নীলাদ্রি বা শহীদ সিরাজ লেক: সৌন্দর্যের পাশাপাশি লুকানো এক বীরের গল্পগাথা

অভিধান ঘাটলে নীলাদ্রি শব্দের অর্থ দাঁড়ায়, নীল বর্ণের পর্বত। ওড়িশার নীলগিরি পর্বতমালাকেই নীলাদ্রি বলা হয়। নীলাদ্রি শব্দটার যদি সন্ধি বিচ্ছেদ করি, তাহলে পাওয়া যাবে, নীল + অদ্রি। যেহেতু অদ্রি মানে পর্বত, তাহলে নীলাদ্রির অর্থ হিসেবে নীল বর্ণের পর্বতটাই জুতসই।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সুনামগঞ্জের টেকেরঘাটে একটি লেকের নাম যে নীলাদ্রি রাখা হলো, লেকের সাথে নামের সম্পৃক্ততা কী? সুনামগঞ্জ যাওয়ার আগে নেট ঘেটে যা বুঝতে পারলাম, মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে শুয়ে থাকা লেকটি আকাশ আর পাহাড়ের নীলে নীলাভ হয়ে থাকে। তাই এর নাম মুখে মুখে ছড়িয়ে গেছে, নীলাদ্রি।

মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে শুয়ে থাকা লেকটি।  সোর্স: পাগলের দল

ভ্রমণপিয়াসুরা একে নীলাদ্রি নামে ডাকলেও এর আসল নাম হলো শহীদ সিরাজ লেক। আমিও নীলাদ্রি নামেই লেকটিকে দেখতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওখানে গিয়ে জানতে পারলাম আরো গভীর কিছু ঘটনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ৫ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর সাব সেক্টর ছিল টেকেরঘাট। মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম ছিলেন এই সাবসেক্টর টেকেরঘাটের কমান্ডার।

সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হলে তাঁকে কবর দেওয়া হয় এই টেকেরঘাটে। তাই এককালের চুনাপাথরের খনি যখন লেকে পরিণত হয়, তখন এর নামকরণ করা হয় শহীদ সিরাজ লেক। মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য এই কমান্ডারকে বীর বিক্রম উপাধীতে ভূষিত করা হয়েছিল। এই লেকের পাড়েই আছে শহীদ সিরাজের সমাধি।

লাইমস্টোন মানে হলো চুনাপাথর। বেশ দামি এই খনিজ সম্পদটির কোয়ারি ছিল এই শহীদ সিরাজ লেক। স্থানীয়রা তাই লেকটিকে কোয়ারি লেক বলে ডাকেন।
একসময় এই কোয়ারি খনির চুনাপাথর ডিনামাইট ফাটিয়ে নিচ থেকে তোলা হতো।

চুনাপাথরের পরিত্যক্ত এই খনিটি থেকে লাইমস্টোন তুলে তুলে অনেক গভীর করে ফেলেছে। ফলে এর গভীরতা অনেক বেশি। একসময় পর্যটকরা হাওর পাড়ি দিয়ে এই লেকে নেমেই দাপাদাপি করতো। কিন্তু বেশ ক’জন ভ্রমণকারী এখানে ডুবে মারা যাওয়ায় এখন লেকের পানিতে নামা বারণ।

প্রতিবিম্ব।  সোর্স: পাগলের দল

তাতে অবশ্য কিছুই যায় আসে না। হাওর আর লেকের মাঝামাঝি জায়গায় গাঢ় সবুজ ঘাসে ঢাকা কিছু টিলা আছে। এই টিলায় বসে শহীদ সিরাজ লেকের যে রূপ চোখে দেখেছি, তার কোনো তুলনা হয় না। লেকের ওপারের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে বাংলাদেশের শেষ সীমানা। বড় উঁচু পাহাড়টির প্রতিবিম্ব লেকে দারুণ দেখায়। মেঘালয়ের কোমরে বাংলাদেশ-ভারতের সীমানা স্বরূপ কাঁটা তারের বেড়া দেওয়া আছে। ওপাশে যাওয়াও বারণ।

প্রথমে এই লেকটি আমার চোখে খুব সাধারণ একটা জলাশয় হিসেবেই ধরা দিয়েছিল। মোটরবাইক ভাড়া করে যখন বারিক্কা টিলার দিকে যাচ্ছিলাম, তখনই লেকটি চোখে পড়েছিল। কিন্তু তখন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে এটিই বিখ্যাত “নীলাদ্রি লেক”। রীতিমতো নাক সিঁটকেছিলাম তখন। পরে বেলা পড়ে যাওয়ার পরে যেন নিমেষে ভোল পাল্টে ফেললো লেকটি।

গাঢ় সবুজ ঘাসে ঢাকা কিছু টিলায় বসে বসে বই পড়ি। সোর্স: পাগলের দল

টেকেরঘাটে যখন সন্ধ্যা নেমেছে, তখন আমরা সারাদিনের ঘোরাঘুরির পর শহীদ লেকের দিকে পা বাড়ালাম। হাঁটতে হাঁটতে কখন কাদায় পা ফেলেছি, নিজেই জানি না। সাবধানে লেকের পানিতে পা ধুয়ে পাশের টিলায় উঠে এলাম। আগেই বলেছি, এখানে কিছু সবুজ ঘাসে মোড়ানো টিলা আছে। ওখানটায় কেউ আয়েশ করে বসে আছে, কেউ বা শুয়েই পড়েছে।

শুয়ে শুয়ে গোধূলীর আকাশের মেঘের ঘটায় ডানাওয়ালা পরী, ঈগল, ঘোড়া ইত্যাদি বিভিন্ন অবয়ব বানাচ্ছে। আমরা পশ্চিম দিকে মুখ করে বসেছিলাম। আর দেখছিলাম, মেঘালয় পাহাড়ের কোলে মেঘকে বিভিন্ন রঙে রাঙিয়ে দেওয়া সূর্যটার অস্তগমন। হঠাৎ ইভা পেছনের দিকে দেখিয়ে বললো, ‘ওই দেখ!’

