পাহাড়ের ভাঁজে অনন্য এক রূপায়ন সাইরু হিল রিসোর্ট

প্রেমিক হারানোর বিরহ সইতে না পেরে পাহাড় চূড়া থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেয়া ম্রো যুবতী ‘সাইরু’ আজ আর নেই। কিন্তু তার অমর প্রেমের সাক্ষী হিসেবে আলিঙ্গনরত অবস্থায় পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে দুটি বৃক্ষ। একটির নাম ফুলসুমারি, অন্যটি ধারমারা গাছ। বান্দরবান জেলায় অবস্থিত চিম্বুক রোডের সেই এলাকার নাম এখন ‘সাইরু পয়েন্ট’।

সাঙ্গু ভিউ কটেজ। সোর্স: মাই হলিডে বিডি.কম

সাইরুর সেই প্রেমকাহিনী তরুণ-তরুণীদের মুখে মুখে। নিজের প্রেমের গভীরতা বোঝাতে তাদের কেউ কেউ বলে- সাইরুর মতো করে আমি তোমাকে ভালোবাসি। পাহাড়ি কন্যার এই ত্যাগের মহিমা আজও তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কেউ বলছেন- সাইরুর নিজেকে বলিদানের কথা শুনে সেই প্রেমিক যুবকটিও একই পাহাড় থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ বিসর্জন দেয়।

কেউ বলে, পাগল বেশে অনেকদিন ঘুরে ঘুরে সে যুবকটি হারিয়ে গেছে। সেই সাইরুর আত্মাহুতি দেয়া চিম্বুক রোডের সেই জুম পাহাড় এখন ‘সাইরু হিল রিসোর্ট’ নামে বহুল পরিচিত। লোকমুখে প্রচলিত সে প্রেমকাহিনী খোদাই করে লিখে রেখেছে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ।

গোটা বান্দরবান বাদে কেবল মাত্র একটি রিসোর্টের সৌন্দর্যে সামিল হতেও যে মন সায় দেয়- এমনটা হয়তো কোনো ভ্রমণপিয়াসুই মানবে না। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এটাই বরাবর ঘটে থাকে সাইরু হিল রিসোর্টের ক্ষেত্রে। ব্যাগ কাঁধে করে গোটা বান্দরবান চষে বেড়ালেও এর অভাবনীয় সৌন্দর্য, আর অবস্থান আপনাকে বারবার ওখানে ঘুরতে যেতে প্রেরণা দেবে। মূল শহর থেকে বান্দরবান-থানচি সড়ক ধরে এগোলে (চিম্বুক পাহাড়ের দিকে) দেখা মিলবে এই চমৎকার রিসোর্টের। বান্দরবান শহর থেকে এর দূরত্ব মাত্র ১৯ কিলোমিটার।

সামনের রাস্তা।সোর্স:  ভ্রমণ. কম

চারদিকে সবুজাভ পাহাড়ের ঢেউ, আর সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ১৮শ ফুট উঁচুতে পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত এই ‘সাইরু হিল রিসোর্ট’। নান্দনিক স্থাপত্যশৈলির সমাবেশ, আরামদায়ক অবকাশ যাপনের আধুনিক সব সুযোগ সুবিধা নিয়ে নির্মিত হয়েছে বিলাসবহুল এই রিসোর্টটি। দেশের ভেতর অবস্থিত অন্য যেকোনো রিসোর্টের চেয়ে অবস্থান আর সৌন্দর্য ভেদে এটি নিঃসন্দেহে প্রথম সারির অবকাশ কেন্দ্রের তালিকায় থাকবে।

এই রিসোর্টের অন্যতম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট হলো- রুমে বসেই দেখতে পাবেন পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা অপরূপা এক সাঙ্গুকে। নয়নাভিরাম ভূ-দৃশ্য, আর কপাল স্পর্শ করে উড়ে যাওয়া মেঘ দেখতে দেখতে বেলা কেটে যাবে আপনার। মনে হবে, সত্যি সত্যি বুঝি একখানা মেঘপরি আপনার ললাট স্পর্শ করে গেল। সাত সকালে এক মগ চা হাতে রিসোর্টের বারান্দায় বসে সুদূরে মগ্ন হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা যে আপনার জীবনে ঘটতে পারে- তা যেন কাল অবধি ভাবনায় আসেনি।

