ঘুপচি অলিগলির শহর কলকাতা ভ্রমণ কথন

ছোট থেকেই নিজের দেশ আর বাইরের দেশ ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছেটা খুব তীব্র ছিল। বাবা প্রতি শীতে বার্ষিক পরীক্ষা শেষে নিয়ম করে বেড়াতে নিয়ে যেতেন পুরো পরিবার সহ। ছোটবেলায় কলকাতা থেকে এক দিদি এলো আমাদের বাসায়, খাঁটি শুদ্ধ কথা আর পরিপাটি চালচলনে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতাম। কোলকাতা যাবার শখ তখন থেকেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর থেকে আমার ঘোরাঘুরি শুরু। বাংলাদেশে মোটামুটি ঘোরার পর ভারত যাবার পরিকল্পনা করছিলাম অনেক দিন ধরে। গন্তব্য কলকাতা, শিমলা, মানালি, দিল্লি। জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমণ, হোক না সেটা পাশের দেশ ভারতেই।

পাসপোর্ট আগেই করানো ছিল, খুলনা থেকে ভিসাটাও করিয়ে নিলাম। চার বন্ধু আমরা পরিকল্পনা করলাম কলকাতায় দুই দিন, শিমলায় এক দিন, মানালিতে দুই দিন আর দিল্লিতে এক দিন থাকবো। দিন তারিখ ঠিক করলাম সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখ।

শিয়ালদাহ স্টেশন, ছবিঃ লেখক

যেহেতু এই ট্যুরে কোন ধরনের হাঁটাহাঁটি করতে হবে না তেমন মনে করেছিলাম, তাই ট্রলিতে সব কাপড়চোপড় গুছিয়ে নিলাম যাত্রার আগের দিন রাতে। তবে ট্রলি নেয়ার ব্যাপারে ভুল ছিলাম আমি। এসব ট্যুরে ব্যাকপ্যাক নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

ট্রাভেল ট্যাক্স ৫০০ টাকা আগেই খুলনার সোনালি ব্যাংকে দিয়ে গিয়েছিলাম, যেকোনো বিভাগীয় সরকারী ব্যাংকে এই কাজটা যাত্রার আগেই সেরে ফেলা যায়। তাহলে ইমিগ্রেশনে গিয়ে বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয় না।

ফেয়ারলি প্যালেস, কোলকাতা। ছবিঃ লেখক

২৫ তারিখ ভোরের ট্রেনে খুলনা থেকে বেনাপোল চলে গেলাম, ইমিগ্রেশন শেষ করে ঢুকে পড়লাম ভারতে। এপাশের এলাকার নাম পেট্রাপোল। এখানে টাকা রুপিতে পরিবর্তন করে চলে গেলাম বনগাঁ স্টেশনে, ভাড়া ৩০ রুপি।

বনগাঁ থেকে প্রতি আধ-ঘন্টা পর পর লোকাল ট্রেন যায় শিয়ালদাহ পর্যন্ত। সকাল সাড়ে ১১টার ট্রেনের টিকেট কিনে নিলাম ২০ রুপি দিয়ে। শিয়ালদাহ পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর ২টা বেজে গেল। এসে গেলাম তাহলে দাদাদের দেশে, যেখানে বিশ টাকাকে বলা হয় কুড়ি টাকা আর কাউকে মামা বলা যায় না, বলতে হয় দাদা।

মুড়ির টিনের বাস, ছবিঃ লেখক

হোটেল বুক দিয়ে গিয়েছিলাম বাংলাদেশ থেকে, বুকিং ডট কমের মাধ্যমে। কলকাতায় হোটেলের দাম অন্যান্য শহর থেকে বেশি, তাই আগে থেকে বুক করে যাওয়া ভালো। আমাদের হোটেল ছিল জোড়া গির্জার পাশে, ব্যানার্জি রোডে।

তবে কলকাতা নিউমার্কেটের আশেপাশে অনেক হোটেল আছে মোটামুটি ১,২০০-১,৫০০ টাকার মধ্যে। আমাদের হোটেলটি খুঁজে বের করতে বেশ কষ্ট হয়ে গেল, বিকেল ৫টায় খুঁজে পেলাম অবশেষে। ছোট তিনজনের রুম, তিনজনকেই থাকতে দেবে তারা। অতিরিক্ত বেডের জন্য লাগবে অতিরিক্ত টাকা।

এসপাল্যান্ড আর হলুদ ট্যাক্সি, ছবিঃ লেখক

জানতাম এমন কিছুই হবে তাই তৈরি ছিলাম এটার জন্য। রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিলাম দেড় ঘণ্টার মধ্যে। উদ্দেশ্য রাতের কলকাতা ঘুরে দেখা। মাথায় ট্রামে চড়ার শখটা চেপে বসলো। বেরিয়ে গেলাম চার বন্ধু কলকাতার সোডিয়াম আলোয় উদ্ভাসিত রাস্তায়।

আশেপাশের হলুদ ট্যাক্সি, মুড়ির টিনের মতো বাস আর দাদাদের ঠোঁটের উপর ঘন গোঁফ জানান দিচ্ছিলো আমরা কলকাতায়। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার ডানে চোখ গেল, ডমিনস! বাংলাদেশে এই একটা ফাস্ট ফুডশপ নেই, তাই তাদের পিৎজা চেখে দেখার শখ হলো আর ঢুকে গেলাম সেই ফুডশপে। চারজন চারটে পিৎজার অর্ডার দিলাম, প্রতিটা পিৎজা আলাদা আলাদা ফ্লেভারের। চারটা ফ্লেভারই সবাই চেখে দেখলাম।

কলকাতা, ছবিঃ লেখক

খাওয়া শেষে আবার বেরিয়ে পড়লাম কলকাতার গলিতে। তখন প্রসেনজিৎয়ের থ্রিলার সিনেমা “ইয়েতি অভিযান” মাত্র মুক্তি পেয়েছিল। সবাই বললো সিনেমা দেখবে কলকাতায়। চিনি না তো কিছু, তাই জিজ্ঞেস করতে করতে যাচ্ছিলাম সিনেমা হল কোথায় আছে।

কলকাতা ঢাকার থেকে একদিক দিয়ে পিছিয়ে, স্থানীয়রা ঠিক ঠিক বলতে পারে না কোথায় কী আছে। তবুও হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম নিউমার্কেটের কাছের একটা সিনেমা হলে। সেদিনের শো ফুল হয়ে যাওয়ায় হতাশ আমরা আবিষ্কার করলাম নিউমার্কেট এসে গেছি।

কলকাতার সবচেয়ে ব্যস্ততম জায়গাগুলোর মধ্যে নিউমার্কেট অন্যতম। দূর্গাপূজার সময় ছিল তখন, পঞ্চমী চলছিল নিউমার্কেট সহ গোটা কলকাতায়।

ব্যস্ত কলকাতা, ছবিঃ লেখক

কম দামী জুতো, ব্যাগ থেকে শুরু করে দামী নাইট ক্লাব, বার- কী নেই নিউমার্কেটে! হরেক রকমের মানুষের ভিড়ে একটু পুরনো আমলের নিউমার্কেটে ঘুরতে লাগলাম আশেপাশে। একসময় বুঝলাম হারিয়ে ফেলেছি ফিরে যাওয়ার রাস্তা।

গোল চত্বর দিয়ে যাচ্ছি চার জনে মিলে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে। একটা হলুদ ট্যাক্সি ডাক দিলাম, বললাম জোড়া গির্জা যাবেন? ভাড়া চেয়ে বসলো ১০০ রুপি, উঠে বসলাম কারণ কোনো উপায় নেই। এক টানে চলে গেলাম হোটেলের সামনে। আজকের মতো এখানেই ঘোরাঘুরি শেষ করে রুম থেকেই খাবারের অর্ডার দিলাম, খেয়ে ঘুম দিলাম।

ট্যাক্সি ক্যাবে পুরো কলকাতা, ছবিঃ লেখক

পরদিন সকাল সকাল উঠেই হোটেল কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করে নিলাম কোন বাস কোন দিকে যায়। হোটেল থেকে বের হয়ে ১৭ রুপি দিয়ে সকালের নাস্তা শেষ করলাম, নাস্তায় ছিল চারটা রুটি, ডিম আর ডাল-তড়কা।

উঠে পড়লাম বাবুঘাট যে বাস যায় সেটায়, গন্তব্য ইডেন গার্ডেন, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আর কলকাতা স্টেডিয়াম। ইডেন গার্ডেনের সামনে নামিয়ে দিল বাস। কলকাতায় যেখানেই বাসে করে যাবেন ভাড়া ৭ থেকে ৮ রুপির বেশি নয়। ইডেন গার্ডেনের পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগলাম আমরা, দেখলাম গার্ডেনে কপোত-কপোতিরা মশগুল হয়ে বসে আছে।

