চন্দ্রনাথ মন্দির ও তার পাতালপুরীর অজানা রহস্য

সীতাকুণ্ড নামটির সাথেই জড়িয়ে আছে এর ইতিহাস। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ও ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, প্রাচীনকালে এখানে মহামুণি ভার্গব বসবাস করতেন। অযোদ্ধার রাজা দশরথের পুত্র রামচন্দ্র তার বনবাসের সময় এখানে এসেছিলেন। মহামুণি ভার্গব তারা আসবেন জানতে পেরে তাদের স্নানের জন্য তিনটি কুণ্ড সৃষ্টি করেন এবং রামচন্দ্রের এখানে ভ্রমণকালে তার স্ত্রী সীতা এই কুণ্ডে স্নান করেন। এই কারণেই এখানকার নাম ‘সীতাকুণ্ড’ বলে অনেকের ধারণা।

চট্টগ্রাম জেলার সর্বোচ্চ স্থান, চন্দ্রনাথ পাহাড়; Source: লেখক

এখানে আছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য ঐতিহাসিক তীর্থ স্থান চন্দ্রনাথ মন্দির, যা চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়োয় অবস্থিত। মূলত চন্দ্রনাথ মন্দির থেকেই এ পাহাড়ের নামকরণ চন্দ্রনাথ পাহাড় করা হয়েছে, যার অপর নাম সীতাকুণ্ড পাহাড়। সীতাকুণ্ড শহরের পূর্বে অবস্থিত চন্দ্রনাথ শৃঙ্গ প্রায় ১,১৫২ ফুট অথবা ৩৫০ মিটার উঁচু এবং চট্টগ্রাম জেলার সর্বোচ্চ স্থান।

ভ্রমণের নেশায় আসক্ত আমরা কজন সীতাকুণ্ডের কাছে ধরা দিয়েছি বারংবার। সর্বশেষ চন্দ্রনাথ মন্দির ঘুরে আসলাম। শুধু মন্দির পর্যন্তই শেষ নয়। এরপর আছে মন্দিরের আরও গহীনে উল্টো কালীবাড়ি নামে পরিচিত এক ভয়াল রহস্য, অত্যন্ত দুর্গম সে পথ। তবে আর দেরি কেন, শুরু করা যাক। 

চন্দ্রনাথ মন্দিরে যাবার গেট; Source: লেখক

ঢাকা-চন্দ্রনাথ মন্দির:

রাতে ঢাকার কমলাপুর অথবা যেকোনো বাসস্ট্যান্ড থেকে চট্টগ্রামগামী বাসে উঠে সীতাকুণ্ড বাজার নামতে হবে। ভাড়া ৪৮০ টাকা (ননএসি)। ট্রেনে যেতে চাইলে রাত ১০ঃ৩০-এ চট্টগ্রাম মেইল ট্রেনে করে সীতাকুণ্ড স্টেশনে নেমে যেতে হবে। ভাড়া ১১০ টাকা। এখানে বলে রাখা ভালো চট্টগ্রাম মেইল ট্রেন সম্পূর্ণ লোকাল। তাই জার্নিটা আরামদায়ক হবে না।

চট্টগ্রাম শহর থেকে যেতে চাইলে প্রথমে এ কে খান মোড়ে আসতে হবে। সেখান থেকে ঢাকাগামী অথবা সীতাকুণ্ডগামী বাসে করে সীতাকুণ্ড বাজারে নামতে হবে। ভাড়া ৩০-৪০ টাকা। 

যাবার পথে পাবেন এরকম ছোট ছোট অনেক মন্দির; Source: লেখক

হাইওয়ের পাশের সিঁড়িপথ দিয়ে নিচে নেমে সিএনজি নিয়ে চলে যেতে হবে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের গোড়ায়। ভাড়া জনপ্রতি ২০ টাকা। সেখানে নেমে একটু হাঁটলে চোখে পড়বে “শ্রী শ্রী চন্দ্রনাথ” লেখা বেশ পুরনো একটি গেট। সেখান থেকে মিনিট দশেক হেঁটে পৌঁছে যাবেন চন্দ্রনাথ মন্দিরে যাবার মূল সিঁড়িপথে।

এখানে বলে রাখি, সিএনজি থেকে নেমে সিঁড়িপথ পর্যন্ত যাবার পথে পাবেন অনেক পুরনো মন্দির। যেগুলোয় একবার করে হলেও ঢুঁ মেরে যাবেন। রাস্তায় এক বৃদ্ধ চাচা থেকে বাঁশের লাঠি নিতে ভুলবেন না যেন। লাঠির ভাড়া ১০ টাকা। যাওয়ার সময় আবার ফেরত দিয়ে যেতে হবে। 

