সাগর কন্যা কুয়াকাটা: দুরন্ত যাত্রা

অক্টোবরের সরকারি ছুটির ফাঁদে পড়ে ভেবেছিলাম বাসায় শুয়ে থাকব৷ বন-বাদাড়, পাহাড়ে ঘুরে মনটা ক্লান্ত অবশান্ত। হঠাৎ হুটহাট কথা নাই জুয়েল রানা ভাইয়ের ফোন- ভাই, বৃহস্পতিবার চলেন মধুমতিতে চড়ে বাগেরহাট ঘুরে আসি৷ দোটানায় পড়ে গেলাম৷ মহাভারতে যুধিষ্ঠির যেমন ছিল জুয়ার নেশায় আসক্ত, তেমনি আমি ভ্রমণ নেশায় অসক্ত৷ তবে এই বাগেরহাট প্রতি ট্রিপের কুফা। বাগেরহাটের প্ল্যান করে চন্দ্রনাথ পাহাড় থেকে শুরু করে সাত সমুদ্র ঘুরে আসছি কিন্তু বাগেরহাট আর যাওয়া হলো না। এবারও যাওয়া হলো না। “স্বপ্নযাত্রা চর আলেকজান্ডার” গল্পে আমাদের কুয়াকাটা ট্যুরের প্রেক্ষাপটের ফিরিস্তি দেওয়া আছে তাই কথা না বাড়িয়ে বরিশাল থেকে শুরু করা যাক।

সারা রাত ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করে খুব সকালে বরিশাল ঘাটে নেমে পড়লাম আমরা চার জন৷ রুপাতলি নথুল্লাবাদ কোথায় থেকে কুয়াকাটার বাসে ওঠা যায় তা নিয়ে ওয়াফি’র সাথে বিস্তর কথা কাটাকাটির পর আমরা তার হাতে লাগাম তুলে দিয়ে নিঃশব্দে ডান বাম ডান বাম করতে করতে চলে এলাম নথুল্লাবাদ বাস স্ট্যান্ড। তখনও জানতাম না কপালে কী শনি লেখা ছিল। ওয়াফি’র ভাষায়- নথুল্লাবাদ যামু, ঢাকার বাসে উঠুম, এরপর কুয়াকাটা যামু গা৷ এই সরল সমীকরণে গরল বাঁধাল মেঘনা পরিবহন।

কর্মব্যস্ত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। ছবিঃ লেখক।

চাঁদি ফাটা রোদে বাস স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে চলে যেতে দেখলাম একের পর এক ঢাকার বাস। কেউ ওয়াফির কথা রাখলো না। কথা রাখলো মেঘনা পরিবহন। কিছু না ভেবেই উঠে পড়লাম। ঘড়ির কাটায় তখন সকাল সাড়ে আটটা৷ শুরু হলো আমাদের যাত্রা৷ সেমি লোকাল বাস বলতে যা বোঝায়। প্রতি মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে যাত্রী নিচ্ছে। এরপরও বাস ভরে না৷

তবে মজার ব্যাপার একটু পর লক্ষ্য করলাম৷ এটা আসলে বাস না, বাস কাম ট্রাক। ক্ষণে ক্ষণে থেমে থেমে নিচ্ছে নানান পণ্যের পসরা৷ ঘরের দরজা থেকে শুরু করে কমোড কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না। এক জায়গায় থামে, সময় নিয়ে লোড করে, এরপর হেলেদুলে চলে মেঘনা পরিবহন। লেবুখালী ফেরী আসতে আসতে মনে মনে গালি দিয়ে বাসের ১৪ গুষ্টি উদ্ধার করলাম। ধীর লয়ে অনেক কষ্টে কুয়াকাটা এসে পৌঁছালাম দুপুর দুটোয়।

দিনের শেষ আলোয় সমুদ্রের গর্জন শুনি। ছবিঃ লেখক।

পূজোর ছুটির চাপে পুরো দক্ষিণবঙ্গ যেন প্রবেশ করেছে কুয়াকাটায়৷ ঠাই নাই, ঠাই নাই। হোটেল খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। এর মধ্যে সেরে নিলাম দুপুরের খাবার। অবশেষে বাসস্থানের ব্যবস্থা হলো। মূল হোটেল পল্লী ছেড়ে একবারে ভিতরের দিকে একটা টিনের চালের ঘর ভাড়া নিলাম। আবাসন ব্যবস্থার সমাধানের পর হুড়মুড়িয়ে সবাই দৌড় দিলাম সমুদ্র সৈকতে৷ আহা, কী সুখ। আমি আসছি সাগর কন্যা। পড়ন্ত বিকালে সমুদ্রে স্নানে মগ্ন অদ্ভুতুড়ে পথিকের দল। ওয়াফিকে আমার সব সময় মুসা আমান মনে হয়। বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেটার গায়ে অসুরের মতো শক্তি। মনটা নারিকেলের শাঁসের মতো নরম।

সদ্য হাস্যোজ্জ্বল জুয়েল ভাই সব সময়ই ভালো থাকেন। আর ভাতিজা আল আমিন এইবারের নতুন এডিশন। শেষ বিকেলের রক্তিম সূর্যের সোনালী আভায় চিক চিক করছে বালুচর৷ আকাশে দিগন্তের এই নীলিমায় বিলীন হয়ে সাগরের জলে যেন মিশে যাচ্ছে এই মন। সূর্যাস্তের সময় হয়ে গেল দেখতে দেখতে৷ সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মতো বিরল দৃশ্য বাংলাদেশে শুধুমাত্র কুয়াকাটায় আসলেই দেখতে পাওয়া যায়। হঠাৎ করে যেন সূর্যটা টুপ করে সমুদ্রে জলে ডুবে গেল। সে এক আপার্থিব নৈসর্গিক দৃশ্য। এর ঘোর লেগে ছিল বহুক্ষণ।

