বাংলাদেশের মনোমুগ্ধকর কয়েকটি পাহাড় কথন

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ এই বাংলাদেশ। সবুজ শ্যামল এই দেশের বুকে আছে অসংখ্য নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র, ঝর্ণা, বন, খাল-বিল ও আরো অসংখ্য আকর্ষণ। এই দেশের বুকে মাটি আঁকড়ে বৃক্ষের মতো মাথা তুলে, আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য পাহাড়।

উচ্চতায় যে যেমনই হোক, সব পাহাড়ের চূড়াতেই মেঘ জমে। তৈরি হয় এক স্বর্গীয় সৌন্দর্যের দৃশ্য। পাহাড় জুড়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেড়ে ওঠে নাম জানা, না জানা কত কত গাছপালা, গুল্মলতা। তৈরি হয় আরো এক ভিন্ন সৌন্দর্য। সেসব সৌন্দর্য ও পাহাড়ের চূড়ায় জমা মেঘের খেলা দেখতে কিংবা পাহাড় আরোহণ করে সেই মেঘ ছুঁয়ে দেখতে কার না ইচ্ছে করবে! আর রোমাঞ্চ প্রিয় ভ্রমণকারীদের কাছে তো এটি বিশাল এক আকর্ষণ।
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য পাহাড় পর্বত। একেকটি পাহাড়ের স্থান, নাম, উচ্চতা, আকৃতিতে যেমন ভিন্নতা তেমনই ভিন্নতা সৌন্দর্যে। চলুন জেনে নেয়া যাক বাংলাদেশের মনোমুগ্ধকর কয়েকটি পাহাড় সম্পর্কে, যাদের সৌন্দর্যে হারিয়ে যেতে আপনার মন্দ লাগবে না।

গারো পাহাড়:

গারো পাহাড়; source: csbnews24.com

জামালপুর জেলা সদর থেকে ৩৮ কিলোমিটার উত্তরে বকশীগঞ্জ উপজেলা। বকশীগঞ্জ সদর থেকে পাকা রাস্তায় ১২ কিলোমিটার উত্তরে এগিয়ে গেলেই ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত। সীমান্ত ঘেঁষে প্রায় ১০ হাজার একর জায়গা জুড়ে বিশাল পাহাড়ি এলাকা। এ জায়গাতেই অবস্থিত সুন্দর গারো পাহাড়।
ওপাশে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা জেলা আর এ পাশে বাংলাদেশের জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ। সীমান্ত ঘেঁষা বকশীগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছবির মতো গারো পাহাড়ের সারি। তার ভেতর গারো আদিবাসীদের পাহাড়ি গ্রাম, বনভূমি, পাহাড়-টিলা, পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে অজস্র ছোটবড় স্বচ্ছ ঝর্ণা ধারা, পাখির কলকাকলি আর দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ সব মিলিয়ে যেন এক স্বর্গীয় দৃশ্য। পাশেই আছে লাউচাপড়া পিকনিক স্পট। ভ্রমণ প্রিয় যারা প্রকৃতির এই মায়াবী ডাকে ছুটে আসে গারো পাহাড়ের উদ্দেশ্যে, তাদের জন্য পিকনিক স্পটটি সুবিধাজনক।

আলু টিলা পাহাড়:

আলু টিলা পাহাড়ের গুহা; source: wordpress.com

বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা উপজেলায় মূল শহর হতে ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে সমুদ্র সমতল হতে ৩,০০০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট আলু টিলা পাহাড়। এই পাহাড়টি বেশ জনপ্রিয় এক জায়গা। পাহাড়টির মূল আকর্ষণ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত অসাধারণ এক গুহা। স্থানীয়রা এই গুহাটিকে বলে থাকে ‘মাতাই হাকড়’ বা ‘দেবতার গুহা’। এটি খাগড়াছড়ির একটি নামকরা পর্যটন কেন্দ্র।
এই গুহাটি খুবই অন্ধকার ও শীতল। কোনো প্রকার সূর্যের আলো প্রবেশ করে না বলে মশাল নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়। গুহাটি এই পাহাড়ের প্রতি পর্যটকদের অধিক আকৃষ্ট করে। স্থানীয়রা এই পাহাড় ও পাহাড়ের গুহাটিকে একটি অত্যন্ত পবিত্র স্থান মনে করে থাকেন। আলু টিলা পাহাড় থেকে পুরো খাগড়াছড়ি শহর দেখা যায়। পাহাড়ের চূড়া থেকে পুরো শহরটিকে বেশ ছোট মনে হয়।
এই পাহাড়টির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পাহাড়ি স্রোতস্বিনী চেংগী। মাথার উপর মেঘ আর আকাশ। পাহাড়ের পাদদেশে আলুটিলা গুহার মুখ। গুহাটি প্রায় ১০০ মিটারের মতো লম্বা। এটি পর্যটকদের একটি রোমাঞ্চকর যাত্রার সুযোগ করে দেয়। তাই আলু টিলা পাহাড়টি ভ্রমণ করতে এলে পাহাড় আরোহণ ও গুহাটি দেখার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হবে, পাশাপাশি উপভোগ করতে পারবেন প্রকৃতির অসাধারণ সৌন্দর্য।

