রক্তদহ বিল: এক অদেখা ভালোবাসার গল্প

রক্তদহর বিল। ছবিঃ লেখক

কখনো কখনো ট্রেন লেট যে কারো কারো জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিতে পারে সেটা জানা ছিল না। কিন্তু এই ঈদের ছুটিতে সান্তাহার থেকে ঢাকায় ফেরার ট্রেনে উঠতে গিয়ে ট্রেন লেটের কারণে দুর্লভ আশীর্বাদের অভিজ্ঞতা হলো।

সান্তাহার থেকে ঢাকায় ফেরার জন্য আমাদের নির্ধারিত ট্রেনের সময়কাল ছিল বিকেল ৪:২০। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে স্টেশনে এসে সহকারী স্টেশন মাস্টারের কাছে জানতে পারলাম আমাদের ট্রেন এখনো শুরুর সেই দিনাজপুর স্টেশন থেকেই ছাড়েনি! যার মানে হলো অন্তত ৩ ঘণ্টা ট্রেন লেট! নিজেকে একটু শান্ত করতে পাশের পুকুর পাড়ের গাছের ছায়ায় গিয়ে বসলাম মেজাজ আর ঘর্মাক্ত শরীর ঠাণ্ডা করতে।

সান্তাহার। ছবিঃ লেখক

কিছুক্ষণ বসার পর পুরনো “ভালো লাগা” মনের মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল। সেই স্কুলে পড়ার সময় এই সান্তাহারের একটি বিশেষ জায়গার প্রতি একটা একেবারেই অন্য রকম কারণে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। সেই জায়গাটার নাম “রক্তদহ বিল”। মনে পড়তেই সামনে এক রিক্সাওয়ালাকে পেয়ে গেলাম।

জিজ্ঞাসা করলাম এখান থেকে “রক্তদহ বিল” যেতে আসতে কত সময় লাগবে? তিনি জানালেন যেতে ২০-২৫ মিনিট আর ফিরে আসতেও তেমনই। হিসেব করে দেখলাম যেতে আর ফিরে আসতে এক ঘণ্টা লাগলে আর সেখানে যদি এক ঘণ্টাও ঘুরে দেখি তার পরেও স্টেশনে ফিরে এক ঘণ্টা অন্তত হাতে থাকবে। সুতরাং আর সময় নষ্ট করা নয় কিছুতেই! উঠে পড়লাম।

ছেলেকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম কিশোর কালের অদেখা ভালো লাগার সেই “রক্তদহ বিল” দেখতে।

বিলের পথে। ছবিঃ লেখক

সেই যখন স্কুলে পড়ি, তখন থেকেই আমার তুমুল আগ্রহ, একদিন সময় পেলে রক্তদহ বিল দেখতে যাবো। তখন পার্বতীপুরে থাকি। নানা রকম কথা প্রসঙ্গে একদিন বন্ধুদের কাছে সান্তাহারের এই “রক্তদহ” বিলের নাম শুনি। নাম শুনেই কেমন যেন একটা রোমাঞ্চ অনুভূত হয়েছিল সেদিন আর ঠিক করেছিলাম একদিন সময় করে অবশ্যই “রক্তদহ বিল” দেখতে যাবো।

কিন্তু ১৩ বছর বয়সের সেই অদেখা ভালো লাগা ২৩ বছরে এসে বুকের ভেতরে কবে যেন ছাই চাপা পড়ে গিয়েছিল, বুঝতেই পারিনি। আবার সেই ইচ্ছে জাগ্রত হলো ৩০ বছরে এসে। যখন বছরে অন্তত একবার নওগাঁ যাওয়া-আসা শুরু করতে হলো। ২০১০ থেকে প্রতি বছর নওগাঁ যাবার আগে আমার নিজের ঘুরে দেখার তালিকায় প্রথমে থাকে এই কৈশোরের অদেখা ভালো লাগার জায়গা “রক্তদহ বিল”। কিন্তু কেন আর কীভাবে যেন সব হয়, সব জায়গায় যাওয়া হয়, শুধুমাত্র এই ভালো লাগার জায়গাটায় যাওয়া হয়ে ওঠে না কিছুতেই।

