পর্ক হয়ে গেল। বেশ আড্ডা দিলাম আমরা ক্রিকেট নিয়ে।
ফি ফি আইল্যান্ডে স্নোরকেলিং-ছবি লেখক

কিন্তু তুমুল বৃষ্টির কারণে আর বাইরে বের হতে পারলাম না। এদিকে আমাদের ফেরার সময়ও ঘোষণা করা হয়েছে। মন খারাপ করে আমরা ফিরে চললাম আমাদের জাহাজের উদ্দেশ্যে। জাহাজে ওঠার পরই ক্যাপ্টেনের ঘোষণা, “জাহাজ নিয়ে তোমরা চিন্তা করো না, জাহাজ পৌঁছাবে ঠিকমতোই, তোমরা তোমাদের নিয়ে চিন্তা করো!” এর মধ্যে জাহাজে বিনামূল্যে সি-সিকনেস পিল বিতরণ করা হচ্ছে, সবাইকে খেয়ে নেয়ার পরামর্শও দেয়া হচ্ছে, পুরো একট যুদ্ধাবস্থা।
ঝড়ের মধ্যে শুরু হলো ফিরতি যাত্রা-ছবি লেখক

জাহাজ চলতে শুরু করলো, বিশাল বিশাল ঢেউ আর তুমুল বৃষ্টির কারণে একটু আগে ছেড়ে আসা জেটিটাও দেখা যাচ্ছে না। খাড়ি থেকে বের হয়ে সমুদ্রে পড়ার সাথে সাথেই ঢেউগুলো যেন দ্বিগুণ হয়ে গেল, সেই সাথে শুরু হলো রোলিং। আমাদের সাথে রওনা দিয়েছিল চার-পাঁচটা ইয়ট টাইপের ছোট ছোট বোট। ঢেউয়ের সাথে পেরে না উঠে সবগুলো নাক ঘুরিয়ে ফিরে গেল হারবারে। মাত্র তিনটা জাহাজ সবকিছু উপেক্ষা করে আগাতে থাকলো, যার প্রথমটায় আমরা। ঝড়ের গল্প এতদিন সবার কাছে শুনেছি, এ প্রথম দেখার সৌভাগ্য (না দুর্ভাগ্য?) হলো। বৃষ্টির বেগ বেড়েই চলেছে, সেই সাথে চলছে ঢেউয়ের বিরুদ্ধে লড়াই। মনে পড়লো আসার সময় ২ ঘণ্টার কম সময় লেগেছিল, এখন এক ঘণ্টা পরও জাহাজ দ্বীপের কাছাকাছি দিয়েই চলছে।

প্রতিটি বড় ঢেউয়ে জাহাজ এমনভাবে আছড়ে পড়ে, তাতে ছিটকে উঠা পানি ভিজিয়ে দিচ্ছে আমাদের সবাইকে। জাহাজে ৫০ বাথেই রেইনকোট পাওয়া যায়, খুব পাতলা, কিন্তু কার্যকর। সবাই একটা করে কিনে পরে ফেললাম। তাতেও যে পানির ছাট থেকে পুরোপুরি বাঁচতে পারছি এমন না। আসন ছেড়ে উঠে পড়লাম আমি, হেলতে দুলতে কোনোমতে জাহাজের পেছনে পৌঁছালাম, উদ্দেশ্য এ ঝড়ের একটি ভিডিও রাখা। পেছনে রেলিং ও পিলারের সাথে ভালোমতো নিজেকে আটকে নিয়ে দাঁড়ালাম। দেখা হয়ে গেল দক্ষিণ ভারতের সেই বন্ধুদের সাথেও। রীতিমতো উপভোগ করছে তারা, ভয়ের চিহ্ন মাত্র নেই তাদের চেহারায়। জিজ্ঞেস করতেই বললো, তাদের ওখানেও এধরনের ঝড় বাদল বেশ সাধারণ ঘটনা, তাই তারা উপভোগই করছে। আমি বললাম, চট্টগ্রামে থাকতে আমিও বেশ কবার ঝড়ে পড়েছিলাম, কিন্ত আজকের ধারে কাছে না।

পাতং বীচ-ছবি লেখক

অবশেষে প্রায় আড়াই ঘণ্টার যুদ্ধ শেষে পানি শান্ত হয়ে গেল। একটু পরে আমরা বুঝতে পারলাম জেটির আর বেশি দূরে নেই জাহাজ। এ সময় তীর বেগে দুপাশ দিয়ে ফি ফি থেকে রওনা দেবার সময়ে ফিরে যাওয়া ইয়টগুলোকে দেখা গেলো আমাদের পাশে। প্রায় সাথে সাথেই আমাদেরকে ওভারটেক করে চলে গেল জেটির দিকে। আমরা এগিয়ে চলেছি ধীরে সুস্থে। অবশেষে জাহাজ ছাড়ার প্রায় তিন ঘণ্টা পরে আন্দামান সাগরের ঝড় মোকাবিলা করে ফুকেট পৌঁছালাম।
ফিচার ছবি-লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সুখী দেশ ভুটানের পথে

চা প্রেমীরা এক বিকেলে ঘুরে আসতে পারেন শৈল্পিক টং ঘর থেকে