গোয়া ভ্রমণ: পাহাড়ের প্রেম আর সমুদ্রের ভালোবাসা!

কী ভালোবাসেন আপনি? পাহাড় না সমুদ্র? সমুদ্র না পাহাড়? নাকি দুটোই? চিন্তায় পড়ে গেলেন কি? আমিও না তাই পড়েছিলাম গোয়া গিয়ে। এক পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে আর সেই পাহাড় চূড়ায় বসে আরব সাগরের উত্তাল ঢেউ, মাতাল বাতাস আর চুম্বকের আকর্ষণে আকর্ষিত করে রাখা বীচের রূপ দেখে, পাথরের উপরে আছড়ে পড়া ঢেউ দেখে, আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম পাহাড়ের চূড়ায় বসে থাকবো নাকি সমুদ্রের তীরে গিয়ে ভেজা বালুতে পা ভেজাবো? এক অদ্ভুত দ্বিধা আর সঙ্কটে পড়ে গিয়েছিলাম সেদিন। তবে সেই গল্পটাই বলি আজ।

পাহাড় আমার সব সময়ের প্রেম বলা যায়। যে কোনো সময়, সুযোগ পেলেই আমি পাহাড়ে ছুটে যেতে ভীষণ ভালোবাসি। পাহাড়ের গায়ে গায়ে, সবুজে সবুজে, মেঘে-কুয়াশায়, ঝর্ণায়-অরণ্যে, মাথার সিঁথির মতো চিকন পথে ধীরে ধীরে হেঁটে বেড়াতে আমার সবচেয়ে ভালো লাগে। আরও ভালো লাগে, কোনো সবুজ পাহাড়ের চূড়ায় উঠে, ছোট্ট ছাউনি দেয়া কোনো পাহাড়ি ঘরে চুপচাপ হেলান দিয়ে বসে থাকতে। কোনো বৃষ্টি ভেজা পাহাড়ের চূড়ায় বসে হাতে গরম কফির মগ নিয়ে, ভেসে যাওয়া মেঘ, টুপটাপ করে ঝরে পড়া জমে থাকা বৃষ্টি ফোঁটা আর জড়িয়ে ধরা কুয়াশার চাদর জড়িয়ে ধোঁয়া ওঠা কফির মগে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াতে!

প্রিয় পাহাড়! ছবিঃ লেখক

এমন মোহনীয় সময় আমার কাছে কয়েকবার এসেছে। আমার কাছে পৃথিবী তখন অপার্থিব হয়ে ওঠে। মনে মনেই ভেসে যাই মেঘের সাথে, যেন ঝরে পড়ি ঝর্ণাধারা হয়ে, ভিজে জড়িয়ে থাকি বৃষ্টি হয়ে আর আঁকড়ে থাকি যে কুয়াশা হয়ে, ছুটে চলি খরস্রোতা নদী হয়ে। এই এত এত কিছু একই সাথে পাহাড়ে পাওয়া যায় বলেই পাহাড় আমার প্রেম। বাসায় পাহাড়কে বলে আমার প্রেমিকা আর তার সতীন! শুনতে আমার মন্দ লাগে না আদৌ। বরং এমন খোঁচাগুলো আমার বেশ লাগে, পাহাড়ের প্রতি প্রেম যেন আরও বাড়িয়ে দেয় দিন দিন। তাই যে কোনো কারণে, কোথাও বেড়াতে যাবার প্রসঙ্গ এলে পাহাড়ের কাছেই প্রথম ছুটে যেতে ইচ্ছে করে।

তার মানে এই নয় যে সমুদ্র আমার ভালো লাগে না। সমুদ্রও আমার বেশ লাগে। দারুণ ভালো লাগে। তবে ভালোবাসা বলতে যেটা বোঝায় তেমন আবেগি টান কেন যেন কখনো অনুভব করিনি। তেমন করে ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়নি সমুদ্রকে। হয়তো পাহাড়ের প্রতি বেশি মোহাচ্ছন্নতা আর আবেগের জড়িয়ে থাকা সমুদ্রকে সেভাবে উপভোগ করতে দেয়নি। হয়তো পাহাড়ের মায়া, সমুদ্রের কাছে ঠিক মতো ঘেঁষতে দেয়নি বলেই সমুদ্র অনেকটা অধরা হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে।

ভালো লাগার সমুদ্র। ছবিঃ লেখক

কিন্তু এবারের গোয়া ভ্রমণের পরে পাহাড়ের প্রতি প্রেমের পাশাপাশি, সমুদ্রকেও কখন যেন ভালোবেসে ফেলেছি বুঝতেই পারিনি। পুরো গোয়া ভ্রমণের সবচেয়ে আচ্ছন্ন সময় ছিল যখন আমরা ডলফিনের রোমাঞ্চ উপভোগ করে, আঞ্জুনা আর অ্যাভাটর বীচের ঠিক মাঝখানে, দুই বীচের মাঝের এক পাহাড় চূড়ায় গিয়ে পৌঁছালাম। একটা অদ্ভুত জায়গা সেটা। আপনি হোন পাহাড় প্রেমি বা সমুদ্র প্রেমী, কোনোভাবেই আপনি এখানে কাউকেই হেলাফেলা করতে পারবেন না। এমনি মোহময় একটা জায়গা।

