সিঙ্গাপুরের বিনোদন স্বর্গ সেন্টোসা আইল্যান্ড

এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ সিঙ্গাপুর। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এ দেশটি একটি ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্র। মাত্র ৬৯৯ বর্গ কিলোমিটারের এ দেশটি এশিয়ার ব্যস্ততম বন্দরের একটি। আশির দশকেই উন্নত দেশের মর্যাদা লাভ করা সিঙ্গাপুর শহর পুরোটাই দর্শনীয় স্থান বলা যায়। তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রম সেন্টোসা দ্বীপ।

প্রতিবছর কৃত্রিমভাবে নিজেদের জায়গা বাড়ানোর চেষ্টায় আছে এ দেশটি। আর এর মধ্যেও প্রায় পাঁচ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের সেন্টোসা আইল্যান্ডটি তৈরী করা হয়েছে বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে। মানতেই হবে মানবসৃষ্ট বিস্ময়কর সব স্থাপনা তৈরীতে সিঙ্গাপুর পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশ।

সেন্টোসা আইল্যান্ডের মারলিওন; ছবি- singapore-guide.com

সমুদ্র সৈকত, রিসোর্ট, ক্যাসিনো, অ্যাডভেঞ্চার একটিভিটিজ, ইউনিভার্সাল স্টুডিও, আন্ডারওয়াটার একুরিয়াম, বাটারফ্লাই পার্ক সহ অসংখ্য বিনোদনের খোরাক দিয়ে ভরপুর এ ছোট্ট দ্বীপটি। মূল ভূখন্ড থেকে একটু দূরে সেন্টোসা আইল্যান্ডে যেতে হলে আপনাকে প্রথমে আসতে হবে হারবার পয়েন্টে। সেখান থেকে সেন্টোসা আইল্যান্ড যাবার জন্য ট্রেন পাবেন, যেটা কয়েক মিনিটের মধ্যেই আপনাকে পৌঁছে দেবে এই দ্বীপে।

এছাড়া আরেকটি পদ্ধতিও আছে। শহর থেকে সরাসরি ক্যাবল কারে পৌঁছে যেতে পারবেন এখানে। পুরো সিঙ্গাপুর শহরটাই ওপর থেকে দেখতে পারবেন। শহরের সুউচ্চ অট্টালিকাগুলোতে আছে দূরের সমুদ্র ও সমুদ্রগামী জাহাজগুলোকেও দেখতে পারবেন ক্যাবল কার থেকে। তবে এজন্য গুনতে হবে ৩২ এসজিডি, বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২,০০০ টাকা। খরচ কমাতে ট্রেনে করে যাওয়াই ভালো।

সেন্টোসাতে ঘুরে বেড়ানোর জন্য পায়ে হাঁটতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বাসে করেও যেতে পারবেন। সর্ব দক্ষিণের প্রান্তে রয়েছে এশিয়ার দক্ষিণাংশের শেষ বিন্দু পালাওয়ান সৈকত। বেশ লম্বা একটি কাঠের সেতু ওঠে সমুদ্রের পানি পার হয়ে আসতে হবে এখানে।

যাওয়া যায় ক্যাবল কারে চড়েও; ছবি- singapore-guide.com

সেন্টোসা আইল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গাগুলোর একটি হচ্ছে সাইলোসো সৈকত। নীল পানির আর সাদা বালির চমৎকার এ সৈকত আপনাকে ভুলিয়ে দেবে আপনি মনুষ্যসৃষ্ট একটি দ্বীপের সৈকতে দাঁড়িয়ে আছেন। এখানে আছে অনেকগুলো মজার মজার সব জিনিস। বাঞ্জি জাম্পিং, ইনডোর স্কাইডাইভিং, ওয়াটাজেটপ্যাকিংয়ের মতো অ্যাডভেঞ্চার আছে এখানে। আর এসব করতে না চাইলে সৈকতে ভলিবল বা ফ্রিসবি খেলেও সময় কাটাতে পারেন।

দ্বীপ আর সৈকত নিয়ে তো অনেক কথা হলো, এবার যাওয়া যাক ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে। সেন্টোসা আইল্যান্ডের প্রধান আকর্ষণ এ স্টুডিও। বিশেষ করে আপনার সাথে যদি বাচ্চা-কাচ্চা থাকে, তবে এখানে আসতে ভুলবেন না। পুরো জায়গা ঘুরে দেখতে অনেক সময় লাগবে, তাই হাতে সময় নিয়ে ঢুকতে হবে।

হলিউডের ইউনিভার্সাল স্টুডিওর আদলেই গড়ে উঠেছে সিঙ্গাপুরেরটাও। বিখ্যাত সব ছবির স্টেজগুলো তো আছেই, সঙ্গে বোনাস হিসেবে আছে মজার মজার সব রাইড। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ট্রান্সফরমার ছবির সাইফাই সিটি। রাইড করতে পারবেন অপ্টিমাস প্রাইমের সাথে। ওয়াক অব ফেমে দেখা মিলবে বিখ্যাত সব নায়ক নায়িকার বেশ ধারণ করা মানুষেরও।

ইউনিভার্সেল স্টুডিও; ছবি- singapore-guide.com

মোট সাতটি জোনে ভাগ করা আছে এ বিশাল স্টুডিও। হলিউড, এনসেইন্ট সিটি, সাইফাই সিটি, এনসেইন্ট ইজিপ্ট, জুরাসিক পার্ক, মাদাগাস্কার, ফার ফার অ্যাওয়ে এ সাত জোনকেই সাজানো হয়েছে মজার মজার রাইড দিয়ে। এই স্টুডিওর প্রবেশ মূল্য ৫৫ মার্কিন ডলার, তবে ভেতরের সবগুলো রাইডই ফ্রি থাকে এর সাথে।

তবে মনে রাখতে হবে সবগুলো রাইডেই বেশ ভিড় থাকে। বিশেষ করে জনপ্রিয় রাইডগুলোতে, তাই হিসেব নিকেশ করে রাইডে চড়তে হবে। আর কিছু কিছু রাইড এতই ভয়াবহ যে দুর্বল চিত্তের কারো না ওঠায় ভালো। জুরাসিক পার্কে পানির মধ্যে দিয়ে অসংখ্য ডাইনোসারের আক্রমণের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, সেটাও মনে রাখবেন।

এশিয়ার সর্বদক্ষিণের বিন্দু; ছবি- singapore-guide.com

সেন্টোসা আইল্যান্ডে এগুলো ছাড়াও বেশ কিছু অ্যাডভেঞ্চার একটিভিটিজ রয়েছে। যার মধ্যে মেগা জিপলাইন অন্যতম। অনেক উঁচু থেকে জিপলাইনের মাধ্যমে দূরের একটি দ্বীপে পৌঁছাতে পারবেন। এসময় গতিবেগ উঠবে ঘণ্টায় প্রায় ৬০ কিমি। মেগা জিপলাইনের জন্য আপনাকে যেতে হবে সাইলোসে সৈকতে।

আছে কায়াকিংয়ের ব্যবস্থা, এক ঘণ্টার জন্য কায়াক নিয়ে নেমে যেতে পারেন সমুদ্রে। আর যদি নতুন কিছু চেষ্টা করে দেখতে চান তাহলে স্ট্যান্ড আপ কায়াক চেষ্টা করে দেখতে পারেন। সাধারণ কায়াকের সাথে এর পার্থক্য হচ্ছে এটাতে দাঁড়িয়ে থেকে প্যাডেল করতে হয়, ফলে অনেক বেশি বল প্রয়োগ করতে হয়।

খাওয়া-দাওয়া নিয়েও ভাবতে হবে না। এ দ্বীপে অন্তত ১০০টি খাওয়ার ভিন্ন ভিন্ন রেস্তোরাঁ আছে। যেখান থেকে আপনি আপনার বাজেট ও পছন্দমতো খেয়ে নিতে পারবেন। আর যদি রাতে এখানে থাকতে চান তাহলে এই দ্বীপের সাতটি রিসোর্টের একটিতে থাকতে পারেন। বলার অপেক্ষা রাখে না এগুলোতে অনেক খরচ পড়বে, সবচেয়ে কম খরচ লা মেরিডিয়ানে।

পানির নিচের জগৎ দেখার জন্য একটি আন্ডার ওয়াটার ওয়ার্ল্ড রয়েছে যেটাতে ঢুকে হেঁটে যেতে পারবেন পানির মধ্য দিয়ে করা একটি রাস্তা ধরে। কাঁচের পর্দার মধ্য দিয়ে দেখতে পারবেন বিভিন্ন জলজ প্রাণী যার মধ্যে হাঙ্গর মাছও থাকে। এছাড়া বিশালাকৃতির কাঁকড়া, স্কুইড, অক্টোপাস সহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর দেখা পাবেন।

মেগা জিপলাইন; ছবি- singapore-guide.com

মনে রাখবেন প্রতিটি জায়গায় প্রতিটি রাইড বা অংশে ঢুকতে আলাদা প্রবেশ মূল্য লাগবে। কী কী দেখবেন সেটা আগে থেকেই প্ল্যান করে তারপর যাবেন। আর যদি কোনো টাকা খরচ না করে ঘুরতে চান তারও ব্যবস্থা আছে। সেন্টোসায় প্রবেশ ২০২০ সাল পর্যন্ত ফ্রি রাখা হয়েছে। অধিকাংশ সৈকতে বিনামূল্যেই ঘোরা যাবে। আর ফোর্ট অংশ ও তার মিউজিয়ামও ফ্রি আছে, সেগুলোও দেখতে পারেন।

সব মিলিয়ে সেন্টোসা সত্যিই একটি বিনোদন স্বর্গ। এমনিতেই সিঙ্গাপুরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চেয়ে খরচ বেশি, তাই সেন্টোসাতেও খরচ বেশিই পড়ে। তবে উপভোগ করার মতো একটি জায়গা এ দ্বীপটি।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গোমুখ অভিযান: ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও চিরবাসা

ঘুরে আসুন সিঙ্গাপুরের পাঁচটি স্বর্গীয় দ্বীপ থেকে