সাগর কন্যা কুয়াকাটা: ফাতরার বন

ঘুম থেকে উঠে আড়মোড়া ভাঙলাম। ঘড়িতে বাজে সকাল সাতটা। হাত মুখ ধুয়ে রওনা দিলাম সাগর পাড়ে। সূর্যোদয় বাদ গিয়েছে তো কি হয়েছে? কমপক্ষে ভোরের সমুদ্র তো দেখা যাবে৷ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বেলাভূমিতে হাঁটছি আমরা চার নাবিক। প্রকৃতির লীলাখেলা বোঝা বড় দায়৷ সাগরকন্যা আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে তার রূপ সুধা পান করার জন্য। প্রথমেই চলে গেলাম ফাতরার বন, লাল কাকড়ার চর যাবার ট্রলারের টিকেট কাটতে। আমাদের সিরিয়াল পড়লো সকাল ৯টার ট্রলারে৷ হাতে অফুরন্ত সময় ঘুরে দেখা যাক সমুদ্র সৈকত।

ছোট এই সৈকতে নেই কোনো আভিজাত্য বা চাকচিক্য৷ এর বদলে দখল করে আছে এক রাশ ঘোর লাগানো মায়া৷ নারিকেল গাছের ঝিরিঝিরি পাতা ভেদ করে সকালের সূর্যের কিরণ স্বাগত জানাচ্ছে আর একটি নতুন দিনের৷ কী শান্ত এই বেলাভূমি। এখানে আমার দিনের পর দিন, মাইলের পর মাইল হাটতেও ক্লান্তি নেই৷ সময় যেন থেমে গেছে অদ্ভূত এক মায়ায়৷ পর্যটক সিজনে কক্সকে বাজার না বানিয়ে কিছু সুখ অনুভূতি নিতে কুয়াকাটা আসলে কোনোদিক দিয়েই পাপ হবে না৷ সমুদ্রের মৃদু মৃদু ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে আমার পা। এর মধ্যে খেয়াল করলাম সোনালী ইলিশ সূর্যের আলোয় চিকচিক করছে এই বালুকাবেলায়। কীভাবে ইহা সৈকতে আসলো তার রহস্য ভেদ করতে না করতেই ডাক পড়লো ফাতরার বনে যাবার যাত্রীদের।

বলে হেঁটে যায় উদাসী। ছবিঃ জুয়েল রানা।

মেইন সি বিচ থেকে ব্যাটারি অটোতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো ট্রলার ঘাটে৷ এখান থেকে আমাদের তরী তৈরি ফাতরার বন যাবার জন্য। শুরু হলো অসম্ভব সুন্দর যাত্রার। কলাপাড়া থানার অন্তগর্ত বে অফ বেংগলের বুকে জেগে উঠছে এই ফাতরার বন। সুন্দরবনের সদৃশ হলেও এটি আমতলী ফরেস্ট রেঞ্জের একটি অংশ। বেশ সুন্দর ম্যানগ্রোভ বন৷ কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর ও খাল পেরিয়ে ট্রলারে করে মাত্র এক ঘণ্টা সময় লাগে ফাতরার বন যেতে। জোয়ার ভাটায় দিনে দুই বার প্লাবিত হয় এই ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট।

চারদিকে রাশি রাশি জলের রাজ্য ভেদ করে এগিয়ে চলছে ট্রলার। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে ফাতরার বন। মাইলের পর মাইলের সবুজের রাজ্য। দিগন্ত বিস্তৃত এই জলের রাজ্য পাড়ি দিয়ে হঠাৎ করে সমুদ্রের বুকে যেন জেগে উঠবে ফাতরার বন। এ যেন সমুদ্রের বুকে ভাসমান কোনো অরণ্য। যখনই ট্রলার ফাতরার বনের রুট ক্যানেলে প্রবেশ করলো, মনে হলো যেন দু’পাশে ঘন সবুজের এই অরণ্য আমাকে স্বাগত জানানোর জন্য দাঁড়িয়ে আছে৷ মোহমায়া আলো ছায়ার খেলা সবুজ অরণ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে গেলাম বনে ঢোকার প্রবেশদ্বারে।

সমুদ্র দেখে পাগল জুয়েল রানা। ছবিঃ লেখক।

এখান থেকেই শুরু বনে ঢোকার সরু পথ। বনের মাঝে বাঁধানো রাস্তা দিয়ে কিছু দূর হাঁটার পর অনেক অভিযাত্রী সামনে মাটির রাস্তার কাদা পানির পাহাড় দেখে ভিতরে ঢোকার আগ্রহ হারিয়ে ফেললেও এগিয়ে চললাম আমরা ১১ জন যুবক। ম্যানগ্রোভের বনের শ্বাসমূল এতক্ষণ পর দেখতে পেলাম।

বিশুদ্ধ বাতাসে হাঁটার গতিবেগ বেড়ে গেল। বনে সুন্দরী, কেওড়া, বাইন, গোলপাতা সদৃশ গাছের সারি লক্ষ্য করলাম। ঘন এই গহীন অরণ্যে প্রকৃতির এই নিরবতার মাঝে ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখির দল। এ যেন এক অন্য জগৎ। হেঁটেই চলছি এক নাগাড়ে৷ কিছু দূর যাবার পর শুনতে পেলাম সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন। গাছাপালার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে এক চিলতে সমুদ্র। আহ কি স্বর্গীয় দৃশ্য।

