সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ: খানজাহান আলীর ৩৫ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ

আমি আর ডাক্তার বিল্লাল চাচা যখন জোড়বাংলা মসজিদ দেখে শেষ করেছি, তখন দুপুর গড়িয়েছে। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। এখন ক্রমশ সূর্যের তেজ কমে আসবে। তারপর একসময় আজকের মতো এ অঞ্চলে নিভে যাবে সূর্যিমামার আলো। আর সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে আমাদের এই যাত্রায় ভ্রমণও শেষ হবে।

সুতরাং সূর্য ডুবে যাওয়ার আগেই আমাদের বারোবাজারের আরো দু-একটি মসজিদ বা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখে শেষ করতে হবে। কাজেই এক মুহূর্তও বিলম্ব নয়। আমাদের এবারের গন্তব্য সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ।

সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ, বারোবাজার। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো তিনটি ঐতিহাসিক মসজিদ, তথা: গোড়ার মসজিদ, গলাকাটা মসজিদ ও জোড়বাংলা মসজিদ পরপর পরিদর্শন শেষে, আমরা আবারো পিচ ঢালা মেঠো পথ ধরে চলেছি। জোড়বাংলা মসজিদ থেকে সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ প্রায় তিন কিলোমিটার।

জোড়বাংলা মসজিদ থেকে রাস্তা ধরে তিন কিলোমিটার যাবার পর রাস্তার ডান হাতে একটি কংক্রিটের পথ নির্দেশিকা পাওয়া যাবে। এই পথ নির্দেশিকার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সরু মাটির মেঠো পথ ধরে মাত্র আধা কিলোমিটার এগোলেই দেখা মিলবে সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদের।

আমি আর ডাক্তার বিল্লাল হোসেন চাচা বাইকে চেপে আঁকাবাঁকা মাটির মেঠো পথ ধরে পৌঁছালাম বারোবাজারের সাতগাছিয়া গ্রামে। এখানে পৌঁছে সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ প্রথম দেখার পর আমি পূর্বের চেয়ে আরো বেশি বিস্মিত হলাম। কেননা ইতিপূর্বে দেখা তিনটি মসজিদ বর্গাকৃতির এবং তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মসজিদ ৬ গম্বুজ বিশিষ্ট। কিন্তু সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ ৩৫ গম্বুজ বিশিষ্ট। তবে অবাক হওয়ার কারণ ৩৫টি গম্বুজ নয়। অবাক হয়েছি এই কারণে যে, ৩৫ গম্বুজ বিশিষ্ট ২৪ দশমিক ২৫ মিটার দৈর্ঘ্যের এই বিশাল মসজিদটিও মাটির নিচে লুকানো ছিল!

সংক্ষেপে সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ বলা হলেও এই মসজিদের সম্পূর্ণ নাম সাতগাছিয়া ঐতিহাসিক আদিনা ৩৫ গম্বুজ গায়েবি জামে মসজিদ। ২০০২-০৩ সালে এখানে একটি পাঠাগারও স্থাপিত হয়। মসজিদের ভেতরে এই পাঠাগারের দুটি আলমারি রয়েছে।

এখানে পৌঁছে পেয়ে গেলাম এই মসজিদের খাদেম মুহাম্মদ আতিকুল্লাহকে। প্রায় ৭০ বছর বয়সী আতিকুল্লাহ একই সাথে এই মসজিদের মুয়াজ্জিন। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত জামাতের সাথে নামাজ আদায় করে স্থানীয় মুসল্লিরা। দিনে পাঁচবার আযান দেওয়া সহ, এই মসজিদের সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ করেন তিনি।

