রূপমুহুরী ঝর্ণার সন্ধান পেতে ঘুরে আসুন আলিকদম

dav

অপার সৃষ্টির মহিমার সম্ভব ক্ষুদ্র বিচরণ। বাকি থাকে অজস্র অজানা। তারপরও শেষ নেই বিস্ময়ের। চলতে থাকে অবিরাম অনুসন্ধান, অদেখাকে দেখার, অজানাকে জানার।

বেশ কিছুদিন ধরে ব্যস্ত শহরে যখন অবসাদগ্রস্ত হয়ে উঠছিলাম তখনই চিন্তা করলাম নির্জনে প্রকৃতির সাথে একটি দিন পার করতে। অবশেষে গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার যাওয়াতে সেই সুযোগটি চলে আসলো। লামা ও আলিকদম উপজেলা বান্দরবান জেলাতে হলেও কক্সবাজার থেকে এসব উপজেলার দূরত্ব অনেক কম। লুফে নিলাম সেই সুযোগও।

যাত্রা শুরু হয়েছিল আলিকদম ঘাট থেকে।  ছবি :লেখক। 

আমরা গিয়েছিলাম বান্দরবান জেলার আলিকদমের রূপমুহুরী ঝর্ণার সন্ধানে। চকরিয়া থেকে চাঁদের গাড়িতে যেতে যেতে সকালের মেঘে ঢাকা চারদিকের পাহাড়গুলো দেখতে অসাধারণ লাগছিল। পাহাড়গুলো তখন মেঘের সাথে একেবারে একাকার।

আমরাও অনেকক্ষণ ধরে উপভোগ করলাম মেঘ-পাহাড়ের খেলা । আলিকদম ঘাটে এসে মাঝিকে দেখলাম হতাশ। তার কথা হলো নদীতে পানি যত বেশি হবে তার নৌকা তত ভালোভাবে চলাচল করতে পারবে। কিন্তু এখন পানি কম।

চলতি পথে।  ছবি : লেখক। 

আলিকদম থেকে স্রোতের বিপরীতে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় রূপমুহুরী যেতে সময় লেগেছে সাড়ে চার ঘণ্টা। পাহাড় সমেত গহীন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে মাতামুহুরি অতিক্রম করতে আপনার লাগবে না বিন্দুমাত্র বিরক্ত। কখনো শেয়াল দূর থেকে অবাক পানে চেয়ে থাকবে আপনার পথচলা।

দেখতে পাবেন নিবিষ্ট মনে ঘাস খেতে থাকা শুকর, বানরের নাচানাচি। বানরের খাওয়ার মতো কোন খাবার থাকলে নৌকা থেকেই আরও কিছু সময় তাদের সাথে উপভোগ করতে পারবেন। তবে স্থানীয়দের মতে আরও অনেক ধরনের বন্য প্রাণী রয়েছে এই জঙ্গলে।

যেতে যেতে চোখে পড়বে এমন অসংখ্য বাঁক।  ছবি : লেখক। 

যতই পথ শেষ হতে থাকে নদীও তত সরু হতে থাকে আবার তার সাথে পাল্লা দিয়ে স্বচ্ছ হচ্ছে নদীর জল। বিশাল বিশাল পাথরগুলোকে দেখলে মনে হবে শিল্পরুচি সম্মত কেউ যেন এসে বসিয়ে দিয়ে গেছে। দেখতে পাবেন দূর জঙ্গল থেকে বাঁশ, কাঠ কেটে ভেলায় ভেসে বাড়ি ফেরা কাঠুরিয়াকে। ধীর গতিতে চলতে থাকা এসব ভেলাতে করে তার বাড়ি ফিরতে হয়তো ২/১ দিন লেগে যেতে পারে।

এভাবে বাঁশ, কাঠ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে পাহাড়ের শত শত পরিবার। আবার অনেকে এসব জঙ্গল থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে লম্বা চালা বানিয়ে ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে লোকালয়ে ফিরছে। অদ্ভুত হলেও সত্য এমন অনেকজনকে দেখা গেলেও দেখলাম না কারও সাথে কাউকে কথা বলতে। নীরবে যে যার কাজ করে যাচ্ছে।

চলে আসলাম আসল গন্তব্যে।  ছবি : লেখক। 

আবার কী শৈল্পিকভাবে আদিবাসীরা জুম চাষ করছে তা অনুধাবন করতে পারবেন নৌকাতে বসেই। ঢালু পাহাড়েই চলছে তাদের চাষাবাদের কারুকাজ। এসব এলাকায় বসবাস বলতে দেখা যায় অল্প কিছু আদিবাসী ।

৯টায় আলিকদম থেকে যাত্রা শুরু করে আমাদের আসল গন্তব্য স্থলে পৌঁছেছি দুপুর ১.৩০ এ। অর্থাৎ পোয়ামুহুরী বাজারে। বাজার থেকে ১০ মিনিট হাঁটলেই রূপমুহুরী ঝর্ণা । দূর থেকে দেখে মনটা কেমন বিষিয়ে গেল। মনে হচ্ছে ছোট, পানি কম। যার জন্য এত ধকল কাটিয়ে আসলাম! কাছে যেতেই ভুলটা ভেঙে গেল।

