সিঙ্গাপুর: যেখানে অল্প বাজেটে ঘোরা অবিশ্বাস্য কিছু নয়

সিঙ্গাপুরকে নিয়ে এটা আমার দ্বিতীয় লেখা। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার আগে আমি ভাবিনি যে সেখানে অল্প বাজেটে ঘোরা সম্ভব। কিন্তু যাওয়ার পর বুঝেছি আসলেই তা সম্ভব। চাঙ্গি এয়ারপোর্টে নামার পর থেকেই আপনি প্লান করে একটু একটু করে আগালেই আপনার বাজেটটাকে কন্ট্রোল করতে পারবেন।

এই সিঙ্গাপুর শহরে দেখার মতো অনেক কিছু আছে। আর আপনি যদি এক মাস থাকেন তাহলে সবকিছু মোটামুটি দেখে আসতে পারবেন।

আপনি যদি বাংলাদেশি হয়ে থাকেন আর আপনার যদি দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশ ঘোরা থাকে, তাহলে আপনি সহজেই ভিসা পেয়ে যাবেন। আর ফ্যামিলি নিয়ে ভ্রমণ করলে তো কথাই নেই, ভিসা আপনি পাবেনই। আর মনে রাখবেন ভিসা পাবেন এক মাসের ডাবল এন্ট্রি ভিসা।

এখন আসি এয়ার টিকেটের প্রসঙ্গে। টিকেটটা আপনি একটু রিস্ক নিয়ে যদি আগে কাটেন তাহলে কম টাকায় কাটতে পারবেন। এই কম টাকায় টিকেট কাটতে পারায় আপনার বাজেট অনেক কমে আসবে। আরেকটা বিষয়, একসাথে অনেকজন যদি ট্রাভেল করতে পারেন তাহলে সেক্ষেত্রে হোটেল থেকে শুরু করে খাওয়া দাওয়া কম বাজেটে করতে পারবেন।

একটা উদাহরণ দেই। এক রাতে মোস্তাফা সেন্টারের অপজিটে রাঁধুনি হোটেলে রাতের খাবার খেতে যাই রাত ১১.৩০টায়। খাবার অর্ডার দেই তিনজনের কিন্তু যখন দুইজনের খাবার আসে তখন একটা খাবার ক্যানসেল করি। কারণ এই দুজনের খাবার চারজনে খাওয়া যেত কিন্তু আমরা তিনজনে খেয়েছি খুব কষ্ট করে। তাই বুঝতেই পারছেন চাইলেই আপনি বাজেট কম করে খুব সহজেই খাওয়া দাওয়া করতে পারবেন এই সিঙ্গাপুরে।

এখন আসি কোন হোটেলে থাকবেন আপনি। সিঙ্গাপুরে অনেক বাজেট হোটেল আছে। লিটল ইন্ডিয়া, ফেরার পার্ক, সেরাঙ্গুন, রোচো, জালান বেসার, চায়না টাউন, কালাঙ্গ, আলজুনিয়েদ, ল্যাভেন্ডার- এসব জায়গাগুলোতে আপনি সহজেই চাইলে খুব কম খরচে থাকতে পারবেন এবং অনলাইনে আপনি এই হোটেলগুলোতে বুকিং দিতে পারবেন  সিঙ্গাপুরিয়ান ৫০ ডলারের নিচে, খুব সহজেই। এই সব জায়গাগুলোতে মেট্রো রেলের সহজ চলাচল আছে।

আপনাদের সুবিধার্ধে কিছু হোটেলের নাম দিলাম-

১। এবিসি প্রিমিয়াম হোস্টেল।

২। রেঙ্গুন হোস্টেল

৩। তাই হো হোটেল।

৪। আরিয়ানা হোটেল

৫। ৬০’স হোটেল

৬। ব্লু জাজ হোস্টেল

৭। একুইন জালান বাসার হোটেল।

৮। জেন হোস্টেল সেরাঙ্গুন সহ আরো অনেক হোটেল আছে।

সিঙ্গাপুরের মেট্রো রেলে করে আপনি এই দেশটির এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সহজেই চলে যেতে পারবেন। আরেকটি ব্যাপার হলো কাউকে কিছু প্রশ্ন করলেই সে আপনাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসবে। মেট্রো রেলের ম্যাপটা খুব ভালো করে বুঝে নিতে পারলে আপনি সিঙ্গাপুর দেশটা ঘুরে দেখতে পারবেন খুব সহজেই এবং কম খরচে। নিচের ম্যাপটা ভালো করে দেখলেই বুঝতে পারবেন।

ভ্রমণপ্রিয় মানুষদের জন্য এখানে কিছু জায়গার বর্ণনা দেওয়া হলো, যদিও আগের লেখাটিতে বলেছি কোথায় কোথায় আপনি ঘুরতে পারবেন। তবে আপনি যেই জায়গায় মেট্রো রেল দিয়ে নামার পর বের হওয়ার রাস্তায় সেই জায়গার দর্শনীয় জায়গাগুলোর নাম এবং তার ম্যাপ দেওয়া দেখতে পারবেন। তাই আপনি ম্যাপ দেখে সেই জায়গায় সহজেই চলে যেতে পারবেন।

