শুভলং আর সূর্য ঝর্ণা: উপভোগ করুন ইচ্ছেমতো!

রাত সাড়ে দশটার বাসে উঠে পড়লাম আমরা ১৮ জন। গন্তব্য রাঙামাটির শুভলং আর সূর্য ঝর্ণা। শুভলং অনেকের কাছে মোটামুটি পরিচিত ঝর্ণা হলেও সূর্য ঝর্ণা, যেটা শুভলং-২ নামেও পরিচিত, এখনো সেভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। যথেষ্ট পানি থাকলে এই দুই ঝর্ণাই হয়ে ওঠে অবর্ণনীয় সৌন্দর্যের আধার!
বাস চলছে। আমাদের সবার মাঝেই চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। পুরো বাসের অর্ধেকটা জুড়েই আছি আমরা। আনন্দের রেশটাও তাই বেশি, বলতেই হবে। নেচে কুঁদে এবং হেঁড়ে গলায় গান গেয়ে চলছি সবাই। আমাদের সহযাত্রীরা বিরক্ত হচ্ছিলেন খানিকটা। কিন্তু আমাদের করার কিছুই ছিল না আসলে! দেশে গণতন্ত্রের হাল যেমনই হোক, বাসে আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে যাত্রীরা এই যন্ত্রণাটুকু মেনে নিয়েছিলেন!
বাস যখন আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে চলছে, তখন ভোর হয়ে গিয়েছে। অসাধারণ সুন্দর রাঙামাটির এই সরু পাহাড়ি রাস্তা। অনেক দূর থেকেই পাহাড়ের মাটি আর গাছপালার গন্ধ সজোরে ধাক্কা লাগাচ্ছে নাকে। একটা দীর্ঘ সময় পর এসেছি পাহাড়ে। স্বাভাবিকভাবেই অসম্ভব ভালো লাগা কাজ করছে। একবার ভালোবেসে ফেললে, প্রকৃতির আবেশ আর পাহাড়ের ডাক আপনি যতই উপেক্ষা করার চেষ্টা করুন, পারবেন না!

বোট থেকে কাপ্তাই লেক, ছবিঃ লেখক

ঠিক ৭টায় আমরা নেমে গেলাম রাঙামাটির পুরনো বাসস্ট্যান্ডে। নাস্তা সেরে এখান থেকে অটো নিয়ে চলে গেলাম তবলছড়ি বোট ঘাটে। আগে থেকে ঠিক করে রাখা নৌকার মাঝি সেখানেই অপেক্ষা করছিলেন। বোট শুভলং আর সূর্য ঝর্ণা ঘুরিয়ে আমাদের পৌঁছে দেবে বিলাইছড়িতে।
কাপ্তাই লেকের বুকে চলতে শুরু করলো আমাদের বোট। দশ থেকে পনেরো মিনিট চলার পরই লেকের চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য একটু একটু করে ধরা দিতে থাকবে আপনার চোখে।
তুলোর মতো মেঘ, ছবিঃ লেখক

লেকের স্বচ্ছ পানি আর চারপাশের উঁচু নিচু পাহাড়ের সারি আপনার মুগ্ধতার পারদ নিঃসন্দেহে ঠেলে দেবে ওপরের দিকে! অপার বিস্ময় নিয়ে চারপাশে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হবেন আপনি!
কাপ্তাই আর দূরের পাহাড়, ছবিঃ লেখক

দূরের পাহাড়গুলোর পাদদেশে দেখতে পাবেন ইট, পাথর আর কংক্রিটের তৈরি ঘরবাড়ি। সেই সাথে মাথার ওপর আছে বিশাল নীল আকাশ। আকাশে জমে আছে পেঁজা তুলোর মতো মেঘ! দুই পাশে পাহাড়গুলোকে রেখে বোটটা যখন ডানে বাঁক নিচ্ছে, তখন একটা ক্ষীণ মুহূর্তের জন্য হারিয়ে গিয়েছিলাম নিজের মাঝে। রাঙামাটি যে এতটা সুন্দর, সেটা আসলেই আমাদের ধারণার বাইরে ছিল।
পানি আর আকাশ, ছবিঃ লেখক

রাঙামাটির এই কড়া সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতেই দেড় ঘণ্টার মাঝে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের প্রথম গন্তব্য শুভলংয়ে। স্থানীয় সবার কাছেই আসার পথে শুনছিলাম শুভলংয়ে বৃষ্টি হওয়ার কারণে পানি আছে বেশ। খুশিতে আমরা তখন সবাই আত্মহারা।
কিন্তু পৌঁছেই বড়সড় একটা ধাক্কা খেলাম। বোটে বসেই দেখতে পাচ্ছি পানি একদমই কম। ইন্টারনেটে এখানকার বেশ কয়েকটা অসাধারণ ছবি দেখেছিলাম। সেগুলোকে কোনোভাবেই চোখের সামনের ঝর্ণাটার সাথে মেলানো যাচ্ছে না।
শুভলং, ছবিঃ লেখক

এসেই যখন পড়েছি, কী আর করা! টিকেট কেটে সিঁড়ি বেয়ে সবাই চলে গেলাম ঝর্ণার একদম কাছে। উপরের দিকে পানি না থাকলেও এর নিচের দিকটায় মোটামুটি পানি আছে। শেষ পর্যন্ত কিছুটা খুশি হতে পারলাম! শুভলংয়ের পাথুরে গায়ের সাথে নিজেদের গা এলিয়ে দিয়ে শুরু হলো ইচ্ছেমতো ভেজা আর দাপাদাপি লাফঝাঁপ!
সূর্য ঝর্ণা, ছবিঃ লেখক

শুভলং বেশ বড় একটা ঝর্ণা। অনেক উঁচু থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে একদম নিচে। বৃষ্টির সময় এটা ঠিক কেমন হয়ে ওঠে সেটা দেখার জন্য হলেও এখানে আরও একবার আসার কথা চিন্তা করছিলাম।
প্রায় আধ ঘণ্টার মতো সময় কাটিয়ে ভিজে চুপচুপে হয়ে আমরা আবারো বোটে উঠে গেলাম। এবার যাচ্ছি পাশের সূর্য ঝর্ণায়। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম।
সূর্য ঝর্ণা তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট। তবে পানির প্রবাহ এখানে অনেক অনেক বেশি। সবাই বোট থেকে নেমেই শুরু করলাম আরেক দফা লাফঝাঁপ! আমাদের সাথে অন্য আরো কয়েকটা বোট সেখানে ছিল। কয়েকটার মধ্যে সাউন্ডবক্সে উচ্চ শব্দে গান বেজে চলছিল। আমরা অবশ্য উপভোগই করেছি সেটা!
ভিজতে ভিজতে ঝর্ণায় চলেছে আমাদের উদ্দাম নৃত্য! ঝর্ণার অসম্ভব আরামদায়ক শীতল পানি থেকে আমাদের কারোই উঠতেই ইচ্ছে করছিল না। এখানে এসে একদম হাতের নাগালে রংধনুর দেখাও পেয়েছি আমরা। বিশেষ একটা ঘটনা বাদ দিলে সূর্য ঝর্ণায় আমাদের অভিজ্ঞতা বেশ ভালো!
রংধনু! ছবিঃ লেখক

শুভলংয়ে যাওয়ার পথে আমরা এখানকার বিখ্যাত পেদা টিং টিং রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে গিয়েছিলাম। সূর্য ঝর্ণা থেকে ফিরে এসে ব্যাম্বু চিকেন, সবজি আর ডাল দিয়ে খাবারটা সেরে ফেললাম। এখানে খাবার খেয়ে যতটা আনন্দ পাবেন, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি আনন্দ আপনি পাবেন চারপাশের দম বন্ধ করা ভিউ দেখে!
লেকের মধ্যে ছোট্ট একটা দ্বীপের মতো জায়গায় রেস্তোরাঁটি গড়ে তোলা হয়েছে। চারপাশে কাপ্তাই লেকের টলটলে পানি আর দূরের পাহাড় দেখতে দেখতে খাবার খাওয়ার অভিজ্ঞতাটা নিতে ভুলবেন না অবশ্যই। এখানে খাবারের দাম একটু বেশি। তবে পুরো সময়টাই যথেষ্ট উপভোগ করবেন আপনি!
খুঁটিনাটি:
রাঙামাটিতে বাসস্ট্যান্ড আছে দুটো। নতুন এবং পুরনো। শুভলং আর সূর্য ঝর্ণায় যাওয়ার জন্য পুরনো বাসস্ট্যান্ডে নেমে যাওয়াই সুবিধাজনক।
তবলছড়ি বোটঘাট এবং লঞ্চঘাট, ঘাটও আছে দুটো। আপনাকে যেতে হবে বোট ঘাটে।
আমাদের মাঝি মুনাফ চাচার ফোন নম্বরঃ ০১৮৪৩৯৬৪১৫৬
দুই ঝর্ণা ঘুরিয়ে মাঝি আমাদের পৌঁছে দিয়েছিলেন বিলাইছড়ির হাসপাতাল ঘাটে। ভাড়া পড়েছিল ৩,৫০০ টাকা।
বিলাইছড়ি যেতে না চাইলে বোটঘাটে ফিরে আসতে পারেন। সেক্ষেত্রে যাওয়া আসার ভাড়া পড়বে ১,৫০০-১,৮০০ টাকা।
সতর্কতা:
সূর্য ঝর্ণা এখনো সেভাবে পরিচিতি পায়নি। নিরাপত্তার খাতিরেই তাই স্থানীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করবেন। ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বেন না। ঘুরতে বেরোলে যে কোনো জায়গার জন্যই এই নিয়ম প্রযোজ্য।
পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখবেন। লেকের পানিতে ঘুণাক্ষরেও কোনো আবর্জনা ফেলবেন না।
ফিচার ইমেজ: রওনক ইসলাম 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লাওস ভ্রমণ: কোথায় থাকবেন, কেন থাকবেন

প্রশান্তি মোড়ানো ধুপপানি ঝর্ণা!