পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং থেকে বলছি

দার্জিলিং নামটা শুনলেই মাথায় চিন্তা আসে বরফে ঢাকা রাস্তাঘাট আর ঝকঝকে একটি সন্ধ্যার। পশ্চিমবঙ্গের বেশ নামকরা শহর দার্জিলিং। শিলিগুড়ি থেকে ৬৩ কিলোমিটার দূরে প্রায় ৩,০০০ মিটার উচ্চতার শহর দার্জিলিং। শিমলার মতো এখানেও পাহাড় কেটে বানানো আছে নানান রঙের ঘরবাড়ি। কাঠের ঘর থেকে শুরু করে ইটপাথরের দালানকোঠা সবই আছে দার্জিলিংয়ে।
বাংলাদেশ থেকে ৭ জন গিয়েছিলাম ২০১৮ এর জানুয়ারির শেষ দিকে। দার্জিলিং দুই উপায়ে যাওয়া যায়। প্রথম উপায়ে কোলকাতা দিয়ে ট্রেনে করে নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত যেতে হবে। ট্রেন ভাড়া ৩৫০-৪০০ রুপি। সেখান থেকে ২৫ রুপি দিয়ে বেবিট্যাক্সি করে চলে যেতে হবে দার্জিলিং মোড়। সেখান থেকে দার্জিলিং যাওয়ার অসংখ্য শেয়ারড জীপ পাওয়া যাবে। ভাড়া ১৬০ রুপি, দার্জিলিং পৌঁছাতে সময় লাগবে ৪ ঘণ্টা।

দার্জিলিং যাওয়ার পথে, ছবিঃ লেখক

দ্বিতীয় উপায়টি অপেক্ষাকৃত সহজ। তবে এক্ষেত্রে ভিসার পোর্ট হতে হবে বুড়িমারির চেংড়াবান্ধা। ঢাকা থেকে হানিফ বাস রাত ৮:৩০ মিনিটে ছেড়ে যায় বুড়িমারির উদ্দেশ্যে। বাসটি একদম চেংড়াবান্ধা বর্ডার পর্যন্ত যাবে। সেখান থেকে ইমিগ্রেশন শেষ করে ওপাশের বাইপাস থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার বাসে উঠে পড়তে হবে, ভাড়া পড়বে ৬০ রুপি এবং সময় লাগবে আড়াই ঘণ্টা। শিলিগুড়ি যাওয়ার পর বাকি পথটুকু প্রথম উপায়ের মতো একদম।
আমাদের ভিসা পোর্ট বেনাপোল থাকায় প্রথম উপায়ে দার্জিলিং পৌঁছেছিলাম। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যাওয়ার পথটি খুবই আঁকাবাঁকা আর উঁচু। তাই যাদের গতি-অসুস্থতা আছে তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকলে তেমন কোনো সমস্যা হবে না। এমনিতে দেখতে দারুণ লাগে ফেলে আসা পথটি, সর্পিল হয়ে অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। বলে নেয়া ভালো, একটি জীপে ১০ জন বসতে পারে। তাই ১০ জনের একটি গ্রুপ গেলে একটা পুরো জীপ নিয়ে নেয়া যায়, ভাড়া ১৬০ রুপি প্রতিজনই পড়বে।
আমরা দুপুর বারোটায় রওনা দিয়ে দার্জিলিং পৌঁছাই বিকেল চারটায়। বেশ ভালোই শীত লাগতে লাগলো। দার্জিলিং পেট্রোল পাম্পের পাশেই হোটেল গ্রুভ হিলে উঠে গেলাম সাতজন। মোট ১,৩০০ রুপিতে দুটো রুম নিলাম। ভাড়া সহনীয় মাত্রার। হোটেলে কথা বলে নিলাম জীপের ব্যাপারে, দার্জিলিংয়ের লোকাল জায়গাগুলো ঘুরে বেড়ানোর জন্য। সাধারণত ২,০০০ রুপিতে একটি জীপ পাওয়া যায় সারাদিনের জন্য। কিন্তু আপনি যদি রক গার্ডেন যেতে চান তবে একটু বাড়িয়ে দিতে হবে। আর দার্জিলিং গেলে অবশ্যই দুটো জায়গায় যেতেই হবে, টাইগার পয়েন্ট আর রক গার্ডেন। আমরা ২,৫০০ রুপিতে একটি জীপ ঠিক করে নিলাম পরের দিনের জন্য।
হোটেলে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম দার্জিলিংয়ের রাস্তায়। সমতল রাস্তা খুব কমই আছে সেখানে, কাছাকাছি কোথাও যেতে হলে রাস্তা বেয়ে উপরে উঠতে হবে। সারাদিনের ক্ষিদেয় পেটে চোঁ চোঁ করছিল, পশ্চিমবঙ্গ বলে একটু উপরে উঠেই বিগ বাজারের পাশে বাঙালি হোটেল পেয়ে গেলাম, নাম আন্না মিষ্টান্ন হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট। নামটা মনে রাখার কারণ হলো দার্জিলিংয়ে যতবেলা পেটপূজা করেছি, এই হোটেলেই করেছি। আর প্রতিবার আমি ১০০ রুপিতে দুই পিস মুরগী, দেড় প্লেট ভাত আর চারটে জিলাপি দিয়ে খাওয়া-দাওয়া সারতাম। শেষদিকে ওদের আর বলা লাগেনি কী খাবো, গিয়ে বসলেই খাবার হাজির হয়ে যেত।
সুস্বাদু সেই খাবার, ছবিঃ টিম মেম্বার আসিফ

