শাহাজাদপুরের পথে রবীন্দ্রনাথের সাথে: মখদুমিয়া জামে মসজিদ

রবীন্দ্র কাছারি বাড়ি থেকে বের হয়ে হালকা আড়মোড়া ভাঙলাম। গন্তব্য তো বেশি দূরে নয়। সূর্যটাও মধ্য গগনে এসে মাথার চাদিতে আদর বুলিয়ে যাচ্ছে। একেবারে কাঁঠাল পাকা গরম যাকে বলে। বৈশাখ মাসে এ অবস্থা, না জানি জ্যৈষ্ঠ মাসে এবার কী হাল করবে! ঈসমাইল ভাই শেষ ভিউ নিয়ে নিচ্ছেন, আর আমি রিক্সা ঠিক করতে ব্যস্ত।

অবশেষে মখদুম শাহদৌলার মাজারের উদ্দেশ্যে যাবার ত্রিচক্রযান পেয়ে গেলাম। বার আউলিয়ার দেশ আমাদের বাংলাদেশ। প্রাচীনকাল থেকেই এই দেশে ধর্ম প্রচার করতে এসেছেন পীর দরবেশ, অলি আউলিয়া। তেমনই এক ধর্ম প্রচারকের পদধূলি পড়েছিল শাহাজাদপুরের মাটি। তিনি আর কেউ নন, হযরত মখদুম শাহদৌলা।

ছুটে চলছে ত্রিচক্রযান। আহা শাহাজাদপুরের বাতাসে যেন ফিরে পেলাম মৃদু প্রাণ। মখদুমিয়া জামে মসজিদ সিরাজগঞ্জে বেশ নাম করা। একে মসজিদ কাম মাজারও বলা যায়। প্রতি বছর এখানে ওরশ বসে। করতোয়া নদীর পাড়েই এই মসজিদ কাম মাজারের অবস্থান। কিংবদন্তি বলে ১২৯২ খ্রিস্টাব্দে আরবের ইয়েমেন থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য হযরত মখদুম শাহদৌলা (রহ.) একদল মুবাল্লিগসহ শাহজাদপুরে আসেন।

শাহাজালালের সিলেট আগমনের অনেক আগেই শাহদৌলা ও তাঁর সহচররা জাঁকিয়ে বসেছিলেন এই শাহাজাদপুরের মাটিতে। আরব দেশের ইয়েমেনের গভর্নর মুয়াজ ইবনে জাবালের দুই পুত্র ও কন্যার মধ্যে সবার বড় ছিলেন মখদুম শাহদৌলা। ইসলাম প্রচারের কাজে পিতার অনুমতি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বিশ্ব ভ্রমণের রোমাঞ্চে।

মাজারের গেট। ছবিঃ খালিদ রহমান (উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহিত)

ইয়েমেন থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথমে তিনি উজবেকিস্তানের বোখরা শহরে প্রবেশ করেন। বোখরা শহরে হযরত জালালউদ্দিন বোখারীর সান্নিধ্যে বেশ কিছু দিন তার দরবার শরীফে কাটানোর পর তিনি বাংলার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। বজরা নৌকা নিয়ে সফরে বের হয়ে ঘুরতে ঘুরতে পোতাজিয়া নামক স্থানে নোঙর ফেলেন। বর্ষা মৌসুমে আসেন তারা। সে সময় করতোয়ার খরস্রোতা রূপ দেখে অবাক হয়েছিলেন মখদুম শাহদৌলা। ভরা বর্ষায় থই থই পানিতে ডুবে ছিল গোটা শাহাজাদপুর। একুল ওকুল দেখা দুষ্কর।

বোখরা শহরের জোড়া কবুতর এবার তাদের পথ দেখায়। জালালউদ্দিন বোখারীর কাছ থেকে নিয়ে এসেছিলেন এই এক জোড়া কবুতর। ছেড়ে দেওয়া হয় কবুতর মুক্ত আকাশে। ফিরে আসে কবুতর জোড়া শুকনো মাটি নিয়ে। বিচক্ষণ মখদুম শাহদৌলা কবুতরকে অনুসরণ করতে বলেন। উড়ে যায় কবুতর দিগন্ত পানে, পিছে ছুটছে মখদুম শাহদৌলার বজরা। করতোয়া নদীর তীরে দরগাহপাড়া এসে শেষ হয় পানির যাত্রা। মাটির স্পর্শ পেয়ে বাংলার জমিনে বুক ভরে শ্বাস নিলেন সুফী সাধক। যেন এ মাটি তার শেষ অবস্থান হবে বুঝে গিয়েছিলেন।

