বাংলাদেশের কয়েকটি নয়নাভিরাম সমুদ্র সৈকত

সমুদ্র, সকলের কাছেই গভীর আবেগের এক জায়গা। শুধু কি ভ্রমণ পিপাসুদেরই টানে সমুদ্র? উত্তরটা ‘না’ হওয়ারই কথা। আসলেই তো, শুধু ভ্রমণ পিপাসুদেরই নয়, সমুদ্র টানে প্রত্যেককেই।
একবার সমুদ্রের জলে পা ভিজিয়ে আনমনে ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে নিজেকে ভুলে যাওয়ার ইচ্ছে হয়তো একবার হলেও উঁকি দিয়েছে সকলের মনে। সমুদ্রের জলে সূর্যটাকে তলিয়ে যাওয়ার অপূর্ব দৃশ্যের দেখা পেতেও হয়তো ইচ্ছে জেগেছে। প্রিয় মানুষটার হাত ধরে সমুদ্রের তীরের সাদা-কালো বালুর উপর পা ফেলে, সমুদ্রের জলে একসাথে পা ভেজানোর ইচ্ছে জাগেনি এমন মানুষের সংখ্যাটাও নিশ্চয়ই হাতে গোনা হবে।
বাংলাদেশে রয়েছে অসংখ্য সমুদ্র সৈকত। এটি প্রকৃতির পক্ষ থেকে বড় এক আশীর্বাদ। এর মানে বাংলাদেশে সমুদ্র নিয়ে আপনার জল্পনাকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পাচ্ছেন অসংখ্য অপশন। কারণ, একেকটি সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য একেক রকম। প্রত্যেকটি সমুদ্র সৈকতই সৌন্দর্য ও ভ্রমণ সুবিধার দিক থেকে একটি অন্যটির থেকে আলাদা।
চলুন জেনে নেয়া যাক বাংলাদেশের সুন্দর কয়েকটি সমুদ্র সৈকত সম্পর্কে।

হিমছড়ি সমুদ্র সৈকত:

সমুদ্রে পাখিদের ঝাঁক; source: ghurtechai.com

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে রয়েছে এই আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকত। পাহাড়ের কোলঘেঁষা এই সমুদ্র সৈকতটির নাম হিমছড়ি সমুদ্র সৈকত। এখানকার সমুদ্র সৈকতটি কক্সবাজারের চেয়ে অপেক্ষাকৃত নির্জন। এর সৌন্দর্যও কোনো অংশে কম নয়। কক্সবাজার থেকে এ সৈকতে যাওয়ার পথটিও বেশ আকর্ষণীয়।
সৈকত লাগোয়া আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড় এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। এ পাহাড়ে উঠলে চোখের সামনে ভেসে উঠবে নীল দিগন্তে হারিয়ে যাওয়া বিশাল সমুদ্র। হিমছড়ির পাহাড়ের হিমশীতল ঝর্ণাগুলো এ সময় স্রোতস্বিনী হয়ে ওঠে। পাহাড়ি ঝর্ণাগুলো বেশ আকর্ষণীয়। কক্সবাজার সৈকত থেকে সব সময়ই খোলা জিপ ছাড়ে হিমছড়ির উদ্দেশ্যে।
অসাধারণ এই সমুদ্র সৈকতটি ভ্রমণ করতে চাইলে বছরের যেকোনো সময়ই যেতে পারেন। প্রায় সারা বছর জুড়েই এই সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের আনাগোনা চলতে থাকে। চারপাশের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি হারিয়ে যাবেন সমুদ্রের বিশালতায়। উপভোগ করবেন ঢেউয়ে ঢেউয়ে আপনার পা ছুঁয়ে যাওয়া সমুদ্রের জল।

সোনার চর সৈকত:

সোনার চর সমুদ্র সৈকত; source: http://www.amaderbarisal.com

পটুয়াখালী জেলা সদর থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার এবং গলাচিপা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে সাগরের মাঝ বরাবরে এর অবস্থান। বিপদসঙ্কুল দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা উপেক্ষা করে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করতে অনেকেই ছুটে আসে সোনার চর সমুদ্র সৈকতে। এ স্থানে দেখা পাবেন সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের। দেখবেন এখানকার জেলেদের মাছ ধরা।
এখানকার প্রায় ১০ কিলোমিটার লম্বা বিশাল সমুদ্র সৈকত জুড়ে কোটি কোটি লাল কাঁকড়ার বিচরণ পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। দেখে মনে হবে যেন লাল কাঁকড়ার ভিন্ন এক জগতে চলে এসেছেন। গোটা সৈকত জুড়েই যেন বিছিয়ে রাখা হয়েছে লাল গালিচা। পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলা সদর থেকে সড়কপথে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে পানপট্টি লঞ্চঘাট। সে জায়গা থেকে কিছুটা সামনে এগিয়ে গেলেই আগুনমুখা মোহনা।
ট্রলার কিংবা লঞ্চযোগে আগুনমুখা মোহনা থেকে ঘণ্টা তিনেক এগুলেই চোখে পড়বে মায়াবী দ্বীপচর তাপসী। তাপসী দ্বীপচরের বাঁকে পৌঁছাতেই পাবেন সোনারচরের হাতছানি। তাপসী থেকে ৩০ মিনিটের পথ সামনে এগিয়ে গেলেই সোনারচর। প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অনন্য সুন্দর চোখ জুড়ানো সমুদ্র সৈকত। এ জায়গায় একই সাথে উপভোগ করতে পারবেন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য।