সেদিকে আর পা না বাড়িয়ে স্টেডিয়ামের দিকে চলে আসলাম। কলকাতায় গরম প্রচুর, তাই কলকাতার দু’দিনে আমাদের সঙ্গী ছিল লিমকা আর নিম্বু পানি। নিম্বু পানি অথবা লেবু জল খেতে খেতে একটু জিরিয়ে নিলাম। স্টেডিয়ামের দেয়ালে ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাস ফুটিয়ে তোলা হয়েছে খুব যত্ন করে। এই এলাকাটা একদমই ফাঁকা, ছুটির দিন ছিল সম্ভবত। আমরা ছাড়া এইদিকে কেউ ছিল না আর।

সকালের নাস্তা, ছবিঃ লেখক

ইডেন থেকে হাঁটতে হাঁটতে এসপাল্যান্ডে চলে গেলাম, বেশ জমকালো কিন্তু পুরনো আদলে তৈরি এই ভবনের ধারের মোড়কে এসপাল্যান্ড মোড় বলা হয়। এখানে মাটির কাপে প্রথম চুমুক দিলাম কলকাতার চায়ে। পাঁচ রুপির সেই চায়ে আহামরি তেমন কিছু ছিল না, ছিল পরিবেশনের প্রাচীনতা। বাসে চেপে ভিক্টোরিয়ার সামনে নামলাম। কলকাতার অন্যতম দর্শনীয় স্থান ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ছবিঃ লেখক

ভারতীয় বলে পরিচয় দিয়ে ২০ রুপি দিয়ে টিকেট কেটে ঢুকে পড়লাম বিকেল ৪টার দিকে ভিক্টোরিয়ায়। ভিক্টোরিয়ার ভেতরে দেখার আছে অনেক কিছু। জাদুঘর আর চিত্রকর্মের সেকশনটা ব্যক্তিতভাবে আমার পছন্দ।

ছবি তোলা নিষেধ তবুও কয়েকটা ছবি তুলেছি। অনেক বড় মেমোরিয়ালে ঘুরতে ঘুরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। ভিক্টোরিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এখানকার চিত্রকর্মের সেকশনে গেলে দেখা হয়ে যায় গোটা ভারতবর্ষ, ভারতের প্রায় সব জনপ্রিয় জায়গায় কিছু অন্যরকম চিত্রকর্ম রাখা আছে এখানে।

ভিক্টোরিয়ার চিত্রকর্ম, ছবিঃ লেখক

ভিক্টোরিয়া থেকে উবারে করে বাবুঘাট চলে গেলাম, বাবুঘাট থেকে হাওড়ার উদ্দেশ্যে ফেরী ছেড়ে যায়। উদ্দেশ্য হাওড়া স্টেশন নয়, উদ্দেশ্য ফেরীতে করে বিকালটা নদী আর হাওড়া ব্রীজকে উৎসর্গ করা। সেই গোধূলীতে হাওড়া ব্রীজ আর বিদ্যাসাগর সেতুর নীচ দিয়ে হেলেদুলে ফেরী পার হচ্ছিলো, ফেরী ভাড়া ৮ রুপি। সন্ধ্যা নামলো হাওড়া স্টেশনে।

সত্যি বলতে এত বড় রেলস্টেশন দেখে ভড়কে গেছিলাম অনেকটা। প্রায় ২৩টা প্ল্যাটফর্মের বিশাল এই স্টেশনের পুরোটাই গুগল দ্বারা ওয়াই-ফাইকৃত। স্টেশনের রেস্টুরেন্টে দুপুর খাবার সন্ধ্যায় খেয়ে আগামীকালের শিমলা যাওয়ার ট্রেনের খবর নিয়ে স্টেশন থেকে বের হতেই বাধলো বিপত্তি। টিকেট ছাড়া বের হতে দেয় না স্টেশন থেকে, পরে বললাম আগামীকালের টিকেট কাটা আমাদের। ছেড়ে দিল।

গোধূলি বেলায় হাওড়াতে, ছবিঃ লেখক

স্টেশন থেকে বেরিয়ে একটু সামনে হাঁটলেই হাওড়া ব্রীজ পড়বে। উঠে গেলাম শত শত গাড়ির চাকার আবর্তনে কাঁপতে থাকা বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ব্রীজ হাওড়া ব্রীজে। পুরোটা ব্রীজ হেঁটে পার করলাম। সেখান থেকে আবার চলে গেলাম নিউমার্কেটে, ফিরে আসার সময় ভাবলাম ট্রামে চড়বো। ট্রাম ঠিক কোথায় যায় সেটা না জানায় ওঠা হয়নি ট্রামে। শুরু করলাম হাঁটা।