মখদুমিয়া মসজিদ। ছবিঃ খালিদ রহমান (উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহিত)

যেখানে বজরা থামে সেই নদীর পাড়ে তাবু টানিয়ে সাময়িকভাবে বসবাস শুরু করে মখদুম শাহদৌলা ও তার সহচররা। এখান থেকেই তিনি ইসলাম প্রচারের কাজে লিপ্ত হন। দরগাহপাড়ায় যেখানে এখন মসজিদের অবস্থান, সেই স্থানেই মখদুম শাহদৌলা ও তাঁর সহচরের দল ওস্তাদ শামসুদ্দিন তাবরেজীকে নিয়ে পাঞ্জেগানা নামাজ আদায় করতেন। ধীরে ধীরে এখানে গড়ে তোলেন মখদুমিয়া জামে মসজিদ।

ইতিহাসে ডুবে ছিলাম। কখন যে দরগাহপাড়া এসে পড়লাম টেরই পেলাম না। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে এক বৃহদাকার গম্বুজ। আমরা থামলাম একেবারে করতোয়ার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ানো মখদুম শাহদৌলার মাজারের গেটে। চারদিকে কী শান্ত পরিবেশ। ভেতরে প্রবেশ করে সংস্কারের কাজ হচ্ছে দেখতে পেলাম। প্রথমেই চোখে পড়ে মখদুম শাহদৌলার সমাধিটি। প্রাচীনকে আমি আপন করিয়াছি। জ্বী, এক কক্ষের গোলাকার সেই প্রাচীন স্থাপত্যের উপরে সেই বৃহদাকার গম্বুজ দূর থেকে পথিককে আপন করতে ডাকে।

শামসুদ্দিন তাবরিজির মাজার। ছবিঃ খালিদ রহমান (উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহিত)

মাজারের পাশেই মখদুমিয়া শাহী জামে মসজিদ। এটি দরগাহ মসজিদ নামেও লোকমুখে প্রচলিত। উত্তর-দক্ষিণে প্রশস্ত মসজিদের পুব দেয়ালে প্রবেশ পথ রয়েছে পাঁচটি। ২.১ মিটার ও ১.৮ মিটার উঁচু এবং চওড়া প্রবেশ পথের মাপ। আটটি পাথরের তৈরি স্তম্ভ সুন্দরভাবে স্থাপিত হয়েছে মসজিদের ভেতর। তিনটি আইল ও পাঁচটি বেতে বিভক্ত মসজিদের ভেতরের অংশ। এর ফলে পনেরটি আয়তক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়েছে। এই আয়তক্ষেতের উপরই নির্মাণ হয়েছে পনের খানা গম্বুজ।গম্বুজগুলো অর্ধবৃত্তাকার এবং মাটি থেকে গম্বুজগুলোর উচ্চতা ৬.১৩ মিটার।

এই মসজিদের পাশেই শামসুদ্দিন তাবরিজির মাজার। শামসুদ্দিন তাবরিজির সমাধিটি একটি প্রাচীন গোলাকার এক কক্ষের স্থাপত্য। কক্ষের উপরে একটি বৃহদাকার গম্বুজ আছে। আর এর পাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অন্যান্যদের কবর। এই স্থাপনার দুই কিমি পুব দিকে বইছে হুরসাগর নদী। নামেই যেন জান্নাতি আমেজ।

করতোয়ার পার। ছবিঃ লেখক।

হুরসাগর, করতোয়া নদী যে তিস্তা মায়ের সন্তান। বাংলাদেশের নদীগুলোর কত সুন্দর সুন্দর নাম। অথচ নদীর কান্না মানুষকে নাড়া দেয় না। আজ থেকে ৫০০ বছর আগে বাংলার অনেক নদীর সাথে সাথে তিস্তা নদীরও গতিপথ পরিবর্তন হয়। তিস্তা নদী আগে বইত জলপাইগুড়ির দক্ষিণে তিনটি ধারায়। পূর্বে করতোয়া , পশ্চিমে পুনর্ভবা ও মধ্যে আত্রাই। এই তিনটি ধারায় প্রবাহিত হয়ে ত্রিস্রোতা নামটি এসেছিল, যা কালের বির্বতনে মানুষের মুখে মুখে ঘুরে হয়ে গেছে তিস্তা।

