চার শতকের পুরনো শমসের গাজীর দীঘি ও গুহা

ফেনীতে বোহেমীয় সকালে নাস্তা খেয়ে রওনা করলাম ছাগলনাইয়ার দিকে। ফেনী স্টেশন রোডে ছাগলনাইয়ার সিএনজি পাওয়া যায়। ঠিক ১৭ মিনিটে সিএনজি ছাগলনাইয়া পৌঁছে গেল। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে নিলয়ও ছাগলনাইয়া পৌঁছে গেল। তাসনু আর সৌরভের আসতে আরোও দেরি হবে। তাই খুঁজেপেতে দেখলাম, ছাগলনাইয়ার কাছাকাছি নরমাল কোনো জায়গা আছে কি না। পাওয়াও গেল। শমসের গাজীর দীঘি। দীঘি বলে আগেই এই জায়গাটি বাদ দিয়েছিলাম। ভাবলাম, ওরা আসতে আসতে আমরা জায়গাটা ঘুরে আসি।

ছাগলনাইয়া বাজার থেকেই শমসের গাজী দীঘি যাওয়ার সিএনজি পাওয়া যায়। চম্পকনগর বা শুভপুরের সিএনজি কোথায় পাওয়া যাবে বলতেই দেখিয়ে দিলো। চম্পকনগরে সিএনজি নামিয়ে দিলো পনেরো মিনিটে। সিএনজি চালককে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম, এখান থেকে রিকশায় শমসের গাজী দীঘি যেতে পারবো। রিকশাওয়ালা চট করে ৬০ টাকা চেয়ে বসলো। ভাবলাম, আমরা নতুন মানুষ বুঝতে পেরে হয়তো বেশি চাচ্ছে। তার উপরে রাস্তাটা খুব সুন্দর। তাই ঠিক করলাম, হেঁটেই যাবো।

মায়াময় এক পথ; source: নিলয়

অনেকদূর হেঁটে যাওয়ার পর পাকা রাস্তা শেষ হলো। এরপর মেঠোপথ। মাটির রাস্তা ধরে এগোতে শুরু করার পর থেকেই দেখছিলাম, সামনের প্রকৃতি কেমন যেন বদলাতে শুরু করেছে। আমাদের চোখে প্রকৃতির ঠিক যেরকম, সেরকম চেনা রূপ দেখতে পাচ্ছিলাম। অদ্ভুত এক ধরনের বন ছোটখাটো একটা টিলার উপর। বনের গাছগুলো একদমই অপরিচিত। টিলার একধারে একটা ওয়াচ টাওয়ার দেখতে পেয়ে ধারণা করলাম, ওটা হয়তো ভারতের অংশ। কিন্তু কোনো কাঁটাতার নেই কেন?

আরেকটু সামনে এগিয়ে দেখি, অপরিচিত বনের পাশে আরেক টিলায় আনারসের ক্ষেত। অনেক কৃষক-কৃষাণী কাজ করছে ক্ষেতে। আমি মাটির রাস্তা ছেড়ে ক্ষেতের আইল ধরে সেদিকে পা বাড়িয়েছি, রাস্তা থেকে একজন লোক বললেন, ‘ওদিকে কিন্তু ভারতের সীমানা। সামনের আইলটা পার হইয়েন না!’

আমি আইল পর্যন্তই গেলাম। তারপর দূর থেকেই আনারস ক্ষেতের ছবি তুললাম। আমার ফ্রেমের মধ্যে কখন যেন একজন বিএসএফ ঢুকে পড়লেন। উনাকে দেখে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ দেখলাম না। আরো কিছু ছবি তুলে আমি রাস্তায় উঠে পড়লাম। পিছন ফিরে দেখি বিএসএফের লোকটা এদিকেই আসছে। তাকে দেখে আমাকে সতর্ককারী লোকটা বললো, ‘নমস্তে স্যারজি।’

ওপারের আনারস ক্ষেত; source: মাদিহা মৌ

আমি আমার মতো করে দেখছি, ছবি তুলছি। নিলয় এমন সময় বললো, ‘দোস্ত, তোকে ডাকে।’

ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, বিএসএফ হাতছানি দিয়ে ডাকছে। মুখে মুচকি হাসি। এবারেও ভয় পাওয়ার কোনো কারণ দেখলাম না। ধাপ ধুপ করে নেমে আ’ল ধরে হেঁটে সীমানার এপারে দাঁড়াতেই হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলো, তার ছবি কেন তুলেছি। আমি পরিষ্কার বাংলায় জবাব দিলাম, ‘আপনার ছবি তুলিনি। আমি ঘুরতে এসেছি এখানে, আনারস ক্ষেতের ছবি তুলছিলাম।’

আমার কথা সম্ভবত বুঝতে পারেনি। এপারে দাঁড়িয়ে থাকা বাঙালি লোকটা আমার কথার অর্থ হিন্দিতে অনুবাদ করে দিল। জবাবে জানালেন, ক্ষেতের ছবি তুললে সমস্যা নেই। তার কোনো ছবি তুলে থাকলে যেন ডিলিট করে দিই। আমি মাথা ঝাঁকিয়ে চলে এলাম।

একটাই রাস্তা এদিকে। সেটা ধরে সোজা হাঁটতে শুরু করলাম আবারো। একটা লাল মাটির টিলা পেলাম। রাস্তায় কিছু ছেলে মেয়েকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, এই টিলা ধরে এগিয়ে গেলেই শমসের গাজী দীঘি পাবো। টিলা বেয়ে উঠে বেশ বয়স্ক কামরাঙ্গা গাছের সারি পাওয়া গেল। গাছের নিচেই কামরাঙ্গা বিছিয়ে পড়ে আছে। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখি এতক্ষণ যেগুলোকে পাতা ভেবেছি, সেগুলো আসলে কামরাঙ্গা! শ’য়ে শ’য়ে কামরাঙ্গা ধরে আছে। কাছেই বাংলাদেশ ভারতের সীমানা চিহ্ন আর নো ম্যানস ল্যান্ড।

লাল মাটির টিলা; source: মাদিহা মৌ

একটু সামনে যেতেই বেতের তৈরি টিকিটঘর পেলাম। ওখানে প্রতিজন পাঁচ টাকা করে দিয়ে সামনের রাস্তা ধরে যেতেই টিলা থেকে নিচে নেমে পড়লাম। নিলয় এই রাস্তায় দাঁড়িয়ে চেঁচালো, ‘আমরা অযথাই ৫ টাকা দিছি। পাহাড়ের নিচের রাস্তা ধরে ঘুরে এলে এই টাকাটা লাগতো না।

আসলে টিকিটের পয়সা দিয়ে লোকে ভিতরের দিকে বন দেখতে যায়। আমরা বনের রাস্তা ধরে না গিয়ে অন্য রাস্তা ধরে নিচে নেমে এসেছি। পেছনে আর ফিরে গেলাম না। সামনে এগিয়ে এক টুকরো উঁচু টিলার মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া গুহা দেখতে পেলাম। গুহাটি এখনো পাথর বা মাটি পড়ে বন্ধ হয়ে যায়নি। এ মাথা থেকে ও মাথা দেখা যায়। নিলয় একটু চেষ্টা করেছিলো ভেতরে ঢোকার, একটু পরেই ভয় পেয়ে বেরিয়ে এসেছে।

কামরাঙ্গা গাছের সারি; source: মাদিহা মৌ

টিলার উপর খোলা জায়গা পেলাম। তারপরই গাছ গাছালির আড়ালে চোখে পড়লো দীঘিটি। দীঘির ওপারেই ভারতের সীমান্ত। ঐতিহাসিক শমসের গাজী দীঘি পরশুরামের অন্যতম দীঘি। বাংলার ভাটির বাঘ নামে পরিচিত ছিল শহীদ বীর শমসের গাজী। প্রায় চারশ’ বছর আগে বর্তমানে ফেনী জেলায় পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলা এবং ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের একাংশ এর তৎকালীন শাসক, বৃটিশ বেনিয়াদের অন্যতম দমনকারী শমসের গাজী এ দীঘি খনন করেছিলেন।

