শ্রী লেদারসে আমাদের বিশ্রী অবস্থা!

dav

সেদিন বলেছিলাম যে কলকাতা নিউমার্কেটে গিয়ে আমাদের দেশের মানুষদের সাধারণত যে দুরবস্থা হয় সেই কথা। কম দামী, অযথা আর অপ্রয়োজনীয় এটা সেটা কিনে মূল্যবান অর্থের অপচয় করে দরকারি আর প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে না পারার আক্ষেপের কথা।

তো কোনো রকমে নিউমার্কেট আর কসমেটিকসের দোকান থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও সামনে রয়েছে আপনাকে আমাকে একেবারেই সর্বস্বান্ত করার জন্য শ্রী লেদারস। শ্রী লেদারস কলকাতার একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় জুতো, ব্যাগ, বেল্ট সহ চামড়ার নানা রকম জিনিসপত্রের সমাহার।

শ্রীলেদারসে নানা রকম পন্য। ছবিঃ লেখক 

এখানে গিয়ে প্রথমেই চোখে পড়বে ব্যাগ। নানা রকমের রঙ-বেরঙের ব্যাগ। ব্যাকপ্যাক, ট্র্যাভেল ব্যাগ, স্কুল, কলেজ ব্যাগ আর সুটকেস। এগুলোর দাম অন্যান্য জায়গার চেয়ে একটু কম হলেও সবাই খুব একটা ওদিকে গিয়ে দেখে, নেড়ে চেড়ে, উল্টে পাল্টে এলেও এককালীন বেশ কিছুটা টাকা খরচ হয়ে যাবে বলে অনেকেই এই সেক্টর এড়িয়ে আসতে পারি অনায়াসেই।

কিন্তু এরপরেই বিপত্তি বাঁধে জুতার কাছে এসে। ছোটদের বর্ণীল নানা রকমের জুতা, স্পঞ্জ, স্যান্ডেল পাওয়া যায় ১৫০-৫০০ এর মধ্যে। যেটা আমাদের যাদের বাসায় ছোট ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন বা আদরের কেউ থেকে থাকে তারা কিছুতেই নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কিছুতেই না। সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না খুব কঠিন হৃদয় আর একেবারেই পকেট শুন্য কেউ না হলে।

প্রথমে নিজের ছেলেমেয়ের জন্য সব রকমের স্যান্ডেল, স্কুলের জুতা, পার্টি শু, খেলার জন্য আলাদা জুতা, বাসায় পরার জন্য একটা স্পঞ্জ সহ মোটামুটি তিন থেকে চার জোড়া জুতা তো কেনাই হয়ে যায় একেকজনের জন্য। নিজের ছেলে আর মেয়ের জন্য কেনা হয়ে যাওয়ার পরে, ইচ্ছা হয় আহারে ভাই বা বোনের ছেলে বা মেয়ের জন্য এক জোড়া জুতা বা স্যান্ডেল নিলে ওরা কত খুশি হবে। আর ওদের বাবা মা তো আরও বেশী খুশি হবে। তাই তাদের জন্য এক বা দুই জোড়া নেয়া হয়েই যায়। দাম যে দারুণ কম!

শ্রীলেদারসে নানা রকম পন্য। ছবিঃ লেখক 

হলো নিজের ছেলে-মেয়ের, পরে ভাই বোনের ছেলে বা মেয়ের জন্য। এরপর আসে নিজের পালা। ছেলেরা তবুও হয়তো এক জোড়া স্লিপার আর এক জোড়া অফিসিয়াল বা এক জোড়া কেডসের উপর দিয়ে চালিয়ে দিতে পারে। এর চেয়ে বেশী আর দরকারও হয়ে ওঠে না তাদের। কিন্তু, কিন্তু, কিন্তু মহা মুশকিলে পড়ে যায় মেয়েরা। আর হ্যাঁ, এই মুশকিল হয়ে ওঠে কসমেটিকসের দোকানের চেয়েও কয়েকগুণ বেশী। এখানে মাদকতার নেশায় একদম মাতাল হয়ে যায় অধিকাংশই! প্রথমে নিজের অফিসের জন্য দুই থেকে তিন জোড়া মাত্র! একটা স্লিপার, একটা একটু উঁচু আর একটা অফিশিয়াল শাড়ির জন্য কিছুটা হিল ধরনের।

এরপর নানা রকম আনুষ্ঠানিক প্রোগ্রামের জন্য একটু পার্টি শু না নিয়ে কি পারা যায় বলুন? তাই এখানেও হয়ে যায় দুই জোড়া অন্তত। একটা অনেক পছন্দের শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে আর একটা খুব ভালো লেগে যাওয়া ওরকম একটা শাড়ির জন্য অগ্রিম কিনে রাখা! দাম অনেক কম বলে কথা!

জুতা কেনা আপাতত যখন শেষ করে হাত ব্যাগের দিকে এগোবে, ইশ ঠিক তক্ষুনি চোখে পড়লো অনেক দিন থেকে মনে মনে ভেবে রাখা একদম মনের মতো একটা জুতা। এটা না নিতে পারলে মনটাই খারাপ হয়ে যাবে যে! তাই সেই মন খারাপ দূর করতে ওটাও নেয়া হয়ে যায়। মনের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে নিতে, এই আর কি মোটামুটি ছেলে, মেয়ে, ভাগ্নে, ভাগ্নি আর নিজের মিলে ১০ থেকে ১২ জোড়া হয়েই গেল!

