উভচর বিমানে সুন্দরবনের উপকণ্ঠে (ভিডিও)

জলে বা স্থলে উভয় জায়গায় উড্ডয়ন ও অবতরণে সক্ষম সেসনা বিমান-ছবি এমএএফ বাংলাদেশ

২০১৬ সালের কথা। আমি তখন কাজ করি বন বিভাগের সাথে ইউএসএইডের অর্থায়নে একটি উন্নয়ন প্রকল্পে। প্রতি মাসেই আমাকে কাজে যেতে হয় দেশের বিভিন্ন বনাঞ্চলে। বলতে গেলে মাসের অর্ধেক সময়টা আমি ব্যস্ত থাকতাম আজ লাউছড়া তো কাল হাজারিখিলে। এর মধ্যে একবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে আমাদের যাওয়া লাগবে সুন্দরবনের মুন্সিগঞ্জ পয়েন্টে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার ‍সুন্দরবনের এই অংশটাই আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে কিন্তু যাওয়ার কথা উঠলেই গায়ে জ্বর ওঠে। ঢাকা থেকে খুলনা যেতে ফেরী আছে, সময় লাগে ৮ ঘণ্টা। তারপর মুন্সীগঞ্জ যেতে লাগে আরও ৪-৫ ঘণ্টা। তার উপর খুলনা-শ্যামনগরের রাস্তা বেশ খারাপ।

জলে বা স্থলে উভয় জায়গায় উড্ডয়ন ও অবতরণে সক্ষম সেসনা বিমান-ছবি এমএএফ বাংলাদেশ

যাওয়ার জন্য যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম হঠাৎ করেই মনে পড়লো এমএএফ ফ্লাইটের কথা। দাতব্য সংস্থাগুলোকে দুর্গম জায়গায় উভচর বিমান সেসনা দিয়ে পৌঁছে দিতে বিশ্বে ৩৫টি দেশে কাজ করে এমএএফ। বাংলাদেশে তারা মূলত দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে। একেবারে হাতিয়া থেকে শুরু করে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা পর্যন্ত মোটামুটি চলনসই নদীতে নামতে পারে সেসনা ক্যারাভান ২০৮ মডেলের এই বিমান। প্রতি রবি, মঙল ও বৃহস্পতিবার তাদের নিয়মিত ফ্লাইট আছে। তবে সিট পাওয়া বেশ কঠিন ব্যপার।
মাত্র ৮ সিটের বিমান, তবে কখনোই ৭ জনের বেশি নেয়া হয় না। যাত্রীদের ওজন গড়ে ৭০ কেজি থাকতে হয়, এর বেশি হলে ৬ জনকে নেয় তারা। লাগেজের জন্য জনপ্রতি বরাদ্দ সর্বোচ্চ ১০ কেজি। বুকিংও দিতে হয় অন্তত এক মাস আগে। কী মনে করে একবার ফোন দিয়ে দেখলাম। ফোন ধরে এ্যানি জানালো আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান, ঘণ্টাখানেক আগেই তিনজন তাদের বুকিং ক্যানসেল করেছে। এখন চাইলে আমরা যেতে পারি। ফোন রেখেই বুকিংয়ের জন্য আনুষ্ঠানিক মেইল পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম, অফিসের থেকে একজন গিয়ে টিকেট নিয়ে আসলো আমাদের জন্য।
পাইলটদ্বয়-ছবি লেখক

রবিবার সকালে আমাদের ফ্লাইট। আমরা মানে আমি ও আমার দুই সহকর্মী কামরুল ভাই ও আজিজা আপা। এদের মধ্যে একমাত্র আমিই আগে চড়েছিলাম এই সীপ্লেনে। কামরুল ভাই জিজ্ঞাসা করলো আমরা কোথা থেকে বিমানে উঠবো, আমি উত্তর দিলাম সদরঘাট থেকে। উনি তাই বিশ্বাস করে বসেছিলেন। যাই হোক, জুলাইয়ের এক রবিবারে আমরা রওনা দিলাম বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে।
চেক ইন শেষ করে এমএএফ এর মাইক্রোবাসে এয়ারপোর্টের মধ্যে তাদের হ্যাংগারে চলে গেলাম। আশেপাশের সব হ্যাংগার মূলত হেলিকপ্টারের জন্য ব্যবহার করা হয়। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন পাইলট ও কো-পাইলট। এছাড়া আর কোনো ক্রু নেই। পাইলট আমাদেরকে বিমানে স্বাগত জানালেন, বিমানের সামনে রাখা সিঁড়ি বেয়ে আমরা উঠে বসলাম বিমানে। পাইলটের ঠিক পরের সিটে বসলাম আমি।
খুব নিচে দিয়ে উড়ে যায় বলে দেখা যায় এমন দৃশ্য-ছবি লেখক