আপনি দাঁড়িয়ে আছেন এক পাহাড়ের চূড়ায় বা বসে আছেন এক পাহাড়ের চূড়ার কোনো পাথর বা বেদীতে, আপনাকে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইবে ভারত মহাসাগরের উত্তাল বাতাস। হু হু বাতাসে আপনার মনপ্রাণ আনচান করে উঠবে, কখনো উড়তে চেয়ে, কখনো ভাসতে চেয়ে। কখনো ইচ্ছে হবে পাহাড় থেকে এক লাফে চলে যেতে নিচের সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের কাছে, ইচ্ছে হবে সমুদ্রের মাঝে বড় বড় পাথরের উপরে বসে বা শুয়ে থাকতে। পাহাড় চূড়ার একপাশে আঞ্জুনা বীচের কোলাহল আর অন্যপাশে অ্যাভাটর বীচের বালুকা বেলা। একটা বীচে বড় বড় আকারের পাথরের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আর অন্য বীচে সমান, বালুময় আর ঢেউয়ের উত্তাল আহ্বান। একটা বীচ রৌদ্র ঝলমলে আর অন্য বীচে রয়েছে বেশ কিছু ছায়া ঘেরা গাছের আচ্ছাদন।

পাহাড় থেকে সমুদ্র। ছবিঃ লেখক

একবার তো ইচ্ছে হচ্ছিল নেমে যাই কোনো এক বীচে, আবার মনে মনে ঠিক করলাম, নাহ থাক। এক বীচে নামলে তখন অন্য বীচে যেতে মন কেমন করবে। সেই সময় তো আমাদের নেই। তাই এটাই ভালো যে পাহাড়ের চূড়ায়, পাথরের উপরে বসে বসে, হেঁটে হেঁটে, দাঁড়িয়ে থেকে দুই বীচের দুই রকম সৌন্দর্য উপভোগ করি। উপরে পাহাড়ের চূড়ায় বসে, নিচের উত্তাল ঢেউ দেখার অন্য রকম আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবে যে কেউ। ভারত মহাসাগরের বাতাসে উড়িয়ে নিয়ে যেতে চাইবে আপনাকে। নিজেরও কখনো কখনো ইচ্ছে হবে উড়াল দিতে। আর বালুময় বীচের সৌন্দর্য। কিছুতেই ইচ্ছা হচ্ছিল না ওখান থেকে ফিরে আসি।

ইচ্ছে হচ্ছিল ওখানে, ওই পাহাড় চূড়াতেই যদি দুই একটি দিন কাটানো যেত? যদি ওই দুই বীচের কোনো একটাতে কয়েকদিন চুপচাপ বসে থাকা যেত, যদি গাছের ছায়া ঘেরা বীচে হ্যামক ঝুলিয়ে দোল খাওয়া যেত কোনো এক সকাল, দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা আর রাতভর? আহা, চির স্মরণীয় হয়ে থাকতো সেই সময়। আর তখন ছিল পূর্ণিমার সময়, কী যে হতো ওখানে, ওই পাহাড় চূড়ায়, ওই পাথুরে বীচে অথবা ওই বালুকা বেলায় কোনো গাছের সাথে ঝুলে ঝুলে জ্যোৎস্না মাথা রূপালি ঢেউ দেখতে পেলে, ভরা পূর্ণিমার চাঁদের আলোতে পুরো নীল সমুদ্র যেন রূপালি পৃথিবী হয়ে ধরা দিত, যদি উত্তাল বাতাস আর উন্মাদ ঢেউ এসে আছড়ে পড়ত হ্যামকের নিচে, আশেপাশে? যদি আকাশের তারাগুলো একটি একটি করে খসে পড়তো রূপালি সমুদ্রের আবগের ঢেউয়ে?

পাহাড় ও সমুদ্র। ছবিঃ লেখক

নাহ আর ভাবতে পারছি না, আর ভাবতে চাই না। এভাবে ভাবতে গেলে সব ছেড়েছুড়ে এখনি ছুটে যেতে মন চাইবে গোয়ার ওই পাহাড় চূড়ায়, বালুকা বেলায়, পাথুরে বীচে, নারিকেল গাছের ছায়ায়, সমুদ্রের ঢেউয়ে, পাগল করা বাতাসে আর পাহাড়র প্রেমে, নয়তো সমুদ্রের ভালোবাসায়। এবারই প্রথম অনুভব করেছি পাহাড় যদি প্রেম হয়, সমুদ্র তবে ভালোবাসা, পাহাড় যদি কাছে টানে সমুদ্র তবে আঁকড়ে ধরে, পাহাড় যদি প্রেম হয়, সমুদ্র তবে ভালোবাসা।

এই পাহাড়ের প্রেম আর সমুদ্রের ভালোবাসা একই সাথে পেতে, আর উপভোগ করতে একবার সময় নিয়ে যেতে হবে গোয়াতে। ওই পাহাড় চূড়ায়, ওই বীচের ছায়ায় আর ঢেউয়ের মায়ায়, ওই মাতাল করা বাতাসের কাছে।

গোয়ার সমুদ্র তীরে পাহাড়ের চূড়ায়। ছবিঃ লেখক

কী যেন এক অদ্ভুত আকর্ষণ আছে শুধু ভাবায়, স্বপ্নে হারায়, কোথায় যেন তোলপাড় করে দেয়, নিজেকেই যেন ছিনিয়ে নেয় নিজের কাছ থেকে, কখনো পাহাড়, কখনো সমুদ্র, কখনো ঢেউ আর কখনো বাতাস। কী যেন জাদু আছে পাহাড়ের প্রেমে আর সমুদ্রের ভালোবাসায় মজে গিয়ে গান ধরেছিলাম-

তুমি আমার এমনই একজন

যারে এক জনমে ভালোবেসে

ভরবেনা এ মন……

ফিচার ইমেজ- travelandfilm.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক নজরে একটি জেলা: বরিশালের ধর্মশালার গল্প

সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ: খানজাহান আলীর ৩৫ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