সে সময়কার এই জায়গাগুলোর নাম ছিল খন্ডল পরগনা। পাঁচশ খননকারীর দীর্ঘ তিন বছর সময় লেগেছিল দীঘিটি খনন করতে। পাড়সহ দীঘির আয়তন প্রায় ১৮ একর। শমসের গাজী যখন এ দীঘি খনন করছিলেন, তখন এর আশেপাশে কোনো জনবসতি ছিল না। পানির সন্ধান পেয়ে গড়ে ওঠে ঘর-বাড়ি। এলাকাবাসীর মাঝে এ দিঘি নিয়ে নানা রোমাঞ্চকর কাহিনী প্রচলিত আছে। এর একটি এমন-

বহু বছর আগে দীঘির পাড় দিয়ে নববধূ নিয়ে নতুন বর যাচ্ছিল। চার বেহারার পালকিতে বসে ছিল ঘোমটা পরা বউ। নববধূর চোখ গিয়ে পড়ল দীঘির মাঝখানে একটি ফুটন্ত শাপলা ফুলের উপর। নববধূ সাথে সাথে পালকি থামানোর নির্দেশ দিল বেহারাদের। নেমেই কাউকে কিছু না বলে ছুটলো শাপলা ফুলের পানে। তাকে বাঁধা দিল তার স্বামী। বাঁধা পেয়ে সে চিৎকার করে বলে আমাকে কেউ বাঁধা দিও না, মধ্য দীঘির শাপলা আমায় ডাকছে। অতঃপর নববধূ দীঘির মধ্য জলে নেমে যায়, আত্মীয়তার কোনো বন্ধনই তাকে আটকাতে পারেনি। এক সময়ে মধ্য দীঘিতে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায় নববধূ।

গুহা; source: মাদিহা মৌ

আমরা দীঘির পাশের খোলা প্রান্তরে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। প্রান্তরের একধারে বন, অন্যধারে বিস্তৃত সোনালী ধানের ক্ষেত আর তাল গাছের সারি। এখানে বসে আড্ডাটা জমলো দারুণ। খুব কম আশা নিয়ে এসে চমৎকার নৈসর্গিকতা দেখতে পেয়ে দারুণ তৃপ্তি পেলাম।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে ট্রেনে ও বাসে ফেনী যাওয়া যায়। ট্রেনে যেতে চাইলে চট্টগ্রামগামী রাতের শেষ ট্রেন তূর্ণা নিশিথায় যেতে পারেন। রাত সাড়ে ১১টায় কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া তূর্ণা নিশিথায় ফেনী পৌঁছে সাড়ে চারটায়। ভাড়া ২৬৫ টাকা।

আবার কম খরচে চট্টগ্রাম মেইলে যেতে পারেন। ভাড়া পড়বে মাত্র ৯০ টাকা। চট্টগ্রাম মেইল কমলাপুর থেকে ছাড়ে রাত সাড়ে দশটায়। সাত ঘণ্টা লাগবে ফেনী পৌঁছাতে। বাসে যেতে চাইলে, এনা ট্রান্সপোর্টে ও স্টার লাইনে যেতে পারেন। ভাড়া ২৭০ টাকা।

শমসের গাজীর দিঘি; source: মাদিহা মৌ

ফেনী স্টেশন রোড থেকে ছাগলনাইয়ার সিএনজি পাওয়া যায়। ভাড়া ২৫ টাকা প্রতিজন। ছাগলনাইয়া থেকে চম্পকনগরের সিএনজি পাবেন। ভাড়া ২০ টাকা। চম্পকনগর থেকে ৫০-৬০ টাকা রিকশা ভাড়ায় শমসের গাজীর দীঘি ও গুহার কাছাকাছি যেতে পারবেন। বাকি পথ হেঁটে যেতে হবে।

Feature Image – মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বইপ্রেমীদের জন্য আদর্শ কিছু ‘বইয়ের শহর’

জয়পুর স্টেশনেই দুঃখ দূর