দেখলাম, পূর্বদিকে বিশাল বড় এক চাঁদ উঠছে। স্বাভাবিক সময় যতটুকু দেখায়, তার চেয়ে অনেক বড়। আমি আগেও দেখেছি, পূর্ণিমার সময়ে যখন পূর্বাকাশে চাঁদ ওঠে, তখন খুব বড় আর লালচে দেখায়। ঠিক মাথার উপর উঠে গেলে অবশ্য আবার ছোট হয়ে যায়। কিন্তু হাওড়ের চাঁদ মাথার উপরে উঠলো, তখনো যেন বড়ই থেকে গেল। পরদিন আমরা বাসে করে ঢাকায় ফেরার সময়ে দেখেছি, চাঁদটা আর হাওড়ের চাঁদের মতো বড় দেখাচ্ছে না।

বেলা পড়ে যাওয়ার পরে যেন নিমেষে ভোল পালটে ফেললো লেকটি।  সোর্স: পাগলের দল

চাঁদটা যখন পূর্বাকাশে পাহাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো, পশ্চিমাকাশে তখনো সূর্য অস্ত যাচ্ছে। পাহাড় সারি, দিগন্ত বিস্তৃত হাওর, শহীদ সিরাজ লেক, গোধূলিতে পরিষ্কার নীল আকাশে মেঘের খেলা, একই সাথে চাঁদ আর সূর্যের অপরূপ দৃশ্য দেখার জন্য এরচেয়ে ভালো জায়গা আর কী হতে পারে, খুঁজে পাচ্ছি না।

পাহাড়ে ঝপ করে রাত নামে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হলো না। বিশ্ব চরাচর অন্ধকারে ডুবে গেলেও শহীদ সিরাজ লেকের আকাশ অদ্ভুত রক্তিম আভায় ছেয়ে রইল। যেন শহীদের রক্তে নিজেকে রাঙিয়ে নিয়েছে টেকেরঘাটের আকাশটা।

মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ।সোর্স: পাগলের দল

লেকের পাশেই একটি স্মৃতিসৌধ আছে। মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ। লেকের আশেপাশের এলাকাটি নিয়ে পার্ক বানানোর ভাবনা আছে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের। প্রথমে সেটির নাম নীলাদ্রি ডিসি পার্ক রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এমনকি ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল এই নামেই।

তবে এখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে শহীদ সিরাজের নামে নামকরণ করা এই লেক নিয়ে তৈরি পার্কের নামও শহীদ সিরাজের নামে হবে। আমাদের এই বীরের প্রতি সম্মান দেখিয়ে আসুন সবাই লেকটিকে নীলাদ্রি লেক হিসেবে না চিনে শহীদ সিরাজ লেক নামেই চিনি। একজন বীর বিক্রমের প্রতি যেন অবমাননা না করা হয়, তার জন্য তো আমরা এটুকু করতেই পারি। পারি না?

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা সুনামগঞ্জ সরাসরি বাস সার্ভিস আছে। ভাড়া ৫৫০ টাকা করে। যাওয়া আসা মামুন পরিবহনে করলে, যাওয়ার সময় ভাড়া পড়বে ৪৫০-৫০০ টাকা, আসার সময় ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৪০০-৪৫০ টাকা। সুনামগঞ্জ থেকে বাইক বা লেগুনায় তাহিরপুর আসতে হবে। ভাড়া পড়বে ৮০ টাকা।

ট্রলার ভাড়া করে টাঙ্গুয়ার হাওর ঘুরে ট্যাকেরঘাট। ভাড়া ট্রলারের আকারের উপর নির্ভর করবে। টেকেরঘাট থেকে হেঁটেই শহীদ সিরাজ লেকে যাওয়া যাবে। দশ মিনিটের হাঁটাপথ।

যেন শহীদের রক্তে নিজেকে রাঙিয়ে নিয়েছে ট্যাকেরঘাটের আকাশটা।  সোর্স: পাগলের দল

কয়েকজন মাঝি, লেগুনা ড্রাইভার এবং বাইক ড্রাইভারের নাম আর ফোন নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি।

লোকমান মাঝি (সোনালি পরিবহন)
মোবাইল: 01736447984
তার ট্রলার টা ৭-৮ জনের জন্য

পরাণ মাঝি
মোবাইল: 01718168314
এর ট্রলার ২০ জনের, মোটামুটি বড় সাইজের

বনি ইয়ামিন (তাহিরপুর এর লেগুনা ড্রাইভার)
মোবাইল: 01997699824

আকতাস (টেকেরঘাট এর বাইক ড্রাইভার)
মোবাইল: 01761214673

সতর্কতা:

পাহাড়, হ্রদ, কিংবা ঝর্ণা- যেখানেই যাই না কেন, সব জায়গাতেই দেখেছি প্রচুর অপচনশীল বস্তু যেখানে সেখানে পড়ে আছে। লোকে ঝর্ণার পানিতে গোসল করতে গিয়ে শ্যাম্পু ব্যবহার করে, সেই শ্যাম্পু-সাবানের প্যাকেট সেখানেই ফেলে আসে।

এসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। যে কোনো পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।

ফিচার ইমেজ: পাগলের দল

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দিগন্তের সাথে বিছনাকান্দি ও রাতারগুল ভ্রমণ

হিমালয়ের নৈসর্গিক শহর মানিকারান উপাখ্যান