লালমাই পাহাড়:

লালমাই পাহাড়; source: dailynayadiganta.com

কুমিল্লার ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক লালমাই পাহাড়। কুমিল্লা সদর, সদর দক্ষিণ ও বরুড়া উপজেলা জুড়ে এই লালমাই পাহাড়টি অবস্থিত। এটি উত্তর-দক্ষিণে ১১ মাইল লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে ২ মাইল চওড়া। এ পাহাড়ের মাটি লাল হওয়ায় এর নাম লালমাই। এ পাহাড়ের সর্বোচ্চ উচ্চতা ৫০ ফুট।
লালমাইয়ের পাশেই রয়েছে নূরজাহান ইকো পার্ক, রাজেশপুর ফরেস্ট, সম্রাট আওরঙ্গজেবের ভাই শাহজাদা সুজার নাম অনুসারে নির্মিত শাহ সুজা বাদশাহ্ মসজিদ, রাজা ধর্মমানিক্যের খননকৃত ২৩.১৮ একর আয়তনের ধর্মসাগর, ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি, রানীর বাংলো, ত্রিশ আউলিয়ার মাজার, নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃত নবাব ফয়জুন্নেছার বাড়ি, পাশেই রয়েছে কুমিল্লার সুখ-দুঃখ গাঁথা গোমতী নদী।
এছাড়াও রয়েছে কুমিল্লা পৌর শিশু পার্ক, চিড়িয়াখানা ও ঐতিহ্যবাহী কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ। তার মানে এ পাহাড়টি ভ্রমণে এলে একই সাথে আরো অসংখ্য জায়গা ভ্রমণ করার সুযোগ থাকছে। পাহাড়টির সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি উপভোগ করতে পারবেন ভিন্ন আরো অনেক বিষয়।

কুলাউড়া পাহাড়:

কুলাউড়া পাহাড়; source: tourist.com

পাহাড়টির অবস্থান সিলেটের মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার কার্মধা ইউনিয়নের বেগুনছড়া পুঞ্জিতে। এটা মূলত খাসিয়াদের গ্রাম। খাসিয়ারা তাদের গ্রামকে ‘পুঞ্জি’ বলে। কালাপাহাড় বা কুলাউড়া পাহাড় মূলত সিলেট জেলার সব থেকে উঁচু পাহাড়। এ পাহাড়টির উচ্চতা ১,০৯৮ ফুট।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকির বেশিরভাগ অংশ কুলাউড়ার অধীনে। এছাড়াও লংলিয়া, গোয়ালজোর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য হাওরও এ জায়গাতেই অবস্থিত। ‘মনু’ সবচেয়ে বড় ও প্রধান নদী এখানকার। হাওর আর নদী ছাড়া এই অঞ্চলের বেশিরভাগ স্থানই সমতল। তাছাড়া উপজেলার ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকা জুড়ে পাহাড়ি বন বিস্তৃত। তাই কুলাউড়া পাহাড় ভ্রমণকালে পাহাড়ের পাশাপাশি অবলোকন করার সুযোগ পাবেন নদী, বন ও হাওরের অসাধারণ সৌন্দর্য।

দুমলং পাহাড়:

দুমলং পাহাড়; source: adarbepari.com

বাংলাদেশের রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় দুমলং পর্বত অবস্থিত। এটি রাংতলং পর্বতশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ও রাইংক্ষ্যং হ্রদের পার্শ্ববর্তী প্রাংজং পাড়ার কাছে এর অবস্থান। নেচার অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব নামে ঢাকার একটি বেসরকারি ভ্রমণ সংগঠন জারমিন জি.পি.এস. (গোবাল পজিশনিং সিস্টেম) এর সাহায্যে পর্বতটির উচ্চতা পরিমাপ করে।
তারা এই পর্বতটিকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত বলে দাবী করে। তাদের হিসাব অনুসারে পর্বতটির উচ্চতা ৩,৩১৪ ফুট। দুমলং বাংলাদেশের একটি পর্বতশৃঙ্গ। এই পর্বতটি আপনাকে দেবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি এক রোমাঞ্চকর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ। পাহাড়টিকে আরোহণ করা হবে জীবনের অবিস্মরণীয় এক ঘটনা।
ফিচার ইমেজ- wikimedia.com

Loading...

3 Comments

Leave a Reply
  1. অসাধারণ লেখা। আপনার লেখাগুলো পরে ঘুরে আসা জায়গাগুলোতে আবারো ঘুরতে যেতে ইচ্ছে হয়। অসাধারণ লেখা…

  2. গারো পাহাড় এর post টা ঠিক করেন এটির তিনভাগের একভাগ জামালপুর জেলার মাঝে আর বাকি দুই ভাগ রয়েছে শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি ও ঝিনাইগাতি উপজেলায়

  3. ফিচারে যে ছবিটা ব্যবহার করেছেন, সেটা কোথায় এবং ডিটেইল উল্লেখ করলে ভালো হতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

খুলনার অন্যতম আকর্ষণ করমজল পর্যটন কেন্দ্র

রসের খোঁজে অনাবৃষ্টির জনপদ লালপুরে