সেন্তোসা, সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড় দ্বীপ। এই ভুবনটা আরও বড়। এখানে রয়েছে অনেক কিছু – বাটারফ্লাই পার্ক, আন্ডার ওয়াটার ডলফিন লেগুন, ইউনিভারসেল স্টুডিও, টাইগার স্কাই টাওয়ার, ফোরডি অ্যাডভেঞ্চার ল্যান্ড, ওয়েভ হাউস সেন্তোসা, আইফ্লাই সিঙ্গাপুর। ভিভো সিটি থেকে সেন্তোসা মনোরেল ও ক্যাবল কার দুটোই রয়েছে। আপনি চাইলে যে কোনো ভাবে যেতে পারেন।

এখানে রয়েছে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মানের ফুড কর্ণার মানে এক সাথে অনেক দেশের খাবারের দোকান। আমরা তিনজন মিলে এক ইন্দোনেশিয়ান হোটেলে দুপুরের খাবারটা তৃপ্তি সহকারে খেয়ে নিলাম। তিনজনের খাবারের দাম নিলো ১১ ডলার । এখানেই রয়েছে পালোয়ান, সিলোসো এবং তনজং নামের ৩টি মনোরম সমুদ্র সৈকত। সেন্তোসা মনের গভীরে দাগ কাটে, মনকে ভুলিয়ে দেয়।

ভালো লাগাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয় দূরের ভিভো সিটিতে নোঙর করা জাহাজগুলো। রয়েছে সেন্তোসা মারলিয়ন। এই সিংহ মূর্তি সিঙ্গাপুরের আইকন। সেন্তোসা আইল্যান্ডের এক সময়কার নাম ছিল ডেথ অব আইল্যান্ড। ১৯৭২ সালে সিঙ্গাপুর পর্যটন কর্তৃপক্ষ নাম দেয় সেন্তোসা। মালয় ভাষা সেন্তোসার অর্থ শান্তি। আর প্রতিবছর এই শান্তির দ্বীপে ২৫ মিলিয়ন পর্যটকের সমাগম ঘটে।

শপিং মলের মধ্য দিয়ে নৌকা চলছে! আর সেখানে নৌকা নিয়ে বেড়াচ্ছে লোকজন। বলছিলাম মেরিনা বে স্যান্ডস শপিং মলের ক্যানেলের কথা। এখানেই রয়েছে ৭ তারকা শেফসমৃদ্ধ সাতটি আন্তর্জাতিক মানের রেস্তোরাঁ। আছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আউটলেট। শপিং মলের সামনেই রয়েছে বিশাল রিভার। সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট দিয়ে প্রবাহিত নদী। দৈর্ঘ্য মাত্র ৩ কিলোমিটার। ঠিক যেন ছোট গল্পের মতো। 

সিংহের মুখ থেকে পানি পড়ছে। স্থানীয়রা এটাকে বলে সিঙ্গা মারলিয়ন। প্রতিদিন প্রায় ২৫-৩০ হাজার দর্শনার্থীর পদভারে মুখরিত হয় মেরিনা বে স্যান্ডস। এখানেই রয়েছে ‘গার্ডেন বাই দ্য বে’ প্রাকৃতিক উদ্যান। জল, ফুল আর বৃক্ষে ভরা উদ্যান। ২৫০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। উদ্যানটি বে সাউথ গার্ডেন, বে ইস্ট গার্ডেন ও বে সেন্ট্রাল গার্ডেন এই তিনটি ওয়াটার ফ্রন্টে বিভক্ত। এখানে রয়েছে ফ্লাওয়ার ডোম, ক্লাউড ফরেস্ট, সুপার ট্রি গ্রোভ, ফ্লাওয়ার মার্কেট, শিশুপার্ক, মন মাতানো ক্যাকটাস গার্ডেনসহ প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিট।

আর ‘গার্ডেন বাই দ্য বে’ প্রকৃতি উদ্যানটি বিশ্বের ভ্রমণ প্রিয় মানুষের কাছে খুবই প্রিয়।  দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হয় ২০১২ সালে। ২০১৪ সাল নাগাদ এর দর্শণার্থী ছিল প্রায় ৭ মিলিয়ন, যা  বর্তমানে প্রায় অর্ধশত মিলিয়নকে ছাড়িয়ে গেছে।

আর সেই সাথে ৫৫ তলার উপরে যে জাহাজ আকৃতির অংশটুকু, এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু সুইমিং পুল। উপভোগ করলাম পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচুতে ঘোরার। এ এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। আপনাদের জন্য আবার সিঙ্গাপুর নিয়ে লিখব আশা রাখি ইন শা আল্লাহ।

ফিচার ইমেজ- ytimg.com

Loading...

3 Comments

Leave a Reply
  1. Dada very pleased to read all of your story. Feel good. if you ever visit Hong Kong, pls write about that country. How to get HongKong visa, air ticket, cost etc. Bit wondering about that country. Thank you.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেষ সন্ধ্যায় ডুয়ার্সে

ইলিশ খেতে চাঁদপুরে টিজিবি বাহিনী (১৩ সেপ্টেম্বর)