শীলবাঁধা পাড়া: দেবতাখুম যাওয়ার পথে পথে

বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকা বান্দরবান যেন নৈসর্গিক সমস্ত সৌন্দর্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে। পাহাড় কন্যা বান্দরবানকে বলা হয় খুমের স্বর্গরাজ্য। মারমা ভাষায় খুম মানে জলপ্রপাত। বান্দরবানের সবচেয়ে বড় খুম হলো দেবতাখুম। স্থানীয়দের মতে প্রায় ৫০-৭০ ফুট গভীর। দেবতাখুমের দৈর্ঘ্য ৬০০ ফুট যা ভেলাখুমের চেয়ে অনেক বড়। স্থানীয়রা একে ডাকেন সোনাখুম। অনেকে আবার মারমা ভাষায় থংচিখুম নামেও ডাকেন।

যাত্রা হলো শুরু; Image source : মাদিহা মৌ

ঈদের ছুটিতে কোথাও তো যেতেই হবে! বিশেষ করে পাহাড়ে। কই যাওয়া যায়, কই যাওয়া যায় ভাবছি৷ কারণ বান্দরবানের সব জায়গা সব সিজনের জন্য উপযুক্ত নয়। ইভানা খুঁজে পেতে বের করলো, দেবতাখুম। একদিনের ট্রেকিংয়েই ঘুরে আসা যাবে৷ সেই সাথে সিদ্ধান্ত হলো যেহেতু এটা রিলাক্স ট্যুর, সেদিন রাতে দেবতাখুমের কাছে যে পাড়া আছে, সেই পাড়ায় থাকব।

সব ঠিকঠাক করে নির্দিষ্ট দিনে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। ভোরে বান্দরবান পৌঁছে, রোয়াংছড়ি যাওয়ার বাসস্ট্যান্ডে বসে ডুবোতেলে ভাজা পরোটা ডিম ভাজা খেয়ে পাহাড়ি রাস্তায় যাত্রা শুরু হলো। আগেরদিনও বৃষ্টি ছিল, কিন্তু আজ ঝকঝকে একটি দিন। এই সকাল বেলাতেই বেশ তাপ ঝরাচ্ছে সূর্যদেব। একেকজন ঘেমে নেয়ে একাকার। বহু চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আমাদের বাস রোয়াংছড়ি যখন পৌঁছুলো, তখন বেলা নয়টা বাজে।

কচ্ছপতলী আর্মি ক্যাম্প; Image source : মাদিহা মৌ

রোয়াংছড়িতে আমাদের আগে থেকে নির্ধারণ করে রাখা গাইডের সাথে দেখা হলো। গাইড আমাদের সিএনজি করে নিয়ে গেলেন কচ্ছপতলী বাজারে। সেখানে আর্মি ক্যাম্পে সবার নাম এন্ট্রি করলাম। ঝকঝকে দিন বলে আকাশ গাঢ় নীল।

আর ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের ভেলা ভেসে চলছে। এর মধ্যে ছোট একটা টিলায় বসানো আর্মি ক্যাম্পটা ছবির মতো সুন্দর দেখাচ্ছিল। ক্যালেন্ডারের পাতার মনোমুগ্ধকর ছবিগুলো বুঝি এসব জায়গা থেকেই তোলা হয়!

কচ্ছপতলী পাহাড় থেকে উপত্যকা; Image source : মাদিহা মৌ

আর্মি জানতে পারলাম, আমরা যে পাড়ায় থাকতে চেয়েছিলাম, সেই শিলবাঁধা পাড়ায় থাকার অনুমতি নেই। ওখানকার স্থানীয়রা বাঙালিদের সাথে বন্ধুভাবাপন্ন নয়। তাই আমাদের আর পাড়ায় থাকা হবে না। ফিরে আসতে হবে এই কচ্ছপতলীতেই। আর সেটা বিকাল ছয়টার মধ্যেই।

যেখানে নাম ধাম লেখা হয়, সেখানে ব্যাগ রাখার ব্যবস্থা আছে। দুইজনের ব্যাগ বাদে আমাদের সবার ব্যাগ সেখানেই রাখা হলো৷ দুইজনের ব্যাগেই সবার একটা করে ড্রেস নেওয়া হলো, খুমে গোসল করার পর বদলে নেওয়ার জন্য। চা পান করে, কিছু শুকনো খাবার আর পানি কিনে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।

প্রথমেই খাড়াই; Image source : মাদিহা মৌ

কচ্ছপতলী থেকে দেবতাখুম যেতে সময় লাগে দেড় ঘণ্টা থেকে দুই ঘণ্টা৷ আর শিলবাঁধা পাড়ায় যেতে লাগে এক ঘণ্টা। প্রথমেই খাড়া একটা রাস্তা। ইট দিয়ে বাঁধানো। গাড়ি চলাচল করে, বোঝা গেল। হেলতে-দুলতে সেই খাড়াই বেয়ে উঠলাম। উপরে উঠে দেখি, সেখানে দাঁড়িয়ে নিচের উপত্যকাটা দেখা যাচ্ছে। সাঙ্গু নদীর সরু প্রবাহ বয়ে চলছে উপত্যকার পাদদেশে।

