সপ্তদশ শতকের ঢাকার কেন্দ্রীয় মসজিদ চকবাজার শাহী মসজিদ

তাঁতি বাজার থেকে রিকশায় করে চকবাজার যাচ্ছিলাম। চকবাজারের কাছাকাছি এসে লম্বা জ্যাম দেখে এক মোড়ে নেমে পড়লাম রিকশা থেকে। যেহেতু হেঁটে গেলে পাঁচ মিনিট লাগবে, তাই হেঁটেই যাব।
রিকশা থেকে নামার সময়ে একটা সোনালি রঙের চমৎকার গম্বুজ চোখে পড়লো। তাসমিকে বললাম, ‘গম্বুজটা কী সুন্দর, দেখ! চল একটু দেখে আসি।’
সামনে এগিয়ে গেলাম। সাদার মধ্যে সোনালি কাজ করা চমৎকার একটা মসজিদ। দেখে মনে হচ্ছিল, নতুন বানানো। কিন্তু এই ভেবে মন খচখচ করছিলো যে, এই ধরনের ডিজাইনে এখনকার মসজিদ বানাতে তো দেখিনি। দেখে টেখে ফিরে গেলাম নিজের কাজে। মসজিদের নাম জানা হলো না।

চকবাজার শাহী মসজিদ। সোর্স: লেখিকা

এর অনেক দিন পর একদিন একা একাই পুরান ঢাকা ঘুরে বেড়াতে বেরিয়েছি। গুগল ম্যাপ দেখে ঠিক করে নিয়েছি, কোনটার পর কোনটা দেখব। ম্যাপে দেখলাম, হোসেনি দালান থেকে অল্প একটু দূরে চকবাজার শাহী মসজিদ। ঠিক করলাম, অযথা রিকশা ভাড়া খরচ করব না। হেঁটেই যাব। লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে করতে হোসেনি দালান রোড ধরে চক সার্কুলার রোডের দিকে হেঁটে যাচ্ছি। রাস্তার পাশে একটা মাজার দেখতেই চট করে ছবি তুলে নিলাম। পুরান ঢাকায় বুঝি অলিতে গলিতে মাজার।
মাক্কুশা মাজার। সোর্স: লেখিকা

মসজিদের কাছাকাছি এসে থমকে গেলাম। এটা তো ওই মসজিদটাই, আগে একদিন এসে যে দেখেছি! সেদিন বুঝতেই পারিনি এই মসজিদ প্রায় চারশ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। মসজিদটি এখন আধুনিক ঔজ্জ্বল্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাই ভেবেছিলাম এটি বর্তমান কালে বানানো।
মসজিদে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে ধারণা করা হয়, সুবাদার শায়েস্তা খান চকবাজারের পশ্চিম প্রান্তে ১৬৭৬ সালে এই মসজিদ নির্মাণ করেন। সুবাদার এই মসজিদ নির্মাণের মধ্য দিয়েই চকবাজারের উদ্বোধন করেছিলেন। ঢাকার নায়েবে নাজিমরা চকবাজার জামে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়তেন। এই মসজিদ এখন চকবাজার শাহী মসজিদ নামে পরিচিত।
মসজিদের মূল প্রবেশদ্বার। সোর্স: লেখিকা

