শ্রীমঙ্গল বার্ড পার্ক অ্যান্ড ব্রিড্রিং সেন্টারে কিছুক্ষণ

এখন শীতকাল। চারদিকে পাখির আনাগোনা বেড়েছে। দেশ বিদেশ থেকে হরেক রকম পাখির আগমন হয় শীতকালেই। পাখির কিচিরমিচির শব্দে চারদিকে মুখরিত। সারা বিশ্বে এই রকম হাজার দশেক পাখি আছে। এদের মধ্যে কেউ আকাশে উড়ে বেড়ায় আবার কেউ বা মাটিতেই ঘুরে বেড়ায়। তেমনই পাখিদের মধ্যে আছে নানা বৈচিত্র্য।

আমাদের চারপাশে হরেক রকম পাখি দেখতে পেলেও এমন অনেক পাখি আছে যা আমরা সচরাচর আমাদের চারপাশে দেখি না। এদের মধ্যে অনেক বিরল প্রজাতির পাখিও আছে। শ্রীমঙ্গল শহরের কেন্দ্রে এমনই এক নাম জানা অজানা বিরল পাখির সমাহার আছে বার্ড পার্ক এন্ড ব্রিড্রিং সেন্টারে।

শ্রীমঙ্গল বার্ড পার্ক এন্ড ব্রিড্রিং সেন্টার।

কমলাপুর থেকে ট্রেন যোগে শেষ রাতে পৌঁছে যাই শ্রীমঙ্গল। স্টেশন থেকে সিএনজি নিয়ে আগে থেকে বুক করা রিসোর্টে যাই। বাকি রাত ঘুমিয়ে সকাল সকাল বের হই শ্রীমঙ্গল শহরটা ঘুরে দেখতে। রাবার বাগান আর চা বাগানের মধ্যে দিয়ে আমাদের সিএনজি এগিয়ে যায়। যতদূর চোখ যায় দিগন্ত বিস্তৃত সবুজের সমাহার। সবুজ রঙয়ের গালিচা বিছানো চারপাশে।

তারই মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাই মণিপুরী পাড়ায়। মূলত শাড়ি ও চাদর কিনতেই মণিপুরী পাড়ায় যাওয়া। বলে রাখা ভালো, মনিপুরিদের তৈরি করা জিনিস দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও সুপরিচিত এবং প্রশংসনীয়। মণিপুরী নারীদের হাতে বোনা শাড়ি, শাল, চাদর, কামিজ প্রভৃতি সর্বজন সমাদৃত।

নীলকণ্ঠ টি-কেবিনে আমরা।

মণিপুরী পাড়া ঘুরে যখন ক্লান্ত তখন নিজেদেরকে সতেজ করতে চলে যাই নীলকণ্ঠ টি-কেবিনে। কেননা ক্লান্তি কাটিয়ে মূহুর্তে সতেজতা ফিরিয়ে আনতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের জুড়ি নেই। আর তা যদি হয় নীলকণ্ঠ কেবিনের চা তাহলে তো আর কথাই নেই।

নীলকণ্ঠ টি-কেবিনের মালিক রমেশ রাম গড়ের চায়ের পরিচিতি আছে দেশ জুড়ে। বিশেষ করে সাত রঙা চা। ক্লান্তিকে বাই বলতে সেই মুহূর্তে চায়ের বিকল্প আর কিছুই নেই। ক্লান্তি কাটিয়ে পরবর্তী পথের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ি।

সাত রঙা চা।

সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানায় যাবো তা আগে থেকে পরিকল্পনা ছিল। সময় স্বল্পতার কারণে এর আগেও যাওয়া হয়নি। তাই এইবার আর কোনোভাবে মিস দেওয়া যাবে না। ড্রাইভার সাহেব বলল শ্রীমঙ্গল শহরে নাকি আরেকটা চিড়িয়াখানা আছে। সেটা শুধু পাখিদের নিয়ে। বেশ সুন্দর নাকি সেই চিড়িয়াখানা। পথিমধ্যে দেখা মিলবে। যাওয়ার পথেই যেহেতু পড়বে তাই একবার ঢুঁ মেরে গেলে খারাপ হয় না। নীলকণ্ঠ টি-কেবিন থেকে ১০ মিনিটের দূরত্ব।

উট পাখি; ছবি- সাইমুন ইসলাম

সিএনজি গিয়ে দাঁড়ালো বার্ড পার্ক এন্ড ব্রিড্রিং সেন্টারের সামনে। গেটে একটা মস্ত তালা ঝুলিয়ে রাখা। বন্ধ দেখে ভাবলাম আজ আর খুলবে না। আশেপাশের দু’ একজনের সাথে কথা বলে জানলাম বার্ড পার্কের দায়িত্বরত যিনি আছেন তিনি দুপুরের খাবার খেতে গিয়েছেন। ৫-১০ মিনিটের মধ্যে চলে আসবেন। ভাগ্য ভালো থাকায় খুব বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। তালা খুলে ভেতরে ঢুকতেই আমি হা। পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত চারপাশ।

