একদিনে সীতাকুণ্ডের সহস্রধারা-২ ও গুলিয়াখালী বীচ ভ্রমণের খুঁটিনাটি

প্রকৃতিপ্রেমী মানুষদের জন্য সীতাকুণ্ডের মায়া কাটানো কখনো সম্ভব না। আর এই মায়ার কাছে আমরা ধরা দিয়েছি বহুবার। দেশের প্রায় ২০% ঝর্ণা অবস্থা এই সীতাকুণ্ডে। বান্দরবানের পর এত ট্রেইল আর ঝর্ণা দেশের আর কোথাযও দেখতে পাওয়া যায় না। এদের মধ্যে খৈয়াছড়া ট্রেইল, নাপিত্তাছড়া ট্রেইল, সুপ্তধারা- সহস্রধারা- ১ ট্রেইল, সহস্রধারা- ২ (মূল সহস্রধারা) ট্রেইল, কমলদহ ট্রেইল, ঝরঝরি ট্রেইল, বাড়বকুণ্ড ট্রেইল, হরিণমারা-হাঁটুভাঙ্গা-সর্পপ্রপাত ট্রেইল, সোনাইছড়ি ট্রেইল, বোয়ালিয়া- বাউশ্যা – উঠান-অমরমাণিক্য ট্রেইল বেশ বিখ্যাত।

এছাড়াও এখানে আছে সহস্রধারা লেক, বাঁশবাড়িয়া বীচ, গুলিয়াখালী বীচ, চন্দ্রনাথ পাহাড় ও মন্দির। সর্বশেষ একদিনের ট্যুরে আমাদের গন্তব্য ছিল সহস্রধারা-২ ও গুলিয়াখালী বীচে। আজ এই ট্যুরের খুঁটিনাটি বিশদভাবে বলার চেষ্টা করব।

সহস্রধারা-২; Source: Shah Mohammed Sharif Ullah

সহস্রধারা- ২ ট্রেইল

সহস্রধারা-১ নামে পরিচিত ঝর্ণাটি সীতাকুণ্ড ইকোপার্কে অবস্থিত। তবে মূল সহস্রধারা ঝর্ণা বলতে সহস্রধারা-২ ঝর্ণাটিকেই বোঝায়। মোটামুটি পরিচিত ও সীতাকুণ্ডের বাকি সব ট্রেইলের চেয়ে সহজতম ট্রেইল এটি। সহস্রধারা-২ ঝর্ণা ছাড়াও এই ট্রেইলে পাবেন সহস্রধারা লেক, বুদবুদকুণ্ড, পুরনো মন্দির।

সবুজের স্বর্গভূমি, পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত স্বচ্ছ পানির সহস্রধারা লেকটি অসাধারণ। চাইলে সেখানে নৌকা দিয়ে লেকের মাঝখানে গিয়ে নির্মল বাতাস আর লেকের সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারেন। পাথুরে পাহাড়ে ঘেরা সহস্রধারা-২ ঝর্ণাটি অনেক উঁচু।

যেভাবে যাবেন

রাতে ঢাকার কমলাপুর অথবা যেকোনো বাসস্ট্যান্ড থেকে চট্টগ্রামগামী বাসে উঠে সীতাকুণ্ড বাজারের আগে ছোট দারোগারহাট নামতে হবে। সুপারভাইজারকে বলে রাখবেন যেন জায়গামতো নামিয়ে দেয়। ভাড়া ৪৮০ টাকা (ননএসি)।

ট্রেনে যেতে চাইলে রাত ১০ঃ৩০টার চট্টগ্রাম মেইল ট্রেনে করে সীতাকুণ্ড স্টেশনে নেমে যেতে হবে। ভাড়া ১১০ টাকা। এখানে বলে রাখা ভালো চট্টগ্রাম মেইল ট্রেন সম্পূর্ণ লোকাল। তাই জার্নিটা আরামদায়ক হবে না। স্টেশন থেকে সিএনজি করে ছোট দারোগারহাট। 