সূর্যটা কমলা লাল। ছবিঃ লেখক।

সাগরের মাতালী হাওয়ায় সন্ধ্যায় সাগর পাড়ে মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছে ভ্রাম্যমাণ দোকানদার৷ পর্যটকে সিজনে এরা ভুইফোড়ের মতো উদয় হয়৷ বাতাসে মাছের ম ম গন্ধে জিভে জল এনে দেয়৷ নিজেকে সামাল দেওয়া দায়। আমরা সবাই মাছ ঘেঁটে ঘেঁটে দেখছি। বেশ অবাক হলাম এত সস্তা দাম দেখে। আমরা টুনা ফিশ, ফ্লাইং ফিশ, ছোট রুপচাদা ভাজার অর্ডার দিয়ে বসলাম। যথারীতি ভাজা শেষে এসে পড়লো মাছ। ভক্ষণ পর্ব শুরু করলাম। টুনা ফিশ এত পেটে চালান দেবার পরও মনে হচ্ছিলো শেষ যেন হয় না।

এর মধ্যে ওয়াফি অদ্ভুতুড়ে সব কাণ্ড করে৷ হঠাৎ করে বলে উঠলো- আশিক ভাই, পেট কেমন জানি গুড়গুড় করে৷ ব্যালেন্স করতে হবে৷ চটপটি খামু। বেরসিক ওয়াফির কথা শুনে আকাশ নয় যেন পাতাল ফুড়ে উপরে উঠলাম৷ পেটে গুড়গুড় ডাক দিলেও যে চটপটি খাওয়া যায় আজ নতুন জানলাম। কত কিছু জানার আছে। সাগর পাড়ে এই সুন্দর সন্ধ্যায় গীতা দত্তের গান মনে বেজে ওঠে। যদিও বা টপিকলেস গান।

এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়
এ কি বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু।।
কোন রক্তিম পলাশের স্বপ্ন
মোর অন্তরে ছড়ালে গো বন্ধু।।

আমলকি পেয়ালের কুঞ্জে,
কিছু মৌমাছি এখনো যে গুঞ্জে
জানি কোন সুরে
মোরে ভরালে গো বন্ধু।।

সাগর কন্যা। ছবিঃ লেখক।

সাগরের বিশালতার কাছে সব কিছুই তুচ্ছ মনে হয়৷ এ জায়গার সাগর আবার কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিনের সমুদ্র সৈকতের মতো গর্জন শোনায় না। তবে রাতের সমুদ্রের গর্জন বড়ই ভয়ংকর৷ জানি না দিনে কেন এমন গর্জন শোনায় না৷ হয়তো বা মানুষের ভিড়ে তা টের পাওয়া যায় না। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে যত রাত খুশি সময় কাটানো যায়৷ এখানে নেই কোনো নিরাপত্তা জনিত সমস্যা। ট্যুরিস্ট পুলিশ বেশ কর্মচঞ্চল এই অঞ্চলে৷ যে কোনো সমস্যায় ট্যুরিস্ট পুলিশের টহল দল বা থানায় জানালে তুড়ি মেরে সমাধান হয়ে যায়৷ তাই এখানে নেই নিরাপত্তা নিয়ে জুজু বুড়ির ভয়৷

চাদের আলোয় আলোকিত রাতের সমুদ্র৷ চাঁদের আলোয় ঝলমলে ঢেউ হৃদয় কাড়ে চন্দ্রবিলাসীদের৷ রাতের সাগর কিছু রহস্য রেখে দেয় পথিকের জন্য। যা চন্দ্রসুধায় মুগ্ধ পথিকদের বার বার তার কাছে টানে। এই আবেদনে নিজেকে ধরে রাখা বড় দায়৷ তবে সাথে বেরসিক ওয়াফি থাকলে এই সব আবেদন ছাই ফেলে যেতে হয়। ছেলেটা পাহাড় ছাড়া কিছু বোঝে না। আর ক্ষুধার রাজ্যে সুকান্তের চাঁদ সে একাই খেয়ে ফেলতে পারবে৷ তাই রাত ৮-৯টার দিকে সেই টিন চালা ঘরে ফেরার আগে পেটের আগুন নিভিয়ে নিলাম৷

কত প্ল্যান ছিল খুব ভোরে উঠে চলে যাব গংগামতির চর। সেখানে ঝাউবনে বসে দেখবো সূর্যোদয়। ঘুম সব মাটি করে দিল। শত চেষ্টায় ভোরে উঠতে না পারলেও শরীরটা আমেজের আবেশে ভেসে যাচ্ছে। কারণ ডেস্টিনেশন হান্টিং বড় ক্লান্তময়। এই সাগরের পাড়ে এসে আমি ধীরতা চাই, সাগরের ঢেউয়ের স্রোতে ভাসাতে চাই আমার সুখের ভেলা।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নতুন বছরের প্রথম দিনে, দিল্লীর মিষ্টির অথৈ সাগরে

সাগর কন্যা কুয়াকাটা: ফাতরার বন