মাজুলা সিঙ্গাপুর: সিঙ্গাপুরের পথে এগিয়ে চলা

সিঙ্গাপুর – অনেক নাম ডাক এই দেশটির, তাই নিজ চোখে দেখার ইচ্ছা ছিল। মহান আল্লাহ তাআলা দেখার সাধ পূর্ণ করেছেন, তার জন্য আলহামদুল্লিলাহ।

থাই লায়ন এয়ারওয়েজে করে ব্যাংকক থেকে সপরিবারে সিঙ্গাপুর আসি। আসার জন্য আমাদের প্রস্তুতিটা একটু বেশি বাড়াবাড়ি রকমের ছিল। অনেক ধনী দেশ তাই খরচ বেশি- আসলে ট্রাভেলারদের জন্য এটা মোটেই বেশি নয়। আপনি কীভাবে থাকবেন তার সব ব্যবস্থাই আছে এই দেশে। না ভুল বললাম, সিঙ্গাপুরকে রাষ্ট্র না বলে নগরই বলা ভালো।

সিঙ্গাপুর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ছোট্ট একটি দ্বীপ। আয়তন মাত্র ৭১৬ বর্গ কিলোমিটার। তবুও এই দ্বীপটিই আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। জনসংখ্যা ৫৬ লাখের কিছু বেশি। প্রতি বছর ১ কোটির বেশি পর্যটক আসে এই ছোট্ট একটি দ্বীপ দেশটিতে, কিন্তু তাতে কোনো সমস্যা হয় না।

সিঙ্গাপুর কত সুন্দর ও সাজানো গোছানো তা চাঙ্গি এয়ারপোর্ট নেমেই বোঝা গেছে। ১৯৮১ সালে উদ্বোধনের পর থেকে গুণগত মান, উৎকৃষ্টতা, অসাধারণ সেবা দ্বারা বিমান পরিবহন শিল্পে চাঙ্গি বিমানবন্দর বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। চাঙ্গি বিমানবন্দরটি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছে। এই বছরও বিমানবন্দরটি বেস্ট এয়ারপোর্ট অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে।

সব ধরনের সুযোগ সুবিধা আছে এই এয়ারপোর্টে। অর্কিডের বাগান, বিনামূল্যে ফুট ম্যাসেজ, বাটার ফ্লাই গার্ডেন, বিনা মূল্যে সিনেমা দেখার সুযোগ, আছে জিভে জল আনার মতো খাবারের দোকান। তাই আমি বলব চাঙ্গি এয়ারপোর্ট ঘুরে দেখার চান্স কোনোভাবেই মিস করবেন না।

এখানকার মানুষ অনেক নিয়ম-কানুন মেনে চলে। সিঙ্গাপুরের ডাক নাম ফাইন সিটি বা জরিমানার শহর, কারণ বিভিন্ন ছোট ছোট কারণে এখানে জরিমানার ব্যবস্থা আছে ।

এয়ারপোর্টে নেমেই সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার নিয়ে নিলাম। সিঙ্গাপুরের এক হাজার ডলারের নোটের পিছনে দেশের জাতীয় সঙ্গীত লেখা থাকে। সিঙ্গাপুরের জাতীয় সঙ্গীত হলো মালয় ভাষায়, ‘মাজুলা সিঙ্গাপুর’ (Majulah Singapura) বা সিঙ্গাপুর এগিয়ে চলো।

নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে মেট্রোরেলে করে আমরা হোটেল ক্লারামন্ট যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। মেট্রোরেলের ম্যাপ দেখে আপনি চাইলে সারা সিঙ্গাপুর ঘুরে দেখতে পারবেন এবং কাউকে কিছু প্রশ্ন করলেই সে আপনাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসবে, যা আমি পাশ্ববর্তী দেশ থাইল্যান্ডে পাইনি।

প্রথম মেট্রোরেলে চড়ার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় –এত ঝকঝকে, মনে হয় কাল উদ্ধোধন হয়েছে। প্রতি স্টেশনে আসার পর চারটি ভাষায় তারা বর্ণনা দেয়। সিঙ্গাপুরের চারটি সরকারি ভাষা রয়েছে। ইংরেজি, মান্দারিন, মালয়ের সঙ্গে রয়েছে তামিল ভাষাও।

হোটেল ক্লারামন্টে উঠেই মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। কোনো জাতের মধ্যে পড়ে না এই হোটেল। শুধু শুধু অনেক গুলো টাকা জলে গেল। এর থেকে কম দাম দিয়ে আপনি ভালো হোটেলে থাকতে পারবেন। আসলে অতি মাত্রায় সর্তকতা সবসময় ভালো ফল বয়ে আনে না এবং দুপুরের খাবার খেতে গিয়ে আরো কিছু টাকা নষ্ট হলো। আমার উপদেশ হবে আপনি যদি বাঙালি হয়ে থাকেন চেষ্টা করবেন বাংলাদেশের হোটেলে খাওয়ার জন্য । মোস্তফা সেন্টারের বিপরীতের গলিতে অনেক খাবার রেস্টুরেন্ট আছে। আবার ডেইলি বেসিক বা মাসিক ভিত্তিতে থাকার জায়গা আছে।