সাইরুর বৈচিত্র সবাইকে এতটাই গ্রাস করে যে, ক্ষণিকের জন্য হলেও যান্ত্রিক জীবন থেকে সরে আসতে বাধ্য হতে হয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও এখানে আছে চমৎকার এক সুইমিং পুল। আছে আলাদা রেস্টুরেন্ট এবং কনফারেন্স রুম।

বিছানা। সোর্স: টিকেটশালা

সাইরুর এই রেস্টুরেন্ট এন্ড ওপেন টেরেসে আছে সার্বক্ষণিক সুবিধা। যেখানে আপনি প্রায় ৫ ধরনের স্যুপ, ৭ ধরনের স্ন্যাক্স, ১২ ধরনের চাইনিজ আইটেম, ২০ ধরনের দেশী খাবার, ৫ ধরনের খিচুড়ি/বিরিয়ানি, ১০ ধরনের কাবাব এন্ড বার-বি-কিউ আইটেম, ১৫ ধরনের বেভারেজ, ৫ ধরনের ডেজার্ট ও বিভিন্ন ধরনের সিজনাল ফলের জুস পেয়ে যাবেন একদম হাতের নাগালে। এছাড়াও তাদের রয়েছে ১১ ধরনের ট্রেডিশনাল আইটেম, যা সাইরুর মেন্যুকে করেছে আরও সমৃদ্ধ ।

রিসোর্টের অভাবনীয় সৌন্দর্যের পাশাপাশি পাহাড়ে বসবাস করা আরও প্রায় ১১ আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা, সংগ্রাম আর তাদের সংস্কৃতি মিলিয়ে দারুণ এক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন এখানে। হানিমুন কিংবা অবকাশ যাপন- যেকোনো উপলক্ষে সাইরুতে এসে দারুণ সময় কাটিয়ে যেতে পারেন। শরৎকাল হলো সাইরু হিল রিসোর্ট ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। এছাড়া যারা মেঘ বা মেঘলা আকাশ ভালোবাসেন, তাদের জন্য অবশ্যই সাইরুর বর্ষাকাল হবে সময় কাটানোর চমৎকার মাধ্যম।

রাতের সাইরু। সোর্স: Trip advisor

ভাড়া

সাইরুতে ৪ ক্যাটাগরির মোট ২০টি কটেজ রয়েছে। এখানে থাকা ও খাওয়ার জন্য অতিথিদেরকে একটু হাত খুলে খরচ করতে হবে।