ত্রিস্রোতার পুনর্ভবা ধারাটি মিশেছিল মহানন্দায়। আর আত্রাই সে যে কাক চক্ষুর চলন বিলের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মিশে যেত করতোয়ায়। আত্রাই-করতোয়ার এই যুগ্মধারা জাফরগঞ্জ হয়ে মিশে যেত পদ্মায়। ১৭৮৭ সালের ধ্বংসাত্মক বন্যার পর তিস্তা তার পুরানো ধারা বর্জন করে ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলিত হয়। রেনেলের মানচিত্রে (১৭৬৪-১৭৭৭) এই ত্রিস্রোতার গতিবেগ দেখে ধারণা করা যায় তিস্তা উত্তরবঙ্গের একাধিক শাখায় (পুনর্ভবা, আত্রাই, করতোয়া ইত্যাদি) প্রবাহিত হতো।

এই ত্রিস্রোতা ধারা উত্তরবঙ্গের বর্তমান পশ্চিমতম নদী মহানন্দায় মিশত। এরপর জান্নাতি পরশে হুরসাগর নাম নিয়ে অধুনা গোয়ালন্দের কাছে জাফরগঞ্জে পদ্মায় মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত। জান্নাতি নদীটি এখনও আছে। তবে পরিবর্তন হয়েছে এর গতিপথ। পদ্মার বদলে হুরসাগর এখন মিশে গেছে যমুনা নদীতে।

নদীর পাড়ে পাখার মেলা। ছবিঃ লেখক।

আহা নদী। কাঁদো নদী কাঁদো। দাঁড়িয়ে আছি সেই করতোয়া নদীর পাশেই। তুমি যে যৌবন হারিয়ে ফেলছো নদী দূষণে। কই সেই তোমার খরস্রোতা রুপ? প্রকৃতি যেন খানিকক্ষণের জন্য বলে ওঠে- চুপ কর পথিক। চোখ বুজে উপলব্ধি কর করতোয়ার আদি রূপ। যে করতোয়া গঙ্গার তিনগুণ বড় ছিল। সে যে এখন খালের মতো হাঁটু সমান পানি নিয়ে বয়ে যায়, বহন করে নিয়ে যায় মানবের নিষ্ঠুরতা।

নদীর বিষন্ন হাওয়ায় কোথায় ডুব দিয়েছিলাম। ঈসমাইল ভাইয়ের ধাক্কায় ফিরে এলাম বাস্তবে। “আশিক ভাই, চলেন ছবি তুইলা যাইগা”। যেতেই তো হবে। যাবার আগে এই শাহাজাদপুর উপজেলা যে মনীষির নাম অনুসারে হয়েছে ধারণা করা হয়, তার ইতিহাস না বলে গেলে ভ্রমণের অপূর্ণতা রয়ে যাবে। মখদুম শাহদৌল্লা (রহঃ) এই মসজিদকে ঘিরেই তার ধর্ম প্রচারণার কাজ চালিয়ে যান। তখন এই অঞ্চল ছিল সুবা বিহারের রাজা বিক্রম কিশোরীর অধীনে। ইসলাম এই অঞ্চলে ছড়িয়ে গেলে বেধে যায় রাজা বিক্রম কিশোরীর সাথে মখদুম শাহদৌল্লার ধর্ম যুদ্ধ।

আহা নদী। কাঁদো নদী কাঁদো। ছবিঃ লেখক।

কথিত আছে, প্রথম দুই যুদ্ধে পরাজিত হবার পর ক্রোধে অন্ধ বিক্রম কিশোরী প্রতিশোধের নেশায় মরিয়া হয়ে ওঠে। মখদুম শাহদৌল্লার দরবারে নিজের গুপ্তচর পাঠান রাজা। গুপ্তচর তার ছল দিয়ে বনে যায় মখদুম বাবার শিষ্য। ছলে বলে কৌশলে একদিন একাকি নামাজরত অবস্থায় ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে গুপ্তচর দেহ থেকে গর্দান মোবারক বিছিন্ন করে ফেলে। পরে তার দ্বিখণ্ডিত মাথা নিয়ে যাওয়া হয় রাজার দরবারে। বিক্রম কিশোরীর নিকট গর্দান নেওয়া হলে অলৌকিকভাবে জবান খুলে যায় গর্দানের। সোবহান আল্লাহ ধ্বনিতে মুখরিত হয় রাজার দরবার। এই দৃশ্য দেখে অতাচারী রাজা তার ভুল বুঝতে পেরে তার অনুচরসহ অনেকেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।

এভাবে শাহাজাদপুরে ইসলামের প্রচার সুগম হয়। এর সাথে শেষ হলো আমাদের শাহাজাদপুরের যাত্রা। তবে এ যাত্রা যে শেষ নয়। ছুটে চলছি আমাদের শেষ গন্তব্যের পথে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লাদাখের পার্পল ড্রিম!

ভিয়েতনামের যত পুরোনো মুখ