শায়েস্তা খান একজন খ্যাতিমান নির্মাতা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তিনি দক্ষিণ ভারতীয় রীতি এ দেশে জনপ্রিয় করে তোলেন। তিনি এই মসজিদের দেয়াল মোগল রীতি অনুযায়ী পুরু করে তৈরি করেছিলেন। প্রবেশ দরজার খিলানগুলো বানিয়েছিলেন চওড়া আর প্রশস্ত। এই ধরনের রীতি প্রচলিত ছিল আওরঙ্গবাদ ও আহমদ নগরে। মোগল মসজিদগুলো সাধারণত মাটি থেকে উঁচু প্লাটফর্মের ওপর তৈরি করা হতো। চক মসজিদটির প্লাটফর্ম ছিল মাটি থেকে দশ ফুট উঁচুতে। আদিতে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ছিল ৫০ ফুট আর প্রস্থ ২৬ ফুট।
এই মসজিদটিই সম্ভবত বাংলায় উঁচু প্লাটফর্মের উপর নির্মিত প্রাচীনতম ইমারত-স্থাপনা। প্লাটফর্মটির নিচে ভল্ট ঢাকা কতগুলো বর্গাকৃতি ও আয়তাকৃতি কক্ষ আছে। এগুলোর মাথার উপরে খিলান ছাদ রয়েছে, যার উপরের অংশ সমান্তরাল। ধারণা করা হয়, এই মসজিদের প্লাটফর্মের নিচের কক্ষগুলোতে মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের আবাসন ছিল। এ ধরনের ভবনগুলোকে বলা হয় ‘আবসিক-মাদ্রাসা-মসজিদ’।
বাংলায় উঁচু প্লাটফর্মের উপর নির্মিত প্রাচীনতম ইমারত-স্থাপনা। ছবিটি দেখে বোঝা যাবে, এটি ঠিক কতো উঁচু প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে। পুরান ঢাকার তারের বহরও দেখা যাবে। সোর্স: লেখিকা

মসজিদের দুইপাশে দুটি আর মাঝখানে ছিল চারটি খিলান। চারকোণে চারটি প্রান্ত বুরুজের ওপর ছোট ছোট মিনার। মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোণে ছিল সুউচ্চ মিনার। এই মিনারের নিচেই মসজিদের প্রধান প্রবেশ দ্বার। দক্ষিণ দিক দিয়েও মসজিদে প্রবেশ করা যেত। পূর্ব দিকে তিনটি প্রবেশ পথ রয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রবেশ পথের সামনে একটি অর্ধগম্বুজ ভল্ট রয়েছে। ভল্টে চমৎকার নকশা শোভিত। সেই যুগে চক মসজিদ ঢাকার কেন্দ্রীয় মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মাইকের প্রচলন না থাকায় আজান দেওয়া হতো উঁচু মিনার থেকে। কাছাকাছি অন্যান্য মসজিদের মুয়াজ্জিনরা চক মসজিদের আজান শুনেই আজান  দিতেন।
রমজান বা ঈদের চাঁদ দেখা গেলে এই মসজিদের সামনে থেকে তোপধ্বনি দেওয়া হতো। রমজান মাসে তারাবির নামাজের সময় ঝাড়বাতির আলোয় আলোকিত করা হতো মসজিদের ভেতরটা। ইফতারির সময় বিভিন্ন বাড়ি ও দোকানপাট থেকে ইফতারি আসত মসজিদে। আরেকটি সামাজিক রীতি ছিল চক মসজিদকে ঘিরে। জুম্মার নামাজের দিন চারপাশের বাড়ি থেকে মিষ্টান্ন পাঠানো হতো। নামাজ শেষে বিতরণ করা হতো এই মিষ্টান্ন।
মসজিদটি একাধিকবার সম্প্রসারণ করা হয়েছে। তবে এই কাজের সময় আদি ভবন অক্ষত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এই মসজিদে এখন দুটি মিনার আছে। এর একটিতে রয়েছে সিরামিকের ভাঙা টুকরোর কারুকাজ। এটি আয়তনে ছোট। এর চেয়ে বড় মিনারটি লালরঙা। মসজিদের মূল ভবনের বাইরের দেয়ালে রয়েছে কালো রঙের একটি ফলক। এই ফলকটি যে দেয়ালে রয়েছে সেটি আদি মসজিদের দেয়াল। আদি মসজিদের রূপ দেখতে হলে মসজিদের একেবারে ভেতরে ঢুকতে হবে। আমি যেহেতু মেয়ে, মসজিদের ভিতরে ঢুকে আর দেখা যায়নি। আরো একবার আক্ষেপ জাগলো এই ভেবে যে, কেন বাংলাদেশের মসজিদগুলোতে মেয়েদের ঢোকার অনুমতি নেই।
মসজিদটির আদি গড়নে ছিল তিনটি গম্বুজ। সোর্স: লেখিকা