হরেক রকম রঙিন টিয়া; ছবি- সাইমুন ইসলাম

হরেক রঙয়ের হরেক রকমের পাখি এখানে। নানা রঙে নানা ঢঙে নানা আঙ্গিকে ডাকছে। সাধারণত ময়না, টিয়া, লাভ বার্ড বাসা বাড়িতে পুষে থাকেন অনেকেই। শখের বসে এমন অনেকেই পাখি পুষে থাকেন বাড়ীর আঙ্গিনায়। এমনই একজন সৌখিন ব্যক্তি লন্ডন প্রবাসী আব্দুল মান্নান। প্রথম দিকে শখের বসে নিজে বাড়িতে কিছু সংখ্যক ময়না, টিয়া, বুলবুলি আর হরিণ পোষা শুরু করেন। পর্বরতীতে নিজ উদ্যোগে পাখি প্রেমীদের মনে আনন্দ যোগাতে গড়ে ওঠে এই বার্ড পার্কটি। নানা জাতের বিরল পাখির দেখা মেলে এই বার্ড পার্কে। বর্তমানে এটি শ্রীমঙ্গল বার্ড পার্ক এন্ড ব্রিডিং সেন্টার নামে পরিচিত।

উটপাখির ডিম।

শ্রীমঙ্গল উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার জালালিয়া সড়কে স্থাপিত এই বার্ড পার্কটি বর্তমানে বাংলাদেশ ওয়াইল্ড কনজারভেশন এন্ড রিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশনের অন্তর্ভুক্ত।

জোড়ায় জোড়ায় পাখি; ছবি- ফারজানা তাসনিম পিংকি

শ্রীমঙ্গল বার্ড পার্ক এন্ড ব্রিডিং সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, বিলুপ্ত এবং বিরল প্রজাতির সব পাখি। এদের মধ্যে আছে উট, ইমু, শকুন, ময়ূর, মায়া হরিণ, রাজহাঁস সহ কয়েকশ জাতের টিয়া পাখির সমাহার। আরও আছে লাভ বার্ড, ঘুঘু, বুলবুলি, নীল ময়ূর, সাদা ময়ূর সহ হরেক রকম পাখির মেলা। লাল, নীল, সবুজ, হলুদ, বেগুনী, সাদা, কালো, ধুসর ইত্যাদি নানান রংয়ের পাখির কিচিরমিচির ধ্বনি পার্কটি মুখরিত করে রেখেছে।

কত রঙের পাখি; ছবি- ফারজানা তাসনিম পিংকি

প্রায় প্রতিদিনই পাখি প্রেমীদের আনাগোনা এই বার্ড পার্কে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দর্শনার্থীদের চলাচল থাকে বার্ড পার্কে। লক্ষণীয় যে এই সকল দর্শনার্থীদের মধ্যে শিশুরাই বেশি থাকে। প্রকৃতি পরিবেশের এত কাছাকাছি এসে তারা আরও বেশি চঞ্চল হয়ে ওঠে।

পায়ে পায়ে পুরো বার্ড পার্ক ঘুরে দেখে বেরিয়ে পড়ি। বৈচিত্র্যময় পাখির সংগ্রহশালা পর্যটনের শহর শ্রীমঙ্গলকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। প্রকৃতি-পরিবেশের অপরূপ পসরা সাজিয়ে সর্বদা তৈরি পর্যটন শহর শ্রীমঙ্গল।

পাখির মেলা।

যাওয়া-আসা:

ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গলের সরাসরি বাস রয়েছে। সারাদিনই কিছুক্ষণ পর পর বাস ছাড়ে। যেতে পারবেন রাতেও। চাইলে ট্রেনে করেও যেতে পারবেন। তবে রাতে গেলে আগেই হোটেল বুক করে রাখবেন। কারণ ট্রেন শেষ রাতের দিকে পৌঁছে যাবে শ্রীমঙ্গলে। শ্রীমঙ্গল থেকে অটোরিকশায় যেতে পারবেন শ্রীমঙ্গল বার্ড পার্ক এন্ড ব্রিডিং সেন্টারে।

অবশ্যই মনে রাখবেন

*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন।
*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতি এবং পরিবেশের যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।

*** ফিচার ইমেজ- সাইমুন ইসলাম

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঘুরে আসুন সিঙ্গাপুরের পাঁচটি স্বর্গীয় দ্বীপ থেকে

ঘুরে আসি সুন্দরী সুন্দরবন