চট্টগ্রাম শহর থেকে যেতে চাইলে প্রথমে এ কে খান মোড়ে আসতে হবে। সেখান থেকে ঢাকাগামী অথবা ফেনীগামী বাসে করে সীতাকুণ্ড বাজারের পরে ছোট দারোগারহাট নামতে হবে। ভাড়া ৩০-৪০ টাকা।

সহস্রধারা লেক; Source: Nazmul Hasan

ছোট দারোগারহাট থেকে সিএনজি নিয়ে চলে যাবেন সহস্রধারা লেকে। রাস্তাটা ভাঙা ও উঁচুনিচু। আদর্শপাড়া জামে মসজিদের সামনে গিয়ে সিএনজি দিয়ে আর যাওয়া যায় না। এখানে নেমে যেতে হবে। ভাড়া জনপ্রতি ১৫ টাকা। এখান থেকে ২০-২৫ মিনিট হাঁটার পথ। এরপরই দেখতে পাবেন সহস্রধারা লেকে ওঠার জন্য সিঁড়িপথ। 

অথবা আপনি চাইলে ছোট দারোগারহাট থেকে সহস্রধারা লেক পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই হেঁটে হেঁটে যেতে পারেন। এতে আশেপাশের সবুজ ও সুন্দর প্রকৃতির সৌন্দর্য চোখে পড়বে। সিঁড়িপথ দিয়ে উপরে উঠে এলেই দেখতে পাবেন নয়নাভিরাম অপরূপা সহস্রধারা লেক।

স্লুইস গেট; Source: Nazmul Hasan

সহস্রধারা লেকের একদম কাছেই বুদবুদকুণ্ড আর পুরনো মন্দির। চাইলে সেখানে একবার ঢুঁ মেরে আসতে পারেন। লেক থেকে নৌকা ভাড়া করে সহস্রধারা-২ ঝর্ণায় যাওয়া যায়। জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়া। অথবা বাম পাশের রাস্তা ধরে ১০-১৫ মিনিট হেঁটে পৌঁছে যাবেন সহস্রধারা-২ ঝর্ণায়।

আমার মতে নৌকায় না গিয়ে হেঁটে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এখানে বলে রাখি লেকের ডান পাশে রয়েছে সুন্দর বাঁধ ও স্লুইস গেট। ছবি তোলার জন্য একদম আদর্শ জায়গাটিতে কিছুক্ষণ সময় কাটাতে ভুলবেন না। 

সহস্রধারা ঝর্ণার আগের বামপাশে একটি ঝিরিপথ দেখতে পাবেন যেটি লেকে এসে মিশেছে। সেই ঝিরিপথ ধরে আরও কিছুক্ষণ হাঁটলে আরেকটি ঝর্ণার দেখা মিলবে।

সহস্রধারা-২ ঝর্ণার অবিরাম ধারা; Source: Shah Mohammed Sharif Ullah

সীতাকুন্ডের রেঞ্জে সর্বোচ্চ উচ্চতা থেকে পানি পতিত হয় এই সহস্রধারা-২ ঝর্ণা থেকে। সারা বছরই এই ঝর্ণায় কম বেশি পানি থাকলেও বর্ষায় এই ঝর্ণা ভয়ঙ্কর সুন্দর রূপ ধারণ করে। বিশাল শক্তিতে প্রবাহিত পানি প্রবাহের নিচে গেলে এক মুহূর্তে নিজেকে প্রকৃতির কাছে অতি নগণ্য মনে হবে।

বিশাল এই ধরনীতে কতটা ক্ষুদ্র অস্তিত্বের অধিকারী আমরা সেটা মনের গহীনে বোধ হয়ে মন খারাপ হতে পারে। এই ঝর্ণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সীতাকুণ্ডের অন্যান্য ঝর্ণার মতো এখানে ময়লা আবর্জনা তেমন দেখা যায় না।

সহস্রধারা-২ থেকে গুলিয়াখালী বীচ

যেভাবে গিয়েছিলেন ঠিক সেভাবে ছোট দারোগারহাট চলে আসুন। সহস্রধারা লেক থেকে সিনএনজি না পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই যাওয়ার সময় সিএনজিওয়ালার নাম্বার রেখে দিন। ছোট দারোগারহাট থেকে সিএনজি করে সীতাকুণ্ড বাজার যেতে হবে। ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা।