দুজনের মধ্যে একজন পাইলট আমাদেরকে বিমানের সেফটি ইন্সট্রাকশন বুঝিয়ে দিলেন। সিট বেল্টটাও একটু ভিন্ন, প্রথমে কোমরে, তারপর বুকের উপর আড়াআড়িভাবে বাঁধতে হয়। বিমান এগিয়ে গেল রানওয়ের দিকে। রানওয়েতে ক্লিয়ারেন্স পেয়ে ছুটতে শুরু করলে মূল রানওয়ে ধরে। তবে আমার কাছে মনে হলো মাত্র ৫০০ গজ গিয়েই উঠে পড়লো।
ছোটখাটো বিমান হওয়াতে রানওয়েতে অল্প সময় দৌড়েই এ বিমান উড্ডয়ন করতে পেরেছে। উড়ে চললাম আমরা খুলনার দিকে। বলা হয়নি, আমরা তিনজন আর দুই পাইলট ছাড়া বিমানে আরও দুজন যাত্রী আছেন। তারা নামবে খুলনায়। তাই প্রথমে তাদেরকে নামিয়ে তারপর আমাদেরকে নামাতে শ্যামনগর যাবে।
আকাশ থেকে খুলনা শহর-ছবি লেখক

অন্য বিমানে চড়ার সাথে এ বিমানে চড়ার একটা বড় পার্থক্য এই সীপ্লেনটা খুব নিচে দিয়ে উড়ে চলে। অন্য বিমানগুলো যেখানে ৮-৯ হাজার ফিট উপর দিয়ে ওড়ে সেখানে আমরা সর্বোচ্চ উঠেছিলাম ৪,০০০ ফিট। আবার পাইলট ও আমাদের মাঝখানে কোনো রকম আড়াল নেই বলে দুই-পাইলট কী করছে সব কিছুই দেখা যাচ্ছে। এমনকি তাদের সামনের বিভিন্ন ড্যাশবোর্ডের কয়েকটা জিনিসের রিডিংও পড়তে পারছিলাম, যার একটি উচ্চতা ৪,০০০ ফিট দেখাচ্ছিল। একটু পরেই আমারা পদ্মা নদী দেখতে পেলাম। প্রমত্তা পদ্মা নদীর উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছি আমরা, নিচে চিক চিক করছে বালুচর, উপর থেকে দেখা যাচ্ছে বয়ে চলা নদীর পানি। পদ্মা পার হবার পর শুরু হলো সবুজের মাঠ। চলতে থাকলো আমাদের ছোট্ট সীপ্লেন।
খুলনার ঘের-ছবি লেখক

একসময় দূর থেকে খুলনার রূপসা নদী দেখতে পেলাম। এখানেই নামবো আমরা। আরেকটু চলার পরই খুলনার বিখ্যাত খান জাহান আলী সেতু (রূপসা সেতু) দেখা গেল। উপর থেকে এই প্রথম অসাধারণ সুন্দর এই সেতুটি দেখতে লাগলাম। নিয়মানুযায়ী প্রথমে সেতুর উপর এক চক্কর দিয়ে পাইলট দেখে নিবে নদীর যে অংশে আমরা নামতে যাচ্ছি সেখানে নামার মতো পরিস্থিতি আছে কিনা, সব ঠিক থাকলে পরের বার চক্কর দিয়ে নদীতে অবতরণ করবে। তেমন কোনো জাহাজ চলছে না দেখে আরেক চক্কর দিয়ে নেমে পড়লো রূপসা নদীতে। এত সুন্দর করে অবতরণ করে, পানিতে ধাক্কাটা প্রায় টেরই পাওয়া গেল না। গতি কমে যাবার পর বিমানের মুখ ঘুরিয়ে এবার রওনা দিলো তীরের দিকে, সেখানে আগে অপেক্ষারত একজনকে ছুড়ে দেয়া হলো বিমানের নোঙর, সেটা ভালোভাবে গেঁথে দিলে, পাইলট যাত্রীদের নামার জন্য প্রস্তুত হতে বললো।
নোংগর করে অপেক্ষা করছে সীপ্লেন-ছবি লেখক