ইতিপূর্বে একাধিক নিবন্ধে বলেছি বারোবাজারের প্রায় সব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মাটির ঢিবির নিচে চাপা পড়ে ছিল। কে বা কারা ৫০০ বছর পুরনো এই সবগুলো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মাটি চাপা দিয়ে লুকিয়ে রেখেছিল। এ অঞ্চলের বিভিন্ন ঢিবি খনন করে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়ার অংশ হিসেবে ১৯৮৩ সালে স্থানীয় জনগণ এখানে থাকা বিরাট আকারের ঢিবির কিছু অংশ খনন করে। স্থানীয় জনগণের সেই আংশিক খননে ১৬টি থাম এবং পোড়ামাটির নকশাসহ পাঁচটি মেহরাব বিশিষ্ট মসজিদ আবিষ্কৃত হয়।

গল্পে গল্পে আতিকুল্লাহ নিজেই বলছিলেন এই মসজিদ আবিষ্কারের কাহিনী। ১৯৮৩ সালে যে কৌতূহলী মানুষগুলো এই মসজিদ আবিষ্কার করেছিল আতিকুল্লাহ তাদেরই একজন। তার ভাষায়, ঢিবির উত্তর পাশে ছোট্ট একটি ছিদ্র আবিষ্কার করেন তারা। তারপর ঢিবির ভেতর কী আছে তা পরীক্ষা করার জন্য এই ছিদ্রপথে বড় একটা বাঁশের লাঠি প্রবেশ করানো হয়। এসময় তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন, বিনা বাধায় বাঁশের লাঠি ঢিবির ভেতর ঢুকে যাচ্ছে!

তখনই তাদের ধারণা স্পষ্ট হয়; এটি নিছক একটি মাটির ঢিবি নয়। ঢিবির অন্তরালে হয়তো লুকিয়ে আছে কোনো অজানা রহস্য। এই রহস্য উন্মোচন করতেই স্থানীয় জনগণ ১৯৮৩ সালে প্রথম এখানে খনন কাজ চালায়। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর জায়গাটি খনন করে ৩৫ গম্বুজ বিশিষ্ট বিশাল মসজিদের অস্তিত্ব খুঁজে পান।

গল্পে গল্পে জনাব আতিকুল্লাহ এক রোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিলেন। মসজিদটি আবিষ্কারের কয়েক বছর পর আজিজুল নামের স্থানীয় একজন ডাক্তার গভীর রাতে মসজিদের পাশ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। হঠাৎ তিনি এক প্রকাণ্ড অজগর সাপ দেখতে পান, যে তার পথ আগলে শুয়ে আছে। আজিজুল ডাক্তার তার মোটর সাইকেল চালিয়ে দেন প্রকাণ্ড সেই অজগর সাপের উপর দিয়ে। মুহুর্তেই মোটর বাইকে আগুন ধরে যায়! স্থানীয় লোকজন ছুটে এসে আজিজুল ডাক্তারকে উদ্ধার করেন। তারপর দীর্ঘদিন দেশে বিদেশে চিকিৎসা করালেও তাকে আর বাঁচানো যায়নি। এমনকি তাকে উদ্ধার করার সময় স্থানীয়রা কোনো সাপের অস্তিত্বই খুঁজে পায়নি। আজ পর্যন্ত এই রহস্যের কোনো কুল কিনারা করা সম্ভব হয়নি।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা পঞ্চদশ শতাব্দীতে খান জাহান আলী অসংখ্য অনুসারী সাথে নিয়ে বাংলায় ইসলাম প্রচার করতে আসেন। তখন এই অঞ্চল জুড়ে তিনি অসংখ্য মসজিদ নির্মাণ করেন। বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ তার মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ খান জাহান আলীর ষাট গম্বুজ মসজিদ ও তুঘলকি স্থাপত্যশৈলীর অনুরূপ। এই কারণে ধারণা করা হয়, খান জাহান আলী বা তার কোনো অনুসারী ৩৫ গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি নির্মাণ করেন।

সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদের পিলার, বারোবাজার। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