সীতাকুণ্ড বাজারে কোনো হোটেল থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে নিন। ভেজ আইটেম খেতে চাইলে গোবিন্দ হোটেল নামে বিখ্যাত হোটেলটিতে খেতে পারেন। সীতাকুণ্ড বাজারের সিএনজি স্ট্যান্ড থেকে গুলিয়াখালী বীচে সিএনজি ঠিক করতে হবে। ভাড়া জনপ্রতি ২০ টাকা।

গুলিয়াখালী থেকে সীতাকুণ্ড পাহাড়ের দৃশ্য; Source: লেখক

গুলিয়াখালী বীচ সম্পর্কে বলতে গেলে যে শব্দগুলো মাথায় ভিড় করে, সেগুলো হলো সবুজ, শান্তি, মায়া, ভ্রম। সবুজ ঘাসের গালিচা বিছানো এরকম বীচ দ্বিতীয়টি আছে নাকি আমার জানা নেই। সিএনজি থেকে নেমে ১০-১৫ মিনিটের হালকা কাদাময় রাস্তায় হেঁটে পৌঁছে যাবেন সবুজের এই গালিচায়।

যেদিকেই তাকাবেন চারদিকে সবুজের গালিচা, মাঝে মাঝে এবড়োথেবড়ো গর্ত। এতটাই সুন্দর চারদিক, হা করে শুধু দেখতে থাকবেন প্রকৃতির এই অদ্ভুত সবুজ রূপ। ফটোগ্রাফির জন্য বীচটি স্বর্গস্বরূপ হওয়ায় প্রফেশনাল কিংবা শখের ফটোগ্রাফারদের আনাগোনা লেগেই থাকে। ইদানীংকালে অনেক নাটক ও সিনেমার শ্যুটিংও হয়েছে এখানে।

গুলিয়াখালী বীচের সবুজ গালিচা; Source: লেখক

সবুজ গালিচা দিয়ে হাঁটার সময় একটু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, মাঝে মাঝে গর্তগুলোতে পার হওয়ার জন্য গাছের গুঁড়ি দিয়ে অস্থায়ী ব্রীজ বানানো হয়েছে। অসাবধানতায় সেগুলো পার হতে গেলে কাদায় পড়ে গোসল করে উঠতে হবে।

এখানে দেখতে পাবেন ম্যানগ্রোভ বনের শ্বাসমূল, জোয়ারের সময় সমুদ্রে পানি অনেকটা কাছে চলে আসে। সবুজ গালিচা পার হয়েই সমুদ্রের চিরায়ত সেই অদম্য ঢেউ দেখতে পাবেন। তবে সমুদ্রের কাছের জায়গাটা বেশ কর্দমাক্ত ও পিচ্ছিল। তাই সমুদ্রের বেশি গভীরে না যাওয়াই ভালো।

গুলিয়াখালী বীচ; Source: লেখক

বিকেলটা বীচে কাটিয়ে সিএনজি নিয়ে চলে আসুন সীতাকুণ্ড বাজারে। বাসস্ট্যান্ড থেকে সন্ধ্যার বাসের টিকেট কেটে অপেক্ষা করুন আর ভাবতে থাকুন প্রকৃতির মায়ার ক্ষমতা, যে মায়াতে মানুষ একবার বশ হলে আর ছুটে আসা সম্ভব না। 

বিঃদ্রঃ প্রকৃতিকে ভালোবাসুন, তাকে রক্ষা করুন। কোনো প্রকার পচনশীল ও অপচনশীল ময়লা আবর্জনা ফেলে প্রকৃতির অপূরণীয় ক্ষতি করবেন না। ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট জায়গা না পেলে ব্যাগে সংরক্ষণ করুন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চট্টগ্রামে আড্ডাবাজি করার মতো কিছু জায়গা

যেভাবে ট্রাভেল জার্নাল লিখবেন