ব্যাকপ্যাকিংয়ে ব্যাকপ্যাক বাছাই

আজকাল ব্যাকপ্যাকার্স ট্রাভেলারের সংখ্যা বাড়ছে। নিজের মতো করে প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে ব্যাকপ্যাকিংয়ের সব থেকে অন্যতম যে উপদান দরকার হয় সেটি হচ্ছে নিজের জন্য একটি আরামদায়ক ব্যাকপ্যাক। খুব বেশী বড় ব্যাগ কিনে ফেললে হয়তো অকারণেই অতিরিক্ত ওজন বহন করতে হবে।

বাসে, প্লেনে ব্যাগের জন্যেই হয়তো দরকার হবে আলাদা একটা সিট, আবার খুব ছোট কোনো ব্যাগ নেবার জন্য হয়তো দরকারী অনেক কিছু বহন করতে পারছেন না। তাই পথের মধ্যে বিপদে পড়া ছাড়া উপায় থাকবে না। আজকাল ব্যাগের ব্যাজারে এত রকম সুযোগ সুবিধা যুক্ত হয়েছে স্বাভাবিকভাবে কোনটা আপনার জন্য উপযোগী সেটা খুঁজতেই কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়তে হয়।



© The Straits Times graphics 

আবার নিজের উচ্চতা বা ভারবাহন ক্ষমতা না জেনে বিশাল ১০০ লিটার সাইজের ব্যাগ নিয়ে ফেললেও পড়ে যেতে হবে বিপদে। কোথায় যাচ্ছেন, সেখানকার আবহাওয়া কেমন, শুধু ঘুরতে যাচ্ছেন  নাকি ট্রেকিংয়ে যাচ্ছেন এসব কিছু বিচার করেই ব্যাগ নির্বাচন করাটা অত্যন্ত জরুরি। ব্যাকপ্যাকিংয়ে মূলত একটা ব্যাগেই থাকে পর্যটকের সমস্ত রসদ। সেটা কাধে করে নিজেকেই হেঁটে চলতে হয় অচেনা অজানা দুর্গম পথগুলোতে।

তাই ব্যাকপ্যাকিংয়ের ব্যাগ হিসেবে যে ব্যাগপ্যাক আপনি বাছাই করবেন সেটা হতে হবে আপনার উপযোগী। আবার অন্যের কোনো দামি ব্যাগপ্যাক আপনার অসুবিধার কারণ হতে পারে। তাহলে কী কী দেখে বাছাই করবেন নিজের জন্য আরামদায়ক একটি ব্যাগপ্যাক?

পানি নিরোধী উপাদান:

দীর্ঘদিনের কোনো ট্রেইলে হাঁটতে না গেলে আপনার ব্যাকপ্যাকটি ১০০% পানি নিরোধী হবার প্রয়োজন নেই। তবে ব্যাগ নেয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে সেটি তৈরির উপাদানটি যেন মোটামুটি রকম পানিরোধক হয়ে, যাতে করে এর উপরে কিছু পানি পড়ে গেলে বা হঠাৎ বৃষ্টিতে পড়লে যেন সব কিছু ভিজে না যায়। যে উপাদান দিয়ে ব্যাগপ্যাকটি তৈরি সেটি যেন দীর্ঘক্ষণ ভেজা অবস্থায় না থাকে।

নাইলন সুতোর তৈরি উপাদানের ব্যাগ সাধারণত দ্রুত শুকায় ও ওজনে কম হয়ে থাকে। কেনার সময় এর উপর পানি ছিটিয়ে পরীক্ষা করে নিলে সব থেকে ভালো হয়। তবে আপনি যদি দীর্ঘদিনের সফরে বের হয়ে থাকেন ও প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটাতে হয় তবে অবশ্যই সম্পূর্ণ পানিনিরোধী উপাদানে তৈরি ও ভালো রেইন কাভার সাথে থাকতে হবে।


জিপার:

ব্যাগের সব থেকে বেশী ব্যবহৃত বস্তুটি হলো এর জিপার। আপনি যে কোনো কাজে ব্যাগ ব্যবহার করতে চাইলেই জিপারের ব্যবহার আগে আসে। তাই আপনার ব্যাগে মাল্টিপল জিপার আছে কিনা পরীক্ষা করে নিন। জিপারে লকিং সিস্টেম আছে কিনা এটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ব্যাগে মূল্যবান কিছু থাকতে পারে। পথে ঘাটে অসাধু লোক আপনার ব্যাগে কিছু ঢুকিয়ে দিতে পারে যা আপনার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

এসব নিরাপত্তার জন্য ব্যাগে লকিং সিস্টেম থাকা দরকার। এছাড়া প্রতিবার জিপার খোলা ও লাগানোর সময় জিপারের ব্যবহার ও ক্ষয় বাড়তে থাকে। তাই কেনার আগে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে ভালোমানের জিপারযুক্ত ব্যাগ আপনি কিনছেন।


কম্পার্টমেন্ট:

ব্যাগপ্যাকিংয়ে অনেক রকম সামগ্রী থাকবে নিজের কাজে। যেহেতু ব্যাগেই থাকবে সব, কিছু তাই একটা জিনিস হুট করে লেগে বসলে খুঁজতে গিয়েই সময় চলে যাবে। তাই ব্যাকপ্যাকে অবশ্যই আলাদা আলাদা কিছু পকেট থাকা দরকার। যেমন স্লিপিং ব্যাগ কম্পার্টমেন্ট, এটি মূলত টেকনিকাল ব্যাকপ্যাকগুলোর নিচের দিকে থাকে। এটি হালকা ও নরম বলে নিচের দিকে এই পকেটের অবস্থান হয়ে থাকে।

মিড পকেটে থাকবে ব্যাগের সব ভারি বস্তু। যেমন রান্না সামগ্রী, পোশাক বা তাবু এবং উপরের দিছে কিছু ছোট ছোট পকেট থাকবে যেগুলোকে বলা হয় কুইক অ্যাকসেস। মানে সব সময় দরকারি জিনিসগুলো এখানেই রাখতে হয় যাতে করে দরকারের সময় খুঁজতে খুঁজতে কাজের সময় না চলে যায়।


ব্যাগের ফ্রেম:

আজকাল ব্যাগের নীচের দিকে এক ধরনের অ্যালুমিনিয়ামের মতো হালকা ধাতু, প্লাস্টিক বা কার্বন ফাইবারের ফ্রেম ব্যবহার করা হয়। এটি মূলত মেরুদন্ডের সাথে হাঁটার সময় ব্যাগ যাতে বেঁকে না যায় তাই দেয়া হয়। এতে করে ব্যাগপ্যাক সোজা অবস্থায় থাকে এবং হাঁটার সময় বেঁকে গিয়ে বাড়তি মোমেন্টের সৃষ্টি করে না। তাই কেনার সময় এই ইন্টার্নাল ফ্রেম আছে কিনা দেখে নেবেন।

কারণ ফাইবার মজবুত ও ওজনে হালকা, তাই এটি নেয়া যুক্তিযুক্ত হবে। এটি আপনার ব্যাগ ও শরীরের ভারসাম্য রাখতে সাহায্য করবে। ব্যাকপ্যাকিংয়ের ক্ষেত্রে যখন দীর্ঘ সময় আপনার ব্যাগ পিঠে থাকবে তখন এই ফ্রেম বাড়তি সাপোর্ট দিয়ে ট্রেকিংকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করবে।

প্যাডেড হিপ বেল্ট:

অধিকাংশ মানুষের ধারণা বা অভ্যাস থাকে ব্যাগের ভর ঘাড়ে করে নেয়া। আসলে আপনি যখন ৭০ লিটারের হ্যাভি ওয়েট একটি ব্যাগ ঘাড়ে করে দুর্গম পাহাড়ে সারাদিন হাঁটবেন  তখন কাঁধের উপর অল্প চাপেই ক্লান্ত হয়ে পড়বেন ও ঘাড়ে ইঞ্জুরি হতে পারে। ব্যাকপ্যাকের ভর মূলত কোমর থেকে হিপের মধ্যে ডিস্ট্রিবিউট করে দিতে হয়। তাহলে সহজে অত্যন্ত ভারী ব্যাগ দীর্ঘক্ষণ বহন করা যায়।

এর জন্য ব্যাকপ্যাকে যদি হিপ বেল্ট থাকে সেটার সাহায্যে ব্যাগটিকে কোমরে আটকে ব্যাগের ভর ছড়িয়ে দেয়া হয়। হিপ বেল্ট প্যাডেড হলে বেল্টটি আটকে বসবে না বরং আরামেই কোমরের চারপাশে জড়িয়ে রাখতে পারবেন।

প্যাডেড শোলডার স্ট্রিপ:

বড় ব্যাকপ্যাকে কাধের বেল্টটি মূলত দেয়া হয় ব্যাগের ভারসাম্য রক্ষার জন্য এবং শরীরের সাথে ব্যাগের ব্যালেন্স বজায় রাখার জন্য। অনেকেই ব্যাগের সমস্ত ভর এর উপর চাপিয়ে দিয়ে অল্পতেইও হাপিয়ে পড়েন। তাই ব্যাগ বাছাই করার সময় খেয়াল রাখতে হবে বেল্টটি যেন প্যাডেড হয়।

বেল্টের মাঝে কমপক্ষে একটি জায়গায় যেন দুটি বেল্ট সংযোগকারী স্ট্রিপ সংযুক্ত থাকে। এবং ব্যাগ ঘাড়ে নেবার পর কমপক্ষে দেড় ইঞ্চি জায়গা কাঁধ ও বেল্টের মধ্যে ফাঁকা থাকে। তাহলেই কাঁধের উপর ব্যাগের লোড না পড়ে কোমর ও হিপের উপর পড়বে।


ব্যাগের সাইজ:

বাজারে ৮ লিটার থেকে শুরু করে ১০০ লিটার বা তার বেশি বড় সাইজের ব্যাগ পাওয়া যায়। তবে আপনার ব্যাগপ্যাকিংয়ের ডিউরেশনের উপর ভিত্তি করে ব্যাকপ্যাক বাছাই করতে হবে। ১-২ দিনের ট্রিপে ১০-২০ লিটার, ২- ৫ দিনের ট্রিপে ২০-৩০ লিটার, ৫-১০ দিনের ট্রিপে ৩৫-৫৫ লিটার, ১০-২০ দিনের ট্রিপে ৬৫-৮০ লিটার বা তার বেশী হলে আপনার সুবিধা অনুযায়ী ৭০-১০০ লিটারের ব্যাকপ্যাক আপনার প্রয়োজন হতে পারে।

তবে অনেকেই অনেক দীর্ঘদিনের ভ্রমণ হয়তো সেই তুলনায় ছোট আকারের ব্যাকপ্যাক দিয়ে করে আসেন। এর জন্যে কয়েকবারের অভিজ্ঞতা হলেই আপনিও বুঝে যাবেন কদিনে আপনার কী কী দরকার হবে ও কোন সাইজের ব্যাগ আপনার প্যাক করতে হবে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নুব্রাভ্যালী ও ক্যামেল সাফারির গল্প… (পার্পল ড্রিম-৩৫)

অপরূপ রূপের সমাহার জার্মানির ন্যাশনাল পার্ক আইফেল