প্রিমিয়াম

ভাড়া- ১৬,০০০ টাকা।

১টি কিং সাইজ বেড।

প্রাপ্ত বয়স্ক- ২ জন (অনূর্ধ্ব-৮ বছর বয়সী ২টি বাচ্চার ভাড়া লাগবে না)।

এক্সট্রা বেড বা ম্যাট্রিক্স নেওয়া যাবে (তার জন্য সামান্য খরচ বাড়তে পারে)।

এক্সিকিউটিভ

ভাড়া- ১৪,০০০ টাকা।

১টি কিং সাইজ বেড।

প্রাপ্ত বয়স্ক- ২ জন (অনূর্ধ্ব-৮ বছর বয়সী ২টি বাচ্চার ভাড়া লাগবে না)।

সাঙ্গু ভিউ উইথ ট্যারেস

ভাড়া- ১২,০০০ টাকা

সর্বোচ্চ ৩ জন থাকতে পারবে।

১টি সিঙ্গেল এবং ১টি বাঙ্ক বেড রয়েছে।

আউটডোর।  সোর্স: ইউটিউব 

সাঙ্গু ভিউ

ভাড়া- ১০,০০০ টাকা।

সর্বোচ্চ ৩ জনের জন্য।

১ টি সিঙ্গেল ও ১টি বাঙ্ক বেড রয়েছে।

ডরমেটরি কটেজ

ভাড়া- ২৫,০০০ টাকা।

১০ জনের জন্য ১০টি ফোল্ডিং বেডের ব্যবস্থা আছে।

সাইজ- ৭৫০ স্কয়ার ফিট।

কীভাবে যাবেন এবং যাতায়াত ভাড়া কেমন পড়বে

১। ঢাকা থেকে বাসে করে যেতে পারেন সরাসরি বান্দরবান। ফেরার টাইম জানা থাকলে কেটে নিতে পারেন ফিরতি টিকিটও।

ঢাকা-বান্দরবান যাওয়ার বাস টিকেটের মূল্য

  • নন এসি বাস (হানিফ/শ্যামলী/সৌদিয়া পরিবহন)- ৬২০ টাকা।
  • নন এসি বিজনেস ক্লাস বাস (সেন্ট মার্টিন পরিবহন)- ৬৫০ টাকা।
  • এসি ইকোনমি ক্লাস বাস (সেন্ট মার্টিন পরিবহন/শ্যামলী)- ৯৫০ টাকা।
  • এসি বিজনেস ক্লাস বাস (হানিফ/সেন্ট মার্টিন/শ্যামলী/দেশ পরিবহন)- ১,৪০০/১,৫০০ টাকা।

২। ঢাকা থেকে ট্রেনে করে চট্টগ্রাম যেতে পারেন। আন্তঃনগর ট্রেনের ক্লাস ভেদে ভাড়া পড়বে সর্বনিম্ন ৩৪৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১,১৭৯ টাকা পর্যন্ত। এরপর সেখান থেকে জনপ্রতি ২০/৩০ টাকা সিএনজি ভাড়াতে বদ্দের হাট। এখান থেকে বান্দরবানগামী পুর্বাণী/পুরবী বাস পাওয়া যায়। যা আপনাকে সরাসরি বান্দরবান শহরে পৌঁছে দেবে। নন-এসি এসব বাসের ভাড়া জনপ্রতি ১২০ টাকা করে।

লাক্সারি সাইরু। সোর্স: ভ্রমণ

৩। ঢাকা থেকে ফ্লাইট ধরে চট্টগ্রাম যেতে পারেন। শাহ আমানত থেকে রিজার্ভ প্রাইভেট/মাইক্রোতে করে সরাসরি সাইরু রিসোর্ট যাওয়া যাবে। ৫,৫০০-৬,০০০ টাকায় এসব প্রাইভেট কার/হায়েস রিজার্ভ পাওয়া যায়।

যারা প্রথম ও দ্বিতীয় পদ্ধতি ব্যবহার করবেন, তারা বান্দরবান শহর থেকে সাইরুতে যেতে পারেন নিম্নোক্তভাবে।

২-৪ জনের দল হলে সিএনজি রিজার্ভ নেয়া যেতে পারে। ভাড়া পড়বে ৮০০-১,০০০ টাকা। দলের লোকসংখ্যা ৫-৭ জন হলে ল্যান্ড ক্রুজার নিলে সুবিধে পাবেন। ভাড়া ১,৫০০-২,০০০ টাকা।

আর ৮ জনের বেশি হলে মাহেন্দ্র খোলা জীপই ভরসা। রিজার্ভ ভাড়া ২,০০০-২,৫০০ টাকা। এটাতে সর্বোচ্চ ১৪ জন পর্যন্ত যাওয়া যায়।

এছাড়াও চাইলে নিজস্ব গাড়ী সহকারে সাইরু ভ্রমণ করা যায়। তবে অবশ্যই তা তেলের গাড়ী হতে হবে । আর ড্রাইভারের পাহাড়ী রাস্তায় চালানোর অভিজ্ঞতা অবশ্যই থাকতে হবে।

ফিচার ইমেজ: ট্রিপ এডভাইজর

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

'ভয়ংকর' স্থানসমূহে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ৯টি নির্দেশনা

ছোটদের জন্য কলকাতার সাইন্স সিটি