মুগ্ধ পথে। ছবিঃ লেখক

অনেকেই ভাবতে পারেন, আরে বলে কী সে, এত এত জায়গায় একা একা ঘুরে বেড়ায় আর সান্তাহারের রক্তদহ বিলে যেতে ভয় পাচ্ছে নাকি! হ্যাঁ, সত্যি একটা ভালো লাগার পাশাপাশি কিছুটা ভয়ের কারণ আছে বৈকি বা ছিল বলা যায়। তা হলো অনেকের কাছে এই “রক্তদহ বিলের” গল্প শুনেছি যেটা একটু গা শিরশিরে অনুভূতির মতোই ভয়াবহ! কথিত আছে বলে শুনেছি, ব্রিটিশ শাসনামলে এই বিলে অনেক অনেক মানুষকে কেটে ভাসিয়ে দেয়া হতো নির্জনে! যাদের খবর আর কেউ কোনোদিন পেত না।

সবুজের বুক চীরে। ছবিঃ লেখক

একবার নাকি কোন এক ব্রিটিশ এবং স্থানীয় জমিদারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত হবার খবর পেয়ে সেই রাজা আর ব্রিটিশরা মিলে বহু মানুষকে একত্রে এই বিলের জলে কেটে ভাসিয়ে দেয়। এত মানুষকে একসাথে কাটা হয়েছিল যে পুরো বিলের পানি রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। পুরো বিলের সেই রক্তে রাঙা লাল পানি দেখে মুখে মুখে এই বিলের নাম হয়ে গিয়েছিল “রক্তদহ বিল!” তো এই গল্প শোনার পর থেকে আমার “রক্তদহ বিল” দেখার আগ্রহ যেমন বেড়েছে, সেই আগ্রহের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে এর সাথে মিশে থাকা সত্য বা মিথ্যে ইতিহাস। তবে যখনই মনে পড়েছে এই রক্তদহ বিলের কথা, রোমাঞ্চিত হয়েছি বার বার।

আহ চলার শুরুতেই একরাশ মুগ্ধতা আর অপার সৌন্দর্য বিমোহিত। শুরুতেই বড় একটা দীঘির মাঝ দিয়ে করা রেল স্টেশনের সাথে লাগোয়া রাস্তা। একদম টলটলে যার পানি, ঝিরঝিরে বাতাসে শরীর মন দুটিই জুড়িয়ে গেল। আমার চিরাচরিত ভালো লাগার পথ আর পথের দুই ধারের অপরূপ দৃশ্য।

আঁকাবাঁকা পিচঢালা মিহি পথের দুই পাশে সবুজের আস্তরণ আর সবুজের মাঝে মাঝে লাল ইটের তৈরি ব্রিটিশ আমলের রেল কলোনির সরকারী বাস ভবন। টিনের চাল, লাল ইটের দেয়াল, সবুজ গালিচা আর এক চিলতে উঠোন, কোনো কোনো বাসার সাথে লাগোয়া সবজি বা ফুলের বাগান। সবকিছু মিলে এক কথায় অপূর্বর চেয়েও বেশী কিছু।

সবুজ মাঠে কৃষকের ব্যাস্ততা। ছবিঃ লেখক

বাঁকা পথ, সবুজ প্রান্তর আর পুরনো রেল কলোনি পার হতেই আমাদের ব্যাটারি বাহন উঠে পড়লো নওগাঁ-বগুড়া বাইপাস সড়কের চওড়া পিচ ঢালা পথে। এই পথের অপরূপ রূপ এর আগেও একবার কিছু সময়ের জন্য চোখে পড়েছিল শেষ সন্ধ্যায়।