মাতামুহুরি নদীতে দাপিয়ে বেড়ানো।  ছবি : লেখক। 

দেখতে পেলাম অনেক উঁচু থেকে বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে তীব্র বেগে নেমে আসছে ঝর্ণার পানি। প্রায় দুইশ ফুট উপর থেকে পড়ে এ ঝর্ণার পানি। যার নিচে একটানা ২/৩ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকা চ্যালেঞ্জ বটে।

ঝর্ণা দেখা শেষ করে আরেক পশলা নিজেদের দাপিয়ে নিলাম স্বচ্ছ মাতামুহুরির জলে। স্রোতের সাথে ভেসে বেড়ালাম আপন মনে। যে মাতামুহুরিকে দেখতে একচোখে তাকিয়ে থাকতে হয়। সেই মাতামুহুরির উজানেই ছোট্ট ছড়ার মতো হাঁটু পানিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছি, ভাবতেই অবাক লাগছে।

সাড়ে তিনটায় আমরা ফিরতি যাত্রা শুরু করলাম। সৃষ্টির নৈসর্গিক সৌন্দর্য অনুভব করতে করতে আলিকদমের দিকে ছুটছে নৌকা । স্রোতের অনুকূলে হওয়ায় যাওয়ার চেয়ে দেড় ঘণ্টা কম সময়ে ফিরে আসা সম্ভব হয়েছে। আসার পথে যখন দেখবেন মেঘ-পাহাড়-জলে একাকার হয়ে আছে, মনে হবে এর চেয়ে সুন্দর বিকেল আর হতেই পারে না। এমন পরিবেশকে শুধু অনুভব করা যায়, প্রকাশ করা অসম্ভব।

মেঘ-পাহাড় আর জ্বলে একাকার।  ছবি : লেখক। 

একসময় অবহেলিত এলাকা হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ভ্রমণপিপাসুরা অনুসন্ধান করে বের করে নিয়ে এসেছে প্রকৃতির লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্যকে। চোখে পড়ার মতো পর্যটক সারাদেশ থেকে এখন আসে আলিকদমের দামতুয়া ঝর্ণা, রূপমুহুরী ঝর্ণা, আলির গুহা দেখার জন্য।

খাবার-দাবার:

ওখানে আপনার পছন্দমতো খাবার নাও পেতে পারেন। তাই সবচেয়ে ভালো হয় আলিকদম থেকে খাবার সাথে নিয়ে যাওয়া। তবে একটি ছোট বাজার ওখানে আছে (পোয়ামুহুরী)। সেই বাজারে কলা, বিস্কুট, মুড়ি, চানাচুর এসব পাবেন। আর আলিকদমে থাকার হোটেলের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। আপনার কক্সবাজার বা চট্টগ্রাম গিয়ে রাত কাটাতে হবে।

যেভাবে যাবেন:

দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে কক্সবাজারের গাড়িতে উঠে চকরিয়া বাসস্টেশন নামবেন। চকরিয়া থেকে চাঁদের গাড়িতে সরাসরি আলিকদম- ৭৫ টাকা নেবে। আলিকদম থেকে রূপমুহুরী ঝর্ণা ইঞ্জিন নৌকা- ৫,৬০০ টাকা (আসা-যাওয়া)।

সতর্কতা :

*অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র সাথে রাখবেন (ফটোকপিসহ)
*যাওয়ার আগে আলিকদম সেনা ক্যাম্প এ সবার নাম ঠিকানা জমা দিবেন। ঠিক যতোজন যাবেন ততোজনের নাম দিবেন। পরে আরও দুইটা চেকপোস্ট আছে সেনাবাহিনীর (জানালী পাড়া ও কুরুকপাতা) । আপনারা চেকপোস্ট গুলোতে পৌঁছানোর আগেই তাদের কাছে আপনাদের সকলের নাম চলে যাবে। তাই হিসাবে যাতে কোন গড়মিল না হয় সেদিকটা খেয়াল রাখবেন।

  • স্থানীয়দের কোনো ধরনের বিরক্তির কারণ হবেন না।
    *যাওয়া-আসার পথে তীরের দিকে নৌকা ভেড়ানোর জন্য মাঝিকে উৎসাহিত করবেন না। এতে যে কোনো ধরনের বিপদ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
  • দীর্ঘ নৌকা ভ্রমণের পথ তাই আলিকদম থেকে যত সকালে রওনা হতে পারবেন প্রকৃতিকে তত বেশি সময় ধরে উপভোগ করতে পারবেন।

ফিচার ইমেজ : মোমেন উদ্দিন। 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্বের ১০ টি বিস্ময়কর মরুভূমি!

প্রাচীনতম জনপদ নারায়নগঞ্জের আনাচে কানাচে একটি দিন