অসাধারণ সৌন্দর্যের বিশ্বের কয়েকটি কৃত্রিম পানির ফোয়ারা

ফোয়ারা এখন সৌন্দর্যবর্ধক হিসেবে কাজ করলেও একসময় তা ছিল সুপেয় পানির কৃত্রিম আধার। যা তৈরি করা হতো প্রাকৃতিক ঝর্ণার প্রবাহকে ব্যবহার করে। ফোয়ারাগুলোর চারপাশে তৈরি করা হতো চৌবাচ্চার আকারের পাত্র, সেখানে জমা হতো সুপেয় পানি। আর সেসব ফোয়ারার চারপাশে রাখা চৌবাচ্চা আকারের পাত্রে জমা পানি থেকেই সেসব স্থানের বসবাসকারীদের জন্য সুপেয় পানি সরবরাহ করা হতো।
খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় তিন হাজার বছর পূর্বে প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় এমন ফোয়ারা তৈরি করা হয়েছিল। প্রায় একই ধরনের ফোয়ারা দেখা গিয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব দুই হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতায় এবং ক্রিটে। এরপর যুগে যুগে নানা ধারা অবলম্বন করে বিভিন্ন ধরনের ফোয়ারার দেখা আমরা পেয়েছি। তার মধ্যে অসংখ্য ফোয়ারা রয়েছে যা অত্যন্ত চমকপ্রদ ও দৃষ্টিনন্দন।
চলুন জেনে নেয়া যাক, বিশ্বের অসাধারণ কয়েকটি ওয়াটার ফাউন্টেইন বা পানির ফোয়ারা সম্পর্কে।

১. বেলাজিও ওয়াটার ফাউন্টেইন, লাস ভেগাস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র:

বেলাজিও ওয়াটার ফাউন্টেইন; source: 10mosttoday.com

বেলাজিও ওয়াটার ফাউন্টেইনটি বেলাজিও হোটেলের সামনে কৃত্রিম উপায়ে তৈরি একটি পানির ফোয়ারা। এই ফোয়ারাটিতে অসংখ্য বাতির ব্যবহার করা হয়েছে। আলো ও জলের নাচের ব্যবস্থা রয়েছে এই ফোয়ারাটিতে। এটি ‘জল পারফর্মড’ বিশিষ্ট একটি ফোয়ারা।
এখানকার জলের নৃত্যের ব্যবস্থা বেলাজিও হোটেলের পাশাপাশি হোটেলের বাইরের রাস্তা থেকেও দেখা যায়। দুপুর এবং বিকেলের মাঝামাঝি সময়ে জলের নৃত্যের শো’টি দেখানো হয় প্রায় ৩০ মিনিটের মতো সময় ধরে। এরপর সন্ধ্যা থেকে মাঝরাত অবধি ১৫ মিনিট পর পর এই জলের নাচের শো দেখা যায়। জলের নাচের দৃশ্যটি বিভিন্ন গানের ছোট ছোট অংশের উপর সাজানো।
যেসব সঙ্গীত প্রায়ই শোনা যায় জলের নৃত্যের সময়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ‘টাইম টু সে গুড বাই’, ‘ইয়্যুর সং’, ‘ভিভা ল্যাস ভেগাস’, ‘লাক বি আ লেডি’ এবং ‘মাই হার্ট উইল গো অন’। সুন্দর সব গানের সঙ্গে অসাধারণ এই জল নৃত্য দেখতে সেসময়গুলোতে অসংখ্য মানুষ ভিড় জমায় হোটেলের সামনে।

২. ত্রেভি ফাউন্টেইন, রোম, ইতালি:

ত্রেভি ফোয়ারা; source: wikimedia.com

ইতালির রাজধানী রোমের ত্রেভিতে অবস্থিত একটি ফোয়ারা। অঞ্চলের নাম অনুসারে ফোয়ারাটির নামকরণ করা হয় ‘ত্রেভি ফোয়ারা’। এটি রোম শহরের বৃহত্তম বারোক ফোয়ারা। আনুমানিক ১৬০০ সালের দিকে যে শৈল্পিক রেনেসাঁ শুরু হয়েছিল তার অংশ এই ফোয়ারাটি।
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফোয়ারাগুলোর একটি হিসেবে খ্যাত এই ত্রেভি ফোয়ারা। এই ফোয়ারাটি ২৬.৩ মিটার (৮৬ ফুট) উচ্চ এবং ৪৯.১৫ মিটার (১৬১.৩ ফুট) প্রশস্ত। স্থানীয় লোককাহিনী অনুযায়ী কথিত আছে, কেউ যদি এই ফোয়ারায় পয়সা ফেলে তবে সে আবার কোনো না কোনোদিন রোমে ফিরে আসবে। এই ফোয়ারাটি রোমের একটি বিখ্যাত পর্যটক আকর্ষণ।

৩. দ্য ম্যাজিক ফাউন্টেইন অব মন্টজুইক, বার্সেলোনা, স্পেন:

মন্টজুইকের জাদুর ফোয়ারা; source: 10mosttoday.com

বার্সেলোনার নিকটবর্তী মন্টজুইকে অবস্থিত এই পানির ফোয়ারাটিকে বলা হয় ‘দ্য ম্যাজিক ফাউন্টেইন অব মন্টজুইক’ বা ‘মন্টজুইকের জাদুর ফোয়ারা’। ১৯২৯ সালে বার্সেলোনার আন্তর্জাতিক উদ্ভাসনের রেশ ধরে এই চমৎকার ফোয়ারাটি নির্মাণ করা হয়। সেসময় এই ফোয়ারাটিতে শুধুমাত্র আলোর নানা রকম দৃশ্য দেখাতো।
১৯৮০-এর দশকে এই ফোয়ারাটিতে আলোর সঙ্গে সঙ্গীতও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল এবং মন্টজুইকে অনুষ্ঠিত ২০০০ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের পূর্বে ফোয়ারাটি সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত করা হয়েছিল। আলো ও সঙ্গীতের মিশেলে আয়োজিত এই ফোয়ারার জল নৃত্যের শো দেখতে সেসময় ফোয়ারাটির আশেপাশের পুরো এলাকা জুড়ে দেখা যায় ক্যামেরা হাতে হাজার হাজার পর্যটকদের ভিড়।

৪. ফাউন্টেইন অব ওয়েলথ, সানতেক সিটি, সিঙ্গাপুর:

সম্পদের ফোয়ারা; source: 10mosttoday.com

ফাউন্টেইন অব ওয়েলথ বা সম্পদের ফোয়ারা নামক পানির ফোয়ারাটি সিঙ্গাপুরের সানতেক সিটির সবচেয়ে বড় শপিং মলের ভেতরে অবস্থিত। গিনেস বুক অব রেকর্ডস অনুযায়ী ফাউন্টেইন অব ওয়েলথ ফোয়ারাটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় পানির ফোয়ারা।
দিনের নির্দিষ্ট একটি সময়ে, পানির ফোয়ারার ঝর্ণা বন্ধ হয়ে যায় এবং বড় ফোয়ারাটির মাঝখানে অবস্থিত ছোট ফোয়ারাটির কাছাকাছি ভ্রমণকারীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
এসময় ভ্রমণকারীরা ফোয়ারাটি থেকে কয়েন সংগ্রহ করার সুযোগ পান। সেখানকার লোকেদের ভাষ্যমতে জানা যায়, মূলত এই ফোয়ারাটি থেকে কয়েন সংগ্রহ করা হয় সৌভাগ্যের জন্য। রাতে ফোয়ারাটি ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ১ ঘণ্টা সময়ব্যাপী লেজারের পারফরম্যান্স ও এর পাশাপাশি লাইভ গান এবং লেজার মেসেজের প্রতিলিপি দেখায়।

৫. আর্চিবল্ড ফাউন্টেইন, সিডনী, অস্ট্রেলিয়া:

জে. এফ আর্চিবল্ড স্মৃতি ফোয়ারা; source: 10mosttoday.com

সিডনীর আর্চিবল্ড ফাউন্টেইনটি ‘জে. এফ আর্চিবল্ড মেমোরিয়াল’ অর্থাৎ জে. এফ আর্চিবল্ড স্মৃতি ফোয়ারা হিসেবেও পরিচিত। অস্ট্রেলিয়ার মানুষদের জন্য নির্মিত সেরা ও সবচেয়ে সুন্দর পানির ফোয়ারা হিসেবে আর্চিবল্ড ফোয়ারাটিকে গণ্য করা হয়। ১৯৩২ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সের সংগঠনের স্মরণে এই স্মৃতি ফোয়ারাটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
এই সুন্দর ফোয়ারাটির নকশা প্রাচীন গ্রিক এবং রোমান শিল্প ও সাহিত্য থেকে অনুপ্রাণিত। ফোয়ারাটিতে ব্রোঞ্জের গ্রীক সূর্যদেব অ্যাপোলোর চিত্র বর্ণনা করা হয়েছে ও ফোয়ারাটির চারপাশ ঘিরে রয়েছে আরো অসংখ্য পৌরাণিক প্রতিমা ও পশুর চিত্র।

৬. টানেল অব সারপ্রাইজ, লিমা, পেরু:

পেরুর আশ্চর্যদায়ক ফোয়ারা; source: edifica.com

পেরুর লিমায় অবস্থিত ঐতিহাসিক একটি পার্কে এই টানেল অব সারপ্রাইজ ফোয়ারাটি নির্মাণ করা হয়। অসংখ্য পানির ফোয়ারা মিলে এই ফোয়ারাটি। এই ফোয়ারাটি নির্মাণে ব্যয় করা হয় প্রায় ১৩ মিলিয়ন ডলার। এই ফোয়ারাগুলোর মাঝ থেকে রাস্তা রয়েছে। এই রাস্তা দিয়ে আপনি চলাচল করতে পারবেন।
মূলত রাস্তাটি চলার জন্যই তৈরি করা। মজার ব্যাপার হচ্ছে অসাধারণ এই ফোয়ারাগুলো দেখলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি সম্পর্কে আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে! কারণ ফোয়ারাগুলোর মাঝের রাস্তা দিয়ে যখন হেঁটে যাবেন তখন আপনার গায়ে একফোঁটা পানিও পড়বে না।
ফিচার ইমেজ- picssr.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

টাইগার নেস্ট ট্রেকিং আর পারো ভ্রমণের আদ্যোপান্ত

কাশ্মীরের রোমাঞ্চকর যোজিলা পাস