ইতিপূর্বে দেখা তিনটি মসজিদ বর্গাকৃতির হলেও, এই মসজিদটি আয়তাকৃতির। উত্তর দক্ষিণে ২৪ দশমিক ২৫ মিটার দীর্ঘ এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৮ দশমিক ৫৫ মিটার প্রস্থ। এর দেয়ালগুলো ১ দশমিক ৬০ মিটার পুরু। তবে এই মসজিদের সঠিক উচ্চতা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খনন করে ভূমি থেকে ১ দশমিক ৮৫ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। এই মসজিদে মোট ১৬টি প্রবেশদ্বার রয়েছে, যার মধ্যে দক্ষিণে পাঁচটি, পূর্বে সাতটি, উত্তরে তিনটি এবং পশ্চিমে একটি দরজা রয়েছে। যদিও স্থানীয় জনগণ পশ্চিমের দরজাটি বন্ধ করে দিয়েছে। যেহেতু পূর্বদিকে সর্বাধিক অর্থাৎ, সাতটি দরজা রয়েছে, তাই পূর্ব দিককেই এই মসজিদের সম্মুখভাগ ধরা হয়।

মসজিদের পশ্চিম দিকের দেয়ালে নানা কারুকাজ খচিত ছয়টি মেহরাব রয়েছে। মেহরাবগুলো ফুল, ফুলের কুঁড়ি, বৃক্ষ, ঘণ্টা, লতা-পাতা, খেজুর গাছ, পিঠা খচিত নানান নকশায় পরিপূর্ণ। মসজিদের ভেতরে মোট ৪৮টি পিলার রয়েছে।

সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদের ১.৬০ মিটার পুরু দেয়াল, বারোবাজার। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

শ্রদ্ধেয় আতিকুল্লাহ আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন এই অসামান্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। ছোট ছোট মেহেরাবগুলোর ঠিক পূর্বেই বৈঠকখানার মতো কিছু একটার অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন স্থানীয়রা। আতিকুল্লাহ আমাদের বলছিলেন এই স্থানে বসে ৫০০ বছর পূর্বে এই অঞ্চলে ইসলামের বাণী প্রচার করা হতো!

আমার জীবনে যত মনে রাখার মতো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখেছি সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ তার মধ্যে অন্যতম। আপনারাও চাইলে সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ থেকে ঘুরে আসতে পারেন। ওখানে গেলে নিশ্চয়ই সৌভাগ্যক্রমে দেখা হয়ে যাবে শ্রদ্ধেয় আতিকুল্লাহর সাথে। তিনি আপনাদের ঘুরে ঘুরে দেখাবেন সব কিছু। মসজিদের ঠিক উত্তর পাশের বিশাল দীঘি দেখে এ যাত্রায় আমাদের প্রত্নতত্ত্ব দর্শন শেষ করলাম।

সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদ, বারোবাজার। ছবি: ইউকিপিডিয়া

কীভাবে যাবেন

ঢাকার গাবতলী থেকে ছেড়ে আসা যশোর অথবা ঝিনাইদাহগামী যেকোনো বাসে চেপে যশোর অথবা ঝিনাইদহে আসতে হবে। তারপর ঝিনাইদহ থেকে দক্ষিণ দিকে ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক ধরে ৩০ কিলোমিটার পথ পেরোলেই পৌঁছানো যাবে বারোবাজার। আর যশোর থেকে যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ধরে ১৬ কিলোমিটার উত্তরে গেলেই পাওয়া যাবে বারোবাজার।

বারোবাজার থেকেই স্থানীয়দের সহযোগিতা নিয়ে খুব সহজেই খুঁজে পাওয়া যাবে সাতগাছিয়া গায়েবানা মসজিদসহ বারোবাজারের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে থাকা নানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গোয়া ভ্রমণ: পাহাড়ের প্রেম আর সমুদ্রের ভালোবাসা!

বোরা বোরা: পৃথিবীর সেরা মধুচন্দ্রিমার গন্তব্য?