খুলনার রূপসা নদীর তীরে ক্যাম্পিং ও ফিশ বার বি কিউ

শীতকালটাই আমাদের দেশে ক্যাম্পিংয়ের জন্য সবচেয়ে ভালো সময়। এ বছর আমি খুলনা চলে আসাতে ক্যাম্পিং করার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। অবশ্য গত জুলাইয়ে মোংলায় একবার ক্যাম্পিং করেছিলাম, গরম ও বৃষ্টি ভালোই ভুগিয়েছে সেদিন। এর মধ্যে খুলনা সাইক্লিস্টসের সাথে আমার বেশ ভালো একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

তাদের কয়েকজনকে বেশ উৎসাহী মনে হলো ক্যাম্পিংয়ের ব্যপারে। আসলে সাইকেল চালিয়ে দূরে কোথাও ক্যাম্পিং করতে যাওয়ার মজাই আলাদা। সমস্যা দেখা দিলো পুরো দলে তাঁবুর সংখ্যা মাত্র একটি, সেটা আমার। সাইক্লিং করি বলে আমি কিনেছিলাম ন্যাচার হাইকের আল্ট্রালাইট তাঁবু, এতে দুজনের বেশি থাকা সম্ভব না।

পথ চলার শুরু; ছবি- লেখক

অন্তত আরেকটা তাঁবু দরকার ছিল। পিক ৬৯ অ্যাডভেঞ্চার শপে ফোন দিয়ে জানতে পারলাম আমারটার মতো একটা মাত্র তাঁবুই ওদের কাছে অবশিষ্ট আছে, সেটা অনলাইনে অর্ডার করে দিলাম। পরের দিনই কুরিয়ারে চলে আসলো তাঁবু। রেজাউলকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম জায়গা খুঁজে বের করার, সে রূপসা উপজেলার বিরাট বাজারের কাছে একটা জায়গা খুঁজে বের করে ফেললো।

রাতের বেলা গ্রামের রাস্তায় ছুটে চলেছে সাইকেল; ছবি- লেখক

দেখা গেলো মোট পাঁচজন হয়েছি আমরা এই ট্রিপের জন্য। কামাল ভাই, আমি, রেজাউল, সালমান ও মিসবাহ। রাতের খাবারের জন্য সালমান আগে থেকে ভেটকি মাছ কিনে রেখে দিয়েছে। বার বি কিউ করার জন্য একটা গ্রীলও কেনা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে আমরা সবাই মিলে সোনাডাংগা থেকে রওনা দিলাম।

ক্যাম্প সাইট; ছবি- মোস্তফা কামাল

বটিয়াঘাটা হয়ে যেতে হবে, দূরত্বের হিসেবে ১০ কিলোমিটারের বেশি হবে না বটিয়াঘাটা বাজার। রাতের আঁধারে চালানোর জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল সবারই। সাইকেলের ফ্রন্টলাইটের উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে আমরা আধা ঘণ্টারও কম সময়ে পৌঁছে গেলাম বটিয়াঘাটা বাজারে। আমার পিঠে প্রায় ১০ কেজি ওজনের ব্যকপ্যাকের কারণে একটু বেগ পেতে হচ্ছিলো, বিশেষ করে ব্রীজে উঠার সময়।

বটিয়াঘাটা বাজারে এসে দেখি নৌকা ওই পারে আছে, এখন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। অবশ্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না, আওয়াজ শোনা গেলো ইঞ্চিনচালিত নৌকার। নৌকা ঘাটে আসার পর আমরা নামতে শুরু করলাম। ভাটা চলছে নদীতে, পিচ্ছিল সিঁড়ি বেয়ে নৌকায় উঠতে বেশ কষ্টই করতে হলো। উঠেই শুনলাম ওপারে কাদা আছে অনেক, এপারটায় সহজ ছিল নাকি।

চলছে ফিশ বার বি কিউ; ছবি- রেজাউল করিম

কিছুক্ষণের মধ্যে ওপারে পৌঁছে দেখলাম আসলেই বিষয়টা সত্য। কাদার ওপর পেতে রাখা হয়েছে কয়েকটা বাঁশ, এটার উপর দিয়েই যেতে হবে। রীতিমতো পরীক্ষা এবার, এক হাতে সাইকেল ধরে কাদার উপর পেতে রাখা এই বাঁশের মধ্য দিয়ে অনেক কষ্ট করে উপরে উঠে আসলাম আমরা। নদীর ধার ধরেই এই রাস্তা, এখন এই রাস্তায় কোথাও একটা ক্যাম্প করার মতো জায়গা খুঁজে নিলেই হবে।

কয়েক কিলোমিটার নদীর ধার দিয়ে চালানোর পর চলনসই একটা জায়গা খুঁজে পেলাম যেখানে ক্যাম্প করা যায়। প্রথমেই তাঁবু খাটানোর কাজ শেষ করলাম আমরা, এর মধ্যে দুজন গিয়ে রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় লাকড়ি নিয়ে আসলো আমাদের স্থানীয় হোস্টের বাসা থেকে। এরমধ্যে সালমান লেগে পড়লো মাছ কাটাকাটি আর মশলা মাখানোর কাজে। আমি গিয়ে যথারীতি মাছ ধরার জন্য ফাঁদ পেতে আসলাম।

পুরো ট্রিপের ভিডিও

একটু পরে বিপত্তি দেখা দিলো। স্থানীয় কয়েকজন লোক এসে আমাদেরকে তাদের বাড়িতে অতিথি হবার জন্য অনুরোধ করতে লাগলো। এই পলিথিনের বাড়িতে তীব্র শীত আর কুয়াশায় আমরা কিছুতেই টিকতে পারবো না বলেই তাদের বিশ্বাস। কিছুতেই তাদেরকে বোঝাতে পারছিলাম না আমরা। শেষে আমি বললাম, আসলে আমরা একটা পরীক্ষা দিচ্ছি, এটাতে আমাদের পাশ করতেই হবে, এটা শুনে তারা নিরস্ত হলো।

অবশ্য তাদের ফোন নাম্বার দিয়ে গেল, জানালো আশেপাশের ঘেরেও তাদের লোকজন পাহারায় থাকে রাতে, যেকোনো প্রয়োজনে যেন আমরা যোগাযোগ করি। এর মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে শুরু হয়ে গেছে মাছের বার বি কিউ তৈরীর কাজ। সুগন্ধে পুরো এলাকা মৌ মৌ করা শুরু করলো। ক্ষুধার্ত থাকার জন্য কিনা জানি না, এক টুকরো মুখে দিয়ে মনে হলো একাই এ দুটো মাছ আমি খেয়ে ফেলতে পারবো।

মাছের বার বি কিউ ছিল অসাধারণ; ছবি- রেজাউল করিম

রান্নার শেষের দিকে আবার একটু ঝামেলা লাগলো, আমাদের লাকড়ি শেষ। এখানে অনেকগুলো বাবলা গাছ আছে, যেগুলোর শুকনো ডাল খুব ভালো জ্বালানি হতে পারে। কিন্তু কাটাযুক্ত এ ডাল ছাড়ানো সহজ কাজ নয়। তখন মনে পড়লো, আমার তো ফুল গ্লাভস রয়েছে, সেগুলো পরে সহজেই গাছ থেকে কিছু শুকনো ডাল ভেঙে নিতে পারলাম, যেটা দিয়ে রান্নার কাজ শেষ করা গেল।

নুডলস, ভেটকি মাছের বার বি কিউ আর সামান্য আলুর তরকারি, এই দিয়েই চমৎকার খাওয়া দাওয়া শেষ করে আমরা যখন তাঁবুতে ঢুকলাম তখন রাত ১২টার বেশি বাজে। মাছের ফাঁদে ছোট সাইজের গলদা চিংড়ি আর একটা কুইচ্চা ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায়নি। চিংড়িটা আগুনে পুড়িয়ে খেয়ে ফেলা গেল।

রাতের খাবার; ছবি- রেজাউল করিম

রাতে ঘুমাতে এসে দেখি তাঁবুর ফ্লায়ার শিশিরে পুরোপুরি ভিজে আছে, ভেতরে অবশ্য শুকনোই আছে। আমি আর কামাল ভাই এক তাঁবুতে আর বাকি তিনজন অন্য তাঁবুতে। ওরা তিনজন সাইজে ছোটখাটো হওয়াতে এবং শীতকাল হওয়াতে ঠিকমতোই থাকতে পারছে। তাঁবুর মধ্যে স্লিপিং ব্যাগের ভেতর ঢুকে আরামদায়ক উষ্ণতায় চমৎকার ঘুম দিলাম। খুব সকালে পাখির ডাকে ঘুম ভেঙে বাইরে বের হয়ে আসলাম।

ভোরের আলোয় ক্যাম্পসাইট; ছবি- মোস্তফা কামাল

কী চমৎকার দৃশ্য। সূর্য উঠি উঠি করছে। চারদিকে শিশিরভেজা প্রকৃতি, ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে আমার ফিশিং ট্র‌্যাপের খোঁজ নিতে গেলাম। বেশ কিছু পুটি আর কয়েকটা চিংড়ি মাছ ধরা পড়েছে। কিন্তু আমরা এখনই ফিরবো দেখে এদেরকে ছেড়েই দিতে হলো। ঘেরের লোকজন এই সকাল বেলায় তাদের ধরা মাছ বাজারে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিছুক্ষণ সেগুলোও দেখলাম, এর মধ্যেই সূর্য উঠতে শুরু করলো। এবার ফেরার পালা আমাদের নগরীতে। শিশিরে ভেজা রাস্তা ধরে আমরা ফিরে আসলাম খুলনায়। এ ট্রিপে আমাদের জনপ্রতি খরচ ২০০ টাকারও কম পড়েছে।

ফিচার ছবি: লেখক

Loading...

One Comment

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

টাইম ম্যাগাজিনের চোখে ২০১৮ সালের বিশ্বের অন্যতম সেরা ১০টি ট্যুরিস্ট স্পট

ট্রানজিটের অবসরে…