শ্রীলেদারসে নানা রকম পন্য। ছবিঃ লেখক 

এরপর জুতা কেনার আনন্দে আনন্দিত হয়ে ব্যাগের কাছে আসা। মনটা তখন খুশিতে আনচান করে ওঠে। প্রাণ হয়ে ওঠে উত্তাল, আবেগ তখন অবাধ্য, ইচ্ছে তখন অদম্য আর সাধ্য তো একদম হাতের মুঠোয়। দাম কম বলে কথা! তাই এখানেই জুতার সাথে ম্যাচিং করে একটা, শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে একটা, অফিসের অমুক ড্রেসের সাথে মিলিয়ে একটা আর তমুক ভাবীর হাতে দেখে কী যে ভালো লেগেছিল ঠিক তেমন পেয়েছে একটা এই হলো তিনটা।

সাথে পার্টি ব্যাগ একটা, একটু বাইরে গেলে হালকা কাপড় আর সাথে হাত ব্যাগ মিলিয়ে মোটামুটি মানের একটা। এই হল পাঁচ থেকে ছয়টা। সবকিছু মিলে বেশ অনেকগুলো পণ্য কেনাকাটার পুরস্কার হিসেবে ফ্রি পাবেন একটা গড়পড়তা দামের উপরে।

উহ, কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে। ৬০০-৭০০ টাকার আরও কোনো একটা পণ্য নিতে পারবে একদম ফ্রিতে! সেই ফ্রি পণ্য নিতে গিয়ে দামের হেরফের মেলাতে গিয়ে কোনোটা একটু কম দামে পেয়ে পুরো টাকা উশুল করতে গিয়ে কেনা হয়ে যায় আরও একটা কিছু। ছোট পার্স বা বেল্ট অথবা আরও এক জোড়া জুতা বা স্যান্ডেল।

এইসব কিনে শেষ করে যখন বের হবে তখন মনে পরে ইশ, মা-বাবা আর শ্বশুর-শাশুড়ির জন্য তো কিছু কেনা হলো না? এত কম দাম ওদের জন্য এক জোড়া করে কেনা যেতেই পারতো। সেই আক্ষেপ ঘোচাতে আরও দুই থেকে তিন জোড়া কেনার জন্য বাছাই করতে গিয়ে দেখে আহারে টাকা তো শেষ হয়ে গেছে! এখন কী করি?

শ্রীলেদারসে নানা রকম পন্য। ছবিঃ লেখক 

নিজের থেকে কি দুয়েকটা বাদ দিয়ে ওদের জন্য নেব? কত পছন্দ করে কিনলাম? নাকি ছেলে মেয়ের কোনো একটা বাদ দেব? ওদের সাইজ ঠিক মত পাওয়া যায় না, এখানে পেলাম, এত কম দামে, আবার বাদ দেব? নাহ থাক। ব্যাগ হাতিয়ে দেখি কত কী আছে বাকি? কোনো রকমে এই ব্যাগের পকেটের ১৫০ রুপী, ওখানে আলাদা করে রাখা ২০০ রুপী, পার্সের ভাঁজে থাকা ৫০ রুপী, সাথের ভাবি, বান্ধবী বা আপার কাছ থেকে নিয়ে ৫০০ রুপী! এভাবে আরও দুই তিন জোড়া জুতা কিনে কিনে নিজেকে একবারেই নিঃস্ব করে ফেলে, একটা বিশ্রী অবস্থা তৈরি করে ফেলি নিজেই নিজের জন্য।

আর যদি কোন কারণে কেনা না হয় শেষের গুলো, বাছাই করেও রেখে দিতে হয় টাকা শর্ট পড়ে যাওয়ার জন্য, তবে তো কথাই নেই আরও বিশ্রী একটা অবস্থা তৈরি হয় মনের মধ্যে, শ্রী লেদারসের সবার সামনে! কি বিশ্রী একটা ব্যাপার হয়ে যায় নিজের কাছেই।

আর এরপর? যখন সকল পণ্য একসাথে এক জায়গায় এনে রাখা হয়, তখনই হয় আসল বিশ্রী অবস্থা তৈরি। কারণ কোনো একজন, দুইজন মানুষের পক্ষে সেগুলো বহন করা অসম্ভব হয়ে ওঠে যে! শেষমেস একসাথে সবকিছু বহন করতে সবগুলো জুতা, ব্যাগ আর অন্য পণ্যের ভেতরের ব্যাগগুলো ফেলে দিয়ে আলাদা একটা বিশাল বস্তার মতো ব্যাগ কেনা হয় সেগুলো রাখার জন্য। আধুনিক কেনাকাটা তখন বিশ্রী পর্যায়ের দোকানদারিতে, মাল টানা অস্বস্তিকর অবস্থার তৈরি করে! যার চেয়ে কষ্টকর দৃশ্য আর কিছু সেই সময়ে হতে পারে না।

শ্রীলেদারসে কেনাকাটার অপেক্ষায়। ছবিঃ লেখক 

সব কিছু মিলেই শ্রী লেদাসের আকর্ষণীয় আর কম দামের শতেক পণ্যের সমাহারে একটা বিশ্রী অবস্থার তৈরি হয়, ঘরে, বাইরে, পার্সে, পকেটে, পথে আর একদম শেষে ফিরে আসাতে! সবকিছু মিলেই শ্রী লেদারস আমাদের হয় এরকম একটা বিশ্রী অবস্থা! তাই আগামী দিনগুলোতে এই অবস্থা এড়াতে কী করবেন সেটা আপনি-ই ভালো বুঝবেন…!

Loading...

2 Comments

Leave a Reply

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    বিহার ও রসমালাইয়ের শহর কুমিল্লায় একটি দিন

    ভারতীয় ভিসায় নতুন ও কার্যকর পোর্ট সংযোজন