দূর থেকে দেখা যায় ফাতরার বন। ছবিঃ লেখক।

মাতাল হাওয়ার শো শো আওয়াজে নড়ে উঠছে যেন বনের গাছপালা। পথের শেষে দেখা মিললো আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত সমুদ্র সৈকতের। ঘন সবুজ পেরিয়ে সাগরের এই বিশালতার মুগ্ধতার আবেশে পাল ছেড়ে দেওয়া নৌকার মতো নিজেকে ছেড়ে দিলাম। সাথে যোগ দিল ওয়াফি, জুয়েল ভাই। ভাতিজা এই গভীরে বনে ঢোকার সাহস দেখায়নি। এরোপ্লেনের মতো ডানা মেলে উড়ে গিয়ে ল্যান্ড করলাম সমুদ্রের জলে। এত বাচ্চামি লাস্ট কবে করেছি নিজেরও মনে নেই।

এমন সুন্দর স্নিগ্ধ নিরিবিলি পরিবেশে সমুদ্রের ঢেউয়ের ছন্দে দোলে এই মন আনন্দে। সুন্দর একটা মিনি এডভেঞ্চার কমপ্লিট করার পর সবাই ক্লান্ত বিধায় ট্রলারের ক্যাপ্টেন সাহেব আমাদের এই দুঃসাহসী নাবিকদের এখান থেকেই পিক করলো৷ ভাগ্য ভাল মোবাইল নেটওয়ার্ক আর আমাদের ভাতিজা ট্রলারে ছিল। না হয় আবার এই পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হতো ট্রলারের কাছে। দূরন্ত যাত্রা শেষে ধীরলয়ে ট্রলার আবার চলা শুরু করলো।

কাঁকড়ার চরে। ছবিঃ লেখক।

এবার যে ঘরে ফেরার পালা?

ট্রলার এসে ভিড়ল লাল কাঁকড়ার চরে৷ এই কাকফাটা রোদে কি আর দেখা মিলবে লাল কাঁকড়াদের? গর্তবাসী গর্ত থেকে উঁকিঝুকি দেবার মাঝে এক চিলতে লাল দেখা যায়৷ সব কাঁকড়া গেছে বনে৷ আমাদের আশা দুরাশায় পরিণত হলো৷ মাইলকে মাইল লাল কাঁকড়ার বালুভূমি যেন এক বিরান মরুভূমি৷ জোয়ারের সময় যা-ও দু’একটা কাঁকড়ার দেখা পাই, পায়ের শব্দে তড়িৎ গতিতে গর্তে লুকিয়ে পড়ে।

এই লুকাছুপি খেলার মাঝে উপভোগ করতে লাগলাম বে অফ বেংগলের মায়া ভোলা রূপ। শো শো দক্ষিণা বাতাস বইছে৷ প্রকৃতি যেন খুলে দিয়েছে তার লাজের দুয়ার৷ বন বিভাগের নিরলস পরিশ্রমে গড়ে তোলা সবুজ বৃক্ষরাজির সারির মাঝে বিমোহিত হয়ে দেখছি উম্মত্ত বঙ্গোপসাগরের রূপ৷ যেন কোনো শিল্পী মনের ক্যানভাসে রাঙিয়ে তুলেছে এই বেলাভূমি৷ বিশ মিনিট প্যাকেজ ডিলে সময় ব্যয় করে এবার ঘরে ফেরার পালা৷

শুধুই বালুচরের বালিয়ারি। ছবিঃ লেখক।

যথারীতি ফিরে এলাম আবার ট্রলার ঘাটে৷ এবার প্ল্যান দুপুরের খাবার খেয়ে বিকাল পাঁচটার মধ্যে বরিশালের বাসে উঠে যাব। যাবার আগে দেখে নেই পুরনো জাহাজ, আর কুয়াকাটার নামকরণের সেই নলকুপখানি৷ হাবিজাবি অনেক স্থান জোর করে স্পট বানানোর প্রবণতা থেকে রেহাই পায়নি সাগরকন্যা৷

মটর সাইকেল গাইডদের বাহারি প্যাকেজ মুগ্ধ হয়ে গেলাম। মার্কেটিং শিখতে হবে এদের কাছ থেকে৷ এক প্যাকেজ ডিলে ১০-১২টা স্পট৷ এত ডেস্টিনেশন হ্যান্টিংয়ের কবলে পড়ে সবাই উপভোগ করতে ভুলে যায় সাগরের আসল মাধুর্য৷ আবার হয়তো ফিরে আসবো এই সমুদ্রতটে। বাংলাপিডিয়ার ছোট একটা ইতিহাসের অংশ দিয়ে শেষ করছি আমাদের কুয়াকাটা ভ্রমণ রোজনামা।

বিদায় সাগর কন্যা। ছবিঃ লেখক।

“কুয়াকাটার নামকরণ সম্পর্কে জানা যায় যে, ১৭৮৪ সালে বর্মিরাজা রাখাইনদের মাতৃভূমি আরাকান দখল করলে হাজার হাজার রাখাইন তাদের মাতৃভূমি আরাকান ত্যাগ করে। তারা বড় বড় নৌকায় অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। বঙ্গোপসাগরের তীরের রাঙাবালি দ্বীপে এসে তারা অবতরণ করে। গড়ে তোলে বসতি। সাগরের লোনা পানি ব্যবহার এবং খাওয়ার অনুপযোগী বলে বালুর মধ্যে তারা কূপ বা কুয়া খনন করে বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করত। কুয়া খনন করে এখানে সুপেয় পানি পাওয়ায় তারা এর নাম দিয়েছিল কুয়াকাটা।”

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাগর কন্যা কুয়াকাটা: দুরন্ত যাত্রা

তিনাপ সাইতার– এক রোমাঞ্চকর যাত্রা: ঘরে ফেরার বার্তা