এর মধ্যেই চলে এসেছে স্পীডবোট, বিমানের গায়ে ঠেকানো পর পাইলটই শক্ত করে ধরে রাখলো বোট। কো-পাইলট যাত্রীদের সাবধানে উঠিয়ে দিল স্পীড বোটে, লাগেজও তুলে দেয়া হলো তাদের। কাজ শেষ হতেই স্পীড বোট ছুটে চললো ফেরি ঘাটের দিকে। আমাদের পাইলট দ্রুত নোঙর তুলে নিয়ে বিমানের নাক ঘুরিয়ে চলে এলো নদীর মাঝে। এবার পানির মধ্য থেকে উড্ডয়নের পালা। দ্রুত বাড়তে থাকলো বিমানের গতি, আশেপাশে চলতে থাকা ট্রলার ও জাহাজকে ছাড়িয়ে ছুটে চললো। অবশেষে প্রায় এক কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে উঠে পড়লো আকাশে। এবারও বলতে গেলে কোনো ঝাঁকিই লাগেনি।
রূপসা নদী থেকে বিমান উড্ডয়নের দৃশ্য (ভিডিও)

আমাদের এবারের গন্তব্য মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়ন। নদীর এপারে লোকালয় আর ওপারে সুন্দরবন এমন একটা জায়গায় আমাদের নামতে হবে। বেশ খানিকটা দূরে থাকতেই আকাশ থেকে সুন্দরবন দেখতে পেলাম। বিশাল এ বনের অল্প কিছুটা অংশই শুধু দেখা যাচ্ছে। রসিকতা করে আমার এক সহকর্মীকে বললাম, “পাইলটকে বলেন কিছু টাকা বাড়িয়ে দিবো, আমাদেরকে সুন্দরবনের ‍উপর ঘুরিয়ে আনুক”। যাই হোক, সুন্দরবন পুরোটা দেখতে না পারলেও কিছু অংশ ভালোভাবেই দেখতে পেলাম। কারণ নামার আগে যে চক্করটা দিতে হয় সেটা সুন্দরবনের উপর দিয়েই অল্প কিছু সময়ের জন্য উড়ে গিয়েছিল।
বেশ নিচুতে থাকায় ভালোভাবেই দেখতে পেয়েছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম একটা বাঘ যদি বিমানের শব্দে বেরিয়ে আসতো সেখানে। যাই হোক কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা নদীতে নেমে পড়লাম। মনে পড়লো কয়েকমাস আগেই এ নদীতে কুমির দেখেছিলাম আমি। স্থানীয় এক ব্যক্তির ছাগল খেয়ে ফেলে সারাদিন মনের সুখে ঘুরছিলো, যদি আরেকটা ছাগল পাওয়া যায়।
সুন্দরবনের উপকন্ঠে অবতরণের দৃশ্য (ভিডিও)

নদীতে বেশ সুন্দরভাবে অবতরণ করে আমাদের বিমান ছুটে চলেছে বন বিভাগের ঘাটের দিকে। সেখানে বিমান দেখার জন্য মোটামুটি ছোটখাটো ভিড় লেগে গেলো। এর মধ্যে পাইলট নোঙর নিয়ে ঘুরছে কিন্তু সুবিধাজনক কোনো জায়গা পাচ্ছে না, তীরের দিকে ইশারা দিয়ে একজন বুঝালো কী করতে হবে। সহৃদয় সেই ব্যক্তিটি হাঁটু সমান কাদায় নেমে বিমানের নোঙর গেঁথে দিতে সাহায্য করলো। এবার বিদায়ের পালা। আমাদের জন্য আসা ছোট নৌকায় উঠে বসলাম আমরা। পাইলট আমাদের ব্যাগ নৌকায় উঠিয়ে দিল। তাকে বিদায় জানিয়ে ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
এর মধ্যে নোঙর উঠানো শেষ, নাক ঘুরিয়ে ফিরে চললো সীপ্লেন, গন্তব্য ঢাকা। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম মাত্র দেড় ঘণ্টা হয়েছে, ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছি আমরা। এর মধ্যেই ১৩ ঘণ্টার গাড়ীর দূরত্ব অতিক্রম করে ফেলেছি। পাইলট বলেছেন যদি খুলনা নামতে না হতো, তবে ৫০ মিনিটেই এখানে আসতে পারতাম আমরা। তবে খুলনা নামাতেই বেশি খুশি হয়েছি আমরা, কারণ অতিরিক্ত একটি পানিতে ল্যান্ডিং ও টেক অফ দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। বিমানে আমাকে এর আগে পরে অনেকবারই চড়তে হয়েছে। তবে নি:সন্দেহে এ ভ্রমণটি একটি স্মরণীয় ভ্রমণ।
ফিচার ইমেজ- এমএএফ বাংলাদেশ

Loading...

One Comment

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতের দ্বৈতরূপ

সেন্ট মার্টিনসের স্মরণীয় রাত