একদম নিউমার্কেট থেকে হোটেল পর্যন্ত হেঁটে আসলাম সেই রাতে। কাছের এক বন্ধু একবার বলেছিল কোনো শহরকে চিনতে হলে হাঁটতে হবে পায়ে। কলকাতায় পায়ে হাঁটার মজাই আলাদা। আলাদা শহর, শহরের গন্ধ আর রাতের মায়ায় অপার্থিবতা কাজ করে। আসার পথে কিছুক্ষণ বাস স্টপে বসে বসে আড্ডাও দিয়ে আসলাম সেখানকার স্থানীয় দাদাদের সাথে।

মিস্টেরিয়াস দাদা, ছবিঃ লেখক

পরদিন সন্ধ্যা ৭:৪০ এ কালকা যাওয়ার ট্রেন ছিল আমাদের। এত সময় বসে না থেকে প্ল্যান করলাম সাইন্স সিটি থেকে ঘুরে আসি। মাথায় সিনেমার আইডিয়াটাও ঘুরপাক খাচ্ছিলো খুব। তাই আগে শিয়ালদাহ স্টেশনের দিকে চলে গেলাম প্রাচী সিনেমা হলে।

সবাই মিলে দেখে নিলাম ইয়েতি অভিযান। সিনেমা শেষ হলো দুপুর ১টার দিকে। প্রাচী থেকে উঠে গেলাম সল্ট লেকের বাসে। গন্তব্য সাইন্স সিটি। সাইন্স সিটির সামনে বাস নামিয়ে দিল, ভাড়া রাখলো ৯ রুপি।

সাইন্স সিটি, ছবিঃ লেখক

সাইন্স সিটির টিকেট ৫০ রুপি দিয়ে কিনে হড়হড় করে ঢুকে পড়লাম কলকাতার বিখ্যাত সাইন্স সিটিতে। আমাদের নভো থিয়েটারের মতোই তাদের এই সাইন্স সিটি, তবে বিজ্ঞানের চেয়ে বেশি পার্ক মনে হলো আমাদের।

গরম ছিল বেশি তাই গাছের ছায়ায় বসে পড়াটাই শ্রেয় মনে করলাম। সাইন্স সিটির একটা অংশ ভালো লেগেছে খুব, দুটো উঁচু ভগ্নপ্রায় ভবনকে এক করে একটা সেতুর মতো বানানো হয়েছে যার উপর গজিয়েছে অনেক গাছপালা। পুরো ব্যাপারটা দেখলে বহু বছর পর পৃথিবীর অবস্থা সম্পর্কে ধারণা আসে। সাইন্স সিটি থেকে বের হয়ে দেখলাম পানিপুরি বানাচ্ছে এক লোক।

তিনটা পানিপুরি দশটাকা। পানিপুরি খেয়ে যা বুঝলাম আমাদের দেশের ফুচকা এর চেয়ে ঢের ভালো। আর পানিপুরি না খাওয়ার প্রতিজ্ঞা করে বিকেল ৫টায় ট্যাক্সি করে হোটেলে চলে আসলাম।

ফেরার পথ , ছবিঃ লেখক

ব্যাগপত্র গোছানো ছিল আগেই, শুধু গায়ের জামাটি পাল্টে হালকা কিছু পরে নিলাম। কারণ সামনে ৩৩ ঘণ্টা টানা রেল ভ্রমণ। ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম হাওড়া স্টেশনে। কিছু বিস্কিট আর ব্রেড কিনে খুঁজে বের করা হলো “নাইন বি” প্ল্যাটফর্ম।

কালকা যাওয়ার কালকা মেইল ছেড়ে যাবে এই প্ল্যাটফর্ম থেকেই। ঠিক রাত আটটায় ট্রেন ছেড়ে দেয় আমাদের। শিমলা যেতে হলে প্রথমে কালকা যেতে হয়। সেখান থেকে টয় ট্রেনে আরো ৬ ঘন্টার পথ শিমলা। শিমলার গল্প লিখতে বসবো অন্য কোনো দিন, অন্য কোনো সময়ে।
ফিচার ইমেজ- লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রাই রাইয়া উপাধিপ্রাপ্ত দেওয়ান দয়ারামের দয়ারামপুর রাজবাড়ি

বিশ্বের কয়েকটি অদ্ভুত আকৃতির নির্মাণ