ধলাঘাটা সমুদ্র সৈকত:

সৈকতে লাল কাঁকড়া; source: www.pinterest.com

বদরখালী থেকে ট্রলারে করে ২ ঘণ্টার যাত্রা পথ মহেশখালীর ধলাঘাটা। অপূর্ব সুন্দর এক জায়গা এটি। সৈকতের দক্ষিণে আদিগন্ত সমুদ্র৷ উত্তর পাশে নারকেলের সারি আর জেলে বসতি৷ বাংলাদেশের শেষ মাথা এটি, কিছুদূর গেলেই বর্ডার।
এ জায়গাটিতে এসে চোখ জুড়িয়ে যাবে আপনার। হাঁসের চর, শত শত বক, হাজার হাজার লাল কাঁকড়ার ছুটে চলা সব মিলিয়ে এক নয়নাভিরাম দৃশ্য। এ জায়গাটিতে এলে চোখে পড়বে ধলাঘাটের মায়া মেশানো আরও একটি দৃশ্য – সূর্যাস্ত। ধলাঘাট সমুদ্র সৈকতের মূল আকর্ষণ হলো লাখ লাখ লাল কাঁকড়া আর ২ ধরনের সৈকত। একটি সম্পূর্ণ সাদা বালির সৈকত আর নারিকেল গাছ (এই সাদা বালির সৈকত মনে হয় আমাদের দেশে একমাত্র ধলাঘাটায় আছে)। আর দ্বিতীয়টি, প্রবাল পাথরের সৈকত।

কুতুবদিয়া সমুদ্র সৈকত:

কুতুবদিয়া সমুদ্র সৈকত; source: http://kutubdia-blog.blogspot.com

কুতুবদিয়া উপজেলার পশ্চিম পার্শ্বে উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার সমুদ্র সৈকত, নাম কুতুবদিয়া সমুদ্র সৈকত। এই সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য যে কাউকে আকৃষ্ট করবে। সৈকতের সারি সারি ঝাউবাগান আর সমুদ্রের ঢেউয়ের নয়নাভিরাম দৃশ্যের মাঝে যে কেউই খুব সহজে হারিয়ে যাবে। বিশেষ করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রেমী ও ভ্রমণ পিপাসু মানুষেরা সহজেই আকৃষ্ট হবেন।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটলে এ সমুদ্র সৈকতটিও হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। কুতুবদিয়া সমুদ্র সৈকত এবং এতে বেড়ে ওঠা বিভিন্ন আকৃতির ঝাউগাছের সারি সত্যিই যে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে যথেষ্ট।

কাট্টলী বা সাগরিকা সৈকত:

কাট্টলী সমুদ্র সৈকত; source: http://bdtravelnews.com

চট্টগ্রাম শহর থেকে কিছুটা দূরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে আকর্ষণীয় এক সমুদ্র সৈকত। অসাধারণ এই সমুদ্র সৈকতটির নাম কাট্টলী সমুদ্র সৈকত। পাহাড়তলী থানার দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডে অবস্থিত এই সমুদ্র সৈকতটি। কাট্টলী সমুদ্র সৈকতটি অনেকের কাছেই অজানা। এই সৈকতটির আরেকটি নাম হলো ‘জেলেপাড়া সমুদ্র সৈকত’। এই নামটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত, সেখানকার সকলে কাট্টলী সমুদ্র সৈকতের চেয়ে জেলেপাড়া সমুদ্র সৈকত নামেই ভালো চেনে।
একদিকে সমুদ্র সৈকত আর অন্যদিকে গ্রামীণ পরিবেশের এমন মেলবন্ধন অন্য কোনো সৈকতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। চট্টগ্রাম শহর থেকে টোল সড়ক ধরে সহজেই পৌঁছানো যায় জায়গাটিতে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের একমাত্র আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু ‘জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম’এর পাশ দিয়েও এ সৈকতে আসা যায়। এ জায়গাটির আরেক নাম সাগরিকা সমুদ্র সৈকত।
ফিচার ইমেজ- kuakatatours.com

Loading...

One Comment

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গোধূলি বেলায় আগ্রার তাজমহলে একদিন

ইটাখোলা মুড়া: ধ্যানী বুদ্ধ অক্ষোভ্য-অমিতাভ মূর্তি সম্বলিত মন্দির