খাওয়াদাওয়া শেষে হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ আড্ডা-টাড্ডা দিয়ে ঘুমোতে চলে গেলাম, কালকে খুব ভোরে উঠতে হবে। ভোর চারটায় গাড়ি চলে আসলো হোটেলের নিচে। রেডি হয়ে পাঁচটার ভেতর গাড়িতে উঠে গেলাম। প্রচণ্ড শীত, তাপমাত্রা মাইনাসের ঘরে। একহাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না, এত বেশি কুয়াশা। আমাদের প্রথম গন্তব্য টাইগার পয়েন্ট। সেখান থেকে দেখা যায় দার্জিলিংয়ের সবচেয়ে সুন্দর সূর্যোদয়।
কাঞ্চনজঙ্ঘার কোল থেকে সূর্য সেখানে বিশাল এক রক্তিম ফুল হয়ে ফোটে । আধঘণ্টায় আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম সেখানে। তখনো ঘুটঘুটে অন্ধকার। প্রচুর মানুষ দাঁড়িয়ে আছে সূর্যোদয় দেখবে বলে, মধ্যবয়সী নারীরা চা বিক্রি করছে। আস্তে আস্তে দিনের আলো ফুটতে লাগলো কিন্তু ভাগ্য আমাদের আর ফুল হয়ে ফুটলো না। প্রচুর কুয়াশার কারণে সূর্য দেখা গেল না সেদিন।
অদেখা কাঞ্চনজংঘা, ছবিঃ i.dailymail.co.uk

ব্যথিত মনে ফেরার পথ ধরি। গন্তব্য বাতাসিয়া লুপ। বাতাসিয়া লুপে আছে বক্রাকার রেল লাইন যার উপর দিয়ে দার্জিলিংয়ের টয় ট্রেন চলে। আর আছে একটি পার্ক। বাতাসিয়া লুপের টিকেট মূল্য ২০ রুপি। একটু উঁচুতে অবস্থিত এই বাতাসিয়ায় ঘুরে আসা যায় খুব অল্প সময়ে। তবে তেমন বিশেষ কিছু মনে হয়নি আমার কাছে। তবুও দার্জিলিং আসলে সবাই ঘুরে যায় এটা, তাই আমরাও ঘুরে গেলাম।
বাতাসিয়া লুপ, ছবিঃ টিম মেম্বার আসিফ

এরপরের গন্তব্য ছিল রক গার্ডেন। রক গার্ডেন যেতে হলে অনেকখানি পথ নিচে নামতে হয়, তাই জীপ সাধারণত যেতে চায় না। তবে দার্জিলিংয়ে ভালো লাগা জিনিসগুলোর তালিকায় আমি রক গার্ডেনকে রাখবো। রক গার্ডেনে অনেক উঁচু থেকে পড়তে থাকা একটি সরু ঝর্ণা আছে। এই ঝর্ণা নিয়েই পুরো রক গার্ডেন। লাল লাল টিউলিপে সাজানো এই গার্ডেনের সৌন্দর্য উপভোগ করা হয় একদম উপর থেকে। পুরো রক গার্ডেনই চোখের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে সেখান থেকে।
রক গার্ডেন, ছবিঃ লেখক

রক গার্ডেন থেকে বের হয়ে চলে গেলাম হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে। ভেতরে একটা চিড়িয়াখানা আর জাদুঘর আছে। যাদের পাহাড় পছন্দ, এভারেস্টের প্রতি আলাদা নেশা কাজ করে তাদের এই জাদুঘরে যাওয়া ফরজ।
এইএমআই প্রধান ফটক, ছবিঃ লেখক

কত পুরনো সব এভারেস্ট এক্সপিডিশনের স্মারক, এই জাদুঘরে গেলেই এভারেস্টের নেশা মাথায় চড়ে যাবে কথা দিলাম। সবচেয়ে অবাক হয়েছি এভারেস্টের প্রথম অঘোষিত জয়কারী জর্জ ম্যালোরির এক্সপিডিশনের ব্যবহার্য সব জুতা, স্পাইক, ব্যাগ, স্লিপিং স্যুট সবই আছে এই জাদুঘরে। যারা জর্জ ম্যালোরি সম্পর্কে জানেন না তারা “The wildest dream” সিনেমাটি দেখবেন।
এভারেস্ট এক্সপিডিশনে ব্যবহার্য জিনিস, ছবিঃ লেখক

হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট থেকে বের হয়ে গেলাম দুই ঘণ্টা ঘুরে। চিড়িয়াখানায় আকর্ষণ বলতে একখানা রেড পান্ডা আছে। তাও খুবই ছোট, বাশেঁর বাগানে উনার দেখা পাওয়া মেলা ভার। তাই আর বেশি সময় নষ্ট না করে বের হয়ে গেলাম। বাইরে ছোটখাট অনেক স্মারক বিক্রি করা হয়। হাতের বানানো চিত্রকর্ম খুব কম দামে পাওয়া যায়। কিনে নিলাম সবাই মিলে। ড্রাইভার বললো দার্জিলিংয়ের সব স্পট মোটামুটি ঘোরা শেষ। হোটেলে ফেরার পথে আবার সেই বাঙালি হোটেলে পেটপূজা করে নিলাম। এইভাবেই শেষ হলো আমাদের দার্জিলিং ভ্রমণ।
ফিচার ইমেজ– wandertrails.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বলছি বরিশালের দুর্গাসাগর দীঘির কথা

নওগাঁর অন্যতম আকর্ষণ আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান