বান্দরবান: পাহাড়ি পথ ধরে বগা লেকের সৌন্দর্যে

“এমন যদি হতো
আমি পাখির মতো
উড়ে উড়ে বেড়াই সারাক্ষণ”

আমরা সবাই যখন মৃদু তালির সঙ্গে অতল জলের গানের এ লাইনগুলো গাইতে গাইতে প্রকৃতির রূপে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে আছি, তখন বাসটি ছুটে চলেছে বান্দরবান শহর থেকে রুমা বাজারের পথে। ঢাকা থেকে আমরা ৭ জনের ছোট্ট দল এসেছি পাহাড়ের দেখা পেতে। পাহাড়ি রাস্তায় কিছুক্ষণ পর পর বাঁক নিয়ে ধীর গতিতে ছুটে চলছে বাস। ড্রাইভারের পাশের জায়গাটুকুতে বসে আমরা ডুবে আছি নিজেদের গান আর প্রকৃতিতে।

রুমার পথে; সোর্স: সানজিদা আলম ইভা

এটি একটি লোকাল বাস। বাসটিতে বেশ কিছু বসার আসন থাকলেও আমরা রোদ উপেক্ষা করে সামনের এ জায়গাটিতেই বসলাম। মূল উদ্দেশ্য, যেতে যেতে এ অঞ্চলের পুরো সৌন্দর্য উপভোগ করা। আমার জন্য পুরো বিষয়টি অবশ্য সবার চেয়ে আলাদা, কারণ এবারই আমার প্রথম পাহাড় দেখা।

৪,৪৭৯ বর্গ কিলোমিটারের পাহাড়ি শহর বান্দরবান। পুরো শহরটিই পাহাড়ে ঘেরা। আর  প্রত্যেকটি পাহাড়ই সবুজ চাদরে মোড়ানো। এখানে নাম না জানা অসংখ্য পাহাড় রয়েছে। কিছু কিছু পাহাড় ঘিরে ভাসতে থাকা মেঘেদের ভেলায় চোখ পড়লে সঙ্গে সঙ্গেই ভুলে যাবেন নির্ঘুম রাত কাটিয়ে আসা আর জার্নির পুরো ক্লান্তির কথা।

পাহাড়ি পথের সৌন্দর্যে; সোর্স: সানজিদা আলম ইভা

বান্দরবান শহর থেকে রুমা বাজার পৌঁছাতে বাসে আমাদের সময় লাগলো ৪ ঘণ্টা। তবে এই দীর্ঘ সময়টি খুব সহজেই কেটে গেল। চারিদিকে ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়, পাহাড়ের বুকে তৈরি হওয়া রাস্তা, মাঝে মাঝেই ভয়ানক বাঁক। কখনো কখনো রাস্তাগুলো এত সরু ছিল যে একই সঙ্গে দুটো গাড়ি যেতে পারছিল না। সব মিলিয়ে বেশ থ্রিলিং এক অনুভূতি পাবেন এটুকু যাত্রায়। তাছাড়া এর মাঝে একবার ১০ মিনিটের বিরতি পাবেন পাহাড়ি এক গ্রামীণ বাজারে।

আমরা যখন রুমা বাজার পৌঁছাই তখন বেলা ১২টা বাজে। রুমা বাজার থেকে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন আমাদের গাইড (ঢাকা থাকাকালীনই তার সঙ্গে কথা বলে ঠিক করে রাখা)। গাইড আমাদের নিয়ে চলে যান রুমা বাজারের আর্মি ক্যাম্পে। এ আর্মি ক্যাম্পের সাথেই রয়েছে ছোট্ট, সুন্দর ও প্রাচীন এক বৌদ্ধ মন্দির। সেটিও ঘুরে দেখে যাবেন।

পাহাড়ি গ্রামীণ বাজার; সোর্স: সানজিদা আলম ইভা

রুমা বাজারের আর্মি ক্যাম্পে নিজেদের বেশ কিছু তথ্য দিয়ে, স্বাক্ষর শেষে আমরা জিপে চেপে বসি। উদ্দেশ্য, আড়াই ঘণ্টার পথ পেরিয়ে কমলা বাজার পৌঁছানো। বেলা হলেও তখনো পাহাড়ের মাথায় ভেসে ছিল অসংখ্য শুভ্র মেঘ। সবুজে মোড়ানো একেকটি পাহাড়ের বুকে দেখা পেলাম নাম না জানা অসংখ্য চমৎকার সব ফুলের।

নানা রঙের সেসব ফুলেরা পাহাড়ের বুকে আরো অদ্ভুত সৌন্দর্যের ছবি এঁকে রেখেছে। এত সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে পথটা স্বপ্নের মতোই কেটে গেলো। যদিও পথে ঘোর কাটিয়ে দুইবার নামতে হলো, আর্মি ক্যাম্পে তথ্য দিয়ে স্বাক্ষর করার জন্য। সে সময় শুকনো কিছু খাবারও খেয়ে নিয়েছিলাম সবাই। কারণ দুপুরের খাবার খেতে হবে বগা লেকে পৌঁছে, আর যাত্রা তখনো অনেকটা পথের।

খাড়া পাহাড়ি পথ; সোর্স: সানজিদা আলম ইভা

কমলাবাজার যখন নামলাম তখন আমাদের মাথার উপর প্রচণ্ড রোদ। সামনেই ভীষণ খাড়া এক পাহাড়। অনেকেই দেখলাম হাঁপাতে হাঁপাতে নেমে আসছেন সেই পাহাড় বেয়ে, হাতে বাঁশের লাঠি। আমরা সবাইও তাদের মতো বাঁশের লাঠি কিনে নিয়ে সামনের খাড়া পাহাড়টির দিকে পা বাড়ালাম।

২ কিলোমিটার খাড়া এই পাহাড়টি বেয়ে উঠতে সময় লাগে প্রায় ৪০ মিনিট। তবে আমাদের কাছে এই কথাটি নেহাত গল্প মনে হলো। কারণ আমাদের সময় লাগলো প্রায় দেড় ঘণ্টা। রাস্তার কাজ চলছে তখন, পুরো পথটিই শুকনো বালিতে ভরা। হাঁটতে গিয়ে প্রায়ই নিচের দিকে পা সরে যাচ্ছিল আমাদের। শুনতে সাধারণ মনে হলেও বিষয়টি আসলে বেশ ভয়ানক। তাছাড়া মাথার উপর প্রচণ্ড রোদ আরো কঠিন করে ফেলেছিল পথটি।

আকাশের রং মেশা বগা লেকের সৌন্দর্য; সোর্স: লেখিকা

তবে এই কঠিন পথ পেরিয়ে যখন চোখে বগা লেকের নীলচে-সবুজাভ জলের দেখা মিলবে তখন এক ঝটকায় সমস্ত ক্লান্তি মিইয়ে যাবে দূরে কোথাও। আমার জন্য এটি ছিল অনেকটা জাদুকরী কোনো মুহূর্তের মতো। এবারই প্রথম পাহাড় ট্রেকিং। রোদ থেকে বাঁচিয়ে একটু ছায়া পাওয়া আর ঠাণ্ডা পানির তৃষ্ণায় যখন প্রায় অন্ধকার দেখছিলাম চোখে, তখন সবটা কষ্ট এক ঝটকায় চলে গিয়েছিল বগা লেকের সৌন্দর্য দেখে।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার সাধু পানির লেক এই বগা লেক। বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে কেওক্রাডং পর্বতের গা ঘেঁষে অবস্থিত এই লেকের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,২৪৬ ফুট (৩৮০ মিটার)। পাহাড়ের উপরে প্রায় ১৫ একর জায়গা জুড়ে এই লেকের অবস্থান। বগা লেককে অনেকে ড্রাগন লেকও বলে থাকেন। তবে নাম যাই হোক, এ লেকের অসাধারণ সৌন্দর্য আপনাকে অসীম মুগ্ধতায় ছেয়ে রাখবে এটুকু নিশ্চয়তা দেয়াই যায়।

ভেবে দেখুন, আপনার সামনেই নীলচে-সবুজাভ জল, চারপাশ ঘিরে থাকা সবুজে মোড়ানো কয়েকটি পাহাড়, তার উপর ঝুলে থাকা শুভ্র মেঘের ভেলা, লেকের কিনার ঘেঁষে ফুটে থাকা লাল রঙের শাপলা আর চারিদিক ঘিরে থাকা শীতল বাতাস! যত ক্লান্তিই থাকুক, সব ক্লান্তি নিমেষেই হারিয়ে যাবে দূরে। ঠিক মনে হবে, এই সৌন্দর্যের মাঝে ডুবে যেতে এটুকু কষ্ট করাই যায়!

ঢাকা থেকে যেভাবে যাবেন:

পাহাড়ের বুকে বগা লেক; সোর্স: সানজিদা আলম ইভা

ঢাকার বেশ কিছু জায়গা থেকে বান্দরবানের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। আমরা ফকিরাপুল বাস কাউন্টার থেকে গিয়েছিলাম ইউনিক বাসে। ঢাকা থেকে সরাসরি বান্দরবান বাস ভাড়া ৬২০ টাকা। বান্দরবান শহর থেকে চান্দের গাড়ি, জিপগাড়ি বা লোকাল বাসে যেতে পারবেন রুমা বাজার কিংবা সরাসরি কমলা বাজার।

লোকাল বাসে গেলে রুমা বাজার পর্যন্ত যেতে পারবেন, ভাড়া জনপ্রতি ১১০ টাকা। সেখান থেকে জিপগাড়ি বা চান্দের গাড়ি ভাড়া করে যেতে হবে কমলা বাজার। বান্দরবান শহর থেকেই কথা বলে সরাসরি চান্দের গাড়িতে চলে যেতে পারবেন কমলা বাজার। ভাড়া আলোচনা সাপেক্ষে। চান্দের গাড়িতে ১২ জনের বেশি যাওয়া যায় না। মোটামুটি ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা লাগবে পুরো চান্দের গাড়ি ভাড়া করতে।

রুমা বাজার থেকে ভেতরে যেখানেই যান না কেন, আপনাকে সাথে গাইড নিতে হবে। গাইড ছাড়া যেতে পারবেন না। রুমা বাজার পৌঁছে স্থানীয়দের সাথে কথা বললেই গাইড পেয়ে যাবেন। গাইডের ভাড়া প্রতিদিনের হিসেবে ৪০০-৬০০ টাকা। এছাড়াও পথে গাইডের যাবতীয় খরচ আপনাদের বহন করতে হবে।

আমরা যে গাইড নিয়েছিলাম তিনি বেশ ভালো। প্রয়োজনে রুমা বাজার গিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

গাইড: ০১৮২৮৮৪২৯৭৭ (তাওহিদ)

সতর্কতা:

বগা লেকের সৌন্দর্য আপনাকে নিঃসন্দেহে মোহিত করবে। তবে লেকের গভীরতা অনেক বেশি হওয়ায় এটি সুন্দরের পাশাপাশি বিপদজনকও। রুমা বাজার পৌঁছে একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয়। যেখানে স্পষ্ট লেখা থাকে বগা লেকে না নামার কথা ও আরো উল্লেখ থাকে, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে লেকে নামলে ও মারা গেলে কেউ দায়ী থাকবে না। এত কিছুর পরও অনেকে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে। লেকের সিঁড়িতে গোসল করার সুযোগ পাবেন। তাই লেকের গভীরে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। সুস্থভাবে ভ্রমণ করুন।

ফিচার ইমেজ- সানজিদা আলম ইভা

Loading...

2 Pings & Trackbacks

  1. Pingback:

  2. Pingback:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গোমুখ অভিযান: রূপালী নদীর রূপে-স্রোতে

কাঞ্চনজঙ্ঘার টানে বিদেশ বিভূঁইয়ের পানে