চন্দ্রনাথ পাহড়ে উঠার মূল সিঁড়িপথ; Source: লেখক

এবার একটু থামুন, বড় করে দম নিন। কারণ আপনাকে প্রায় ২,২০০+ সিঁড়ি পার করে যেতে হবে চন্দ্রনাথ মন্দির। সিঁড়িগুলো যেমন ভাবছেন তেমন না, সাধারণ সিঁড়ির তিনটা ধাপের সমান হবে একেকটা সিঁড়ির ধাপ। কোনো কোনো জায়গায় এতটাই খাড়া সিঁড়ি যেন মনে হবে মই বেয়ে উঠছেন। আস্তে আস্তে ধীর পায়ে উপরে উঠুন। তাড়াহুড়ো করবেন না। কারণ একবার পড়ে গেলে সেখান থেকে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। 

মিনিট পনেরো সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পর একটি ছোট ঝর্ণা দেখতে পাবেন। যার দুই পাশে দুটি পথ যা উঠে গেছে একদম পাহাড়ের চূড়োয়। বাম পাশের পথ দিয়ে ওঠা সহজ। এবং ডান পাশের পথ দিয়ে নামা সহজ। তাই বাম পাশের পথ ধরে উপরে উঠতে থাকুন। এই রাস্তাটা সম্পূর্ণ পাহাড়ি পথ এবং কিছু ভাঙা সিঁড়ি রয়েছে। আর ডান পাশের পথটার প্রায় পুরোটাই সিঁড়িপথ যেটা দিয়ে ওঠা বেশ কঠিন। অনেকে এই পথ দিয়ে উপরে উঠতে গিয়ে অর্ধেক পথে ফিরে আসে। 

এবড়োথেবড়ো সিঁড়িপথ; Source: লেখক

তবে এত কঠিন পথ পাড়ি দিতে হলেও আশেপাশের সবুজে ঘেরা অকৃত্রিম মনোমুগ্ধকর দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করে যাবে। মাঝে মাঝে থেমে স্মৃতিসংরক্ষণ ও বিশ্রাম নেবার কথা ভুলবেন না। ব্যাগে যথেষ্ট পরিমাণে পানি ও স্যালাইন রাখুন।কারণ মন্দিরে পানি পাওয়া কঠিন। আর পাওয়া গেলেও দাম প্রায় দ্বিগুণ।

পথে খাওয়ার জন্য কলা রুটি সাথে নিতে পারেন। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখবেন কোনোমতেই কলার খোসা যেন সিঁড়িপথে না ফেলা হয়। কারণ আপনার একটি ভুলে অন্য কারো জীবনও হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে।

চন্দ্রনাথ মন্দির; Source: লেখক

প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে উপরে ওঠার পর চন্দ্রনাথ মন্দির পৌঁছানোর আগে বিরুপাক্ষ নামের আরেকটি মন্দির পড়বে। চাইলে এখানে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে নিতে পারেন৷ এখান থেকে সীতাকুণ্ড শহরের ও সমুদ্রের এক অদ্ভুত দৃশ্য আপনি দেখতে পাবেন। তবে সব কষ্ট নিমেষেই মস্তিষ্ক থেকে ভুলে যাবেন চন্দ্রনাথ মন্দিরের উপরে উঠে আশেপাশের দৃশ্য দেখার পর।

এতটাই সুন্দর আর সবুজে ঘেরা চারপাশ, যেন কোনো শিল্পী তার নিপুণ হাতে রংতুলি দিয়ে এঁকে রেখেছেন। সীতাকুণ্ডের প্রায় পুরোটাই দেখতে পাবেন এখান থেকে। দূরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে এক ঐশ্বরিক অনুভূতিতে আপনার মন প্রাণ জুড়িয়ে যাবে মুহূর্তেই।

চন্দ্রনাথ মন্দির থেকে পুরো সীতাকুণ্ডের ভিউ; Source: লেখক

মন্দিরটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য তীর্থস্থান এবং মন্দিরের ভেতরে শিব লিঙ্গ রাখা আছে। তাই এখানে হইহুল্লোড় না করে নিরবতা বজায় রেখে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিন, আর ভালো করে মস্তিষ্ককে ঠাণ্ডা রাখুন। কারণ পরের পথটা আরও বেশি ভয়ানক, আরও বেশি রোমাঞ্চকর। 