চওড়া রাস্তার ঠিক উপরে কোথাও মেঘ আর কোথাও মেঘমুক্ত নীল আকাশে সাদা মেঘেদের ওড়াউড়ি, রাস্তার দু’পাশে তাল গাছের অপূর্ব সৌন্দর্য, মিহি পিচ ঢালা পথে ছায়া ঘেরা প্রান্তরের দিকে ছুটে যাওয়া, সবুজ ধান ক্ষেতের মাঝে ছোট ছোট ইটের বাড়ি, পুরোপুরি ছায়া ঘেরা এক মিহি পথ ধরে এগিয়ে চলেছি অনেক অনেক আর অনেক অপেক্ষার রক্তদহ বিলের দিকে।

একটি পরেই রাস্তার দুপাশের তালগাছ অপরূপ পথ ছেড়ে, কাঁচা মাটির পথে চলতে শুরু করলো আমাদের অটো রিকশা। এখানে কাছে রাস্তার দু’পাশে নানা রকম সবুজ গাছ, ধান ক্ষেতের সবুজ প্রান্তর, আর একটু দূরেই চোখে পড়লো অনেক অপেক্ষার আর সাধের সেই রক্তদহ বিল। রিকশা ড্রাইভার জানালো।

রক্তদহর বিলের শুরু। ছবিঃ লেখক

শোনা মাত্র চোখ তুলে তাকাতেই কেমন যেন একটা রোমাঞ্চ অনুভব করলাম নিজের ভেতরে। একটা অস্থিরতা বা ছটফটানি অনুভূতি! রিকশা যেন আগের চেয়ে ধীর হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও কাদাময় পথে থেমে নেমেও যেতে হয়েছে। শেষে অস্থির চিত্তের আমি নেমেই গেলাম রিকশা থেকে পায়ে হেঁটে যেতে।

মনে হলো এই রিক্সার চেয়ে পায়ে হেঁটেই আমি বেশী দ্রুত চলে যেতে পারবো। আর তাই করলাম, দুই পাশের শান্ত জলাশয়, মিহি ধান ক্ষেত, ছোট সেচের আইল, মাটির মেঠো পথ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম কাঙ্ক্ষিত সেই রক্তদহ বিলের শুরুতে।

বেশ কয়েকটি বট গাছের ছায়ায় মাখামাখি কাঁচা রাস্তার শেষ প্রান্তে পৌঁছাতেই চোখে পড়লো সাইনবোর্ড, রক্তদহ বিলের পরিচিতি। বিশাল আয়তনের এক জলাশয়, যা নওগাঁ, বগুড়া হয়ে ছুঁয়ে গেছে দেশের বিখ্যাত চলন বিলের সাথে। যতদূর চোখ যায় শুধু টলটলে জলের সমারোহ, মাঝে মাঝে গুচ্ছ গ্রামের মতো কয়েকটি বাড়ি নিয়ে কারো কারো আবাস, নৌকায় করে বেড়াতে আসা ছেলে মেয়েদের ভেসে বেড়ানো হালকা ঢেউয়ের দোলায় দোল খেয়ে চলেছে সবাই।

টলটলে স্বচ্ছ জলের মাঝে মাঝে সবুজ কচুরিপানার দল, জলজ গুল্মলতা, মাছের আনগোনা, দুই একটি সাপের নরম জলের ভেতরে নিজের মতো করে ছুটে চলা। অনেক দিন পর চোখে পড়লো মাছরাঙা পাখি। ঝুপ করে জলে ডুব দিয়ে ঠোঁটে করে তুলে নিল নিজের আহার একটি রুপালী মাছ! আমার ছেলে তো এই দৃশ্য দেখে যার পর নাই অভিভূত! কীভাবে, কেন একটি আকাশে উড়তে থাকা রঙিন পাখি, পানির মধ্যে ডুবে থাকা কোনো মাছকে লুফে নিতে পারে!

ডিঙি নৌকায় বিলের জলে। ছবিঃ লেখক

এরপর বটের শেকড় ধরে নেমে গেলাম বিলের জলের শীতল স্পর্শ পেতে, সবুজ কচি ঘাসের কোমলতার স্বাদ নিতে, কাঁচা মাটির গন্ধ নিতে, জল-কাদার সুখ ছুঁতে আর ঝিরঝিরে বাতাসের মিহি পরশ পেতে। নরম ঘাসের উপরে বসে, ঝিরঝিরে বাতাস গায়ে মাখতে মাখতে পা ডোবালাম রক্তদহ বিলের স্বচ্ছ জলে। কী অদ্ভুত একটা আনন্দের শিহরণে শিহরিত হলাম, বলে বা লিখে বোঝানোর মতো নয় আদৌ।

চারদিকে যেদিকেই চোখ যায় শুধু পানি আর পানি, কোথাও কচুরিপানার সবুজ জটলা, কোথাও জেলেদের মাছ ধরার ডিঙি নৌকার দোলা, কোথাও দূরের গুচ্ছ গ্রামে হাঁস, গরু, ছাগলের মায়াবী ডাক। গাছে আর ঘাসে উড়ে উড়ে এসে বসছে, আসতে যাচ্ছে, উড়ছে, নিজের মতো করে খেলা করছে নানা রঙের ফড়িং আর কীটপতঙ্গ। সেসব এক অবাক বিস্ময় আর নানা রকম প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল ছেলেকে।

সবুজ ঘাসে রঙিন ফড়িং! ছবিঃ লেখক

চারপাশের এই বিশুদ্ধ, কোমল আর স্বচ্ছ জলাশয়, মিহি ঘাসের নরম স্পর্শ, টলটলে জলের শীতল পরশ, ইচ্ছে করেই কাদায় একটু মাখামাখি, কাছে দূরের সবুজ গ্রামের হাতছানি, অসময়ে কোকিলের কুহুতান, আকাশে উড়ে চলা গাঙচিল, ঝিরঝিরে বাতাসের কোমল পরশ, মাটির কাঁচা রাস্তার ধুলোময় পথ, ঘাঁটে বাঁধা আর ভেসে চলা ডিঙি নৌকা, জেলেদের মাছ ধরা, নানা রকম গাছে গাছে আচ্ছাদিত মেঠো পথের অপার সুখে ভেসে ভেসে, দেখে দেখে, হেঁটে হেঁটে অবশেষে চলে এলাম আমাদের অটো রিক্সার কাছে।

তবে আফসোস হয়েছে খুব ফিরে আসার বেলায়। কেন সময়টা আরও দীর্ঘ হলো না, কেন নীরবে, এমন নির্জনে, শীতল আইলে, এই বিলের পাড়ে বা জলের মাঝে ভেসে থাকতে পারলাম না কিছুক্ষণ? তবে আফসোস হলেও অতৃপ্তি নেই। আবারো নওগাঁ আসবো যখন তখন নাহয় প্রাণ ভরে উপভোগ করবো রক্তদহ বিলের কোনো এক নির্জন ঝিঁঝিঁ ডাকা দুপুর, মিষ্টি রোদের ঝলমলে বিকেল, শীতল আর ঝিরঝিরে বাতাস ছুঁয়ে যাওয়া কোমল সন্ধ্যা, ঢেউয়ের জলে ভেসে ভেসে কোনো এক চাঁদনী রাত!

বিলের জলে কচুরিপনা। ছবিঃ লেখক

আমি তাই অপেক্ষার প্রহর গুনতে শুরু করেছি, আবারো কোনো এক সময় এমন করে, পুরো একটি দিন বা অন্তত একটি পুরো দুপুর, বিকেল আর সন্ধ্যা রক্তদহ বিলের অপার্থিব প্রকৃতির রঙ, রূপ, রস আর গন্ধ উপভোগের।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দক্ষিণ বলিভিয়ার সালার ডি ইউনি: বিশাল এক প্রাকৃতিক দর্পণ

রাফটিং রোমাঞ্চ তিস্তায়