দেখতে দেখতেই হেঁটে যাচ্ছি। এখন আর খাড়াই বা উৎরাই না। প্রায় সমতল। পাহাড়ের একধারের গাছগাছালির ফাঁক গলে দূরের পাহাড় দেখা যায়। সবচেয়ে কাছে যে পাহাড়টা, ওটাকে দেখতে বীভৎস লাগছে! পাহাড়ের গায়ে কোনো সবুজ তো নেইই, বরং লালচে মাটিগুলোকে কেমন দগদগে ঘায়ের মতো দেখাচ্ছে। আর সেখানে অর্ধ পোড়া কালো কালো গাছের কাণ্ডগুলোকে দেখাচ্ছে কাঁটার মতো। কেন এই হাল? জুম চাষ করার জন্য পাহাড়ে একটা নির্দিষ্ট অংশ জুড়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এঁকেবেঁকে পাহাড়ি পথ; Image source : মাদিহা মৌ

হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম সেখানে৷ ওইটুকু পেরিয়ে একটা বন পেলাম বড় বড় গাছের। সেখান থেকে আবার খাড়াই নেমে গেছে নিচে। ঝর্নার নিচের শক্ত শিলাময় পাহাড় পেলাম কাছেই। এখানে হয়তো একসময় কোনো ঝরনা ছিল। এখন আর পানি নেই। খাড়াই পাহাড় নামার পরেই শীলবাঁধার সীমানা শুরু। এখানে প্রথমেই পং সু আং নামের একটা সাধারণ খুম পার হতে হবে। পং সু আং খুম গিয়ে যুক্ত হয়েছে দেবতাখুমে।

এই খুমে পানি তেমন একটা নেই। বড় বড় কালো পাথরের উপর দিয়ে ঝির ঝির করে পানি বয়ে যাচ্ছে। পায়ের গোড়ালি ডোবানো পানি। তবে পাথরগুলো খুব পিচ্ছিল। পেরুনোর সময় সাবধানে থাকতে হবে, নইলে পড়ে কোমড় ভাঙার সম্ভাবনা প্রবল।

বন; Image source : মাদিহা মৌ

এই জায়গাটায় একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। প্রথমে ভেবেছি, মাছ ধরার ফাঁদ। বাঁশের কঞ্চি চিরে উল্টো ইউ আকৃতির কিছু একটা বানানো আছে। অনেকগুলো উল্টো ইউ দিয়ে একটা লাইন। পরে দেখি দুটো বাঁশের উপর একটা ছোট্ট ঘরের মতো কিছু একটা।

সেটার ভিতরে কিছু খাবার রাখা। মনে হলো সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে দেওয়া ভোগের খাবার। গাইড জানালো এটা একটা মন্দির। তবে ওখানে কোনো মূর্তি ছিল না।

পং সু আং খুম; Image source : মাদিহা মৌ

খানিক পরেই পৌঁছে গেলাম শীলবাঁধা পাড়ার ক্যান্টিনে। পাহাড়ের পাদদেশে ছোট একটা জলপ্রপাতের পাশ ঘেঁষে বাঁশ, ছন, চাটাই দিয়ে বানানো হয়েছে ক্যান্টিনটি। ক্যান্টিনের বাইরে বাঁশ কেটে চমৎকার টেবিল আর বেঞ্চ বানানো হয়েছে। আমরা দেড় ঘণ্টার ট্রেকিং শেষে এখানে বসে বিশ্রাম নিলাম।

জায়গাটি এতই স্নিগ্ধ ছিল যে এটা ছেড়ে উঠতেই ইচ্ছে করছিল না। দলের দুয়েকজন বেঁকে না বসলে এই সময়টাতেই খাবার খেয়ে নিতাম। যেহেতু দুপুরের খাবারে দেরি হবে, তাই কেন্টিনের দোকান থেকে ড্রাইকেক আর কফি খেয়ে নিয়ে রওনা হলাম দেবতাখুমের দিকে৷

পাহাড়িদের মন্দির; Image source : মাদিহা মৌ

কীভাবে যাবেন

দেবতাখুম বা তিনাপ অভিযানে গেলে প্রথমেই আপনাকে বাংলাদেশের যে কোনো জায়গা থেকে চলে যেতে হবে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলায়। সেখানকারই দুটো জায়গা শিলবাঁধা এবং কচ্ছপতলী। বান্দরবান সদর থেকে বাস/চাঁদের গাড়ি/সিএনজি/ মটর সাইকেলে করে রোয়াংছড়ি যেতে এক ঘণ্টা লাগে। সেখান থেকে সিএনজি বা মোটরসাইকেলে কচ্ছপতলী বাজার। বাজারের কাছেই অংখিংয়ের মামার বাসা।

শিলবাঁধা পাড়া থেকে নিচের উপত্যকা; Image source : মাদিহা মৌ

কচ্ছপতলী বাজার থেকে ঘণ্টাখানেক হাঁটলেই শিলবাঁধা পাড়া এবং ক্যান্টিনের দেখা মিলবে।

Feature Image : মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভারতের অনলাইন ভিসা ফর্ম পূরণ সম্পর্কিত সকল খুঁটিনাটি

লাদাখের পার্পল ড্রিম!