চন্দ্রনাথ মন্দির-উল্টো কালীবাড়ি:

চন্দ্রনাথ মন্দির পর্যন্ত অনেক পর্যটক গেলেও এরপরের পথটায় সহজে কেউ যায় না। তাই অনেকটা অজানা আর অচেনাই রয়ে গেছে এই পথটা। চন্দ্রনাথ মন্দিরের পেছন দিকে বেশ দুর্গম ও ভয়াবহ পাহাড়ি পথ বেয়ে নিচে নামতে হয়। কিছু কিছু জায়গা এতটাই সরু যে সেখান থেকে পা পিছলে পড়লে আর রক্ষা নেই।

কারণ পাশেই বিশাল খাদ। তাই সাবধানে ধীরে ধীরে নিচে নামুন এবং এক্ষেত্রে ট্রেকিং স্যু আবশ্যক। নইলে বিপদ ঘটতে পারে যেকোনো সময়। বৃষ্টি হলে এই রাস্তাটা পাড়ি দেয়া রীতিমতো অসাধ্য সাধন হয়ে যায়। 

উল্টো কালীবাড়ি যাবার দুর্গম পথ; Source: লেখক

প্রায় ৪০ মিনিট নিচে নামার পর দেখতে পাবেন পাহাড়ি ছড়া। সেখানে চাইলে গোসল করে নিতে পারেন। সেখান থেকে আরেকটু সামনে দেখতে পাবেন একটা গোল বিশালাকার পাথর, উপরে লাল কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।

পাথরের ঠিক নিচে গিয়ে দেখতে পাবেন পাথরের গায়ে ভেসে উঠেছে উল্টো কালী দেবী। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য খুব পবিত্র এই জায়গাটি। শুধুমাত্র কালী পূজোর দিন এখানে প্রচুর লোকের দেখা মেলে। অনেকে পাঠা বলী দিতে সেই দুর্গম পথে বেয়ে নিচে নামে। 

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের গহীনে পাতালকালী মন্দির; Source: লেখক

এখানে বলে রাখি, পুরো রাস্তাটাই পাহাড়ি পথ। আর শোনা যায় সেখানটায় ডাকাতের উপদ্রবও রয়েছে। তাই দলবল না নিয়ে উল্টো কালীবাড়ির দিকে ভুলেও এগুবেন না। সবচেয়ে ভালো হয় কালী পূজোর দিন সেখানে যাওয়া। তাদের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে যেকোনো উগ্র আচরণ থেকে বিরত থাকুন। 

পাথড়ের গাঁয়ে ভেসে ওঠা উল্টো কালী দেবী; Source: লেখক

এবার ফিরে আসার পালা, তবে জীবনে অবিস্মরণীয় একটি দিন ইতোমধ্যে আপনার স্মৃতির ঝুলিতে জায়গা পেয়ে গেছে। 

যেই পথে উল্টো কালীবাড়ি গিয়েছিলেন সে পথেই চন্দ্রনাথ মন্দিরে ফিরে আসুন। সেখান থেকে এবার ডান দিকের সিঁড়িপথ ধরে নিচে নামুন। এই পথটা পুরোটাই সিঁড়িপথ হওয়ার নামতে সুবিধা। তবে তাড়াহুড়ো করবেন না। পাহাড়ের পাদদেশে এসে সিনএনজি নিয়ে আবার সীতাকুণ্ড বাজারে চলে আসুন। সেখানে শ্রী গোবিন্দ হোটেলে চাইলে নিরামিষ খাবার খেয়ে নিতে পারেন। সন্ধ্যার বাসে করে ঢাকায় চলে আসুন। 

সনাতন ধর্মালম্বীরা মনের আশা পূরণ হবার আশায় এই গাছে সুতো বাঁধে; Source: লেখক

বিঃদ্রঃ কোনো ধরনের পচলশীল ও অপচনশীল ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলবেন না। ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট স্থান না পেলে ব্যাগে সংরক্ষণ করুন। পাহাড়ের উপর মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষা করুন। যতটা সম্ভব হালকা জামাকাপড় পরিধান করুন।

Loading...

2 Comments

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মহামায়া লেকের মায়ায় কাটিয়ে দেয়া একদিন

পৃথিবীর শীতলতম মরুভূমি স্পিতি ভ্যালির গল্প