বিশ্ব বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কয়েকটি প্রাচীরের গল্প

সারা বিশ্বে অসংখ্য প্রাচীর তৈরি করা হতো প্রাচীনকাল থেকেই। সেই প্রাচীরগুলো যেসব কারণে তৈরি করা হতো তার মধ্যে অন্যতম কিছু কারণ ছিল- একটি দেশ বা নির্দিষ্ট স্থানের সীমারেখা নির্ধারণ করে দেয়া, শত্রুদের নিজস্ব সীমানা থেকে বাইরে রাখা কিংবা নিজেদের একটি সুরক্ষিত সীমার ভেতরে রাখা।
তবে প্রাচীনকাল থেকে যে কারণেই প্রাচীরগুলো তৈরি হোক না কেন, পরবর্তীকালে আরো অনেক প্রাচীর তৈরি হয়েছে যা তৈরির কারণ ছিল ভিন্ন। কিছু তৈরি হয়েছে স্মৃতি স্মারক হিসেবে, কিছু প্রাচীর তৈরি হয়েছে সৃজনশীলতা ও শিল্পকে মাথায় রেখে। তবে যে কারণেই তৈরি হোক সে প্রাচীর, প্রাচীরগুলো ভূমির উপর আধিপত্য করে থাকে যেখানেই তারা দাঁড়িয়ে থাকুক।
চলুন জেনে নেয়া যাক বিশ্বের বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কয়েকটি প্রাচীর সম্পর্কে।

১. ওয়াল অব স্টোন (পাথরের প্রাচীর), দক্ষিণ ক্রোয়েশিয়া:

ওয়াল অব স্টোন; source: touropia

‘ওয়াল অব স্টোন’ নামক প্রাচীরটি দক্ষিণ ক্রোয়েশিয়ার পেলজেসাক উপদ্বীপে অবস্থিত। উপদ্বীপটি সবচেয়ে সঙ্কীর্ণ স্থান, মূল ভূমিতে যুক্ত হওয়ার কিছুটা আগেই এই প্রাচীরটি তৈরি করা হয়েছে, টাউন অব স্টোন থেকে শুরু করে মালি স্টোন পর্যন্ত।
এই প্রাচীরটি ৫.৫ কিলোমিটার (৩.৫ মাইল) দীর্ঘ, যা দুটি ছোট সম্প্রদায়ের সাথে যুক্ত।
এই প্রাচীরটি তৈরির কাজ পঞ্চদশ শতাব্দীতে সম্পন্ন হয়। এই প্রাচীরটিতে ৪০টি টাওয়ার এবং মোট ৫টি দূর্গ রয়েছে। এই ৪০টি টাওয়ার এবং ৫টি দূর্গ সহই প্রাচীরটির কাজ সম্পন্ন হয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে।
এই প্রাচীরটিকে ডুব্রোভনিক শহরের প্রতিরক্ষার জন্য একটি দ্বিতীয় লাইন হিসাবে বোঝানো হয়েছিল এবং তা বহুমূল্য লবণ প্যানগুলো সুরক্ষিত করেছিল, যা ডুব্রোভনিক সম্পদে অবদান রাখে। ওয়াল অব স্টোন নামক এই প্রাচীরটি ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাচীর।

২. ভিয়েতনাম ভেটেরান্স মেমোরিয়াল ওয়াল, ভিয়েতনাম:

ভিয়েতনাম ভেটেরান্স মেমোরিয়াল ওয়াল; source: scenicase

ভিয়েতনাম ভেটেরান্স মেমোরিয়াল ওয়ালটি ওয়াশিংটনের জাতীয় যুদ্ধ স্মারক। এটিকে শহরের সবচেয়ে বেশি মর্মস্পর্শী স্মৃতি স্মারক হিসেবে জানা যায়। ভিয়েতনাম ভেটেরান্স মেমোরিয়াল ওয়ালটি তৈরি করা হয়েছিল তাদের স্মরণে যারা যুদ্ধে মারা গিয়েছে বা হারিয়ে গেছে। এই স্মারকে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।
তবে এর আরো একটি লক্ষ্য ছিল, সর্বাপেক্ষা উৎসর্গীকৃত সৈন্যদের স্মরণে রাজনৈতিক বিতর্ক অতিক্রম করা। এই দেয়ালটির কেন্দ্রস্থল ময়লা লিন দ্বারা নির্মিত। দেয়ালটির স্মৃতিস্তম্ভ প্রাচীর দুটো কালো গ্রানাইট দেওয়ালের দ্বারা গঠিত, তাতে রয়েছে ৫৮,২৫৬ জন সৈনিকের প্রত্যেকজন সৈনিকেরই নাম।

৩. ওয়াল অব ট্রয় (ট্রয়ের দেয়াল), ট্রয়, উত্তর-পশ্চিম তুর্কি:

প্রাচীন ট্রয়ের প্রাচীর; source: dreamstime

‘ট্রয়’ এটি এখন উত্তর-পশ্চিম তুরস্কের একটি কিংবদন্তী শহর। যে শহরটি বিখ্যাত হয়েছে, উঠে এসেছে হোমারের মহাকাব্য কবিতায়, ইলিয়াডের কাছে। ইলিয়াডের মতে, এটিই সেই স্থান যেখানে ট্রয় যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। ট্রয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ধ্বংসাবশেষের বেশ কিছু স্তর রয়েছে।
ট্রয়ের ধ্বংসাবশেষের ‘ট্রয় VIIA’ সম্ভবত ট্রয় অব হোমার ছিল। এটি বহু শতাব্দী পূর্বে নির্মিত। তবে ধ্বংসাবশেষের ভেতর এখনো দৃশ্যমান ওয়াল অব ট্রয় দেয়ালটি। আজ ট্রয়ে অসংখ্য পর্যটক আসেন। তাদের অনেকেই আসেন প্রাচীন এই দেয়ালটি দেখতে।
বর্তমানে এটি একটি বড় ও বিখ্যাত পর্যটন বাণিজ্যিক সাইট। এ স্থানের একটি অংশে একটি বড় কাঠের ঘোড়া শিশুদের জন্য রাখা হয়েছে, সাথে আরো আছে খেলার মাঠ। শিশুদের খেলার জন্য মাঠ, কিছু দোকান এবং একটি যাদুঘর পরে নির্মাণ করা হয়।

৪. হাদ্রিয়ান্স ওয়াল, ইংল্যান্ড:

হাদ্রিয়ান্স ওয়াল; source: wikimedia

স্কটল্যান্ডের উপজাতিদের কাছ থেকে নিজেদের কলোনি ব্রিটানিয়া রক্ষা করার জন্য রোমানদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল ‘হাদ্রিয়ান্স ওয়াল’। এটি ইংল্যান্ডের উত্তর জুড়ে ১১৭ কিলোমিটার (৭৩ মাইল) পর্যন্ত প্রসারিত হয়ে আইরিশ সাগর থেকে উত্তর সাগরের দিকে এগিয়ে রয়েছে। রোমান সম্রাট হাদ্রিয়েনের একটি সফরের পর ১২২ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় এই দেয়ালটির নির্মাণ কাজ এবং ছয় বছরের মধ্যে এটির কাজ সম্পূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়।
দেয়ালটি প্রায় ৯ হাজার সৈন্য দ্বারা গৃহীত হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল পদাতিক এবং ঘাঁটি। বিখ্যাত এই প্রাচীর বা দেয়ালটি আজও দৃশ্যমান এবং এই দেয়ালটি ইংল্যান্ডের পর্যটন আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। ওয়ালেসেন্ড থেকে বোনেস-অন-সোলওয়ে পর্যন্ত প্রাচীরের পুরো দৈর্ঘ্য অনুসরণ করে একটি জাতীয় পথ রয়েছে।

৫. বার্লিন প্রাচীর, জার্মান:

বার্লিন প্রাচীর; source: yoldacin

জার্মানের ইতিহাসে পশ্চিম বার্লিন ও পূর্ব বার্লিনের সীমানা প্রাচীর হিসেবে পরিচিত হয়ে আছে ‘বার্লিন প্রাচীর’। এই প্রাচীরটি প্রথমে পশ্চিম জার্মানি ও পূর্ব জার্মানির একটি সীমানা ছিল। ২৮ বছর এটি পশ্চিম বার্লিন থেকে পূর্ব বার্লিন এবং পূর্ব জার্মানির অন্যান্য অংশকে আলাদা করে রেখেছিল।
সরকারী হিসাব অনুযায়ী এ সময়কালে প্রাচীর টপকে পশ্চিম বার্লিন যাবার চেষ্টাকালে ১২৫ জন প্রাণ হারান। বেসরকারী হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় ২ শত।

৬. গ্রেট জিম্বাবুয়ে ওয়ালস, জিম্বাবুয়ে:

গ্রেট জিম্বাবুয়ের প্রাচীর; source: youtube.com

বর্তমানে গ্রেট জিম্বাবুয়ে শহরটি জিম্বাবুয়ের দৈন্যদশা পূর্ণ একটি শহর। তবে কোনো এক সময় এটিই ছিল জিম্বাবুয়ের রাজধানী। আর রাজধানীকে রক্ষা করার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল এই দেয়ালটি অর্থাৎ গ্রেট জিম্বাবুয়ে প্রাচীরটি। গ্রেট জিম্বাবুয়ে প্রাচীর, আধুনিক জিম্বাবুয়ের একটি বৃহৎ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে।
একাদশ শতকের শুরুর দিকে এই প্রাচীরটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ৩০০ বছর ধরে অব্যাহত থাকে। অনুমান করা হয়, এই প্রাচীরটির উপর অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির মানুষ বাস করতো। গ্রেট জিম্বাবুয়ের হিসেবে সংখ্যাটি ১৮ হাজারের মতোই।
এই দেয়ালটির সবচেয়ে দুর্লভ ভবন হিসেবে সাধারণত ‘গ্রেট এনক্লোজার’এর কথা উল্লেখ করা হয়। এটি ১১ মিটার (৩৬ ফুট) উচ্চতার একটি প্রাচীর যা প্রায় ২৫০ মিটার (৮২০ ফুট) প্রসারিত। এটি সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে অবস্থিত বৃহত্তম প্রাচীন কাঠামো।
ফিচার ইমেজhoustonprees.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শান্তি মিশনের অগ্রদূত মহাত্মা করমচাঁদ গান্ধীর আশ্রমে একবেলা

এক নজরে একটি জেলা: ইতিহাসের পাতা থেকে বাগেরহাট