বর্তমানে মসজিদটির উত্তর দেয়াল ভেঙে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। আর পূর্বদিকের বাড়তি অংশে নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন। এই তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির গম্বুজ ভেঙে আরেকটি তলা নির্মাণ করা হয়েছে। দ্বিতল ছাদের ওপর নতুন তিনটি গম্বুজ নির্মাণ করা হয়েছে।
এক সময় চক মসজিদের সামনে একটি খোলা আঙিনা ছিল। এখন আঙিনাকে ঘিরে মসজিদের আয়তন বাড়ানো হয়েছে। মসজিদের আয়তন এখন আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। মসজিদের তিন প্রবেশপথের সমান্তরালে পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি মিহরাব। অবশ্য মিহরাবগুলোর আদিরূপ অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এগুলো নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবটি আদি বৈশিষ্ট্য রেখেই অর্ধ অষ্টকোণাকৃতি করা হয়েছে। বাকি দুটো আয়তকার। মিহরাবগুলো আধুনিক টাইলস দিয়ে মোড়ানো। উত্তর-পূর্ব কোণের সুউচ্চ মিনারটির উচ্চতা বর্তমানে আরো বাড়ানো হয়েছে।
মসজিদের পিছনেত দিক৷ সোর্স: লেখিকা

মসজিদটির আদি গড়নে ছিল তিনটি গম্বুজ। বিভিন্ন সময়ে সংস্কারকার্য ও নির্মাণ সম্পাদনের ফলে বর্তমানে এর আদি রূপটি আর দেখা যায় না। মসজিদের ভিতরকার নকশা তিনটি বে’তে বিভক্ত ছিল, যার মাঝখানের বে ছিল বর্গাকার, কিন্তু দুপাশের বে ছিল আয়তাকার। তিনটি বে’র উপরেই গম্বুজ দিয়ে আচ্ছাদিত ছিল, মাঝখানের গম্বুজটি ছিল তুলনামূলক বড় আকৃতির। কেন্দ্রীয় মেহরাবটি অষ্টকোণাকৃতির, যা সংস্কারের পরে এখনো সেরকমটাই রয়েছে।
মসজিদটিতে একটি শিলালিপি রয়েছে, যেখানে মসজিদের ইতিহাস সম্পর্কে তথ্য রয়েছে। হরিনাথ দে এই লেখাটির ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন। সেই ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে পঙ্কতিটির মানে যা দাঁড়ায়-

“সত্যের পথে থাকা বাদশাহদের বাদশাহ
শায়েস্তা মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন আল্লাহ্‌র ইবাদতের উদ্দেশ্য।
কথাটা আমি জানালাম এর নির্মাণের সময়কাল জানতে আগ্রহী অনুসন্ধানকারীকে।
এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছিল খোদার নিয়ামতেই।”

সোনালি রঙের কারুকাজের বর্ডার করা চমৎকার তিনটি গম্বুজ। সোর্স: লেখিকা

পুরান ঢাকা মানেই চিপাগলি আর ঝুলে থাকা তারের বহর। চিপাগলির কোণায় দাঁড়িয়ে, তারের ফাঁক ফোকর গলে যতটুকু সম্ভব হয়েছে, মসজিদটির আলোকচিত্র ধারণ করেছি। তবে ছবিতে এর রূপের অর্ধেকটুকুও উন্মোচিত হয়নি।
তথ্যসূত্র :
http://archive.prothom-alo.com/detail/news/88407
ফিচার ইমেজ: মাদিহা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

পেয়ারা বাজারের ভাসমান সবুজ স্বর্গরাজ্যে

মোংলায় ক্যাম্পিং ও সুন্দরবনে ডে ট্রিপ