জামান সেন্টারে আপনি থাকতে পারেন। মোস্তফা সেন্টারে একবার ঢুকলে বের হওয়া কঠিন। এত্ত এত্ত ক্যাশ কাউন্টার তবুও বিল দিতে গিয়ে আধ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আর সব থেকে মজার কথা অনেক বাংলা ভাষী মানুষজনের কথা শোনা যায়। সেরাঙ্গুন এলাকাটা বাঙালি অধ্যুষিত। মেট্রোরেল করে আপনি চাইলে এই এলাকাতে আসতে পারবেন। রূপালি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক থেকে শুরু করে এমনকি তরিতরকারি দোকানের সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা।

কী কী দেখবেন সিঙ্গাপুরে তার একটা শর্ট লিস্ট আপনাদের জন্য দেয়া হলো-

১। সিঙ্গাপুর আই বা ফ্লাইয়ার

২। মারলায়ন পার্ক

৩। মারিনা বে স্যান্ডস

৪। জুরং বার্ড পার্ক

৫। সী একুরিয়াম- জলের তলের এক অপার সৌন্দর্যের নাম সী একুরিয়াম যেটি স্যান্টোসা দ্বীপে (Sentosa Island) অবস্থিত

৬। ইউনিভার্সাল স্টুডিও-পৃথিবী বিখ্যাত ইউনিভার্সাল স্টুডিও সিঙ্গাপুরের মূল আকর্ষণ বিন্দু। এটি অনেকটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সাল স্টুডিও এর আদলে গড়ে উঠেছে। এটির অবস্থানও স্যান্টোসা দ্বীপে। এখানে এলে মনে হবে যেন কোনো এক কল্পনার রাজ্যে চলে এসেছেন।

এখানে রয়েছে বিভিন্ন সেকশন যেমন হলিউড (Hollywood), সাই ফাই (Sci-Fi), জুরাসিক পার্ক (Jurassic Park), মাদাগাস্কার (Madagaskar) ইত্যাদি। এছাড়াও অনেক সিনেমার চরিত্র যেমন চার্লি চ্যাপলিন, মেরিলিন মনরো প্রমুখদের সাথে ছবি তোলার সুযোগ পাবেন যদিও সবই কাল্পনিক চরিত্র। যারা সিঙ্গাপুরে বেড়াতে আসেন এটি অবশ্যই দেখে আসতে ভুলবেন না।

৭। সিঙ্গাপুর চিড়িয়াখানা

এর সাথে আরেকটি জায়গা আমার ভালো লেগেছে তা হলো বোটানিক গার্ডেন।  প্রত্যেকটি জায়গায় আপনি মেট্রোরেল দিয়ে কম খরচে চলে যেতে পারবেন। এর সাথে আরো কিছু তথ্য জানিয়ে রাখি-

# সিঙ্গাপুরের নাগরিকরা বেশিরভাগ কথার শেষে ‘লা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। যেমন-‘ওকে’কে বলেন ‘ওকে-লা’।

# সিঙ্গাপুরকে বলা হয় সিংহের শহর বা লায়ন সিটি কিন্তু বাস্তবে কোনো সিংহ নেই।

# পর্ণোগ্রাফি, গান বা সিনেমা ডাউনলোড করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।

# ১৯৯২ সালে সরকার চুইংগাম নিষিদ্ধ করে। কারণ চুইংগামে পথচারীদের অসুবিধা হয়।

# সমকামিতা এখানে নিষিদ্ধ কিন্তু জুয়া আইনসিদ্ধ।

# সিঙ্গাপুরের সংস্কৃতি পশ্চিমা ঘরানার হলেও এখানে গোঁড়া হিন্দুবাদ, গোঁড়া খ্রিষ্টানবাদ , গোঁড়া ইসলামবাদ (মালয় সংস্কৃতি) এবং গোঁড়া বৌদ্ধবাদ (চাইনিজ সংস্কৃতি) আছে।

# বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হওয়া জায়গাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সিঙ্গাপুর। বছরে গড়ে ১৭১ বার বাজ পড়ে এই শহরে।

আরো একবার যাব- শুধু মাত্র দেশটাকে ভালোভাবে ঘুরে দেখার জন্য।

ফিচার ইমেজ সোর্স- changiairport.com

Loading...

2 Comments

Leave a Reply
  1. বজ্রপাতের বিষয়টা জানা ছিল না। এর কি কোনও ব্যাখ্যা আছে? চমতকার রিভিউ।

One Ping

  1. Pingback:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কাশ্মীর ভ্রমণ: খরচের খেরো খাতা

সবুজের ভিড়ে হারাতে লাউয়াছড়া জাতীয় বনে